শনিবার, মার্চ ২৩

ভক্তিবাদ ও সুফিবাদের আবহে বিরাজমান গ্রামবাংলার এক বিস্ময়কর লোকদেবতা বামনগাজী

সুনন্দা হালদার

দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার প্রত্যন্তে অবস্থিত তাজপুর গ্রামটি খুবই ছোট। অধিবাসীদের মধ্যে এক ঘর ব্রাহ্মণ ছাড়া সবাই জেলে বা বাগদি সম্প্রদায়ের। গ্রামের বেশিরভাগ মানুষের পেশা মাছ ধরা আর চাষবাস। এমন একটি গ্রামের মানুষ, আপদে বিপদে, কায়মনোবাক্যে ডাকেন একজন লৌকিক দেবতাকে।  তিনি হলেন বাবা বামনগাজী। কারণ এই তাজপুর গ্রামেই অবস্থিত দক্ষিণ চব্বিশ পরগনার এক প্রসিদ্ধ ও বিস্ময়কর দেবালয় ‘বামনগাজী’। যে নামটির সঙ্গে জড়িয়ে আছে সনাতন হিন্দুধর্ম ও ইসলামের এক বিস্ময়কর সহাবস্থান।

বামনগাজীর মন্দির

উৎসের সন্ধানে

তখন চৈতন্য মহাপ্রভুর ভক্তিবাদী নাম-সংকীর্তনে ভেসে যাচ্ছে বাংলা।  সুফিবাদের বাহ্যিক আচারের চেয়ে অন্তরের পবিত্রতা জাগানোর কথা বলা হচ্ছে।  কাছাকাছি আসছে, ভাবনা ও দর্শনের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে হিন্দু ও মুসলমান। সেই শিকল মুক্ত আধ্মাত্মিক পরিবেশে, ক্যানিং অঞ্চলের এক গ্রামে দরবেশ কামাল হোসেন প্রতিষ্ঠা করলেন ‘খানকা‘। সুফি, পীর, দরবেশগণ যে স্থানে তাসাউফের পাঠদান করেন, তাকে বলা হয় ‘খানকা শরীফ’। কাকতালীয় ভাবে সেখানে কামাল হোসেনের সঙ্গে বন্ধুত্ব হল পরম বৈষ্ণব বিজয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের। দুজনেই আপন আপন ধর্মের বাহ্যিক অনুষ্ঠানের ঘোরতর বিরোধী। কামাল হোসেনের জলপড়া ও বিজয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের তেলপড়া মিলে নাকি স্থানীয় জনগণের রোগ নিরাময় করতে শুরু করেছিল। ফলে, এই দুটি মানুষের নাম দ্রুত  ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে। প্রচুর মানুষ আসতে লাগলেন তাঁদের কাছে। ধীরে ধীরে ভক্তের সংখ্যা বাড়তে লাগল। এই ভাবেই দুই বন্ধু একত্রে কাটিয়ে গেলেন তাঁদের জীবন।

বাবা বামনগাজীর একটি বিগ্রহ

তাঁদের মৃত্যুর পর তাঁদের এক পরমভক্ত অক্ষয় বন্দ্যোপাধ্যায়, তাজপুরে এসে বাগদি সম্প্রদায়ের মধ্যে ভক্তিবাদ ও সুফিবাদের বাণী প্রচার করতে শুরু করলেন। তাজপুরেই প্রতিষ্ঠা করলেন অশ্বারোহী লৌকিক দেবতা বামনগাজীর বিগ্রহ। গাজীবাবার মন্দিরে একই সঙ্গে শুরু হল হরিনাম সংকীর্তন ও ভক্তদের মধ্যে তেলপড়া-জলপড়ার বিতরণ। আজও তেজপুরের বামনগাজীর মন্দির পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণ করেন অক্ষয় বন্দ্যোপাধ্যায়ের উত্তরপুরুষ মনোরঞ্জন ও রবীন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। বামনগাজী সাহেবের কাছে মানত করতে আসেন হিন্দু মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষই।

মন্দিরের ভিতরে বামনগাজী বাবার বিগ্রহ

লৌকিক দেবতা বামনগাজী

গাজীবাবার মন্দিরের ভেতরে, ঘোড়ার ওপর বসে আছেন ঘনকালো শুশ্রু বিশিষ্ট, সুদর্শণ ও সুঠাম দেহী বামনগাজী সাহেব। গায়ে নাকি আছে পৈতা। তাই নাকি তাঁর নাম হয়েগেছে বামুনগাজী। কে জানে, হয়তো এই লোকদেবতার মধ্যে লুকিয়ে আছেন দরবেশ কামাল হোসেন আর বৈষ্ণব বিজয় বন্দোপাধ্যায়। তাঁদের পরমভক্ত অক্ষয় বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর দুই গুরুকে একই বিগ্রহে  প্রতিষ্ঠা করে গিয়েছেন।  লোকবিশ্বাস অনুযায়ী বামনগাজী রোগ-ব্যাধির দেবতা। এঁর দরবারে রোগ নিরাময়ের জন্য মানত করলে নাকি রোগ সারে। এমনকী ভক্তদের বিশ্বাস, মন্দিরের উঠানের ধুলো গায়ে মাখলেও রোগ সারে। বাবা বামনগাজীর প্রসাদ হল চিনি, সন্দেশ ও বাতাসা। বিগ্রহের সামনে হরিসংকীর্তন হয়। পুজো দেওয়ার আগে একজন নাপিত হাতের নখ কেটে দেন। তারপর স্নান করে মন্দিরে পুজা দিতে হয়। অসুস্থ ভক্ত মন্দিরের ধুলো মেখে নাকি সুস্থ হয়ে যান। এরপর মন্দির থেকে তেলপড়া নিয়ে গোয়ালঘর কিংবা ঠাকুর ঘরে রাখতে হয়। প্রত্যেকদিন এই মন্ত্রপূত তেলের ব্যবহারে নাকি সম্পূর্ণ রোগ নিরাময় হয়।

মন্দির প্রাঙ্গণে মানতের জন্য কিনতে পারেন গাজী বাবার মূর্তি

বাবা বামনগাজীকে নিয়ে একটি লোকছড়া আছে,

সর্বচিন্তা পরিহরি   বামনগাজীরে স্মরি

নিয়মিত ‘জলপড়া’ করহ সেবন,

অচিরে জানিবে তবে   কোনও রোগ নাহি রবে

তাজপুরে গিয়া পুনঃ   দাও হে পূজন।

মানত পালনে এসেছেন ভক্তের দল

আগে বামনগাজী বাবার পুজোয় মন্ত্রের উপস্থিতি না থাকলেও, বর্তমানে মন্ত্রচ্চারণ করেই পূজাপাঠ চলে। গন্ডীদান প্রথা, মন্দিরে ঢিল বেঁধে মানতের প্রথা আজও আছে। নিত্যপুজা হলেও ভিড় হয় শনি মঙ্গলবার। প্রতি শনি ও মঙ্গলবার মনোস্কামনা পূরণের পর ঢাক ঢোল বাজিয়ে বাবার দরবারে পুজো দিতে আসেন স্থানীয় ও দূরদূরান্তের মানুষ। চৈত্র, বৈশাখ ও জৈষ্ঠ মাসে মন্দির প্রাঙ্গনে বিশাল ভক্তসমাগম হয়। প্রতিবছর অক্ষয় তৃতীয়াতে নিকটবর্তী পঞ্চানন মন্দিরের সামনের সুবিশাল প্রান্তরে গাজীবাবার বিশাল মেলা অনুষ্ঠিত হয়। দশ-পনেরোটি ঘোড়ার দৌড় প্রতিযোগিতার মাধ্যমে শুরু হয় উৎসব। রাত্রে চলে গাজন গানের প্রতিযোগিতা এবং যাত্রাপালা। মেলা চলে তিনদিন। গ্রামবাংলার লোকউৎসবের সমস্ত উপকরণ এই মেলায় উপস্থিত থাকে। শিয়ালদা থেকে ট্রেনে লক্ষীকান্তপুর গিয়ে, সেখান থেকে ভ্যানে করে ঘুরে আসতে পারেন গাববেড়িয়া গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বামনগাজীর মন্দির ও মেলা।

( লেখিকা–  শিক্ষিকা, আগরহাটি গৌরহরি বিদ্যাপীঠ, সন্দেশখালি )

( ‘দ্য ওয়াল’  কুসংস্কার ও অবৈজ্ঞানিক চিকিৎসা পদ্ধতির সম্পূর্ণ বিরোধী। গ্রামবাংলার প্রাচীন লোককথা পাঠকদের সামনে তুলে ধরাই আমাদের উদ্দেশ্য)   

Shares

Comments are closed.