বৃহস্পতিবার, জানুয়ারি ২৩
TheWall
TheWall

জেএনইউতে হামলা নিন্দনীয়, কিন্তু বিরোধীরাও কি ধোয়া তুলসিপাতা?

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

নাগরিকত্ব আইন বিরোধী আন্দোলন হয়তো সময়ের সঙ্গে সঙ্গে স্তিমিত হয় আসত, কিন্তু জেএনইউয়ে হামলার পর ফের দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। আন্দোলন মানেই উত্তেজনা। তাতে অনেক কিছু গুলিয়ে যায়। কিছুদিন আগে কী ঘটেছিল তাও মনে থাকে না। সেই জন্য যাঁরা আন্দোলন করছেন, তাঁদের কয়েকটা কথা মনে করিয়ে দেওয়া দরকার।

 

জেএনইউয়ের ঘটনার পর রাহুল গান্ধী থেকে সীতারাম ইয়েচুরি, সবাই বিজেপির বিরুদ্ধে আক্রমণ শানিয়েছেন। বেশ করেছেন। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বাইরে থেকে এসে গুন্ডারা হামলা করে যাবে আর বিরোধীরা কি চুপ করে থাকবে?

 

কংগ্রেস, সিপিএম একবাক্যে কেন্দ্রীয় সরকারকে বলছে ফ্যাসিবাদী। খুব ভাল বলেছে। তাদের এ কথা বলার নেপথ্যে নিজ নিজ যুক্তিও রয়েছে। কিন্তু এরপরে একটা প্রশ্ন আছে। যাঁরা অমন বলছেন, তাঁদের দলের অতীতও কি খুব পরিচ্ছন্ন?

 

বিগত ৫০ বছরে এই দলগুলির কীর্তিকলাপের সাক্ষী আছে আমাদের অভাগা রাজ্য পশ্চিমবঙ্গ।

 

সাতের দশকে রাহুল গান্ধীর ঠাকুমা ইন্দিরা গান্ধী যখন দেশের প্রধানমন্ত্রী, তখন এখানকার কলেজ-ইউনিভার্সিটিতে কংগ্রেসিদের দাপট ছিল ভয়ংকর। তাদের সংগঠন ছিল ছাত্র পরিষদ। তাতে অনেক বদ ছেলের ভিড় হয়েছিল। তারা লম্বা ঝুলপি রাখত, হাতে বালা পরত, সঙ্গে চকরাবকরা জামা আর ড্রেনপাইপ প্যান্ট। কলেজের প্রিন্সিপাল পর্যন্ত তাদের সমঝে চলতেন। পরীক্ষা হলে বই খুলে টুকতে দেখলেও কিছু বলার সাহস ছিল না। এর ফলে একটা নতুন শব্দ সৃষ্টি হয়েছিল—গণ টোকাটুকি।

 

সেই আমলা কলেজে বামপন্থার কথা উচ্চারণ করা ছিল মানা। কেউ বাম ছাত্র সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত জানলে তাকে মেরে তাড়িয়ে দিত। পরবর্তীকালে সিপিএমের রাজত্বে যাঁরা দাপুটে মন্ত্রী বা নেতা হয়ে উঠেছিলেন, তাঁদের অনেকে সাতের দশকে ছিলেন ছাত্র। কিন্তু ছাত্র পরিষদের দৌরাত্ম্যের মুখে ভিজে বেড়ালটি হয়ে থাকতেন।

 

জমানা বদল হল ১৯৭৭ সালে। নিজেদের গুছিয়ে নিতে সিপিএম সময় নিয়েছিল কয়েক বছর। আটের দশক থেকে তারা স্বমূর্তিতে আবির্ভূত হল। তখন থেকে প্রায় সাড়ে তিন দশক ধরে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল এসএফআইয়ের একচেটিয়া রাজত্ব। সিপিএমের লোকাল হার্মাদরা এক একটা কলেজকে নিয়ন্ত্রণ করত। ছাত্র সংসদ নির্বাচনের সময় বিরোধীদের কেউ নমিনেশন জমা দিতে গেলেই হত বিপদ। এসএফআই তাকে ভয় দেখিয়ে বলত, নমিনেশন তুলে নে। তাতে কাজ না হলে বাড়িতে হুমকি দিত। প্রার্থীর বাবা-মাকে বলত, যদি ছেলের মঙ্গল চান তো মনোনয়ন প্রত্যাহার করতে বলুন।

 

বেশিরভাগ সিটে এসএফআই প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জিতত। তারপর লাল আবির মেখে বিজয় উৎসব হত। বিজয়ীরা বলত, ছাত্ররা আমাদের খুব ভালবাসে। তাই কেউ বিরুদ্ধে দাঁড়ায়নি। কত ভালবাসে তা বোঝা গেল ২০১১ সালের পর। এখন জেতা দূরে থাক, অনেকে কলেজে তাদের প্রার্থীও জোটে না।

 

এখন কলেজে কায়েম হয়েছে তৃণমূল ছাত্র পরিষদের রাজত্ব। তাই সবুজ আবির মেখে বিজয় উৎসব হয়। টিএমসিপি অবশ্য এসএফআইয়ের মতো অত অর্গানাইজড নয়। সংগঠনের মধ্যে অনেক দলাদলি। তাদের মধ্যেকার বিবাদ প্রায়ই প্রকাশ্যে এসে পড়ে। কলেজে লাঠিসোঁটা নিয়ে মারপিট হয়। তাতে নিরীহ ছেলেমেয়েরাও বিপদে পড়ে। এমনকি কলেজের অধ্যক্ষ-অধ্যাপকদের মারধর হেনস্থার ঘটনাও বাদ যায়নি।

 

আগের মতো এখনও কলেজে বিরোধী রাজনীতি করা মানা। অন্যায়ের বিরুদ্ধে মুখ খুলতে গেলে শিক্ষক, অধ্যাপক এমনকি অধ্যক্ষও সবার সামনে অপমানিত হন। কটু মন্তব্য, মারধর কিছু বাদ যায় না।

 

আমাদের রাজ্য ছেড়ে এবার দিল্লির কথায় আসি।

 

ঐশী ঘোষ ও অন্যদের মারধর করা নিঃসন্দেহে অন্যায়। পুলিশ তাদের খুঁজে বার করুক। কড়া ব্যবস্থা নিক। যারা টুইটারে দাবি করেছে, আমরা হামলা করেছিলাম, তাদের কথা সত্যি কিনা খতিয়ে দেখুক। সত্যি হলে অ্যারেস্ট করুক।

 

কিন্তু আমরা কীভাবে ভুলে যাব যে, ঐশীর সংগঠন বিনয় কোঙারের দলের সমর্থক। যিনি নন্দীগ্রামে ‘লাইফ হেল’ করে দেব বলে হুমকি দিয়েছিলেন। একসময় দিয়েওছিলেন তাই। ছোট আঙারিয়া খ্যাত তপন-শুকুরও তো ঐশীদের পছন্দের দলের সদস্য ছিলেন, তাই না?

 

জেএনইউতেও তো বিরোধীরাও অনেকবারই ঐশীদের সংগঠনের হাতে মার খেয়েছেন। একথা সকলেই জানে।

 

রাহুল গান্ধীর দলকে একবার দিল্লির শিখ গণহত্যার কথা মনে করিয়ে দেওয়া যায়। ইন্দিরা গান্ধী শিখ দেহরক্ষীদের গুলিতে নিহত হয়েছিলেন। তারপরে দিল্লিতে শিখ নিধনে বেরিয়েছিল উন্মত্ত জনতা। তাদের নেতৃত্বে ছিল কংগ্রেসীরা। হাজার হাজার মানুষ মারা গিয়েছিলেন। অনেকের দেহে টায়ার জড়িয়ে তাতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল।

 

সীতারাম ইয়েচুরি আর রাহুল গান্ধীরা বলছেন, বিজেপি মেয়েদের হস্টেলে ঢুকে মেরেছে। এ হল ফ্যাসিবাদ। কিন্তু তাঁদের দল যখন মারপিট করে তখন কী বলা হবে। গণতন্ত্র?

 

আসলে হিংসা ব্যাপারটা সব সময়েই নিন্দনীয়। সে যেই করুক না কেন। অতীতে বাংলা বা কলকাতার শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলিতে যা হয়েছে বা এখনও হচ্ছে এবং এবার দেশের প্রথম শ্রেণির একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যা হল তা সমান নিন্দনীয়। কংগ্রেস বা বামেরা আগে কী করেছে তা দিয়ে এখনকার হিংসাকেও বিচার করা যায় না। ছাত্র আন্দোলন থাকবে, তাঁদের প্রতিবাদও থাকবে, গণতান্ত্রিক পরিবেশে সেটাই স্বাভাবিক। কিন্তু হিংসার যে সংস্কৃতি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে একদা কংগ্রেস বা বামেরা জন্ম দিয়েছিল, সেই ট্রাডিশানে এ বার ইতি টানা উচিত। দেশ জুড়ে আন্দোলনের উত্তেজনার মধ্যে এই কথাটা সকলের ভাল করে বোঝা দরকার।

Share.

Comments are closed.