মৃত ‘পরিযায়ী’ মায়ের কাপড় ধরে খেলছে শিশু, জাগানোর চেষ্টা করছে শ্রমিক-মাকে! মর্মন্তুদ দৃশ্যের সাক্ষী গোটা দেশ

শ্রমিক-ট্রেনে গুজরাত থেকে বিহারে ফিরছিলেন তরুণী। সারা ট্রেন খাবার বা জল জোটেনি। তার উপর তীব্র দাবদাহে রীতিমতো খারাপ পরিস্থিতি হয়। সব মিলিয়ে ঘরে ফেরার পথটুকু আর সহ্য করতে পারেননি তিনি। মারা যান বিহার পৌঁছনোর খানিক আগেই।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: মা ঘুম থেকে উঠছে না কেন? রোজ তো অমন করে না! সবার আগে তো মা উঠে পড়ে! ওই এক রত্তিকে কে বোঝাবে, ওর মা আর জাগবে না। আর কখনও না। মায়ের শাড়ি ধরে ও তবু টেনেই চলেছে। টেনেই চলেছে। যেন নতুন খেলায় মেতেছে ও। নিথর মায়ের পাশে ছোট্ট শিশুর খেলার সাক্ষী হয়ে রইল বিহারের মুজফফরপুর স্টেশন। সেখানে আদতে মায়ের মৃতদেহ নিয়ে খেলা করছে শিশু! এই মর্মান্তিক দৃশ্যেরও সাক্ষী থাকল গোটা ভারতবর্ষও। সৌজন্যে লকডাউন ও তার পরবর্তী পরিযায়ী শ্রমিকদের চরম দুর্ভোগ। সকলে শিউরে উঠেছেন এ ঘটনায়।

    সোমবার বিহারের মুজফ্ফরপুর স্টেশনে শ্রমিক স্পেশ্যাল ট্রেনে করে এসে পৌঁছেছিলেন গুজরাতের একদল শ্রমিক। তাঁদেরই মধ্যে অসুস্থ হয়ে পড়েন এক তরুণী। জানা গেছে, সারা ট্রেন খাবার বা জল জোটেনি। তার উপর তীব্র দাবদাহে রীতিমতো খারাপ পরিস্থিতি হয়। সব মিলিয়ে ঘরে ফেরার পথটুকু আর সহ্য করতে পারেননি তিনি। মারা যান স্টেশনে নামার আগেই। সঙ্গে ছিল তাঁর ছোট দু’বছরের বাচ্চা। মাকে হারানোর বোধ হয়নি এখনও তার।

    স্টেশনে ওই তরুণীর দেহ নামিয়ে, কাপড়ে ঢেকে রাখা হয় তাঁকে। তখনই দেখা যায়, তাঁর ছোট্ট ছেলে টানছে কাপড়টি ধরে। মা কেন নড়ছে না, কেন সাড়া দিচ্ছে না, তা নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ওঠে ছোট্ট ছেলেটি। টানতে শুরু করে মাকে। এ দৃশ্যের ভিডিও ভাইরাল হয়েছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। চোখের জল ধরে রাখাই দায়।

    শুধু তাই নয়, জানা গেছে পথের ক্লান্তি সহ্য করতে না পেরে ওই একই ট্রেনে মারা গেছে একটি দু’বছরের শিশুও। সে পরিজনদের সঙ্গে ফিরছিল গুজরাত থেকে। তার মা-বাবা দিল্লি থেকে অন্য ট্রেনে উঠেছিলেন। তাঁরা পরে এসে পৌঁছন বিহার। মৃত সন্তানকে স্টেশন থেকে নিয়ে বাড়ি ফেরেন।

    একের পর এক এমন ঘটনা যেন আর সহ্য করা যায় না। মাস দুয়েক আগে করোনা সংক্রমণ রুখতে দেশজুড়ে লকডাউন শুরু হওয়ার পর থেকেই সামনে এসেছে অভিবাসী শ্রমিকদের দুর্ভোগ। ভিন্ রাজ্যে কাজ হারিয়ে চরম সংকটে পড়েন তাঁরা। বাড়ি ফেরার জন্য উপায়ান্তর না দেখে কেউ মাইলের পর মাইল হাঁটেন, কেউ সাইকেল প্যাডেল করেন। পথের ক্লান্তি, দুর্ঘটনা কেড়েছে একের পর এক প্রাণ। ১২ বছরের কিশোরী থেকে ৭২ বছরের বৃদ্ধ– মৃত্যুর তালিকা ক্রমে দীর্ঘ হয়েছে।

    কয়েক সপ্তাহ আগে থেকে শ্রমিকদের ঘরে ফেরানোর জন্য শ্রমিক স্পেশ্যাল ট্রেন চালাতে শুরু করে কয়েকটি রাজ্য। কিন্তু সেই ট্রেনের অব্যবস্থাও সামনে আসে বারবার। খাবার নেই, জল নেই, নেই কোনও সুরক্ষা।

    এরই মধ্যে শ্রমিক স্পেশাল ট্রেনে অনেক মা সন্তানের জন্মও দিয়েছেন। রেল সূত্রে জানা গিয়েছে সেই সংখ্যাটা কমপক্ষে ২০। কয়েকদিন আগেই অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে ফেরার পথে বাংলা-ওড়িশা সীমানায় দাঁতনে কন্যা সন্তানের জন্ম দেন এক পরিযায়ী শ্রমিক। তাঁর ও সদ্যোজাতর চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় প্রশাসন। শিশুর জন্য বেবিফুড, ওই শ্রমিকের জন্য পুষ্টিকর খাবার দেওয়ার পাশাপাশি নগদ টাকাও তাঁর পরিবারের হাতে তুলে দিয়েছে পুলিশ।

    কিন্তু এ ঘটনাটি যেন সেই সমস্ত প্রাণের জন্মের আনন্দকে মলিন করে দিল। গত দু’দিন ধরে সুতীব্র দাবদাহ শুরু হয়েছে উত্তর ভারতজুড়ে। প্রবল তাপপ্রবাহে এমনিই অসুস্থ হয়ে পড়ছে মানুষ। এই অবস্থায় দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করে টিকিট কেটে ফেরার ধকলে, সারা ট্রেন জলটুকুও না পেয়ে তা যেন মৃত্যুর আরও একটি কারণ হয়ে উঠেছে দেশে!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More