আমাকে বাঁচাতে পারলি না তোরা! সৌদিতে নিহত নাজমার ভিডিও প্রকাশ, সামনে এল ভয়ংকর তথ্যও

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য় ওয়াল ব্যুরো: গত আট মাসে সৌদি আরব থেকে দু’হাজার ৬১১ জন শ্রমিকের মৃতদেহ এসেছে বাংলাদেশে! সে দেশের তথ্য মন্ত্রকের তরফে এই পরিসংখ্যানই প্রকাশ পেয়েছে সম্প্রতি। হিসেব করলে দাঁড়ায়, এক এক দিনে ১১টি করে কফিন এসেছে ঢাকায়। শুধু তাই নয়, এর মধ্যে প্রচুর পরিমাণে রয়েছেন মহিলা শ্রমিক।

ঢাকার একটি দৈনিক সংবাদপত্রের দাবি, সাড়ে তিন বছরে সৌদি আরবে কাজ করতে গেছেন বাংলাদেশের ২ লাখ ৬০ হাজার মহিলা। এই সাড়ে তিন বছরেই মহিলা শ্রমিকের মৃতদেহ ফিরে এসেছে প্রায় সাড়ে তিনশো। তাঁদের মধ্যে ৫৩ জনই আত্মহত্যা করেছেন বলে জানিয়েছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। তথ্য বলছে, আত্মহত্যার এই হার তিন বছর আগের চেয়ে ১৭ গুণ বেশি!

ওই সাড়ে তিনশো জনের মধ্যে ১২০ জনের মৃত্যুর কারণ হিসেবে আবার দেখানো হয়েছে, ‘স্ট্রোক’। চিকিৎসা মতে হৃদ্‌রোগের হার পুরুষের চেয়ে মহিলাদের কম। কিন্তু সৌদিকে কাজ করতে গিয়ে ২০ থেকে ৪০ বছরের সুস্থ মহিলারাও এত বেশি পরিমাণে স্ট্রোকের শিকার হচ্ছেন!

এই সব কিছুই সামনে এসেছে, সৌদিতে বাংলাদেশি মহিলা নাজমা বেগমের মৃত্যু, এক মাস ২৪ দিন পরে দেশে দেহে পেরা এবং তার পরে তাঁর একটি ভিডিওবার্তা প্রকাশ পাওয়ার পরে।

মানিকগঞ্জের বাসিন্দা নাজমা বেগমের স্বামী দেলোয়ার হোসেন মারা যান বছর দেড়েক আগে। তাঁর দুই সন্তানের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে ১১ মাস আগে সৌদি আরবে পাড়ি দিয়েছিলেন নাজমা বেগম। গত ২ সেপ্টেম্বর তাঁর রহস্যজনক মৃত্যু হয়। পরিবারের অভিযোগ, যাওয়ার আগে হাসপাতালে পরিচারিকার চাকরি দেওয়ার কথা বলা হলেও, নাজমাকে কাজ দেওয়া হয় এক জনের বাড়িতে। সেখানে তাঁকে যৌন নির্যাতনসহ নানাভাবে নির্যাতন করা হতো বলে অভিযোগ।

এই অভিযোগের সপক্ষে একটি ভিডিও প্রকাশিত হয়েছে সম্প্রতি। তাতে দেখা যায়, তিনি নির্যাতনের বর্ণনা দিয়ে, কাঁদতে কাঁদতে, তাঁকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কাতর আকুতি জানিয়েছিলেন পরিবারের কাথে। কিন্তু বাংলাদেশের যে দালাল সিদ্দিকুর রহমানের মাধ্যমে নাজমা গিয়েছিলেন, তার হাত-পায়ে ধরেও নাজমাকে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়নি বলে দাবি তাঁর পরিবারের।

দেখুন সেই ভিডিও।

মধ্যপ্রাচ্য থেকে দিনে আসছে গড়ে ১১টি কফিন। আট মাসে এসেছে ২ হাজার ৬১১টি। সাড়ে তিন বছরে শুধু সৌদি আরবেই গেছেন ২ লাখ ৬০ হাজার নারী। এই সাড়ে তিন বছরে নারী শ্রমিকের লাশ এসেছে প্রায় সাড়ে তিন শ। তাঁদের মধ্যে ৫৩ জনই আত্মহত্যা করেছেন বলে বলেছে সৌদি কর্তৃপক্ষ। আত্মহত্যার এই হার তিন বছর আগের চেয়ে ১৭ গুণ বেশি। তার মানে এই সময়ে তাঁদের ওপর নির্যাতনও ১৭ গুণ বেড়েছে? কোনটা আত্মহত্যা আর কোনটা হত্যা, তা-ই বা কে বলবে? কোন পরিস্থিতিতে পরিবারের দায়িত্ব নেওয়া কোনো নারী বিদেশবিভুঁইয়ে আত্মহত্যা করেন? নির্যাতন কোন চরমে গেলে মৃত্যুই হয় সহনশীল বিকল্প! ওই সাড়ে তিন শর মধ্যে ১২০ জনের মৃত্যুর কারণ ‘স্ট্রোক’। নারীদের হৃদ্‌রোগের হার পুরুষের চেয়ে কম। কিন্তু মৃত্যুপুরীতে ২০-৪০ বছর বয়সী তরতাজা নারীরাও হন স্ট্রোকের সহজ শিকার।নাজমা স্বজনদের বারবার বলেছিলেন, বাড়ি বিক্রি করে হলেও তাঁকে যেন বাঁচানো হয়। এই দেশে মানুষের চেয়ে বাড়ি অনেক মূল্যবান বিধায়, তাঁকে ফেরত আনার খরচ মেটানো যায়নি। সন্তানের জন্য জীবন দিতে পারেন মা। কিন্তু বিদেশির বান্দি যে, যৌন নিপীড়িত হতে হতে তার করুণ মৃত্যুতে কিসের সান্ত্বনা? দেশে মরলে খাটিয়া পেতেন, বিদেশে মরায় কফিন পেয়েছেন, বিমানে চড়ে ফিরতে পেরেছেন। এটুকু বটেই উন্নতি। কিন্তু এটাই কি প্রবাসী শ্রমিকের ভবিতব্য? মধ্যপ্রাচ্যে তাঁদেরও কি রোহিঙ্গা শরণার্থীদের মতো রাষ্ট্রহীন ভাবা হয়? ভেবে তেমন আচরণই কি করা হয়? ২০১৪ সালের আগের ছয় বছরে এসেছে ১৪ হাজার কফিন। উন্নয়নে গর্বিত রাষ্ট্রের টনক কি তারপর নড়ার কথা ছিল না?নাজমা বেগম কোনো ব্যতিক্রম নন। অনলাইন জগতে সৌদিতে আটকে পড়া অজস্র নির্যাতিত বাংলাদেশি নারীর আহাজারি দেখা যায়। গায়ে নির্যাতনের চিহ্ন, অঝোর কান্নায় ভেসে যাওয়া সেসব মুখের নারীরা একটা কথাই বলে যান বারবার, ‘আমাকে বাঁচাও, আমাকে ফেরাও’। এই আকুতি কেবল পরিবারের প্রতি না। তাঁরা তাঁদের সরকারকে ডাকেন, দূতাবাসকে ডাকেন। তাঁরা তাঁদের দেশকে ডাকেন, যেই দেশের ভোগবিলাসের প্রধান ভরসা এসব প্রবাসী নারীর পাঠানো রেমিট্যান্স। টাকা নাকি কথা বলে, কিন্তু প্রবাসী শ্রমিকের পাঠানো টাকার ভোক্তা যাঁরা, তাঁরা নীরব। বিভিন্ন দেশের বাংলাদেশি দূতাবাসে প্রবাসী শ্রমিকেরা অভিযোগ জানাতে গেলে অপমানিত হন, অনেক সময় মারও খান। আমাদের জাতীয় লাঞ্ছনার দৈর্ঘ্য কেবলই বাড়ে।ফারুক ওয়াসিফের লেখা প্রথম আলো থেকে নেওয়া। রেমিট্যান্স এর আশায় আর কত মা বোনকে বলি দিতে হবে? রাষ্ট্র তোমার কাছে কোন উত্তর আছে?আমরা নাহয় দরীদ্রই থেকে যাবো তবুও নরকে আর কাউকে যেন পাঠানো না হয়।

Sk Sabbir Hossain Miraz এতে পোস্ট করেছেন রবিবার, 27 অক্টোবর, 2019

এমনকি নাজমা মারা যাওয়ার পরেও তাঁর দেহ সৌদি থেকে দেশে ফিরিয়ে আনতে পারছিলেন না পরিজনেরা। শেষমেশ নাজমার দেহ আনার ব্যাপারে উদ্যোগ নেয় বাংলাদেশ সরকার। সরকারি নানা প্রক্রিয়া পার করে এক মাস ২৪ দিন পরে, গত বৃহস্পতিবার নাজমার দেহ দেশে এসে পৌঁছয়।

বাংলাদেশের পটভূমিতে নাজমা বেগমের এই চরম পরিণতি কোনও বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। সৌদিতে আটকে পড়া বহু নির্যাতিত বাংলাদেশি মহিলার এই ধরনের ভিডিও প্রায়ই সামনে আসে সোশ্যাল মিডিয়ায়। শরীরজুড়ে অত্যাচারের চিহ্ন, বুকফাটা কান্নায় কাতর মহিলারা বাঁচার জন্য, দেশে ফেরার জন্য আকুল আবেদন রাখেন।

নাজমাও কম কাঁদেননি। মৃত্যুর দু’দিন আগে শেষ বার বলেছিলেন, নির্যাতন করে তাঁকে কোথায় যেন নিয়ে যাচ্ছে তাঁর সৌদি ‘মালিক’। বলেছিলেন, “আমাকে আর বাঁচাতে পারলি না তোরা। আমাকে আর জীবিত পাইলি না।” সেই ভিডিও পাঠিয়েও ছিলেন তিনি। তবু বাঁচানো গেল না তাঁকে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More