শনিবার, ডিসেম্বর ১৪
TheWall
TheWall

অনির্বাণের আমেরিকা অভিযান! অতীত থেকে ভবিষ্যতে বয়ে চলেছে একটি মানুষ, দু’টি চাকা

চন্দন বিশ্বাস

কলকাতা থেকে সানফ্রান্সিসকো একটা ওয়ান ওয়ে ফ্লাইট টিকিট, ২৫ হাজার টাকা, দু’মাসের ভিসা এবং একটা ব্যাকপ্যাক। ব্যস, এইটুকু সম্বল। তাই নিয়েই মাস চারেক আগে জয় মা বলে আমেরিকা পাড়ি দিয়েছিলেন অনির্বাণ আচার্য্য। ইচ্ছে, সাইকেলে এমাথা ওমাথা ঘুরে যদি লাতিন আমেরিকার দিকে পাড়ি দেওয়া যায়। ইমিগ্রেশন অফিসার কাণ্ড দেখে শুনে হাঁ করে করে তাকিয়ে ছিলেন খানিকক্ষণ। তার পর বলেন, “দু’মাসে কী হবে?” এই বলে তাঁর নিজের বিবেচনায় ভিসাটাকে ৬ মাসের করে দিলেন। অযাচিত ভাবে অতিরিক্ত সময় জীবনে পেয়ে যাওয়ার যে কী আনন্দ!

নিজের চেনা বলতে কেউ নেই সে দেশে। কলকাতার বন্ধুবান্ধবের সূত্রে একটু-আধটু যোগাযোগ কয়েক জনের সঙ্গে। সেই সূত্রেই যাওয়ার আগে ভিসার বন্দোবস্ত করার চেষ্টা করেছিল আমেরিকার একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন। ওরাই দিয়েছিল টেন্ট এবং অন্যান্য টুকিটাকি জিনিসপত্র। পৌঁছনোর পর সাইকেলের ব্যবস্থা হয়েছে এক অনাবাসী ভারতীয় যুধাজিৎ সেনমজুমদারের সহযোগিতায়। তাই দিয়েই জার্নি শুরু। দু’চাকায় আমেরিকা।

কিন্তু তার পর? রাস্তায় নামলে যেমন আনন্দের শেষ নেই, তেমনই সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকে প্রতিকূলতারাও। অনির্বাণকেও চলতে হয়েছে সে সবের মধ্যে দিয়েই। সাধারণ অ্যাডভেঞ্চারের থেকে একটু বেশিই সমস্যায় পড়েছেন তিনি। অনেক বাধা।টেন্ট সঙ্গে থাকলেও, হিমালয় বা ইউরোপীয়ান দেশগুলির মতো তা সব জায়গায় পিচ করা যায় না। চুরি-ছিনতাই-বাটপাড়ির আশঙ্কাও অনেক বেশি, দু-একবার পড়তেও হয়েছে তাদের খপ্পরে।

তাই চলার পথে রাত্রে থাকার জন্য অনির্বাণের ভরসা সেই মোটেল বা হোটেলই। খরচও বেড়ে চলেছে সে ভাবেই। অবশ্য সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন বহু প্রবাসী ভারতীয়। কিছু স্থানীয় আমেরিকান মানুষও কম সাহায্য করেননি। বেশ কয়েক বার বাধ্য হয়ে রাত কাটাতে হয়েছে  রাস্তায়, যেটা আবার আমেরিকায় বেআইনি! অর্থ সংস্থানের জন্য কিছু দিন কাজ করতে হয়েছে এদিক-সেদিক। চলার পথে তৈরি হয়েছে নতুন বন্ধুও।

সানফ্রান্সিসকোতে অনির্বাণের সঙ্গে দেখা হয় ভারতীয় ক্রিকেটের লিটিল মাস্টার সুনীল গাভাস্কারের। তিনি নিজের আগ্রহে জানতে চান অনির্বাণের অভিজ্ঞতা। শুভেচ্ছা, ভালবাসার সঙ্গেই দেশে ফিরে সহযোগিতার আশ্বাসও দেন। বলাই বাহুল্য তাঁর অভিযানে এটা একটা বড় প্রাপ্তি।

ক্যালিফোর্নিয়ার সানফ্রান্সিসকো থেকে লস এঞ্জেলস হয়ে আরিজোনা, টেক্সাস, নিউ মেক্সিকো, কানসাস, ওকলাহামা, মিসৌরি হয়ে ইলিনয়ের শিকাগো– এই হল এ পর্যন্ত অনির্বাণের অভিযানের রুট। আপাতত হাঁটু সমান বরফ সেখানে। সাইকেল চালানো যাচ্ছে না আর। তাঁর পরবর্তী গন্তব্য ওয়াশিংটন ডিসি, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী।

চার মাসে ইতিমধ্যেই ৩ হাজার ৬০০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়েছেন অনির্বাণ। এর পর যাবেন লাতিন আমেরিকার দিকে। ভেনেজুয়েলা, কলম্বিয়া হয়ে পেরু, ব্রাজিল, আর্জেন্টিনা থেকে স্বপ্ন পৃথিবীর দক্ষিণতম বিন্দু অ্যান্টার্কটিকা স্পর্শ করার।

তবে পৃথিবী জুড়ে সন্ত্রাসবাদের দাপটে এখন সব দেশই ভিসা নিয়ে বেশ কড়াকড়ি। তাই পরিকল্পনা অনুযায়ী ভিসা মিলবে কি না, জানা নেই। অনির্বাণের অবশ্য ভিসা না পেলেও ক্ষতি নেই। তখন তিনি চলে যাবেন আফ্রিকার দিকে। নিরুদ্দেশ যাত্রায় এটা কোনও ব্যাপারই নয়।

সেই তিনের দশকে রামনাথ বিশ্বাস, বিমল মুখার্জীকে দিয়ে শুরু হয়েছিল বাঙালির সাইকেলে বিশ্ব ভ্রমণ। তারপর বহু বাঙালি এবং ভারতীয় সেই পদাঙ্ক অনুসরণ করেছেন, ধারা এখনও অব্যাহত।

৩৩ বছরের অনির্বাণ স্কুলজীবন থেকেই অ্যাডভেঞ্চারের সঙ্গে যুক্ত। শৈলারোহণ থেকে পর্বতারোহণ সব কিছুরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নিয়েছেন। মাত্র ২২ বছর বয়সে দেশীয় সাইকেল নিয়ে পাড়ি দিয়েছিল কলকাতা থেকে কাশ্মীর। মাঝের কয়েকটা বছর ক্যান্সার সচেতনতা প্রসার ও প্রচারে সাইকেলে ঘুরেছেন সারা ভারত, বাংলাদেশ, মায়ানমার, থাইল্যান্ড, লাওস, কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড। ধীরে ধীরে এখন এক জন পরিপূর্ণ ট্রাভেলারে পরিণত হয়েছেন।

এই অভিযান থেকে অনির্বাণ কবে ফিরবেন, কোথায় ফিরবেন, আদৌ ফেরা হবে কি না, কেউ জানে না। যেন অতীত থেকে ভবিষ্যতের দিকে বয়ে চলেছে একটি মানুষ ও দু’টি চাকা। এক দিন হয়তো এ ভাবেই নিঃশব্দে সারা পৃথিবীটাই ঘুরে ফেলবেন অনির্বাণ।

Comments are closed.