‘আমি তো শ্বশুরের সামনে হাফপ্যান্ট পরে ঘুরব না!’ লকডাউনে নিজের তৈরি শর্টফিল্ম নিয়ে অকপট অপরাজিতা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

    লকডাউনে সবকিছু লক হয়ে থাকলেও থেমে নেই ক্যালেন্ডারের পাতা। তাই দেখতে দেখতে আমরা পা দিয়েছি বাংলার নতুন বছরে, পৌঁছে গেছি কবিপক্ষেও। তবে এ বছরের পঁচিশে বৈশাখ একদম আলাদা। যা আগে কোনও দিন ইতিহাসে ঘটেনি, এবার তেমনটাই ঘটেছে। ঘরবন্দি হয়ে আমরা পালন করেছি পঁচিশে বৈশাখ। এমনই এক অজানা সময়ের বুকে ঘরবন্দি জীবনে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কতখানি প্রাসঙ্গিক, সেই ভাবনায় আরও একটি শর্টফিল্ম বানিয়েছেন অভিনেত্রী অপরাজিতা আঢ্য। ছবির নাম ‘বদ্ধ ঘরে রবি’।

    তবে এই ছবিতে বার্তা শুধু রবীন্দ্রনাথ বিষয়ক নয়, কোন পরিবেশে কী পোশাক পরা উচিত, গুরুজনদের কীভাবে শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা উচিত– তা নিয়েও মতামত তৈরি করেছেন অপরাজিতা।

    “রবীন্দ্রনাথ মানুষের মননে। এখনও অনেক মানুষ আছেন যারা রবীন্দ্রনাথ নিয়ে বাঁচেন। রবীন্দ্র অনুরাগী। আমি উত্তম কুমারকে পছন্দ করি মানেই আমায় উত্তম কুমার হতে হবে,তাঁর মতো অভিনয় করতে হবে তা তো নয়। উত্তমকুমারকে ভেবে আমাদের মায়েরা বাঁচেন। সেরকমই রবীন্দ্রনাথ আমাদের আদর্শ পুরুষ। যেমন আমার বাপের বাড়ির সংস্কৃতিতে কথায় কথায় রবীন্দ্রনাথ। আগেকার যুগে মানুষের জীবনে এত টিভি, ইন্টারনেট, সোশ্যাল মিডিয়া ছিল না। তাঁদের কাছে সাহিত্য বলতে ছিল রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র। এখন যেরকম মানুষের বাড়িতে রবীন্দ্র রচনাবলী কেবল সাজানো থাকে, আজ থেকে তিন দশক আগেও তেমনটা হতো না। আগে মানুষ বুঁদ হয়ে পড়তেন রবীন্দ্রনাথ, সমৃদ্ধ হতেন তাঁর সৃষ্টিতে। মানুষের জীবনচর্চায় থাকতেন রবীন্দ্রনাথ।”– বলছিলেন অপরাজিতা।

    আর এই জায়গাটা থেকেই ভাবনায় এসেছে রবিঠাকুরকে নিয়ে ‘বদ্ধ ঘরে রবি’ ছবি করার কথা। ছবিটি পরিচালনা করেছেন অপরাজিতার স্বামী অতনু হাজরা। ছবির ভাবনা, গল্প ও চিত্রনাট্য অপরাজিতা আঢ্যেরই। সম্পাদনা করেছেন সুবীর বিশ্বাস।

    অপরাজিতা জানালেন, একজন রবীন্দ্র অনুরাগী অথচ আধুনিক মনস্কা মায়ের চরিত্র করেছেন তিনি। তাঁর মেয়ে সমস্ত রকমের আধুনিক পোশাক পরে। কিন্তু সব জায়গার জন্য সব পোশাক নয়, সব মানুষ সবকিছু পছন্দ নাও করতে পারেন– এটাই মেয়েকে বোঝান মা। তবে কোনও রাগারাগি বা বিদ্রোহের পথে নয়, যুক্তি দিয়ে বুঝিয়ে। তাই সেই মা বলেন “নিয়ম তৈরি হয়েছে মানুষের জন্য, নিয়মের জন্য মানুষ তৈরি হয়নি। তবু শৃঙ্খলা বলে একটা শব্দ আছে। মানুষ যে বাড়িতে থাকে, সেই বাড়ির সেই বাড়ি হল মন্দির। গুরুজনেরা ঈশ্বর। তাই সেখানে পরিবর্তন আনতে হলে ভালবাসা দিয়ে আনতে হবে। তর্ক বা ঝগড়া করে, আলাদা হয়ে নয়।”

    আমরা ‘বদ্ধ ঘরে রবি’ ছবিতে দেখছি মেয়েটি তার বয়ফ্রেন্ডের সঙ্গে তর্ক করছে যে সে তার জন্য সব ত্যাগ করেছে অথচ সেই ছেলেটির একান্নবর্তী পরিবারের মা-কাকিমারা মেয়েটির পোশাক মেনে নিতে পারছেন না। তাঁদের চোখে লাগছে। মেয়েটি বুঝে পায় না, সে নিজে যে পোশাকে স্বচ্ছন্দ, তা নিয়ে অন্যদের কীসের মাথাব্যথা? ঠিক এই সময়ে সমস্যার হাল ধরেই মেয়েটির মা অপরাজিতা।

    দেখুন ছবিটি। উত্তর মিলবে অনেক দ্বন্দ্বের।

    অপরাজিতা ‘দ্য ওয়াল’কে জানালেন, “আমার নিজের ছোট্ট বয়সে বিয়ে হয়েছে। আমার শাশুড়িমা আমায় খুব ভালবাসতেন। এতই ভালবাসতেন যে আমার কোনও কিছু অপছন্দ হলেও উনি সেটা ভালবাসা দিয়েই বদলে নিয়েছেন। আমিও সেটাই শিখেছি। একটা সময়ের পর বাচ্চাদের মেরে-বকে বোঝানো যায় না কিছু। মাকে বন্ধুর মতো মিশে মেয়েকে বোঝাতে হয়।”

    এই ছবিটাতেও দেখানো হয়েছে, যাঁদের বাড়িতে রাবীন্দ্রিক সংস্কৃতি রয়েছে, তাঁদের বাড়ির ছোটদের মধ্যেও সেটা থাকে। যুবসমাজ রবীন্দ্রনাথকে চেনে না তা নয়, তারা হয়তো তাদের মতো করে জানে। যেহেতু নবীন যৌবনে রক্তের একটা জোর থাকে তা দিয়ে অনেক সময় তাদের বোধবুদ্ধি লঘু হয়ে যায়। ছবির পর্দার তরুণী মেয়েটিও সেই সমস্যায় ভুগছে। কিন্তু বয়সের সঙ্গে-সঙ্গে ম্যাচিওরিটি এলে সে বোঝে, ‘আমি’ বলে কিছু হয় না। সবাইকে নিয়েই মানুষ।

    সন্তানরা একটা বয়সে ভাবে, সে একাই ঠিক। বাবা মা যা বলছেন সেটা ভুল। তাই জন্যই ছবিতে মেয়েটি তার মাকে বলে “আমিও যখন মা হব তখন তোমায় কথায় হারিয়ে দেব।” কিন্তু আধুনিক সময়ের ছেলেমেয়েরা ভাবে এবং বিশ্বাস করে, নিজের শরীরের ও মনের অধিকার একমাত্র তারই। সেটাকে যে খারাপ নজরে দেখছে, এটা তার সমস্যা। অপরাজিতা কি এই বিষয়ে একমত?

    অপরাজিতা বললেন “সে তো বটেই। সেটা এখানেও বলা আছে। আমি যে পোশাকে সহজ হতে পারি আমি তো সেটাই পরব। এখন আমি যদি রোজ ভাল দেখতে লাগার যুক্তিতে শাড়ি পরে শ্যুটিংয়ে যাই, সেটায় তো কষ্টও হবে দেরিও হবে। কিন্তু বড়দের গুরুজনদের তো তোমায় সম্মান দিতেই হবে, তাই না। আজকে আমি তো আমার শ্বশুরের সামনে হাফপ্যান্ট পরে ঘুরব না। তা বলে কি আমি পরি না! আমি তো বিদেশ গেলে পরি। কিন্তু উনি যেহেতু পছন্দ করেন না, ওঁর পছন্দকে আমি আঘাত করব না। এটা আমার অনুভূতি। খুব দরকারে তাঁকে আমি আমার জায়গাটা বোঝাব। কিন্তু তাঁকে দুঃখ দেব না ইচ্ছেমতো আচরণ করে।”

    ছবিতে অপরাজিতা আঢ্যর সঙ্গে অভিনয় করেছেন মেয়ের ভূমিকায় টেলিভিশনের চেনা মুখ প্রিয়াঙ্কা ভট্টাচার্য। তাঁর প্রেমিকের ভূমিকায় সায়ন চক্রবর্তী। অপরাজিতা এ ছবিতে ব্যবহার করেছেন ‘শনিবারের চিঠি’  পত্রিকার কবিতা। ব্রিটিশ আমলে এই পত্রিকার সম্পাদক সজনীকান্ত দাস তৎকালীন সামাজিক অবস্থা কবিতা ও ছড়ার আকারে তুলে ধরেন বিভিন্ন মাসিক সংখ্যায়। ব্রিটিশ বিরোধিতার উদ্দেশে প্যারডি কবিতা থাকত তাতে, যা তখন খুব জনপ্রিয় হয়। সুখের কথা, এই পত্রিকা আজও প্রকাশিত হয়। কিন্তু স্বল্পচর্চিত।

    আরও পড়ুন: লকডাউনেই শ্যুটিং মোবাইলে, মা-মেয়েকে নিয়ে নতুন শর্টফিল্ম অপরাজিতার, তফাত নেই রিল ও রিয়েলে

    ছবিতে ব্যবহার করে হয়েছে ওই পত্রিকায় প্রকাশিত ‘পঁচিশে বৈশাখ’ কবিতা। দেখা যায়, একটা বাইশ বছরের মেয়ে রবীন্দ্রানুরাগী পরিবারে বেড়ে ওঠে বলেই সে এই কবিতাটা জানে আবার সে যে ছেলেটিকে পছন্দ করেছে সেও জানে এই কবিতাটা। যেন একটা বৃত্ত সম্পূর্ণ হয় এই কবিতাটা দিয়ে। অপরাজিতার কথায়, “অনেক মতের অমিল হলেও মানুষ একে অপরের সঙ্গে থাকতে পারে কারণ কোথাও একটা কিছু পছন্দ বা রুচি মিলে যায় দিনের শেষে।”

    সবশেষে অপরাজিতা আবারও মনে করিয়ে দিলেন বড়দের সম্মান করার কথা। বললেন, “এমনিতেই আমাদের আর্শীবাদ করার লোক কমে যাচ্ছে। গত দু’বছরে আমার জানা অন্তত দু’শো বৃদ্ধ মানুষ মারা গেছেন। মানুষের বয়স হলে সে শিশুর মতো হয়ে যায়, বিরক্ত না হয়ে একটু ভালবাসা দিতে হয় তাঁদের। আমরা বাচ্চাদের ভুলিয়ে খাওয়াই, কিন্তু বৃদ্ধ মানুষ খাওয়া নিয়ে বায়না করলে রাগ বা অবহেলা দেখাই। আমি এটা নিজের বাড়িতেও শেখাই। বয়স্ক শ্বশুর-শাশুড়িকে যত্ন করতে বলি। কেন তাঁদের বকতে হবে, ছেড়ে চলে যেতে হবে বা বৃদ্ধাশ্রমে পাঠিয়ে দিতে হবে! তাঁদের আঘাত করে কী লাভ!”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More