গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না! তরুণীর শিল্প-কীর্তি নিয়ে কেন এত আলোড়ন? জেনে নিন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

দ্য ওয়াল ব্যুরো: গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না। এমনটাই লেখা ছিল খোঁপার কাঁটায়। বছর খানেক আগের ঘটনা। এই খোঁপার কাঁটার ছবিই ভাইরাল হয়েছিল সোশ্যাল মিডিয়ায়। বাংলাদেশের তরুণী শিল্পী জিনাত জাহান নিশার এই কনসেপ্টকে কুর্নিশ জানিয়েছিল নেট-দুনিয়া। অবশ্য সমালোচনাও কম হয়নি এমন বাক্য নিয়ে। প্রশ্ন উঠেছিল, সমস্ত পুরুষ জাতিই কি ইচ্ছে করে গা ঘেঁষে দাঁড়ায়?

বছর ঘুরতেই সোশ্যাল মিডিয়ায় আত্মপ্রকাশ করেছে জিনাতের ডিজ়াইন করা টিশার্ট। টিশার্টটি খুব সাধারণ হলেও, তা বহন করছে সেই পুরনো বার্তাই। টিশার্টের বুকে-পিঠে লেখা আছে, গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না। রীতিমতো আদেশের সুরে। খোঁপার কাঁটায় যতটা না চোখে পড়ার মতো করে ছিল এ বাক্য, তার চেয়ে বেশি ছিল সুন্দর শিল্পের মতো। কিন্তু এবারের টিশার্টে যেন শিল্পকে অতিক্রম করে গেছে, কড়া আদেশের সুর। অনুজ্ঞার দাপট।

আর ঠিক এই জায়গাতেই বোধ হয় গত বারের তুলনায় কয়েক গুণ বেড়েছে আলোচনা তথা সমালোচনাও। সোশ্যাল মিডিয়া উত্তাল হয়েছে এই টিশার্টের পক্ষে-বিপক্ষে।

একটা বড় শ্রেণির মানুষ বলছেন, টিশার্টে এমন বাক্য লিখে মোটেই সব সমস্যা মিটে যাবে না। কিন্তু এই সব সমস্যার বিরুদ্ধে লড়ার প্রথম এবং শেষ কথা হচ্ছে, আওয়াজ তোলা। মেয়েদের অনেকেই সব সময় গলা তুলে প্রতিবাদ জানাতে পারেন না। এই জাতীয় পোশাক তাঁদের সাহায্য করবে। মুখে না বলেও অনেক কথা বলা হয়ে যাবে। আবার অন্য পক্ষ বলছেন, ভিড় গণপরিবহণে ইচ্ছে না থাকলেও মানুষ ঘেঁষাঘেঁষি করেই দাঁড়ায়। তার মানেই তারা সকলে খারাপ উদ্দেশ্য নিয়ে দাঁড়িয়েছে, এমনটা নয়।

টিশার্ট শিল্পী, ২৮ বছরের জিনাত জাহান নিশা অবশ্য বলছেন, সমস্ত পুরুষ খারাপ না-হওয়া সত্ত্বেও প্রতি দিন রাস্তাঘাটে, বাসে-ট্রেনে মেয়েদের যে ভাবে নিত্য হয়রানির মুখে পড়তে হয়, তার বিরুদ্ধে বার্তা দেওয়ার জন্যই এই অভিনব ভাবনা।

ঢাকা বাসিন্দা জিনাত ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভের চারুকলা বিভাগ থেকে আর্ট নিয়ে স্নাতক এবং স্নাতকোত্তর পাশ করেছেন। সঙ্গে তিন ভাইবোন— বিজু, জিসা আর শুভকে নিয়ে খুলে ফেলেছেন একটি অনলাইন ফ্যাশন বিপণি। সেই বিপণির তরফেই প্রস্তুত করা হয়েছে এই টিশার্ট।

ফ্যাশনের সঙ্গে প্রতিবাদের যোগসূত্র ঘটানোর চিন্তাটা কী ভাবে এল?

জিনাত জাহান নিশা।

জিনাত বললেন, ‘‘প্রতি দিন বিভিন্ন জায়গায়, বিভিন্ন ভাবে মেয়েদের হয়রানির সঙ্গে আমরা যেন অভ্যস্তই হয়ে গিয়েছি। বাসে-ট্রেনে বহু বার অস্বস্তিকর অভিজ্ঞতার মুখোমুখি আমি নিজেও হয়েছি। তারই প্রতিবাদ তুলে ধরতে চেয়েছি আমার কাজে।’’ জিনাতের দাবি, এই টিশার্ট বা খোঁপার কাঁটার আগেও, ‘থামুন’ লেখা আংটি, দুল, পেনড্যান্ট বানিয়েছিলেন তাঁরা। ভবিষ্যতেও এ ধরনের আরও কাজ করবেন বলেই জানালেন জিনাত।

কিন্তু প্রতিবাদ তো হল। প্রশ্ন ওঠে, টিশার্ট বা গয়না কি মানুষের মনের বিকৃতিতে সত্যিই বদল আনতে পারে? জিনাত দাবি করছেন, চেষ্টাটা জরুরি। প্রতিবাদটা আবশ্যিক। সকলেই নানা পরিস্থিতিতে নিজের মতো প্রতিবাদের ভাষা বেছে নেন। এই টিশার্টই তাঁর প্রতিবাদের ক্যানভাস।

জিনাত বলছেন, “যদি সত্যিই এই টিশার্টে কেউ কোনও বদলের আলো না দেখতেন, তা হলে এত মানুষ সমর্থন করতেন না। বিশ্বাস করুন, এটা বহু মেয়েরই মনের কথা। এ কথা পোশাকের মাধ্যমে জানাতে চান তাঁরা।”

বস্তুত, বাসে যৌন হয়রানির ঘটনা ঢাকা ও বাংলাদেশের অন্য শহরে নৈমিত্তিক। একটি সমীক্ষা জানিয়েছে, নিত্যযাত্রী মেয়েদের ৯৮ শতাংশই পুরুষ সহযাত্রীর খারাপ স্পর্শের শিকার হয় একাধিক বার। এমনকী স্কুলের ছোট ছোট মেয়েরাও হয়রানির হাত থেকে রেহাই পায় না।

এ বিষয়ে সংবাদমাধ্যমকে জিনাত জানিয়েছেন, বছর খানেক আগে বাসে যৌন হয়রানির শিকার হওয়ার পরে তিনি প্রতিবাদে সরব হয়েছিলেন। কিন্তু অন্য সহযাত্রীরা তাঁর পাশে এসে দাঁড়ানোর বদলে উল্টে তাঁকেই মুখ বন্ধ করার পরামর্শ দেন। সে রাতেই তিনি ক্ষোভ এবং রাগ থেকে নতুন খোঁপার কাঁটার ডিজাইন করেছিলেন। তাতেই প্রথম লেখা ছিল, ‘গা ঘেঁষে দাঁড়াবেন না।’ তখন সেই প্রতিবাদী কাঁটা ছড়িয়ে পড়েছিল মেয়েদের খোঁপায় খোঁপায়। এর পরে এখন এল একই কথা লেখা এই টি-শার্ট।

মজার ব্যাপার হল, এই টিশার্ট ভাইরাল হওয়ার পরে, হিজাব বা বোরখা পরা বেশ কিছু তরুণা জিনাতের সংস্থার কাছে আবেদন করেছেন, বোরখা বা হিজাবের পিনের জন্যও অমন লেখা ব্রোচ তৈরি করে দিতে। জিনাত বলেন, “আমার টিশার্টের বিরোধিতা করে অনেকেই বলছেন, শরীর ঢেকে রাখাই অশালীন আচরণ থেকে বাঁচার উপায়। তাঁদের কাছে আমার বক্তব্য, হিজাব-বোরখা পরা মেয়েরা যে গণ-পরিবহণে নিরাপদ, এ তথ্য কোথাও নেই। থাকা সম্ভবও নয়। কারণ সেই মেয়েরা নিজেরাই চাইছেন এই সাবধানবাণী লেখা ব্রোচ! তার মানে তারা নিরাপদ নন মোটেই।”

জিনাত অবশ্য স্পষ্ট বলছেন, ‘‘ভিড়ের মধ্যে পুরুষ সহযাত্রীর স্পর্শ এড়ানো সম্ভব নয়। এরকম দাবি করেও টিশার্ট বানানো হয়নি। সব স্পর্শেই খারাপ উদ্দেশ্য থাকে, তা নয়। বেশির ভাগ পুরুষই বেশ সহানুভূতিশীল হন। কিন্তু বহু খারাপ মানুষ আবার ভিড়ের সুযোগ নিয়ে খারাপ আচরণ করতে মুখিয়ে থাকে। খোঁপার কাঁটা বা টি-শার্টের বার্তা তাদের জন্যই। সকলের এত বিচলিত হওয়ার দরকারই বা কী!’’– অর্থপূর্ণ হাসি খেলে যায় শিল্পীর ঠোঁটে।

জিনাতের জানাচ্ছেন, তিনি এক জন শিল্পী। “ছবি আঁকা, ডিজাইন করার মতো কাজগুলোর মাধ্যমেই আমি আমার অনুভূতি শেয়ার করি এবং হালকা বোধ করি। এর পেছনে সব সময় বাণিজ্যিক উৎসাহ থাকে না।”– বলেন জিনাত। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশে গণপরিবহনে যৌন হয়রানির শিকার বেশির ভাগ নারীই তাদের সাথে ঘটা অন্যায়ের প্রতিবাদ করতে পারেন না। তিনি নিজেও তাঁদেরই এক জন। তাই ওই মেয়েদের জন্য প্রতিবাদের একটি মাধ্যম হিসেবে এই বাক্যটি ফুটিয়ে তুলেছেন জিনাত।

তবে জিনাতের তৈরি এই টিশার্ট নিয়ে এর মধ্যেই কুরুচিকর নোংরামিও কম হয়নি। অনেকেই টিশার্টের লেখা বিকৃত করেছেন, কাজটিকে ট্রোল করেছেন। এ বিষয়ে জিনাতের বক্তব্য, “সামাজিক মাধ্যমে এই ছবিগুলো ভাইরাল করার উদ্যোগ কিন্তু আমাদের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়নি। যাঁরা এগুলো নিয়ে নেতিবাচক মন্তব্য করছেন, ছবিগুলি বিকৃত ভাবে এডিট করে ট্রোল করছেন, তাঁরাই এটিকে ভাইরাল করেছেন।”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More