উপাচার্যরা যা শিক্ষা দিচ্ছেন, এবার থেকে তো কেউ কাউকে মানবে না

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    তাহলে এই রকমই চলুক। কেউ কাউকে মানবে না। এই না মানার সংস্কৃতি নতুন নয়। ‘মানছি না মানব না’ এরাজ্যে অনেক হয়েছে। হুগলি নদীর দুই পাড়ের শিল্পাঞ্চল এমনি এমনি শ্মশান হয়ে যায়নি। মজুররা ইউনিয়নের উস্কানিতে মালিক-ম্যানেজমেন্টকে না মানতে শিখেছে। পরিণামে কারখানায় ঝুলেছে তালা। মজুররা রাস্তায় কৌটো নাড়িয়েছে। সেই উদাহরণ থেকে শিক্ষা নেওয়া উচিত ছিল। বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, বিশ্ববিদ্যালয়ের  উপাচার্যরাই ‘মানছি না মানব না’ সংস্কৃতিকে বর্জন করতে শেখেননি। রাজ্যপাল তথা বিশ্ববিদ্যালয়ের আচার্য তাঁদের ডাকছেন কিন্তু উপাচার্যরা যাচ্ছেন না। এমন অদ্ভূত ব্যাপার এরাজ্যে কখনও ঘটেনি।

    চাণক্য বলে গিয়েছিলেন, ‘বিদ্যা দদাতি বিনয়ম্‌’। অর্থাৎ বিদ্যা বিনয় দান করে। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলররা নিশ্চয় বিদ্বান। কিন্তু তাঁরা চরম দুর্বিনীত আচরণ করে দেখালেন। রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় হঠাৎ সবাইকে ডেকে পাঠিয়েছেন, এমন নয়। তিনি ডিসেম্বরের শেষ দিকেই বলেছিলেন, উপাচার্যদের সঙ্গে বৈঠকে বসতে চান। তা তিনি বসতেই পারেন। আচার্য হিসাবে উপাচার্যদের ডাকার পূর্ণ অধিকার তাঁর আছে। তিনি ১৩ জানুয়ারি দুপুরে ভাইস চ্যান্সেলরদের রাজভবনে আসতে বলেছিলেন। কিন্তু রাজ্যের সর্বোচ্চ পদাধিকারী ব্যক্তিটি দু’ঘণ্টা ধরে অপেক্ষা করলেন। কেউ এলেন না। শুধু তাই নয়, তাঁরা যে আসছেন না, সেকথা জানানোর প্রয়োজনও বোধ করলেন না।

    বিশ্ববিদ্যালয়ের শীর্ষ পদাধিকারীরা যদি এমন অসৌজন্য দেখান, তাঁদের ছাত্ররা কী শিখবে? এরপর উপাচার্যরা ডাকলে যদি কলেজের প্রিন্সিপ্যালরা দেখা করতে না আসেন, তখন কী হবে? তারপর হয়ত প্রিন্সিপ্যাল ডাকলে কলেজ শিক্ষকরা আসবেন না, শিক্ষকরা ডাকলে ছাত্ররা আসবে না, রাজ্য প্রশাসনের মুখ্যসচিব ডেকে পাঠালে সচিবরা আসবেন না, সচিবরা ডাকলে তাঁর অধীনস্থ অফিসাররা আসবেন না। এরকম চলতেই থাকবে।

    একে বলে নৈরাজ্য। যেখানে কেউ কাউকে মানে না। যে যার ইচ্ছামতো কাজ করে। পরিণামে দেশের উন্নয়ন, শিক্ষাদীক্ষা, আইন-শৃঙ্খলা সব জলাঞ্জলি যায়।

    উপাচার্যরা কোথায় ছাত্রদের শৃঙ্খলা মানতে শেখাবেন, তা নয় শেখাচ্ছেন তার উল্টো। হয়তো তাঁরা আচার্যকে পছন্দ করেন না। রাজ্যপাল যেভাবে হুটহাট এখানে ওখানে চলে যান, নানা ব্যাপারে মতামত দেন, রাজ্য সরকারের সমালোচনা করেন, তা হয়তো উপাচার্যদের ভাল লাগে না।

    তাঁদের মনে হতেই পারে রাজ্যপাল হাইপার অ্যাক্টিভ। সব জায়গায় নাক গলানো স্বভাব। তিনি বিজেপির প্রতিনিধির মতো আচরণ করছেন। কিন্তু সভ্য সমাজে ক্ষোভ-বিক্ষোভ জানানোর নির্দিষ্ট পদ্ধতি থাকে। প্রতিবাদের নামে অভব্যতা করা বিধিসম্মত নয়।

    রাজ্যপালের বিরুদ্ধে ক্ষোভ জানাতে হলে উপাচার্যরা ইউজিসিতে যেতে পারতেন। কোর্টে যেতে পারতেন। এমনকি খোদ রাষ্ট্রপতির কাছেও গিয়ে বলা যেত, আমাদের আচার্য বাড়াবাড়ি করছেন। যা নয় তাই বলছেন। কিন্তু উপাচার্যরা সেপথে হাঁটলেন না।

    আশ্চর্যের ব্যাপার হল, রাজ্যপাল কী বলেন, তা শোনার ধৈর্যটুকু পর্যন্ত তাঁরা দেখাননি। জগদীপ ধনকড় হয়তো পঠন-পাঠন নিয়ে কথা বলতে চেয়েছিলেন। রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন প্রণব মুখোপাধ্যায় মাঝে মাঝে উপাচার্যদের ডেকে অ্যাকাডেমিক বিষয়ে আলোচনা করতেন। রাজ্যপালও হয়তো তাই চেয়েছিলেন। কিন্তু উপাচার্যরা আগেই ভেবে নিলেন, তিনি অপ্রীতিকর কিছু বলবেন, রাজ্যের নিন্দা করবেন, বিজেপির হয়ে প্রচার করবেন। তাই মিটিং-এ গেলেন না।

    সোমবার দুপুর অবধি রাজ্যপাল এসম্পর্কে কোনও বিবৃতি দেননি। দেওয়ার দরকারও নেই। উপাচার্যরা বুঝিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা কত বড় অসহিষ্ণু।

    আমাদের শিক্ষিত সমাজের অনেকেই কথায় কথায় অসহিষ্ণুতা নিয়ে মুখ খোলেন। তাঁরা এবার কী বলবেন?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More