থ্যালাসেমিয়া: সচেতনতাই কমাতে পারে এই রোগের প্রকোপ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    থ্যালাসেমিয়া , এই শব্দটি শুনলেই আমাদের চোখের সামনে একটি ফুটফুটে বাচ্চার অসুস্থ, ফ্যাকাসে মুখের ছবি ফুটে ওঠে।  যাকে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে রক্ত নিতে হয়।  এই রোগ সম্বন্ধে অনেক অমুলক ধারনাও সাধারন মানুষের মধ্যে রয়েছে। তাই বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ৮ই মে দিনটিকে ‘থ্যালাসেমিয়া দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করেছে, থ্যালাসেমিয়া নিয়ে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য।  আমরা কথা বললাম বিশিষ্ট হেমাটোলজিস্ট ডঃ দিব্যেন্দু দে-র সঙ্গে।  জানুন কী বললেন, ডাক্তারবাবু–

    দ্য ওয়াল: থ্যালাসেমিয়া কী?

    ডঃ দে
     : থ্যালাসেমিয়া কথাটি এসেছে গ্রিক শব্দ “thalassa” থেকে, যার অর্থ সমুদ্র।  প্রাচীন ভূমধ্য সাগর অঞ্চলের মানুষের মধ্যে এই রোগ দেখা যেত বলে এর নাম ‘ সাগরের রক্ত’ বা থ্যালাসেমিয়া।  এই ব্যাধি মধ্য এশিয়ার দেশগুলিতে এবং ভারত, বাংলাদেশ, পাকিস্তান, শ্রীলঙ্কা, মায়ানমার সহ দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার দেশগুলিতে বেশি দেখা যায়।  ভারতে প্রতি ১৪ জনে একজন থ্যালাসেমিয়া রোগের বাহক।

    দ্য ওয়াল: কেন হয় থ্যালাসেমিয়া?

    ডঃ দে
     : থ্যালাসেমিয়া জিনের ত্রুটির জন্য।  আমাদের শরীরে লোহিত রক্ত কণিকার মধ্যে যে হিমোগ্লোবিন থাকে, তা তৈরি করার জন্য দুটি জিনের প্রয়োজন হয়।  এই জিন দুটির একটি আসে বাবার কাছ থেকে, ও অন্যটি মায়ের কাছ থেকে।  কারও যদি দুটি জিনেই ত্রুটি থাকে তবে সে থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হয়।
    তবে মনে রাখতে হবে যে, যদি দুটি জিনের মধ্যে কোনও একটি জিনও নর্মাল হয়, তবে তা অন্য জিনের ত্রুটি ঢেকে দিতে পারে এবং সম্পূর্ণ স্বাভাবিক হিমোগ্লোবিন তৈরি করতে পারে।  এদেরকে বলা হয় থ্যালাসেমিয়ার বাহক।  এই বাহকরা সম্পূর্ণ সুস্থ জীবন যাপন করে এবং রক্ত পরীক্ষা ব্যতীত এদের চিহ্নিত করা সম্ভব নয়।  সুতরাং ট্রেনে বাসে আপনার সাথে যে সমস্ত যাত্রী রয়েছেন, তাঁদের প্রতি দশ জনে একজন হয় তো থ্যালাসেমিয়ার বাহক।

    দ্য ওয়াল: কারা থ্যালাসেমিয়ার বাহক?

    ডঃ দে : একমাত্র স্বামী ও স্ত্রী দুজনেই থ্যালাসেমিয়া বাহক হলে বাচ্চার থ্যালাসেমিয়া হতে পারে।  একজন বাহক যদি কোনও নরমাল ব্যাক্তিকে বিয়ে করেন, তাহলে সেই পরিবারে থ্যালাসেমিয়া আসার কোন সম্ভাবনা নেই।  তাই বিয়ের আগে হবু স্বামী ও স্ত্রী, দুজনেই রক্ত পরীক্ষা করে জেনে নিন আপনারা থ্যালাসেমিয়া বাহক কিনা।  যদি স্বামি ও স্ত্রী দুজনেই থ্যালাসেমিয়া বাহক হন , তাহলেও ভয়ের কোন কারন নেই।  কারন এক্ষেত্রেও শতকরা ৭৫ ভাগ ক্ষেত্রে বাচ্চা থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত হয় না।  কিন্তু ২৫ ভাগ সম্ভাবনা থাকে থ্যালাসেমিয়া হওয়ার।  তাই এক্ষেত্রে গর্ভাবস্থার প্রথম ৩ থেকে ৫ মাসের মধ্যে ভ্রূণ- এর পরীক্ষা করে জেনে নেওয়া যায় তার থ্যালাসেমিয়া আছে কিনা।

    আরও জানুন কী বলছেন ডাক্তারবাবু–


    দ্য ওয়াল: প্রতিরোধের উপায় কী?

    ডঃ দে
     : থ্যালাসেমিয়া একটি জিনগত রোগ, বংশ পরম্পরায় ছড়ায়।  এটি কোনও ছোঁয়াচে রোগ নয়।  সুতরাং থ্যালাসেমিয়া রোগীর সাথে সম্পর্ক রাখলে এই রোগ ছড়ানোর সম্ভাবনা নেই।  বলিউড তারকা অমিতাভ বচ্চন, আমিশা পটেল, এরাও থ্যালাসেমিয়ার বাহক।  যদি কোনও থ্যালাসেমিয়া বাহক অন্য কোনও থ্যালাসেমিয়া বাহককে বিয়ে করেন,তবে তাঁদের সন্তানের মধ্যে থ্যালাসেমিয়া হওয়ার সম্ভাবনা থাকে ২৫ শতাংশ।  তাই বিয়ের আগে থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং পরীক্ষা করে জেনে নেওয়া দরকার হবু স্বামী স্ত্রী থ্যালাসেমিয়ার বাহক কিনা।  তার মানে এই নয় যে থ্যালাসেমিয়ার বাহক হলে বিয়ে করতে পারবে না।  থ্যালাসেমিয়ার বাহক কোন নর্মাল ব্যাক্তিকে বিয়ে করলে থ্যালাসেমিয়া নিয়ে বাচ্চার জন্ম হবে না।  আর যদি দু’জন থ্যালাসেমিয়ার বাহক না জেনে বিয়ে করে থাকেন, তবে অবশ্যই প্রেগনেন্সির প্রথম তিন মাসের মধ্যে পরীক্ষা করে জেনে নিন আপনার গর্ভস্থ সন্তান থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত কি না।
    তাই সকলের উচিত থ্যালাসেমিয়া স্ক্রিনিং করে জেনে নেওয়া তারা বাহক কিনা।  বিয়ের আগে অথবা প্রেগনেন্সির শুরুতে পরীক্ষা করিয়ে নিলে আপনি থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত বাচ্চার জন্ম আটকাতে পারবেন।

    দ্য ওয়াল: কী ভাবে বুঝবেন বাচ্চা থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত?

    ডঃ দে : সাধারনত থ্যালাসেমিয়ার বাচ্চারা ৬ মাস বয়স থেকে অসুস্থ হতে শুরু করে।  এরা বারেবারে সর্দি, কাশি, জ্বর ইত্যাদিতে ভুগতে থাকে, খাওয়া দাওয়া কমিয়ে দেয়,নিস্তেজ হয়ে পড়ে।  এদের রক্ত পরীক্ষায় অ্যানিমিয়া ধরা পড়ে, পেটে স্প্লিন বা প্লীহা বড় হয়ে যায়।  এক বছর বয়সের পর HPLC টেস্টে ধরা পড়ে যে শিশুটি  থ্যালাসেমিয়া মেজর। তবে অনেক থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত বাচ্চা ছোট বেলায় ভাল থাকে, এদের রক্ত লাগে না, অনেক পরে এদের থ্যালাসেমিয়ার লক্ষণ ধরা পরে।  এদের বলা হয় থ্যালাসেমিয়া ইন্টারমিডিয়া।

    দ্য ওয়াল: থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসা কী?

    ডঃ দে
     : থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত রোগীদের শরীরে সঠিক হিমোগ্লোবিন তৈরি হয় না, তাই এদের বাইরে থেকে হিমোগ্লোবিন তথা লোহিত রক্ত দিতে হয়।  এই রক্ত প্রতি তিন থেকে পাঁচ সপ্তাহ অন্তর প্রয়োজন হয়।  এখন কম্পোনেন্ট সেপারেশন প্রক্রিয়ায় রক্তের মধ্যে থেকে কেবল লোহিত রক্ত ছেঁকে নিয়ে, পরিশোধিত বা filtered রক্ত দিয়ে রক্ত সঞ্চালনজনিত সমস্যাগুলো থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।  এতে রক্ত বৃদ্ধির পরিমাণও বাড়ে।  এ ছাড়া, থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত বাচ্চাদের প্রতিবার রক্ত দেওয়ার সময় শরীরে আয়রন প্রবেশ করে যা শরীর বের করতে পারে না।  এই অতিরিক্ত আয়রন ক্রমশ হার্ট, লিভার, প্যানক্রিয়াসে জমা হয়ে এই অঙ্গগুলোর ক্ষতি করে, ফলে বাচ্চা হার্ট বা লিভারের সমস্যা,ডায়াবেটিস, গ্রোথ-এর সমস্যা, বয়ঃসন্ধির বিকাশ না হওয়া, হরমোন সমস্যায় ভোগে।  বর্তমানে চিলেশন থেরাপির মাধ্যমে ওষুধ দিয়ে অতিরিক্ত আয়রন বের করে দিয়ে এই সমস্যার সমাধান করা হয়।

     দ্য ওয়াল: সার্জারি করাতে হয় কি?

    ডঃ দে : থ্যালাসেমিয়ার চিকিৎসায় অনেক সময় সার্জারি বা অপারেশনের কথা বলা হয়।  যে সব বাচ্চার প্লীহা খুব বড় হয়ে যায়, বা যাদের মাসে দুবারের ও বেশি রক্তের প্রয়োজন হয় তাদের স্প্লেনেকটমি বা প্লীহার অপারেশন করা হয়।
    তবে অল্প বয়স থেকে সঠিক চিকিৎসা করালে এবং নিয়মিত ফলোআপ করলে এই অপারেশনের প্রয়োজনীয়তা কমে আসে।

    দ্য ওয়াল: বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্টের প্রয়োজনীয়তা কতটা থাকে?

    ডঃ দে : থ্যালাসেমিয়া থেকে সম্পূর্ণ মুক্তির একমাত্র উপায় বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট বা অস্থি মজ্জা প্রতিস্থাপন।  এই চিকিৎসায় বাচ্চার নিজের ভাই বা বোন, যার সাথে বাচ্চার HLA এর মিল আছে, তার থেকে নর্মাল অস্থি মজ্জা সংগ্রহ করে, থ্যালাসেমিয়া আক্রান্ত বাচ্চাকে দেওয়া হয়।  এতে donor- এর কোন ক্ষতি হয় না।  তবে মনে রাখতে হবে যে, বোনম্যারো ট্রান্সপ্ল্যান্ট করার আগে পর্যন্ত থ্যালাসেমিয়ার যথাযথ চিকিৎসা করা দরকার।  তাই filtered PRBC transfusion, আয়রন কমানোর ওষুধ, এবং সব রকম কমপ্লিকেশনের সঠিক সময়ে চিকিৎসা করানো জরুরি।

    থ্যালাসেমিয়া নিয়ে সাধারন মানুষের মধ্যে সচেতনতাই পারে থ্যালাসেমিয়াকে জয় করতে।  বর্তমানে থ্যালাসেমিয়ার পরিপূর্ণ চিকিৎসার মাধ্যমে রোগীকে স্বাভাবিক জীবন দেওয়া সম্ভব।  আর স্বতঃস্ফূর্ত থ্যালাসেমিয়া বাহক স্ক্রিনিং এর মাধ্যমে একটি থ্যালাসেমিয়া -শিশুর জন্ম প্রতিরোধ করা সম্ভব।

    দ্য ওয়াল: থ্যালাসেমিয়া বাহক নির্ণয় পরীক্ষা কিছু আছে কি? 
    ডঃ দে : থ্যালাসেমিয়া বাহক জানার জন্য রক্ত পরীক্ষা ছাড়া অন্য কোন উপায় নেই।  কোন শারীরিক লক্ষণ বা অন্য কোন রক্ত পরীক্ষা থেকে থ্যালাসেমিয়া বাহক কিনা বোঝা যায় না।  একমাত্র special Thalassemia screening test এর মাধ্যমে জানা সম্ভব।  তাই থ্যালাসেমিয়া থেকে বাঁচতে আজই হেমাটোলজিস্ট এর কাছে special Thalassemia screening test করিয়ে নিন আর জেনে নিন আপনার পরিবারে ভবিষ্যতে থ্যালাসেমিয়া আসতে চলেছে কিনা।  মনে রাখবেন, আপনার একটি রক্তপরীক্ষা ভবিষ্যতে আপনার বাচ্চাকে শত শত রক্তপরীক্ষা থেকে মুক্তি দেবে।

    সাক্ষাৎকারটি নিয়েছেন মধুরিমা রায়

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More