বৃহস্পতিবার, জুন ২৭

ডিভাইডেড বাই কাঁটাতার, ইউনাইটেড বাই শপিং

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

ইদ-মরসুমে দুই বাংলা বাঁধা পড়ছে ফ্যাশন-সুতোয়!

–ভাইয়া একটা শুভশ্রী আনারকলি দেখান না!
–ভাইয়া আমার কিন্তু অমুক সিনেমায় দেবের মতো শেরওয়ানি লাগবে!
–ভাইয়া আমার বাবুটার জন্য বলিউডের নতুন কোনও স্টাইল দেখান না!

গোটা রমজান মাস জুড়ে কলকাতার ধর্মতলা চত্বরে ঘোরাঘুরি করলে এই শব্দবন্ধগুলো আপনার কানে আসবেই। সেই সঙ্গে মনে হতেই পারে হুট করে ঢুকে পড়েছেন বাংলাদেশেরই কোনও এক অভিজাত শহরে। প্রাক্-ইদের উৎসব মরসুমে এ যেন রীতিমতো এক মিনি-ঢাকা! যে দিকেই তাকাবেন, হৈ হৈ করে ঘুরে বেড়াচ্ছেন বাংলাদেশের মানুষজন। সকলের হাতেই কেনাকাটার বড় বড় ব্যাগ। পোশাক থেকে জুতো, গয়না থেকে পার্স— সব কিছুই সারা পরিবারের জন্য ইদের মরসুমে সংগ্রহ করে নিতে সীমান্ত পেরিয়ে এ শহরে হাজির তাঁরা। আর ব্যবসায়ীরা বলছেন, এই প্রবণতা প্রতি বছর বাড়ছে।

ধর্মতলায় জমেছে কেনাকাটা

বস্তুত, এত দিন চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা এবং ভ্রমণ—এ সবের জন্য প্রতি বছরই উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বাংলাদেশি মানুষ প্রতিবেশী দেশে আসতেন। বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ব্যাঙ্কের হিসেবে, ২০১৭ সালেই টুরিস্ট ভিসায় ভারতে যাওয়ার জন্য ৫কোটি ৭০ লাখ মার্কিন ডলার আয় হয়েছে। যা তার আগের বছরের তুলনায় ১ কোটি বেশি। আর তথ্য বলছে, এর মধ্যে একটা বড় অংশই ভিসা নিয়েছে রমজান মাসে ভারতে আসার জন্য, যার মূল কারণ কেনাকাটা। এক কর্তার সরেস মন্তব্য, “একে শপিং ভিসা বলাই ভাল।”

এই অবস্থায় ইদের মরসুমে বেশ ভাল রকম ব্যবসা করে নিচ্ছেন ধর্মতলার ব্যবসায়ীরা। কিন্তু একই সঙ্গে, মার খাচ্ছে ওপার বাংলার ‘ফ্যাশন হাউস’গুলির ব্যবসা। জামাকাপড়ের বড় দোকানকে সেখানে এই নামে ডাকেন স্থানীয় মানুষ। কিন্তু গত কয়েক বছরে ভারতের পণ্যের প্রতি বাংলাদেশের ক্রেতাদের এই আগ্রহ কেন?

ফাঁকা বাজার ঢাকায়

ঢাকার ফার্মগেট থেকে সপরিবার কলকাতা এসেছেন ফারহানা হক। নিউ মার্কেট চত্বরে কেনাকাটা করতে করতে জানালেন, কলকাতায় ঘুরতে আসার পাশাপাশি ইদের বাজার করে নিয়ে যান তাঁরা। গত তিন বছর ধরে এমনটাই চলছে। তাঁর কথায়, “কলকাতার কাপড়ের কাজ, রং, ডিজ়াইন অনেক ভাল। দামও সস্তা পড়ে। একই জিনিস ঢাকায় দুই গুণ বেশি দাম দিয়ে কিনতে হয়।”

আবার ধানমণ্ডি এলাকার নাজ়মা চৌধুরী মজেছেন কলকাতার ব্যবসায়ীদের ব্যবহারে। একটি দোকানে শাড়ি পছন্দ করতে করতে বললেন, “এখানে যে কোনো দোকানে আপনি পাঁচশো টাকার শাড়ি কিনলেও তাঁরা চাইলে একশোটা শাড়ি দেখাবেন। কিন্তু বাংলাদেশের দোকানিদের মধ্যে সেটা নেই। কোনও ক্রেতা পছন্দসই জিনিস না পেয়ে ফিরে গেলে তাঁরা একটু বিরক্তই হন।”

ধর্মতলার একটি বড় পোশাক দোকানের ম্যানেজার আতিকুর রহমান জানালেন, এই সময় পুজোর চেয়েও বেশি ব্যবসা করি আমরা। ইদের কয়েক সপ্তাহ আগেই কলকাতায় কেনাকাটা করতে চলে আসেন বাংলাদেশিরা। রোজার শেষ সপ্তাহেও বেশ ভিড় থাকে নিউ মার্কেট চত্বরে। বাংলাদেশিদের আনাগোনা সারা বছর লেগে থাকলেও, এই সময়ের ভিড় কিছু বেশিই। ঈদ উপলক্ষে বিশেষ ছাড়ও দিচ্ছেন ধর্মতলার ব্যবসায়ীরা।

এসে পৌঁছেছে ‘শপিং গাড়ি’।

এমনকী ইদের আগে পেট্রাপোল থেকে বিশেষ কিছু বাস সার্ভিসও চালু হয়ে যায় ধর্মতলায়। সে বাসের আনঅফিসিয়াল নাম, “শপিং গাড়ি”। বলতে গিয়ে হেসেই ফেললেন দেশ ট্র্যাভেলসের চালক শোয়েব চৌধুরী। বললেন, “মেলা লোক আসে এই সময়ে। চাপের মুখে সার্ভিস বাড়াই আমরা। লাভও হয়। কিন্তু আসে যত লোক, ফেরার সময় তার তিনগুণ জিনিসপত্র থাকে। জায়গা হওয়াই মুশকিল।”

শুধু তাই নয়। গত বছরেই বাংলাদেশে ভারতীয় দূতাবাস কর্তৃপক্ষ ভিসা প্রক্রিয়া সহজ করার ঘোষণা করে এবং ইদের কয়েক মাস আগে বিশেষ ভিসা ক্যাম্পও করে। সেখানে দু’সপ্তাহ ধরে দীর্ঘ লাইন পড়তে দেখা যায় বলেও জানাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। তথ্য বলছে, এই বছর ইদের আগে ভারতে আসার জন্য অতিরিক্ত প্রায় দু’লক্ষ বাংলাদেশি ভিসা নিয়েছেন।

কিন্তু উৎসব-বাণিজ্যে কেন পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ? ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়ের সঙ্গে কথা বলেই জানা গেল, এর মূল দু’টো কারণ হল ফ্যাশন এবং দাম। ‘ইন্ডিয়া’ নিয়ে যতই বাধা থাক, ইন্ডিয়ান ফ্যাশন সে দেশে একেবারে হটকেক। আর তার উপরে আছে সাশ্রয়ের হিসেব। বস্তুত, ইদের বিপুল চাহিদা মেটাতেও সমস্যায় পড়েন বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা। বড় অঙ্কের ভ্যাট দিয়ে, ভাল কোয়ালিটি রেখে অত পোশাক প্রস্তুত করা সম্ভব হচ্ছে না তাঁদের পক্ষে। যতটা সম্ভব হচ্ছে, তার দামও প্রায়ই মধ্যবিত্তের নাগাল ছাড়িয়ে যাচ্ছে।

ঢাকার বুটিক হাউজ বিবিয়ানার মালিত ও ডিজ়াইনার লিপি খন্দকার বলছেন, “আমরা যেভাবে পোশাক বানাচ্ছি, সেভাবে কিন্তু তিন বছর আগেও ভাল ব্যবসা করেছি। কারণ তখন এই মার্কেট এত ওপেন ছিল না। এখন প্রতিযোগিতা বেড়েছে। ফ্যাশন হাউজ বিশ্বরঙের মালিক বিপ্লব সাহা বলেন, ”স্যাটেলাইটের যুগে শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই টিভি-সিনেমা দেখে চাইছে ভিনদেশি পোশাকে সাজতে। এটা এক রকম ব্রেনওয়াশ হওয়ার মতো।”

আর এক ব্যবসায়ী আফরাজ়ুল হক আজাদ অবশ্য বলছেন, “বিদেশি পোশাকের টানে বাংলাদেশের একটা বড় অংশের মানুষ ইন্ডিয়ায় ছুটছেন ঠিকই, কিন্তু বাংলাদেশের দেশীয় পোশাকের বাজার তেমন পড়েনি।” বিদেশি ফ্যাশন আর দেশি ঐতিহ্যের লড়াইয়ে দেশের পোশাকের চাহিদাই এগিয়ে রয়েছে বলে জানাচ্ছেন তিনি।

Leave A Reply