শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

প্রাণীহত্যা না করেই মিলবে মাংস, পথ দেখাল বিজ্ঞান

রূপাঞ্জন গোস্বামী

আমাদের মধ্যে অনেকে আছেন যাঁদের মাংস খেতে ইচ্ছে করে, কিন্তু প্রাণীহত্যা চোখে দেখতে পারেন না। অনেকে আছেন  রাস্তা নিয়ে যাওয়ার সময় মাংসের দোকানে সারি সারি ঝুলন্ত পাঁঠা কিংবা গরুর শবদেহ দেখবেন না বলে অন্য রাস্তা দিয়ে ঘুরে যান, কিন্তু দিব্যি মাংস খান। আবার অনেকে আছেন পালক ছাড়ানোর পর মুরগিগুলিকে দেখতে সদ্যোজাত মানব শিশুর  মতো লাগে বলে মুরগির মাংস কিনে খান না, কিন্তু হোটেলে বা অনুষ্ঠানে মুরগির মাংস খান।

এঁরা সবাই মাংস খেতে ভালোবাসেন, কিন্তু প্রাণীহত্যা চান না। কিন্তু হত্যা ছাড়া কোনও প্রাণীর মাংস খাওয়া কি সম্ভব! হ্যাঁ সম্ভব, অতিমাত্রায় সম্ভব। মাংস খাবেন কিন্তু প্রাণী হত্যা করতে হবে না। সে পথও এবার দেখিয়ে দিল বিজ্ঞান। ফর্মুলা দিয়ে নয়, একেবারে হাতেনাতে খাবার উপযোগী মাংস ল্যাবরেটরিতে তৈরি করে দেখিয়ে দিয়েছে বিজ্ঞান।

৭৭০ কোটির মধ্যে নিরামিষ খান মাত্র ৫০ কোটি মানুষ

২০১৯ সালের এপ্রিলের পরিসংখ্যান অনুযায়ী পৃথিবীর জনসংখ্যা ৭৭০ কোটি। এর মধ্যে প্রথম  ১০০ কোটি মানুষ হতে লেগেছিল ২ লক্ষ বছর। এর পর বাকি ৬৭০ কোটি মানুষ তৈরি হতে লেগেছে মাত্র ২০০ বছর। পৃথিবীর আয়তন কিন্তু একই আছে। খাদ্যের উৎপাদন বৃদ্ধির চেয়ে জনসংখ্যা বেড়েছে উল্কাগতিতে।

২০১৪ সালে the Friends of the Earth এবং the Heinrich Böll Foundation নামে দুটি সংস্থা জানিয়েছিল পৃথিবীতে নিরামিষ খান মাত্র ৫০ কোটি মানুষ। বাদ বাকি ৬০০ কোটিরও বেশি মানুষ আমিষাশী। এঁরা যে কোনও ধরনের রেড মিট, টার্কি, এমু, মুরগি, বিভিন্ন পাখি, মাছ, শামুক, ঝিনুক, গেঁড়ি, গুগলি ও  অনান্য সামুদ্রিক জীবজন্তু অম্লানবদনে ভক্ষণ করে থাকেন। তবে সবাই যে সব প্রাণীর মাংস খান তা নয়। নিজেদের মনপসন্দ মাংস তাঁরা নিজেরাই বেছে ও খুঁজে নেন।

এঁদের জন্য পৃথিবীর পশুপাখিদের অবস্থা অত্যন্ত করুণ। মানুষের রসনাকে তৃপ্ত করতে করতে গিয়ে বিভিন্ন পশুপাখি ঝাড়েবংশে নির্মূল হয়ে গেছে। তাই বিজ্ঞানীদের মাথার মধ্যে অনেকদিন ধরেই ঘোরা ফেরা করছিল একটা চিন্তা। সেটা হল মাংসাশী মানুষদের হাত থেকে পশুপাখিদের কীভাবে বাঁচানো যায়।

মাংস খাওয়া বন্ধ করতে বললে দেশে দেশে গৃহযুদ্ধ বেঁধে যাবে। ফলে একটা যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নিলেন বিজ্ঞানীরা, যেটি কার্যকর করলে পশুপাখীরাও বাঁচবে, মানুষও কবজি ডুবিয়ে মাংস খাবে।

মহাকাশে সফলভাবে তৈরি হল মাংস

ইজরায়েলের খাদ্য উৎপাদন কোম্পানি আলেভ ফার্ম, এটি বিজ্ঞানসম্মতভাবে বিকল্প খাদ্য নিয়ে পরীক্ষা নিরীক্ষা করে ও উৎপাদন করে। কোম্পানিটি গত ৭ অক্টোবর ঘোষণা করেছিল, একটি বিফ-স্টেকে যত পরিমাণ মাংস থাকে ততটা পরিমাণ মাংস তারা বিজ্ঞানীদের সাহায্যে কৃত্রিম পদ্ধতিতে তৈরি করেছে।

মাংসখণ্ডটি পৃথিবীতে উৎপাদন করা হয়নি, উৎপাদন করা হয়েছে ভূপৃষ্ঠ থেকে ২৪৮ কিলোমিটার ওপরে ভাসমান  আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রে এবং কোনও প্রাণীকে হত্যা না করেই। এই গবেষণায় ইজরায়েলের কোম্পানিটিকে সাহায্য করেছে রাশিয়ার একটি এবং আমেরিকার দুটি বিকল্প খাদ্য উৎপাদনকারী সংস্থা।

আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্র

প্রাণী হত্যা ছাড়া কীভাবে পাওয়া গেল মাংস!

জীবাণুমুক্ত পরিবেশে কোনও জীবদেহ থেকে নেওয়া কলা বা টিস্যুকে কৃত্রিমভাবে পুষ্টি দিয়ে আয়তনে বাড়ানোর পদ্ধতির নাম টিস্যু কালচার। যেটি নতুন কোনও পদ্ধতি নয়। বহু লুপ্তপ্রায় উদ্ভিদকে সংরক্ষণ করা, প্রাণীর দেহের কোনও ক্ষতিগ্রস্থ টিস্যুকে আগের অবস্থায় ফিরিয়ে দেওয়া, এমনকি ডিম্বাশয়ের টিস্যু থেকে ডিম্বানু তৈরির মতো ঘটনা ঘটিয়েছে বিজ্ঞান। টিস্যু কালচারের সাহায্যে। এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষক ইভলিন টেলফার ও তার টিম এই অসাধ্যসাধন করেছিলেন ২০১৮ সালে।

এই টিস্যু কালচার পদ্ধতিরই আরেকটা রুপ হলো BIO-PRINTING। এই পদ্ধতিতে একটি 3D BIO-PRINTER মেশিনের থাকা  BIO-INK-এর মধ্যে প্রাণীকোশ বা কলার কৃত্রিম বৃদ্ধি ঘটানো হয়। BIO-INK-এর মধ্যে কোষের বৃদ্ধিতে সাহায্যকারী বিভিন্ন উপাদান মেশানো থাকে।

3D BIO-PRINTER

মহাকাশে থাকা আন্তর্জাতিক মহাকাশ কেন্দ্রের রাশিয়ার অংশে এই বছরের সেপ্টেম্বর মাসের ২৬ তারিখে cultivated beef steak  নামের ঐতিহাসিক পরীক্ষাটি হয়। রাশিয়ান মহাকাশচারী ও জীববিজ্ঞানী ওলেগ স্ক্রিপোচকা  এইপরীক্ষাটি করেন। জীবিত গোরুর দেহ থেকে একটি ছোট্ট টিস্যুকে বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে সুস্থ ও জীবন্ত রেখে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল মহাকাশে। সেই জীবন্ত টিস্যুটির বায়োপ্রিন্টিং ঘটান বিজ্ঞানী ওলেগ স্ক্রিপোচকা।

বিজ্ঞানী ওলেগ স্ক্রিপোচকা

জীবন্ত টিস্যুটির কোষগুলি অনবরত বিভজিত হতে থাকে 3D BIO-PRINTER মেশিনে থাকা বিশেষ তরলে। সাহায্য করে  করে চুম্বক শক্তি। ফলে ক্রমশ আকারে বাড়তে থাকে টিস্যুটি। মাত্র দু’সপ্তাহের মধ্যে তৈরি হয়ে যায় বিফ-স্টেক করার উপযুক্ত বড়সড় একটি মাংসখণ্ড এবং এই মাংসখণ্ডটি পেতে কোনও প্রাণীকে হত্যা করতে হয়নি।

মহাকাশে গবাদিপশুর টিস্যু থেকে তৈরি হওয়া মাংসের পিস

এ মাংস কি আলাদা ধরনের!

না একেবারেই স্বাভাবিক এক টুকরো মাংস, যা জীবিত কোশ দিয়ে তৈরি। পরীক্ষাটি গোমাংস নিয়ে হয়েছিল বলে গোমাংসের টুকরো তৈরি হয়েছে। শুয়োরের টিস্যু নিলে শুয়োরের মাংস তৈরি হতো, পাঁঠার নিলে পাঁঠার, মুরগির নিলে মুরগির।বায়োপ্রিন্টিং পদ্ধতিতে তৈরি মাংসের বৈশিষ্ট্য হলো এই মাংস জীবাণুমুক্ত হবে।

আলেফ ফার্মের ম্যানেজার ইয়ভ রেইসলার সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছেন, পৃথিবীতেও তাঁরা এই পরীক্ষা চালিয়েছিলেন। তবে পৃথিবীর চেয়ে মহাকাশে মাংসখণ্ডটি দ্রুত বৃদ্ধি পায়। এর কারণ হিসেবে তিনি মহাকাশে মাধ্যাকর্ষণের অনুপস্থিতিকে দেখিয়েছেন।

রেইসলার বলেন, মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে পৃথিবীতে টিস্যুটির নিচের দিকের কোশের বৃদ্ধি ও বিভাজন হয়। কিন্তু মহাকাশে টিস্যুর সব দিকের কোষ একসাথে বিভাজিত হয় বলে মাংসখণ্ডটি সব দিকে একসঙ্গে ও দ্রুত বাড়তে থাকে।

মহাকাশ কেন্দ্রের ল্যাবে একটি  টিস্যু রূপান্তরিত হচ্ছিল একটি জীবন্ত মাংসখণ্ডে

পরিবেশ বাঁচাবে এই মাংস!

এ বছর  অর্থাৎ ২০১৯ সালে, বিভিন্ন দেশের বিশেষজ্ঞদের নিয়ে গড়া একটি প্যানেল পরিবেশ দূষণ নিয়ে একটি স্পেশাল রিপোর্ট দিয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে আবহাওয়া পরিবর্তনের বড় কারণ হল পশুপালন, পশুর মাংস পক্রিয়াকরণ, চামড়া, হাড় ও লোম সংক্রান্ত বিভিন্ন শিল্প।

গ্রিন হাউস গ্যাসের বাড়বাড়ন্তের জন্য এগুলিও দায়ী। তাছাড়া এই সবের জন্য বিপুল পরিমানে শক্তি ও জল খরচ হচ্ছে। পৃথিবীর বিভিন্ন ফার্মে পশুপাখি পালন, জবাই ও প্রক্রিয়াকরণের পর প্রতি কেজি মাংস তৈরিতে গড়পড়তা কয়েক হাজার লিটার জল লাগে। বায়োপ্রিন্টিং পদ্ধতিতে জলের খরচ নেই, গ্রিন হাউস গ্যাস সৃষ্টির সম্ভাবনাও নেই।

বায়োপ্রিন্টিং পদ্ধতিতে উৎপাদিত মাংসের টুকরো রান্নার জন্য জন্য তৈরি

আলেফ ফার্ম ও এই প্রজেক্টে যুক্ত বিজ্ঞানীদের বক্তব্য কিন্তু পরিস্কার। তাঁরা বলছেন,পৃথিবী এই মুহূর্তে আগুনের ওপর আছে, অন্য গ্রহে পালাবার সুযোগ নেই। তাঁরা চান পৃথিবীর আকাশ ও সাগর যেন নীল থাকে। ভূপৃষ্ঠ যেন সবুজ রঙেরই হয়। যাতে   আগামী প্রজন্ম নির্মল পৃথিবীকেই দেখতে পায়।

তাঁদের দ্বিতীয় লক্ষ্য মাংসাশী মানুষদের বোঝানো, এই পৃথিবীটা পশুপাখিদেরও। তাদেরও বাঁচার অধিকার আছে। খাদ্যের জন্য নিরীহ প্রাণীদের জীবন কেড়ে নেওয়া মানুষের মতো উন্নত জীবের মানায় না। পশুপাখি না বাঁচলে মানুষও বাঁচবে না।

তাই বাজারে আসতে চলেছে ল্যাবে তৈরি মাংস

২০০৬ সালে রাশিয়ার বিজ্ঞানী ভ্লাদিমির মিরোনভ ল্যাবরেটরিতে মাংস উৎপাদনের স্বপ্ন দেখেছিলেন। ২০১৩ সালে ডাচ বিজ্ঞানী মার্কাস জোহানেস পোস্ট সর্বপ্রথম ল্যাবরেটরিতে বার্গার আকৃতির মাংস তৈরি করেন। কিন্তু তিনি সেই সাফল্যকে ব্যবসায়িক দৃষ্টিতে দেখেননি। ল্যাবরেটরিতে উৎপাদিত মাংসের বিশ্ব জুড়ে ব্যবসার স্বপ্ন দেখছে ইজরায়েলের আলেফ ফার্ম।

ল্যাবরেটরিতে মাংস প্রথম তৈরি করেন এই ডাচ বিজ্ঞানী, মার্কাস জোহানেস পোস্ট

সানফ্রান্সিসকোয় হওয়া এক সাংবাদিক সম্মেলনে ক্যালিফোর্নিয়ার ‘জাস্ট’ কোম্পানির সিইও জোস টিটরিক  বলেছেন, কৃত্রিম মাংসের সুপার মার্কেটে চলে আসা এখন সময়ের ব্যাপার মাত্র।। এই মাংস শুধু চার হাজার ওয়ালমার্ট বা সব ম্যাকডোনাল্ডেই নয়, পৃথিবীর সর্বত্র সরবরাহ ও উৎপাদন করা হবে।

আলেফ ফার্মের সহ প্রতিষ্ঠাতা ও চিফ এক্সিকিউটিভ দিদিয়ের তৌবিয়া বলেছেন, “ সমস্যা তিনটি। মাংসের ক্রমবর্ধমান চাহিদা, পশুপাখি হত্যা এবং পরিবেশ দূষণ। আমরা সঠিক সময়ে তিনটি সমস্যারই স্থায়ী সমাধান করে দিয়েছি। আমরা প্রমাণ করতে পেরেছি, মাংসও চাষ করা যায়। যেকোনও সময়ে, যেকোনও জায়গায়, যেকোনও পরিবেশে।”

আলেফ ফার্ম শুরু করে দিয়েছে মাংস চাষ

সেদিন আর দেরি নেই

যে রবিবার সকালে ব্যাগ ঝুলিয়ে বাজারে গিয়ে দেখবেন পাঁঠার মাংসের দোকান আর পাঁঠা ঝুলছে না। কচি পাঁঠার ঝোল আর দেহরাদূন রাইসের স্বপ্ন মুহূর্তেই ভেঙে খান খান। মুরগির মাংসের দোকানের খাঁচায় মুরগী নেই। আপনি এবার হতভম্ব। কিন্তু ঘোর কাটার আগেই দুই দোকানির কেউ একগাল হেসে বলবেন, ” সেদিন আর নেই দাদা, নিন ‘ল্যাব’ মাংস নিয়ে যান।”

“নেই মামার চেয়ে কানা মামা ভালো” কথাটা মাথায় রেখে ল্যাবে তৈরি পাঁঠার বা মুরগির মাংস নিয়ে বাড়ি ফিরবেন। দুর থেকে হয়তো একটা মুরগি ‘কঁক কঁক’ করে ডেকে উঠবে। হয়তো ‘ব্যা ব্যা’ করে ডেকে উঠবে একটা ছাগল। বুঝবেন ওরা ওদের ভাষায় আপনাকেই বলছে, “রাখে হরি মারে কে।”

Comments are closed.