বাংলা, দেশ-কাল-সীমান্তের ঊর্ধ্বে এক স্বতন্ত্র আবেগ, তার জন্যই বিশ্বজুড়ে সুরের বন্ধন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

সুষ্মিতা রায়চৌধুরী

বাংলা, তুমি কার? যে থাকে তার নাকি যে রাখে তার? আমরা যারা দেশ ছাড়া, ঘর ছাড়া, অনেক সময়েই বিদ্রুপের শিকার হই, “দেশ ছেড়ে থেকে শিকড়ের টানটা বোঝেনা” বলে, এই ব্যাখ্যাহীন আরোপ প্রায়শই যারা মুখ বুজে মেনে নিতে বাধ্য হই, তারাও তো এখন বাংলার জন্য লড়ছি। আসলে তর্কে জিতে হয়তো সাময়িক তৃপ্তি মেলে, কিন্তু কাজে থেকে যায় প্রমাণ।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কোভিডের আক্রমণে পর্যুদস্ত। অর্থনীতিতে ধস, ভিসার সমস্যা, গ্রিন কার্ড নিয়ে অনিশ্চয়তা এগুলো এখন আমাদের নিত্যসঙ্গী। সংবাদমাধ্যমের হাত ধরে এখন একথা জেনে গেছে বহু ভারতীয় মানুষ। আমাদের দেশে বাঙাল বাড়িতে চায়ের আড্ডায় অনেক সময়েই এখন স্থান পাচ্ছে অমুকের ছেলের চাকরিটা আছে কিনা সেই চর্চা। আলোচিত হচ্ছে তমুকের মেয়ের নবজাতককে নিয়ে দেশে ফিরে আসার ঘটনার বিবরণ। কিন্তু আমরা এখানকার মাটিতে বসে রোজ অনিশ্চয়তা নিয়ে বাঁচার লড়াইটা চালাচ্ছি।

কিন্তু তবুও হঠাৎ আমাদের লড়াইটা হোঁচট খেয়েছিল। আসলে আমরা এখানে তখনই খুব ভাল থাকি যখন দেশে বয়স্ক বাবা-মা বা আত্মীয়-স্বজন নিরাপদে থাকেন। এখন সেটা নেই। আমেরিকায় ক্রমবর্ধমান মৃত্যুর সংখ্যাটা আমাদের অতোটাও হয়তো ভয় পাওয়ায়নি, যতোটা বাংলায় করোনার সংখ্যাটা আমাদের ভয় পাওয়াচ্ছে। কারণ একটাই, চাইলেও যাওয়া যাবে না যদি পরিবারের কারও দরকার হলে। একটা ভাইরাস প্রথম অসহায় করে দিয়েছে প্রত্যেকটি প্রবাসীকে। বিনিদ্র রাত কাটতে থাকে চিন্তায়।

ঠিক এমন সময়ে একদিন সকালে সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় দেশে থাকা মানুষগুলোর সঙ্গে! ১৫৫কিমি প্রতি ঘণ্টায় বয়ে যাওয়া উমফান যখন উড়িয়ে দিচ্ছে নিরাপদ আশ্রয়, ভেঙে গুঁড়িয়ে দিচ্ছে জানলার কাচ, ভেসে যাচ্ছে পাঁচতলা ইমারত থেকে ফুটপাথ, তখন এখানে বুকের ভেতর তোলপাড়, একবার যদি শুনতে পাওয়া যায় কাছের মানুষের কণ্ঠস্বর! পাগলের মতো খবরের দিকে চোখ রেখে বসে থাকা আর ভীত মনে তখন একটাই চিন্তা। দু’দিন হয়ে গেল! লোডশেডিঙে বুড়ো বাবা-মা কী করে জল পাচ্ছে! বাইরে থেকে আনলে তাতে চুপিসারে চলে আসছে না তো মারণ ভাইরাস?

পড়ুন দ্য ওয়ালের তরফে প্রকাশিত বাংলার প্রথম পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল পত্রিকা, সুখপাঠ।

হাহাকার করছে আমার বাংলা। বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন ডায়ালিসিসের রোগী। অ্যাম্বুলেন্স ঢুকতে দেরি করায়, গাড়িতেই মারা গেছেন কেমো নিতে আসা ক্যানসারের রোগী। আমার বাংলা কাঁদছে। আর্ত চিৎকার পৌঁছয় এখানেও। পূর্ব মেদিনীপুর, উত্তর ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা, কলকাতা, হুগলি, হাওড়া… চাই খাবার, চাই বাসস্থান।

কিংকর্তব্যবিমুঢ় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আহ্বান জানায় সবাইকে। নাহ, থেমে থাকলে তো চলবে না। যে সংস্কৃতিকে বাঁচানোর অভিপ্রায়ে এখানে প্রত্যেকটি পুজো-পার্বণ হয় নিষ্ঠাভরে, ভাঙা বাংলাতেও নবপ্রজন্ম গান গায় ঐক্যের, ব্রতকথায় থাকে বাঙালি পরম্পরা, সে দেশ সহ্য করতে পারে না বাংলার আর্তনাদ। অনেকেই এগিয়ে আসেন ত্রাণের লক্ষ্যে। কল্লোল, মনপানসি, আইসিসি নিউজার্সি, অমরজ্যোতি, আড্ডা নিউজার্সি… ছোট-বড়ো, জানা -অজানা নির্বিশেষে সবাই এক তখন শিকড়ের টানে। এনআরআই হওয়ার সঠিক অর্থ তখন দেশের জন্য কিছু করা। বুকের ভিতর একটাই সুর বাজে, “বাংলা আমার তৃষ্ণার জল, তৃপ্ত শেষ চুমুক, আমি একবার দেখি, বারবার দেখি, দেখি বাংলার মুখ।”

আমরা খুঁজছিলাম একটা বড় খুঁটি। যা একত্রিত করবে আরও অনেককে। এগিয়ে আসে নর্থ আমেরিকান বেঙ্গলি কনফারেন্স (এনএবিসি) এবং কালচারাল অ্যাসোসিয়েশন অফ বেঙ্গল (সিএবি)। শুরু হয় মহাযজ্ঞ। অশ্বমেধ ঘোড়া তখন ছুটছে সমস্ত আমেরিকাজুড়ে। এবার নিউ জার্সির সঙ্গে হাত মেলায় ফ্লোরিডা, ভার্জিনিয়া। সমস্ত পৃথিবীকে এক করতে পারে একমাত্র সুর-সংস্কৃতি। আর যে মাটিতে সুর, তাল, লয়ে সোচ্চার হয়েছে বিপ্লবী স্লোগান, জন্ম নিয়েছে অগ্নিগর্ভ কবিতারা, সেখানে সুরের আমন্ত্রণে ঘুচবে দেশ-কালের গণ্ডি, এ তো জানা কথা। হলও তাই।

Welcome to North America Bengali Conference - NABC 2020

এনএবিসি ও সিএবি-র হাত ধরে বাংলা আবারও গ্লোবাল। প্রয়াসের নাম “HOPE 2020,NABC COVID & AMPHAN CARE CONCERT”।

মহারাষ্ট্রের সমস্ত প্রতিকূলতাকে উপেক্ষা করে এগিয়ে এলেন তাবড় সব নক্ষত্র। কলকাতার আর্টিস্ট ফোরামের সহযোগিতায় তৈরি তখন টলিউড। কে নেই এই আর্যা প্রয়াসে। নবীন-প্রবীণের আহ্বানে তখন ভাইরাল সোনার বাংলা। ৩, ৪, ৫ জুলাই– এই তিন দিন রুদ্ধশ্বাস এক সুরযজ্ঞের স্বাক্ষী হয়ে রইলে গোটা পৃথিবী। শুরুতেই এল সুব্রহ্মণ্যমের বাদ্যযন্ত্র-কোরাসে রোমকূপ শিহরিত হল দেশের টানে। অলকা ইয়াগনিক, ঊষা উত্থুপ, শম্পা কুণ্ডু, অনুপ জলোটা, দালের মেহন্দী, অন্তরা চৌধুরী, শান্তনু মৈত্র, জোজো, রাঘব চ্যাটার্জী, দেবজ্যোতি মিশ্র, ইমন চক্রবর্তী, রূপঙ্কর বাগচী, সুরের সম্রাট হরিহরণ, সুনিধি চৌহান, জনি লিভার, মমতা শংকর, দুর্নিবার, কুমার শানু….আরও অনেক তাবড় শিল্পী কোনও অর্থ বিনিময় ছাড়াই তিন দিন শুধু সুরের আর কথার মুর্ছনায় বেঁধে রাখলেন সবাইকে।

হ্যাঁ, বিনা পারিশ্রমিকেই নক্ষত্ররা এসে পৌঁছেছেন সাধারণের লিভিং রুমে। আবির চ্যাটার্জী, রাজ চক্রবর্তী, প্রসেনজিৎ চট্টোপাধ্যায়, অপরাজিতা আঢ্য, ঋতাভরী চক্রবর্তী এবং আরও অনেক শৈল্পিক মানুষ বিদগ্ধ মহলে ছড়িয়ে দিয়েছেন এই কনসার্টের তাৎপর্য। পায়েল সরকার, অঙ্কুশ, সুজয় প্রসাদ চ্যাটার্জী অনুষ্ঠানটিকে নিয়ে গেছেন এক অন্য স্তরে। আমরা পাশে পেয়েছি সুনীল গাভাসকরের মতো মানুষকেও!

আমরা যেন আবারও গলা ছেড়ে গেয়ে উঠতে পেরেছি, “আমি বাংলায় দেখি স্বপ্ন, আমি বাংলায় বাঁধি সুর, আমি এই বাংলার মায়াভরা পথে হেঁটেছি এতটা দূর।”

দিবারাত্রি পরিশ্রম করে এখনও অবধি এনএবিসি সংগ্রহ করেছে প্রায় দেড় লক্ষ মার্কিন ডলার। রামকৃষ্ণ মিশন এবং ভারত সেবাশ্রমে পাঠানো হয়েছে ৩০ হাজার ডলার। এগিয়ে এসেছে প্রায় সব দেশ। অনুষ্ঠানটি বিনামুল্যে দেখা যাবে ইউটিউব চ্যানেল NABC TV-তে এবং NABC ফেসবুক পেজে। ৩১ জুলাই পর্যন্ত থাকবে ভিডিওটি। এতটুকু জোর দিয়ে বলতে পারি, এই অনুষ্ঠানটি আপনার অন্তরকে নাড়া দিতে বাধ্য হবে, যদি আপনি বাঙালি হন।

আমরা হয়তো এবছর এখানে দুর্গাপুজো পাব না, পাব না কলকাতার ঢাকের শব্দ। করোনার সংক্রমণ আবারও বাড়ছে আর অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে রোজ। তবুও যে ভাষায় প্রথম বুলি ফুটেছিল, যে মাটিতে প্রথম পদক্ষেপ বা যে অক্ষরে হাতেখড়ি সেই বাংলা ভাল থাকলে, আশায় বুক বাঁধতে পারব আমরাও।

বাংলা তো কেবল একটুকরো ভূমি বা একটা ভাষা নয়, বাংলা একটা আবেগ, একটা পরিচয়। বাংলা হার না মানার অঙ্গীকার। একবার নয়, বারবার, প্রতিবার।

(নিউ জার্সির বাসিন্দা সুষ্মিতা রায়চৌধুরী একজন ব্লগার ও লেখিকা।)

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More