শনিবার, অক্টোবর ১৯

অবলাদের সবচেয়ে বড় বাড়ি চেন্নাইয়ে, ১৮ বছরের ছেলের হাত ধরে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কুকুর, বেড়াল হোক বা পাখিদের পোষ্য করে রাখতে আমরা অনেকেই তো ভালোবাসি।  কিন্তু সেই পোষ্যরাই তো বারবার অত্যাচার সহ্য করে এসেছে।  কখনও কোনও কুকুরের ধর্ষণ হওয়ার খবর হোক বা কখনও কোনও বেড়ালকে জ্বালিয়ে দেওয়া- এরকম খবর পড়তে পড়তে আমরা যখন ক্লান্ত, তখন আমাদের কাছে দমকা বাতাসের মতো সাই বিগনেশের নাম উঠে আসে।  চেন্নাইয়ের ১৮ বছরের ছেলেটি নিজের চেষ্টায় তৈরি করে ফেলেছে একটি আশ্রয় কেন্দ্র।  পশুপাখিদের জন্য তৈরি হচ্ছে এই আশ্রয় কেন্দ্র।

বিগনেশ বলছেন, তার দাদু ঠাকুমা সবসময়ে তাকে শিখিয়েছেন, পৃথিবীতে যখন জন্মেছি মানুষ হয়ে, তখন অবলাদের জন্য কিছু করা উচিত।  তারা কথা বলতে পারে না।  আর দাদু ঠাকুমাকে সবসময়ে ছোট থেকেই সে দেখেছে রাস্তার কুকুর বেড়ালদের জন্য কিছু না কিছু করতে।  তাই সহজেই তার মধ্যেও সেই মনোভাব এসেছে।  তার যখন মাত্র পাঁচ বছর বয়স, তখনই সে পোষ্য কুকুর বৈরভকে হারিয়েছিল।  তারপর ৭ বছর বয়স থেকেই সে রাস্তার কুকুর বেড়ালদের নিয়ে খুব উৎসাহী হয়ে ওঠে।  গত দু বছরে তাদের আট বার বাড়ি বদলাতে হয়েছে, কারণ ভাড়া বাড়িতে প্রচুর কুকুর বেড়ালকে এনে যখনই তাদের সুস্থ করতে গেছে বা তাদের শুশ্রূষা করতে গেছে, বাড়িওয়ালা তা মেনে নেননি।  তাই বারবার তাদের বাড়ি বদলাতে হয়েছে কিন্তু কোনও ভাবেই সে তার অভ্যাস বদলাতে চায়নি।

বৈরভের মৃত্যুর পর থেকে বিগনেশ আর একটি কুকুরও বাড়িতে পোষেনি, কিন্তু প্রায় ১০০০ এর উপরে কুকুরের দেখভাল করেছে, যারা সকলেই পথকুকুর।  ২০১৫ তে চেন্নাইয়ের বন্যায় যখন সব ভেসে যাচ্ছিল, তখন সে কিছু কুকুরছানাকে বাড়িতে এনেও রেখেছিল, ২০১৬-এ সাইক্লোনে যখন পাখি পশুরা বিপর্যস্ত হয়েছে, তখনও সে ওদের বাড়িতে আশ্রয় দিয়েছিল।  তখন থেকেই সে আমিষ খাওয়াও ছেড়েছে বলে জানিয়েছে বিগনেশ।  এই মুহূর্তে বিগনেশের চেন্নাইয়ের আলাপক্কমের বাড়িটি ১৫ টি রাস্তার কুকুরের আশ্রয়।  এরা প্রত্যেকেই অসুস্থ এবং তার সেবা পাচ্ছে।  নিজের বাড়িতে জায়গা সঙ্কুলান করতে পারেনি, তাই বাড়ির কাছেই পশুপাখিদের একটি বোর্ডিং-এ নিয়মিত যাতায়াত করে বিগনেশ।

২০১৭ তে সে অলমাইটি অ্যানিম্যাল কেয়ার ট্রাস্ট শুরু করে, আরও বেশি করে, ভালো করে পশু-পাখিদের যত্ন করবে বলে।  এই সংস্থা রাস্তার কুকুর, বেড়াল, পাখিদের জন্য আইনত যা যা করার, তাদের ভ্যাকসিনেশন থেকে স্টেরিলাইজেশন সব কিছুই করে।  এখনও পর্যন্ত প্রায় ৯০০ রাস্তার কুকুরের ভ্যাকসিন ও স্টেরিলাইজেশন করিয়েছে সে।  এ পর্যন্ত প্রায় ২০০-র উপর কুকুরছানা, বেড়ালছানাকে আশ্রয় দিতে পেরেছে, প্রায় ১০০ এর উপরে অসুস্থ পশু পাখিকে সুস্থ করতে পেরেছে সে।  এ সব কারণেই নিজেকে ভাগ্যবানও মনে করে বিগনেশ।

তার বিভিন্ন কাজের মাধ্যমে সে সমাজের কাছে বার্তা পৌঁছতে বদ্ধপরিকর যে, “এসব পশুপাখিরাও আমাদের সমাজের জন্য খুব প্রয়োজন, তাদেরও সঠিক সম্মান, সঠিকভাবে বেঁচে থাকার অধিকার দিতে হবে। ” এই উদ্দেশ্যেই সে বিভিন্ন পদযাত্রাও করে থাকে।  যাতে মানুষ সচেতন হন।  ২০১৭ তে এমনই একটি পদযাত্রাতে সে আরও একজন সমমনস্ক মানুষের সাথে পরিচিত হয়, যাঁর নাম শিবমনি।  শিবমনিকে সে তার মনের কথা জানায়।  তারপরেই তিরুভেল্লুরে ৮.৪ একর জমি শিবমনি দান করেন বিগনেশকে।  সেখানেই এবার পশুপাখিদের আশ্রয়স্থল এবং মেডিক্যাল ডিসপেন্সারি তৈরি করা হচ্ছে।  বিগনেশ বলছে, “মেডিক্যাল ডিসপেন্সারি প্রায় তৈরি হয়ে গেছে, কুকুরদের জন্য থাকার জায়গাটাতে হাত দেওয়া হয়েছে, আপাতত এটার পরে বেড়াল এবং বাকি পশুপাখিদের জন্য আলাদা আশ্রয়স্থলের দিকে নজর দেব আমি।”এই আশ্রয়স্থলে চারটি ভাগ থাকছে, এক জায়গায় থাকবে কুকুররা, আরেক জায়গায় বেড়ালরা, অন্যটিতে ফার্ম অ্যানিম্যাল বা ছাগল, মুরগি, বাকি গবাদি পশুরা, আর বাকিটুকু মেডিক্যাল ডিসপেন্সারি।

বিগনেশ আরও বলছে, “অনেক সময়ে পাভরো বা অন্য অনেক সংক্রামক ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়া কুকুরদের চিকিৎসা করছে না চেন্নাইয়ের পশু হাসপাতালগুলো।  তখন ওরা মরে যাচ্ছে, কিন্তু ওদের শুরুতেই চিকিৎসা শুরু করা গেলে, হয় তো প্রাণে বাঁচানো সম্ভব।  তাই আমরা চেষ্টা করব আমাদের প্রায় ৮ একরের এই জায়গায় সংক্রামক ব্যাধি আছে যে সব কুকুরদের, ওদের আলাদা করে একটা জায়গায় রেখে চিকিৎসা করার।  আর টাকা পয়সা যতই লাগুক, প্রয়োজনে নিজেদের বসতভিটের কিছুটা করে বিক্রি করে দেব।  তাতে অন্তত অবলাগুলো বেঁচে যাবে।  আমি বিশ্বাস করি আমাদের এই স্যাঙচুয়ারি কুকুর, বেড়াল, গরু, মুরগি সকলের জন্যই জায়গা করে দেবে, তাতে ওরা সুস্থ সুন্দর করে বেঁচে থাকতে পারবে।  আমি আরও বেশি করে সচেতনতা তৈরি করার চেষ্টা করে যাব।  যাতে এই অবলাগুলো আর অত্যাচারিত না হয়, ওদের যাতে ফেলনা ভেবে আর কেউ মেরে না ফেলে। ” ইতিমধ্যেই সে মানুষের থেকে এই স্যাঙচুয়ারির জন্য সাহায্য প্রার্থনা করতেও শুরু করেছে।  যিনি যতটুকু পারছেন, দিচ্ছেন।  তাতে বিগনেশ তার স্বপ্ন সফল করতে বদ্ধপরিকর।  শেষ পর্যন্ত বিগনেশ কতটা সফল হয়, সেটাই এখন দেখার।

Comments are closed.