বুধবার, নভেম্বর ২০
TheWall
TheWall

কলকাতায় শিশুর শরীরে জাদু! কেমো বন্ধ করতেই বেমালুম উধাও ক্যানসার, টিউমারও

দ্য ওয়াল ব্যুরো: চিকিৎসাবিজ্ঞানকে যেন প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে ছোট্ট মিনু। একইসঙ্গে মানবিকতার নতুন সংজ্ঞাও লিখেছে সে। মিনুর সবে দু’বছর বয়স। তার অভিভাবকের নাম, কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল। হ্যাঁ, এমনটাই লেখা রয়েছে তার জন্মের শংসাপত্রে। ঠিকানা, ওই হাসপাতালেরই পেডিয়াট্রিক বিভাগের ফিফ্থ ফ্লোরের একটি বেড। সুস্থ, ফুটফুটে এই শিশু এখন হাসপাতালের সকলের আদরের। বিস্ময়েরও বটে!

হাসপাতাল সূত্রের খবর, ২০১৭ সালের ৩ অক্টোবর কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে জন্ম হয় মিনুর। জন্মানোর পরেই দেখা যায়, তার শরীরে রয়েছে এক বিশাল টিউমার। পেটের ভিতরে, পেছন দিকে থাকা সে টিউমার এতই বড়, যে তার শরীরের যা মোট ওজন, তার অর্ধেক ওজনই টিউমারের। এই অবস্থায় জন্মের পরেই চিন্তায় পড়ে যান চিকিৎসকরা। আলোচনা শুরু হয় অস্ত্রোপচারের।

কিন্তু মুশকিল হয়, পরের দিন। চিকিৎসক-নার্সরা দেখেন, হাসপাতালের বেডে সদ্যোজাত শিশুটি একা পড়ে রয়েছে। কেউ নেই আশপাশে। খোঁজাখুঁজি চালিয়ে বোঝা যায়, শিশুটিকে ছেড়ে চলে গিয়েছে তার মা। পুলিশে খবর দেন হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। যে নাম-ঠিকানা লেখা ছিল পরিবারের, সেখানে খোঁজ নিয়ে দেখা যায় সবই ভুয়ো। এর পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই দায়িত্ব নেয় সদ্যোজাতর। তার নাম রাখা হয় মিনু। শংসাপত্রে লেখা হয়, ‘কেয়ার অফ কলকাতা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল’।

এ সবের পাশাপাশিই, তার পেটের বিশাল টিউমারটি দ্রুত অপারেশন করার সিদ্ধান্ত নেন চিকিৎসকরা। পেডিয়াট্রিক বিভাগের প্রধান চিকিৎসক সুকান্ত দাসের তত্ত্বাবধানে করা হয় জটিল অস্ত্রোপচার। অস্ত্রোপচারের পরে বায়োপসি করে দেখা যায়, ওই টিউমারটিতে ম্যালিগন্যান্সি রয়েছে। সে আবার যেমন তেমন ম্যালিগন্যান্সি নয়। মস্তিষ্কে যে ক্যানসার হয়, সেই প্রকৃতির ক্যানসারের দু’ধরনের কোষ ওই একটি টিউমারে মেলে।

চিকিৎসকদের কথায়, “এমন ক্যানসার বিরল থেকে বিরলতম। কোনও কেস স্টাডি পাওয়া যায়নি এমন ঘটনার। কলকাতা মেডিক্যালের প্যাথোলজি বিভাগের তরফে একটি বিশেষ রিপোর্ট লিখেও জমা দেওয়া হয় এই নিয়ে।”

এ সবের মধ্যেই হাসপাতালেরই উদ্যোগে পালন করা হয় তার অন্নপ্রাশন। উৎসবে-আদরে মেতে ওঠেন চিকিৎসক, নার্স, চিকিৎসাকর্মীরা।

এর পরে মেডিক্যাল অঙ্কোলজি বিভাগে দেখানো হয় মিনুকে। শুরু করা হয় কেমোথেরাপি। কিন্তু চিকিৎসায় সাড়া দেওয়া দূরের কথা, ক্রমেই আরও অসুস্থ হয়ে পড়ে একরত্তি মিনু। তখন সবে কয়েক মাস বয়স তার। চিকিৎসকরা প্রায় ধরেই নেন, এই ক্যানসার থেকে তাকে বাঁচানো কঠিন। এমন সময়ে এমআরআই করে ধরা পড়ে, তার পেটে আরও একটি টিউমার বড় হচ্ছে। সেটিও ম্যালিগন্যান্ট।

এক চিকিৎসকের কথায়, “ওর বাঁচার আশা ছিল না। অসম্ভব কষ্ট পাচ্ছিল। ফলে আমরা কেমোথেরাপি বন্ধ করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিই। কারণ মৃত্যুই যখন অবধারিত তখন কেমো দিয়ে কষ্ট না বাড়ানোই ভাল। আর তার পরেই ঘটে যায় বেনজির এক ঘটনা!” চিকিৎসকদের দাবি, কেমোথেরাপি বন্ধ করার পরেই ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতে থাকে সে। কষ্ট কমতে থাকে, শারীরিক স্বাস্থ্যের উন্নতি হতে থাকে। ২০১৮ সালের গোড়ার দিকে ‘পেট সিটি স্ক্যান’ করে দেখা যায়, পেটের ভিতরে টিউমারটি উধাও! এমনকি আর কোনও ম্যালিগন্যান্সিও নেই তার শরীরে!

বিস্মিত হয়ে যান চিকিৎসকরা। মেডিক্যাল কলেজের সুপার ইন্দ্রনীল বিশ্বাসের কথায়, “চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে এমন ঘটনার নজির আছে বলে আমার জানা নেই। ক্যানসার ধরা পড়ার পরে কেমোথেরাপি চলা এবং কেমো বন্ধ করে বাচ্চার সুস্থ হয়ে ওঠা– এ যেন সত্যিই অভূতপূর্ব! শুধু তাই নয়, এখন মিনুর বয়স দু’বছর, দিব্যি সুস্থ রয়েছে সে। কোনও অসুবিধা নেই শরীরে। চিকিৎসাবিজ্ঞানের আওতায় যদিও এই ঘটনার ব্যাখ্যা এখনও মেলেনি।”

অনেকে বলছেন, কেমোথেরাপি বেশ কয়েক দিন চলেছিল মিনুর। তখনই হয়তো নষ্ট হয়ে গিয়েছিল ক্যানসার সেলগুলি। তার পরে থেরাপি বন্ধ করতে তাই আপনাআপনিই সেরে ওঠে সে। তবে এ ব্যাখ্যা চিকিৎসার ইতিহাসে খুব একটা ঠাঁই পায় না। কারণ কেমো চলার সময়ে যদি নিরাময় হতো, তা হলে তা চিকিৎসকরা বুঝতে পারতেন।

দিব্যি আছে মিনু। নার্সদের কোলে, ডাক্তারদের পিঠে ঘুরে বেড়াচ্ছে ওয়ার্ড জুড়ে। কখনও দুদ্দাড় করে চড়ে বসছে মেট্রন দিদির টেবিলে। গোটা ওয়ার্ড দাপিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আস্ত এক মিরাকেল হয়ে। তাকে নিয়ে চিকিৎসক ও চিকিৎসাকর্মীদেরও স্নেহের শেষ নেই। সকলের আদরে, প্রশ্রয়ে হাসপাতালেই বেড়ে উঠছে মিনু। সদ্য দু’বছরের জন্মদিন পেরোল তার। ফের এক বার সবরকম পরীক্ষা করা হয়েছে। কোনও অসঙ্গতি বা অসুস্থতা নেই তার।

মেডিক্যালের মিরাকেল মেয়ে মিনুর জার্নি, দেখুন ভিডিও।

চিকিৎসকরা বলছেন, মিনু এখন সুস্থ। চিকিৎসা পরিভাষায় এই সময়কে বলা হয় ‘কিওর পিরিয়ড’। এটা পার করে ফেললেই ১০০ শতাংশ নিশ্চিত হওয়া যাবে, আর কোনও রকম কোনও অসুস্থতা নেই মিনুর। তার পরেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, কী করা হবে তাকে নিয়ে। সরকারি কোনও হোমে পাঠানো হবে, নাকি বিকল্প কোনও ব্যবস্থা খুঁজে বার করা যাবে।

ক’দিন আগেই আনন্দ করে জন্মদিন পালন করা হল তার। নতুন জামা পরে, কেক কেটে খুব খুশি ছোট্ট মিনু। আফশোস একটাই। যে অসুখের ভয়ে মিনুকে ছেড়ে চলে গেলেন তার মা-বাবা-পরিবার, তাঁরা হয়তো জানতেও পারবে না, অসুখ থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পেয়েছে তাঁদের মেয়ে!

Comments are closed.