শুক্রবার, মে ২৪

দিদিমণি, তোর দাবাই খাকে মোর ছোওয়া আচ্ছা হোয় গেলাক! নার্স ডে-র প্রাপ্তি বলতে এটুকুই

শাশ্বতী পাল

‘নার্স’– এই শব্দটা শুনলেই আমাদের প্রত্যেকের মনে ভেসে ওঠে হাসপাতালের থমথমে সাদা করিডরে, লাইজ়লের গন্ধ আচ্ছন্ন পরিবেশে, ধবধবে সাদা পোশাক পরা আর মাথায় সুন্দর করে সাদা তেকোণা রুমাল বাঁধা কোনও গম্ভীর মুখ। কিন্তু এই সাদা পোশাকের বাইরেও যে নার্সদের কাজের একটা বিশাল ক্ষেত্র রয়েছে, তা আমাদের অনেকেরই অজানা। আমি নিজে ‘অক্সিলিয়ারি নার্সিং অ্যান্ড মিডওয়াইফারি ট্রেনিং’-এ না গেলে হয়তো আমারও জানা হতো না।

জানা হতো না, আমাদের মত উন্নয়নশীল দেশে যেখানে জনসংখ্যার এক বিশাল অংশের বাস গ্রামে, যে সব প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে সরকারি হাসপাতালে পৌঁছনো সহজ নয়, কার্যত সম্ভবই নয়– সেই সমস্ত গ্রামে স্বাস্থ্য পরিষেবা প্রদানের মূল কাণ্ডারীই এই অক্সিলিয়ারি নার্সরা।

আপনারা হয়তো খেয়াল করে থাকতে পারেন, যে রাজ্যের গ্রামগুলিতে ছোট ছোট কিছু সরকারি স্বাস্থ্যকেন্দ্র থাকে, যার পোশাকি নাম ‘উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র’। সে চা-বাগানের মাঝে হোক, বা পুরুলিয়ার লাল মাটিতে, বা সুন্দরবনের খাঁড়ির পাড়ে; কোথাও বা সেগুলোর একটা ছোটখাটো বিল্ডিং রয়েছে, আবার কোথাও দিনের পর দিন কোনও দরমার বেড়ার ঘর ভাড়া নিয়ে বা জরাজীর্ণ চা-বাগানের ভাঙাচোরা হাসপাতালের ছোট্ট একটি ঘরেই চলছে এইসব উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র! আর এই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির পরিষেবা প্রদানের প্রধান মুখই হল এক জন অক্সিলিয়ারি নার্স, যাঁদের ইউনিফর্মের রঙ কিন্তু সাদা নয়, গোলাপি।

আমিও এই রকমই এক উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের অক্সিলিয়ারি নার্স অ্যান্ড মিডওয়াইফ অর্থাৎ এএনএম। দীর্ঘ ন’বছরেরও বেশি সময় ধরে উত্তরবঙ্গের চা-বাগান এলাকায় কাজ করতে গিয়ে দেখতে পাচ্ছি, ফিল্ডের মানুষ কী ভীষণ রকমের নির্ভরশীল এই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের পরিষেবার উপর!

যাঁরা যে কোনও সমস্যায় নার্সিং হোম ছাড়া ভাবতে পারেন না চিকিৎসার কথা, তারা হয়তো কল্পনাও করতে পারবেন না, ঠিক কী কী কাজের সাথে যুক্ত এই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলি! সে নিরাপদ মাতৃত্ব সুনিশ্চিত করাই হোক বা শিশুদের টীকাকরণ, ছোঁয়াচে রোগ বা পতঙ্গবাহিত রোগ নিয়ন্ত্রণ বা নির্মূল করা হোক– প্রতিটা ক্ষেত্রেই এক জন এএনএম-এর কাজ ও দায়িত্ব অনেকটা।

একটু সহজ করে বলি। ধরা যাক, এক জন মহিলা গর্ভবতী হলেন। এখন স্বাভাবিক নিয়মেই তাঁকে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিজের নাম রেজিস্ট্রেশন করাতে হবে। কিন্তু সেই মহিলা এক জন বন্ধ চা-বাগানের শ্রমিক। কাজ না করলে খাওয়া জুটবে না, তাই তাঁকে রোজ অন্য কোথাও যেতে হয় কাজ করতে। ফলে উপস্বাস্থ্যকেন্দ্র যতটা সময় খোলা থাকে, ততটা সময় তিনি থাকেন বাইরের কাজে। এ বার এই উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রের কর্মী অর্থাৎ অক্সিলিয়ারি নার্সকেই কিন্তু তাঁকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে এক দিন উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে এসে তাঁর রেজিস্ট্রেশন নিশ্চিত করতে হবে। তাঁর ব্লাডপ্রেসার, হিমোগ্লোবিন, সুগার, এইচআইভি, ইউরিন অ্যালবুমিন– এই সমস্ত টেস্টও করতে হবে। নিয়মিত ভাবে তাঁকে চেক আপের আওতায় রাখতে হবে। না, এই সবটা এক জন এএনএম-এর ‘কাজ’ নয়। কিন্তু এই জরুরি কাজ তিনি ছাড়া অসম্ভব।

খুব স্বাভাবিক ভাবেই এই রকম আর্থ সামাজিক প্রেক্ষাপট থেকে উঠে আসা মায়েদের হাসপাতালে গিয়ে প্রসব করানোর প্রতি একটা অনীহা থাকে। ফলে সেই মাকে বুঝিয়ে রাজি করানো, সঠিক সময়ে তাঁকে হাসপাতালে পাঠানো– এ সমস্তটাই করতে হয় অক্সিলিয়ারি নার্স, থুড়ি, ‘দিদিমণিকে’।

আবার ধরা যাক, এক ব্যক্তি মাছ ধরেন। বাড়িতে স্ত্রী ও ছোট ছোট দুই ছেলে মেয়ে আছে। মাঝে মাঝে তিনি নেশা করে বউকে পেটানও। এক দিন আবার তিনিই যখন দায়িত্ববান বাবার মতো বাচ্চাদের নিয়ে এসেছেন টীকা দিতে, তখন ‘দিদিমণি’ খেয়াল করলেন, লোকটির চেহারা আগের তুলনায় অনেকটা খারাপ হয়েছে। জিজ্ঞেস করাতে জানতে পারলেন তেমন কোনও অসুবিধা নেই। তবে ইদানীং ক্ষিদে পায় না একেবারে, আর মাঝে মাঝে হালকা জ্বরও আসে, ওষুধ খেলে কমেও যায়।

তার পরে ‘দিদিমণির’ কথা শুনে হাসপাতালে গিয়ে কফ পরীক্ষা আর এক্সরে-র পরে ধরা পড়ে টিবি। এর পরে রোজ সকালে নিয়ম করে দিদিমণির কাছে গিয়ে ওষুধ খাওয়ার কাজটা যোগ হয় তাঁর জীবনে।

প্রায় প্রতিটা ক্ষেত্রেই যে জিনিসটা কমন, সেটা হল যাঁদের পরিষেবা দিচ্ছি তাঁরা সেই পরিষেবা পাওয়ার ব্যাপারে একেবারেই সচেতন নন। তাঁরা জানেনই না, এই পরিষেবাগুলো পাওয়া তাঁদের অধিকারের মধ্যেই পড়ে। তাঁদের নিজস্ব প্রাপ্যটুকু বুঝিয়ে দিতে দিতেই অক্সিলিয়ারি নার্সের আর ‘সিস্টার’ হয়ে ওঠা হয় না, তাঁরা থেকে যায় ‘দিদিমণি’ হয়েই।

এমনকী আজ যখন বাড়িতে প্রসবের সংখ্যা অনেকটা কমে এসেছে, যখন মাতৃমৃত্যু ও শিশু মৃত্যুর হারও আগের তুলনায় কম, কিংবা এনডেমিক বা এপিডেমিক রোগের প্রাদুর্ভাবও অনেকাংশে নিয়ন্ত্রিত, তখন স্বাস্থ্য দফতরের বাহবা বা স্বীকৃতি এই অক্সিলিয়ারি নার্সদের না জুটলেও, উপস্বাস্থ্যকেন্দ্রে যাওয়া আসার পথে যখন কোন মা বলেন, ”দিদিমণি, তোর দাবাই খাকে মোর ছোওয়া আচ্ছা হোয় গেলাক”– তখন সেটুকুই আমার বা আমার মতো প্রত্যেক অক্সিলিয়ারি নার্সের ‘নার্সেস ডে’-র প্রাপ্তি।

(লেখিকা আলিপুরদুয়ারের মাদারিহাট ব্লকের সদ্য বন্ধ হয়ে যাওয়া মুজনাই চা-বাগানের অক্সিলিয়ারি নার্স)

Shares

Comments are closed.