বুধবার, মার্চ ২০

তিন বছরের শিশুর পায়ে গেঁথে গিয়েছে তিন ইঞ্চি কাচ! দিনভর ঘোরাল তিন হাসপাতাল

দ্য ওয়াল ব্যুরো: খেলতে খেলতে চিলচিৎকার করে কাঁদতে শুরু করেছিল তিন বছরের ছোট্ট শিশুটি। সবাই দৌড়ে এসে দেখে, তার পায়ের গোড়ালির কাছে বড় একটি পেরেক বিঁধে রয়েছে। সেই অবস্থায় সুরজিৎ দে নামের ওই শিশুকে নিয়ে তিনটি হাসপাতাল ঘুরতে হয় বলে অভিযোগ। তার পরে, ২৪ ঘণ্টা পার করে, তিনটে হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে, অবশেষে বৃহস্পতিবার দুপুর দু’টো নাগাদ অস্ত্রোপচার হয়েছে তার। দেখা গেছে, পেরেক নয়। একটা লম্বা কাচের টুকরো ঢুকে গিয়েছিল পায়ে। পারিবারিক সূত্রের খবর, প্রায় তিন ইঞ্চি লম্বা ওই কাচের টুকরোটি তিন ভাগে ভেঙে বার করেছেন চিকিৎসকেরা।

সুরজিতের মামা শিবশঙ্কর দত্তগুপ্ত জানিয়েছেন, সুরজিতের মা ঝর্না দে পরিচারিকার কাজ করেন। বাবা মারা গিয়েছেন ছোটোবেলায়। বুধবার বেলা তিনটে নাগাদ সুরজিতের পায়ে পেরেক বেঁধার খবর পেয়ে ছুটে আসেন ঝর্নাদেবী। তার পরে সুরজিৎকে নিয়ে তাঁরা পৌঁছন সাগর দত্ত মেডিক্যাল কলেজ এবং হাসপাতালে। শিবশঙ্করবাবুর দাবি, “ওখানে আমাদের বলা হল, এত বড় পেরেক বার করার মতো যন্ত্র নেই। আরজিকরে নিয়ে যান।”

এই কাচটিই ঢুকে ছিল সুরজিতের পায়ে।

সময় নষ্ট না করে তখনই সুরজিৎকে নিয়ে আরজি করে ছুটে আসে তার পরিবার। শিবশঙ্করবাবুর অভিযোগ, “আরজিকর হাসপাতালে বলল ওদের যন্ত্র আছে পেরেক বার করার। কিন্তু সেই যন্ত্র চালানোর মতো কোনও চিকিৎসক এই মুহূর্তে হাসপাতালে নেই।” তত ক্ষণে তীব্র ব্যথায় ককিয়ে উঠছে সুরজিৎ। রক্তও পড়ছে অঝোরে। অথচ তার পা থেকে কাচটা বার করা সম্ভবই হল না সন্ধে আটটা পর্যন্ত।

আরজিকর থেকে তাদেরই পরামর্শ অনুয়ায়ী, সুরজিৎকে নিয়ে এনআরএসে ছোটেন পরিবারের সদস্যরা। অভিযোগ, সেখানেও প্রাথমিক কিছু ওষুধ দিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয় তাকে। জানানো হয়, পরের দিন অর্থাৎ আজ, বৃহস্পতিবার সকালে নিয়ে আসতে। “আমাদের সই করতে বলা হয়। তার কারণ হিসেবে জানানো হয়, পেরেকটি হয়তো না-ও বার করা যেতে পারে। চিকিৎসকেরা জানান, পেরেকটি এমন জায়গায় রয়েছে, যে, তা বার করা মুশকিল হয়ে যেতে পারে। আরও বলা হয়, সুরজিৎকে অজ্ঞান করতে হবে। সে জন্যও সই করানো প্রয়োজন।”– বলেন শিবশঙ্করবাবু।

এ দিকে রাত বাড়ছে। সুরজিতের পা-ও ক্রমে ফুলে যাচ্ছে। কোনও ব্যবস্থাই নেই। এই সময়ে ধৈর্য্য হারায় সুরজিতের পরিবার। চিকিৎসকদের সঙ্গে তখন কিছু সময় উত্তপ্ত বাক্যবিনিময়ও চলতে থাকে তাঁদের। এর পরে বিষয়টি সংবাদমাধ্যমে জানাজানি হতে সুরজিৎকে ভরতি নেওয়া হয় বলে দাবি করেন শিবশংকরবাবু।

শেষমেশ বৃহস্পতিবার দুপুর দু’টো নাগাদ খবর মেলে, সুরজিতের পা থেকে লম্বা কাচের টুকরোটি বার করা গিয়েছে।

সুরজিতের মা ঝর্নাদেবী জানান, বাড়ির কাছে একটি প্যান্ডেল তৈরির কাজ চলছিল। সেখানেই পেরেক, কাচ– এই সব পড়ে ছিল। খেলার সময়ে ছেলের পায়ে কাচ ঢুকে যায়। এক্স রে করে প্রথমেই দেখা যায় সেটি।”

কিন্তু এক জন ছোট্ট শিশুর পায়ে গেঁথে যাওয়া কাচ বার করতে গিয়ে কেন দিনভর এমন ভোগান্তির শিকার হতে হবে পরিবারকে, তা নিয়ে স্বাভাবিক ভাবেই সমালোচনা শুরু হয়েছে স্বাস্থ্য মহলে। চিকিৎসকদেরই একাংশ বলছেন, গোড়ালি থেকে পেরেক বার করার জন্য পেডিয়াট্রিক সার্জারির মতো সুপার-স্পেশ্যালিটি শাখার দরকারই পড়ে না। গ্রামীণ কিংবা ব্লক হাসপাতালেও তো করা যায় এ ধরনের অস্ত্রোপচার। অথচ অভিযোগ, পেডিয়াট্রিক সার্জারির এমার্জেন্সি পরিষেবা না-থাকার দোহাই দিয়েই প্রথমে সাগর দত্ত এবং পরে আরজি কর হাসপাতাল চিকিৎসা না-করে সুরজিৎকে এনআরএস হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয় বুধবার সন্ধ্যেয়। এমনকী, এনআরএসেও বুধবার রাতে কিছু করা হয়নি বলে অভিযোগ সুরজিতের মা ঝর্না দে-র।

তাঁদের অভিযোগের বিষয়ে আরজি করের অধ্যক্ষ শুদ্ধোদন বটব্যাল বলেন, “এমনটা হওয়ার কথা নয়। আমি বিস্তারিত খোঁজ নিয়ে দেখছি। পেডিয়াট্রিক সার্জারির এমার্জেন্সি আমাদের নেই বটে। কিন্তু খুব জটিল কেস না-হলে, এমন রোগী ভর্তি হয়ে যাওয়ারই কথা।” একই বক্তব্য সাগর দত্তের অধ্যক্ষ হাসি দাশগুপ্তের। তিনি বলেন, ‘আমাদের পেডিয়াট্রিক সার্জারি না-থাকলেও এমন রোগীদের সাধারণত পেডিয়াট্রিক্স মেডিসিনে ভর্তি করে নেওয়া হয়। পরে জেনারেল সার্জেন সেই রোগীকে সামলান। কিন্তু কেন তা হল না, জানি না।” এনআরএসের মেডিক্যাল সুপারিনটেন্ডেন্ট তথা ভাইস প্রিন্সিপাল সৌরভ চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাঁর বক্তব্য মেলেনি।

Shares

Comments are closed.