শুক্রবার, নভেম্বর ১৬

চিতার ধোঁয়ায় অন্ধকার চার পাশ, এমনটা আগে ঘটেনি অমৃতসরের সেই শ্মশানে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: ঘন কালো ধোঁয়ায় আটকে আসছে দম। চোখ-মুখ যেন জ্বলে যাচ্ছে। আর সেই সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন কান্নার আওয়াজ। সমবেত। এমন দৃশ্যই দেখলেন অমৃতসরের শিবপুরি দুর্গিয়ানা শ্মশান ও সংলগ্ন এলাকার মানুষেরা। সাধারণ মানুষ দূরের কথা, শ্মশানের ডোমরাই খোদ বলছেন, এমনটা কখনও ঘটেনি তাঁদের শ্মশান-জীবনে।

দশমীর রাতে অমৃতসরের জোড়়া ফাটক এলাকার ভয়ঙ্কর রেল দুর্ঘটনায় মুহূর্তে পিষে গিয়েছেন ৬১ জন মানুষ। তাঁদের মধ্যে ৩৮ জনের দেহ রবিবার দাহ করা হয় শিবপুরি দুর্গিয়ানা শ্মশানে। সেখানকার দৃশ্যই থমকে দিয়েছে গোটা শ্মশান এলাকা। অনেকে বলছেন, সেই রাতের দুর্ঘটনা যদি শিউরে ওঠা হয়, তা হলে এ দিনের শ্মশান-আবহ যেন সারা শরীরকে অবশ করে দিয়েছে। শ্মশানের ম্যানেজার ধর্মেন্দ্রও বলছেন, “এই শ্মশানে প্রথম এতগুলি চিতা একসঙ্গে জ্বলছে”। ৩৮টি দেহের মধ্যে পাঁচটি দেহ তিন থেকে ১৩ বছরের ছেলেমেয়েদের।

একটু দূরেই দাঁড়িয়ে ছিলেন শোকস্তব্ধ যুবক গৌরব দোগরাকে। সামনের চার-চারটি চিতার দিকে চেয়ে রয়েছেন। একটিতে জ্বলছে তাঁর বোনের শরীর, আর একটিতে ভগ্নীপতি এবং বাকি দুটিতে তাঁর ভাগ্নে-ভাগ্নি। “আমাদের পরিবারটাই শেষ হয়ে গেল”– বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়েন গৌরব। জানালেন, লাশগুলো এমন ভাবে ছিন্নভিন্ন হয়েছিল, যে শনাক্ত করাই মুশকিল হয়েছিল প্রথমে।

গৌরবের ভাই রাহুল বলছেন, “দুর্ঘটনার কিছু ক্ষণ আগেই আমি গিয়েছিলাম দশেরার শুভেচ্ছা জানাতে। দিদি, জামাইবাবু স্প্রিংরোল আর জিলিপি খাওয়াল… বাচ্চাগুলো ‘মামু…মামু’ করছিল। কয়েক বছর আগে আমাদের বাবা-মা চলে গিয়েছেন, এবার দিদির পরিবারও চলে গেল।”

গৌরব-রাহুলদের এই হা-হুতাশএকটি পরিবারের বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। শিবপুরি দুর্গিয়ানা শ্মশানের যে কোনও দিকে চোখ মেললেই এমন আক্ষেপ ঘুরপাক খাচ্ছে। স্বজন হারানোর যন্ত্রণায় মানুষগুলো যেন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছেন। এর মধ্যেই প্রশাসনের বিরুদ্ধে ক্ষোভ উগরে দিলেন দুর্ঘটনায় মৃত ১৬ বছরের কিশোর শচিন সিং-এর বাবা নভোজিত সিং। পুত্রশোকে আকুল বাবার প্রশ্ন, “এই প্রথম আমার ছেলে মেলা দেখতে গিয়েছিল, কিন্তু আর ফিরল না। দেশের যাবতীয় নিরাপত্তা কি কেবল ভিআইপিদের জন্যই? কেন ওরকম জায়গায় রাবন দহনের অনুমতি দেওয়া হয়েছিল? ওখানে আগুন এবং ট্রেন দু’টোই ছিল, কেউ এটা দেখল না কেন?” আর কারও সন্তান যেন না যায় রাবণ পোড়া দেখতে, আকুতি ঝরে পড়ে তাঁর কান্না গলায়।

রবিবারের শ্মশানে যে শুধু ৩৮টা দেহ পুড়ছে তা-ই নয়, সেই সঙ্গে পুড়েছে বিশ্বাসও। পৌরাণিক গল্পকে কেন্দ্র করে আয়োজিত অনুষ্ঠান এবং তার অভিঘাতে ঘটে যাওয়া এই ভয়াবহ বিপর্যয়ে যেন উলাট পুরাণ ঘটে গিয়েছে মানুষের ভিতরে। তাই তো যে রাবণ-দহনকে শুভ শক্তির দ্বারা অশুভ শক্তির বিনাশের উদযাপন হিসেবে পালন করা হয়েছে এত কাল, সেই উদযাপনকেই আগামী দিনের জন্য বয়কট করতে চলেছে মৃত্যুপুরী-সম শহর।

Shares

Comments are closed.