মঙ্গলবার, অক্টোবর ২২

আনুগত্য না মেরুদণ্ড, বাজি রইল অনশন!

অনীক চক্রবর্তী

মাঝে মাঝে কেমন মনে হয়, ক্ষমতার কোনও যুক্তি হয় না। অবিশ্বাস্য ঔদ্ধত্য পরিমাপের কোনও একক হয় না। একটা প্রকান্ড অন্যায়ের শেষে প্রাণহীন পড়ে থাকা দেহের জন্য কোনও সুবিচার হয় না।

অথচ আমরা জানি দু’হাজার আঠেরোয় আমরা মোটামুটি একটা সভ্য দেশেই বাস করি যেখানে এক জন সভ্য নাগরিকের একটা কথার পেছনে কিছু যুক্তি থাকে, নিজের একটা আচরণের সবার সামনে রাখার মতো মানে থাকে এবং নিজের একটা কাজের জন্য থাকে জবাবদিহি করার দায়। এবং সেই নাগরিক কোনও নির্দিষ্ট যোগ্যতার বলে একটি নির্দিষ্ট পদাধিকারপ্রাপ্ত হলে, সামাজিক পিরামিডে আর পাঁচ জনের চেয়ে একটু ওপরে অবস্থান করলে তার যুক্তি, দায়িত্ব এবং আচরণও সেই অনুপাতেই বেশি হওয়া স্বাভাবিক। চোদ্দর কিশোরের কাছে এক জন চুয়ান্নর অভিভাবক অনুসরণীয় শুধু সম্পর্কে অভিভাবক বা বয়সে চুয়ান্ন হওয়ার দাবি থেকে হন না, তাকে পাশাপাশি যুক্তি, দায়িত্ববোধ এবং আচরণেও নিজের সেই জায়গা তৈরি করতে হয়। নাহলে অভিভাবক শব্দটা হয়ে যায় ঘুন ধরা কড়িকাঠ আর তার শাসন হয়ে যায় স্ট্যান্ড আপ কমেডি শো।

শতাব্দীপ্রাচীন ৮৮ নম্বর কলেজ স্ট্রিট এই মুহূর্তে নিজেই আইসিইউতে ভর্তি, কারণ কোনও এক অজানা কারণে সেখানে বিগত তিন সপ্তাহ ধরে সভ্য সমাজের এই উপরোক্ত নিয়মগুলি আর খাটছে না। এশিয়ার প্রাচীনতম মেডিকেল কলেজ আজ তার অভিভাবকের ধারাবাহিক যুক্তিহীনতা, দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ এবং প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির নেট প্র্যাক্টিসের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। আজ সভ্যতার সংজ্ঞার উল্টো দিকে দাঁড়িয়ে মেডিকেল কলেজ কলকাতার অভিভাবক এবং তার অবিশ্বাস্য ঔদ্ধত্য, তার নিজস্ব রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির বলি হতে চলেছে সুবিচার চাওয়া সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা।

ঠিক কী হয়েছে মেডিকেল কলেজ কলকাতায় যার জন্য এই মুহূর্তে দু’শো ঘন্টারও বেশি সময় ধরে অনশন করছেন সাধারণ ছাত্রছাত্রীরা? ক্যাম্পাসে সদ্য একটি এগারো তলা নতুন বিল্ডিংয়ের কাজ শেষ হয়েছে। তার কয়েকটি তলায় ক্যান্টিন, হাসপাতালের জন্য কিচেন ইত্যাদি ছাড়া বাকি সব ক’টি তলাতেই বিভিন্ন বর্ষের ছাত্রছাত্রীদের থাকার কথা ছিল। হ্যাঁ, গত বছর ৬ জুন হওয়া একটি মিটিংয়ে তৎকালীন প্রিন্সিপালের উপস্থিতিতে সর্বসম্মতিক্রমে ঠিক হয় স্নাতকোত্তর ছাত্রী ছাড়াও স্নাতকস্তরের ছাত্রছাত্রীদের থাকার জন্যও ব্যবহৃত হবে নতুন হস্টেলটি।

কিন্তু হঠাৎ এই বছর ১০ মে একটি নোটিসে সেটি বদলে গিয়ে হয়, যে স্নাতকস্তরে শুধুমাত্র প্রথম বর্ষের ছাত্ররাই থাকবে সেখানে। কারণ? না প্রথমত প্রথম বর্ষের ছাত্রদের র‍্যাগিংয়ের হাত থেকে বাঁচানো এবং দ্বিতীয়ত এটা নাকি এমসিআই বলেছে, এতে কারওই কিছু করার নেই। প্রথমত, মেডিকেল কলেজের সুদীর্ঘ ইতিহাসে র‍্যাগিং হয়েছে এমনটা কেউ দেখাতে পারবে না। শহর কলকাতার বাইরে মূলত গ্রাম মফস্বল থেকে যে সমস্ত ছাত্রেরা আসে, তারাই একসাথে থাকে হস্টেলে। সিনিয়র জুনিয়র সম্পর্কের ভিত্তিতেই দাঁড়িয়ে থাকে দৈনন্দিনে বাঁচা, ডাক্তারি পড়া বা শেখা এবং অন্যান্য আরও হাজারো সমস্যার সমাধান। আর দ্বিতীয়ত, এমসিআই প্রথমে বলেছে কলেজে পড়া পঁচাত্তর শতাংশ ছাত্রছাত্রী থাকবে হোস্টেলে, প্রতিটি রুমে থাকবে সর্বোচ্চ তিন জন করে বোর্ডার, এবং তার পরে বলেছে প্রথম বর্ষের ছাত্রদের যত দূর সম্ভব আলাদা ব্লকে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে!

চলছে অনশন।

এবং আশ্চর্যের বিষয় এই, যে গত তিন বছর ধরে হস্টেল কাউন্সেলিং হয়নি। দূর দূরান্ত থেকে বহু ছাত্র হয় দিনের পর দিন যাতায়াত করতে বাধ্য হয়েছে, বা হাজার হাজার টাকা ভাড়া গুনে থাকতে বাধ্য হয়েছে পেইং গেস্ট হিসেবে। প্রতিটা রুমে চার জন, কখনও পাঁচ জন করে থাকতেও বাধ্য হয়েছে তারা। বিগত কয়েক বছরে হু হু করে বেড়েছে পড়ুয়ার সংখ্যা, তাদের মাথা গোঁজার জন্য মেইন হস্টেলের ছাদ কেড়ে নিয়ে বানানো হয়েছিল একটি তলা। বিভিন্ন সময়ে তার ফল্স সিলিং খুলে গিয়ে, মেঝের টাইলস ভেঙে গিয়ে আহত হয়েছে ছাত্রেরা। গোটা হস্টেলই যেন পৌরসভার ভ্যাট, পরিষ্কারের লোক পাওয়া যায় না। ছাত্ররাই উদ্যোগ নিয়ে করায় তা। মেসও চলে ছাত্রদেরই উদ্যোগে।

বছরের পর বছর বারবার যাওয়া হয়েছে প্রিন্সিপালের কাছে এই সমস্ত সমস্যার সমাধানের জন্য। তখন জুটেছে সীমাহীন অবজ্ঞা। আর আজ যখন নতুন হস্টেলে স্বচ্ছ ভাবে হোস্টেল কাউন্সেলিংয়ের দাবি নিয়ে ছাত্ররা যায়, তখন তাদের জোটে দায়িত্বহীন উচ্চারণ “আমি এই কলেজের প্রিন্সিপাল, আমার যা ইচ্ছে তাই করব”।  সন্তানসম ছাত্রদের মুখের ওপর বলেন “ফল্স সিলিং ভেঙে আহত হলে বেডের ব্যবস্থা করে দেব এমার্জেন্সিতে”। আর সকালে ছাত্রদের কাছে রাখা এই সীমাহীন ঔদ্ধত্য বিকেল গড়ানোর আগেই বদলে যায় প্রশ্নহীন রাজনৈতিক আনুগত্যে, যখন দেখা যায় সেই নতুন হস্টেলের সুপার আসলে সদ্য এমবিবিএস পাশ করে ওঠা এক বিশেষ রাজনৈতিক দলের কুখ্যাত নেতা। যে পদ এক দিন ছিল দায়িত্ববান প্রফেসরের জন্য সংরক্ষিত, তা পদলেহনের ফলে মুক্ত হয়ে যায় অচেনা এমবিবিএস ডাক্তারবাবুর জন্য। আর যে হস্টেল ছিল সাধারণ ছাত্রদের অধিকার, তার দরজায় পুলিশ মোতায়েন হয় প্রিন্সিপালের নির্দেশে।

অভিভাবক অবশ্য এখানেই থেমে থাকেননি। শান্তিপূর্ণ ভাবে অবস্থান করা ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে এক বারও সুস্থ আলোচনায় যাওয়ার চেষ্টা করেননি, ডাকেননি কলেজ কাউন্সিলের মিটিং। উপরন্তু পুলিশ ডেকেছেন ক্যাম্পাসে। অনশনে বসার পরে এক বারের জন্যও নেমে আসেননি নিজের সিংহাসন থেকে, উপরন্তু ছাত্রদের বাড়িতে বাড়িতে পুলিশ পাঠিয়ে তাদের অভিভাবকদের ভয় দেখিয়েছেন। হুমকি দিয়েছেন তাদের কেরিয়ার শেষ করে দেওয়ার। এবং এখানেই শেষ নয়। ক্লাস শুরুর এক মাস আগে রীতিমতো ফোন করে চাপ দিয়ে নতুন হস্টেলে ডেকে আনা হয়েছে প্রথম বর্ষের ছাত্রদের। আর কড়া পুলিশি প্রহরায়, রাতে তাদের ইন্ট্রো নিয়েছে বিশেষ রাজনৈতিক দলের সিনিয়াররাই। মেডিকেল কলেজের অভিভাবকের প্রত্যক্ষ মদতে শুরু হচ্ছে এক জন ডাক্তারি পড়ুয়াকে তার জীবনের প্রথম রাত থেকেই পার্টির ক্যাডার বানানোর পদ্ধতি। এর পরেও আমরা বিশ্বাস করছি দু’হাজার আঠেরোয় আমরা একটি সভ্য গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক, যেখানে সমস্ত সন্তানকে বুকে আগলে রেখে বড় করেন সমস্ত দায়িত্বশীল অভিভাবক।

নির্দিষ্ট জায়গায় এই সিলেক্টিভ অতিসক্রিয়তা আর অন্যান্য জায়গায় সিলেক্টিভ নিষ্ক্রিয়তার এই চাষের সংস্কৃতি আজ সমস্ত মেডিকেল কলেজগুলিতেই প্রায় রুটিন হয়ে দাঁড়িয়েছে। কিন্তু মেডিকেল কলেজ কলকাতার গণতন্ত্রপ্রেমী সাধারণ ছাত্রছাত্রী সব দিনই রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধি করতে চাওয়া নেতা এবং কলেজ অভিভাবকদের জন্য শক্ত ঘাঁটি। তাই তার ওপর আঘাতও অনেক বেশি, অনেক বেশি তার গায়ে কালশিটের দাগও। তবু এই কলেজেই চর্চা চলে দৈনন্দিনে ডাক্তারি পড়া পেরিয়েও বৃহত্তর সমাজ ও তার স্বাস্থ্যের অন্যান্য দিকগুলি নিয়ে, তাতে নিজের কর্তব্য নিয়ে।

এক জন ডাক্তার মানে শুধুমাত্র কিছু রোগচিহ্ন আর তার নির্দিষ্ট চিকিৎসার তথ্যবোঝাই বাবুমশাই নয়। নিজের চিন্তাপদ্ধতি মুক্ত রেখে, নিজের বিচার বিবেচনায় মানবিক থেকে, নিজের বৃহত্তর বাঁচার ক্ষেত্রে মেরুদণ্ডটি সোজা রেখে তবেই তাকে এক জন মানুষের পাশে দাঁড়াতে হয়, তার ক্ষতস্থানে মলম ছাড়াও দিতে হয় সমানুভূতির পরাগ। সেটা আসে ছাত্রাবস্থা থেকেই উপরোক্ত পদ্ধতিগুলির দৈনন্দিন যাপনের মধ্যে দিয়ে। মেডিকেল কলেজ কলকাতা অনেক ঝড়জল কাটিয়ে কিছুটা হলেও আজও বাঁচিয়ে রেখেছে সেই যাপনকে, সেই চিন্তাস্রোতকে।

কেমন যেন মনে হচ্ছে আজকের এই প্রশ্নহীন আনুগত্যের যুগে মেডিকেল কলেজ কলকাতার সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের বহু যত্নে বাঁচিয়ে রাখা এই চিন্তাস্রোতটি থেকে নবাগতদের বিচ্ছিন্ন করে ফেলার একটা চক্রান্ত হচ্ছে। বিচ্ছিন্নতা ছাড়া, নিজস্ব স্বার্থসিদ্ধি ছাড়া, অযৌক্তিকতা আর ঔদ্ধত্য ছাড়া আর কিছু থাকবে না। ডাক্তারেরা এই সমাজের সন্তান হলেও পাশাপাশি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কলেজ জীবনে সে এক জন রোগীকে, এবং তার সাথে সম্পৃক্ত জীবনকে কী ভাবে দেখতে শিখছে সেই শিক্ষাটাও। বর্তমান ছাত্রদের অধিকারের প্রশ্নে মুখ ফিরিয়ে তো বটেই, কিন্তু নবাগতদের কাছ থেকে সেই চিরপ্রবহমান সঞ্জীবনী স্রোতকে সরিয়ে রেখেও শতাব্দীপ্রাচীন এই কলেজকে আগত সময়ের জন্য শ্মশানে পরিণত করতে চাইছে কলেজ কর্তৃপক্ষ।

তবু মেডিকেল কলেজ লড়ছে তার সমস্ত শক্তি নিয়ে। কারণ শ্মশানের শান্তি নয়, অসহ্য ঔদ্ধত্য নয়, এই কলেজের প্রতি দেওয়ালে কান পাতলে এখনও তাতে শোনা যায় জীবনের জন্য, ভালোবাসার জন্য গান গাইছে, জীবন চাইছে অসংখ্য ছাত্রছাত্রী।

লেখক আইআইটি খড়্গপুরে এমএমএসটি পাঠরত, কলকাতা মেডিকেল কলেজের প্রাক্তনী।
মতামত তাঁর ব্যক্তিগত।

Leave A Reply