ঘুরে আসুন সিকিমের অচেনা ট্যুরিস্ট স্পট, আগমলোক

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    রূপাঞ্জন গোস্বামী

    দার্জিলিং মানেই চেনা পাহাড়ের অলিগলি দিয়ে সেই পরিচিত হিমেল হাওয়া। দার্জিলিং মানেই বাঙালির নস্টালজিয়া, টয় ট্রেনের বাঁকে হারিয়ে যাওয়া প্রেমকে খুঁজে পাওয়া। তাই দার্জিলিং মেলের কম্পার্টমেন্ট হোক বা বাগডোগরা এয়ারপোর্টের লাউঞ্জ, দেখা হলেই বাঙালিদের মধ্যে একটা অলিখিত কম্পিটিশন লেগে যায়। কেউ বলেন ছুটি মানেই তো ব্যাগ গুছিয়ে দার্জিলিং, কারও কাছে হিল স্টেশনের চেনা ছবিটা দার্জিলিং দিয়েই শুরু হয়। আবার কেউ বলেন, ”আমার দার্জিলিং আটবার দেখা”, কারও স্বগতোক্তি, “আমার তো পনেরো বার”। কেউ বলেন গ্যাংটক-পেলিং চারবার যাওয়া, সঙ্গে সঙ্গে উত্তর আসবে আমার ন’বার কি আরও বেশি। একই ট্যুরিস্ট স্পটে গোঁত্তা মারার ব্যাপারে হার মানবার পত্র নন কেউ। সেই দার্জিলিং, কালিম্পং, মিরিক, গ্যাংটক, ছাঙ্গু, বাবামন্দির, নাথুলা, লাচুং, গুরুদোংমার, কুপুপ, জুলুক নয়তো কালুক, রিনচেনপং এই নিয়ে বাঙালি ট্যুরিস্টরা বার বার পাক খাচ্ছেন, মোমবাতির চারদিকে ঘুরতে থাকা পতঙ্গের মতো। পুরনো প্রেম যদি হয় দার্জিলিং, তাহলে নতুন প্রেম খুঁজে নিতে আপনাকে একটু অন্য স্বাদ চাখতেই হবে। হিমালয়ের বাঁকে বাঁকে লুকিয়ে থাকা অজানা সৌন্দর্যের খনি ফেলে, চেনা জায়গায় বার বার যাওয়া মোটেই কোনও কৃতিত্বের কাজ নয়। একই জায়গায় বার বার যেতে অনেকেরই ভালো লাগে না। কিন্তু উপায়ও নেই, প্রতি বছর সপরিবারে বা বন্ধু বান্ধবদের নিয়ে বেরোতেই হবে। কারণ বাঙালির পায়ের নিচে সর্ষে। কাছাকাছি বরফের দেখা পেতে গেলে দার্জিলিং আর সিকিমই ভরসা। কিন্তু এই দু’টি জায়গাতেই কয়েক ডজন আনকোরা ট্যুরিস্ট স্পট আছে, যেগুলিতে এখনও সে ভাবে বাঙালির পায়ের ধুলো পড়েনি। তাই, সেগুলি বাঙালির দিপুদা ( দিঘা-পুরী-দার্জিলিং) হওয়ার আগেই ঘুরে আসুন।

    পিক সিজনের হুজুগে হই-হট্টগোল, ডজন খানেক শীতের পোশাক কেনাকাটা, নয়তো আকণ্ঠ সিকিমি সুরা পান বা ব্লুটুথ স্পিকার বাজিয়ে হোটেলের ঘরে উদ্দাম নাচ গান থেকে অনেক দূরে, দু-একদিন কাটাতে চান? প্রাণের আরাম পেতে চান? তাহলে চলে আসুন প্রায় অচেনা ট্যুরিস্ট স্পট আগমলোকে। নিউ জলপাইগুড়ি থেকে ১১০ কিলোমিটার দূরে সিল্করুটের প্রবেশদ্বার লিংতাম। পুলিশ চেকপোস্টের একটু আগে বাঁ দিকে একটি রাস্তা উঠে গেছে। সামনেই পড়বে ডাকলাইন লিংতাম। এখানে আছে গোটা দশেক বাড়ি আর একটি মাঝারি মানের হোটেল। ডাকলাইন লিংতাম থেকে বস্কো স্কুল হয়ে রাস্তাটা উঠে গেছে ছোট্ট একটি পাহাড়ি জনপদ আগমলোক-এর (আপার লিংতাম) দিকে।

    আগমলোক মানেই আনন্দলোক। নিঃস্তব্ধতার সঙ্গে মিশে রয়েছে প্রকৃতির অমোঘ টান। এখানে হাড়কাঁপানো ঠাণ্ডা বা বরফের দেখা মিলবে না ঠিকই তবে মনের শান্তি মিলবে গ্যারান্টি। এখানে হয়তো আপনি অনেক কিছুই পাবেন না। মদের দোকান পাবেন না। শীতবস্ত্রের সম্ভার পাবেন না। গুটিকয়েক দোকান গ্রামবাসীদের নিত্য প্রয়োজনীয় জিনিস নিয়ে খোলা রয়েছে দিনভর। যদি কিছু কিনতেই হয় লিংতাম আসার আগে, ৯ কিমি দূরের রঙ্গলি থেকে কিনবেন। বরফপ্রেমীদের যেতে হবে লিংতাম থেকে সিল্ক রুটের পথে, কুপুপ পর্যন্ত উঠতে হবে। আগমলোক থেকে পদমচেন হয়ে একদিনে (পাঁচ-ছয় ঘণ্টায়) বরফে মোড়া পথে ঘুরে আসতে পারেন জুলুক, নাথাং ভ্যালি, পুরোনো বাবা মন্দির হয়ে কুপুপ। গাড়ি লিংতাম থেকেই পাবেন। সুদূর অতীতে এই পথেই ভারতবর্ষের ব্যাপারীদের সঙ্গে বাণিজ্য চলত মধ্য এশিয়ার বিভিন্ন দেশের ব্যাপারীদের। যদি সিল্করুট যেতে চান, সঙ্গে নেবেন ভারী শীত বস্ত্র। সিল্করুটের জন্য পারমিট বার করতে হয় রঙ্গলি থেকে। এর জন্য লাগে এক কপি ছবি ও সচিত্র প্রমাণপত্র। ড্রাইভাররাই সে ক্ষেত্রে পাকাপোক্ত। তারাই পারমিট বের করে আনবে, আপনাকে ছুটতে হবে না।

    তাহলে কী পাব আগমলোকে !

    চারদিকে পাহাড় দিয়ে ঘেরা, প্রায় ৬০০০ ফুট উচ্চতায় থাকা আগমলোকে পাবেন শান্তি, আর প্রাণের আরাম। প্রচুর বাঙালি ট্যুরিস্ট আজকাল সিল্ক রুট যাচ্ছেন। তাঁরা বরফ দেখার নেশায় বুঁদ। তাই তাঁরা আগমলোকের একটু নিচে দিয়ে সিল্করুটের পথে চলে যান, ছুঁয়েও দেখেন না সৌন্দর্যের ডালি সাজিয়ে বসে থাকা ধ্যানমগ্ন আগমলোককে। অথচ তাঁদের আসা যাওয়ার পথের পাশেই পড়ে আছে এক অজানা আনকোরা অসামান্য সুন্দর এই জনপদ।

    আগমলোক

    যাঁরা সত্যিই ঢেউ খেলানো উচুঁ উচুঁ সবুজ পাহাড়, বন্য প্রকৃতি ও সরল মানুষজনের সঙ্গে নিবিড় ভাবে কয়েকদিন অবকাশ যাপন করতে চান, তাঁদের জন্য আছে আনকোরা নতুন ট্যুরিষ্ট স্পট আগমলোক। ডাকলাইন লিংতাম থেকে আগমলোকের দূরত্ব মাত্র দেড় কিলোমিটার। পিচ ঢালা রাস্তা ধরে বা পাকদণ্ডি পথে ঘুরে বেড়ান পাহাড়ের গায়ে ছবির মতো এঁকে দেওয়া গ্রামগুলিতে। দেখুন জৈব সার প্রয়োগ করে কী ভাবে ধান, মকাই, এলাচ, আলু,বাঁধাকপি, ফুলকপি এমনকি আখের চাষ চলছে।

    ঘুরে দেখুন সুপ্রাচীন গাছ ও অর্কিডে ঘেরা ঘন অরণ্য। দেখুন সরল পাহাড়ি মানুষদের সরল জীবন যাপন। আগমলোক-এর চারদিকে উচুঁ উচুঁ সবুজ ভরা পাহাড়ের সারি। মাথার উপর নীল আকাশের চাঁদোয়া। শব্দদূষণ মুক্ত প্রকৃতির কোলে দু’দিন হাঁফ ছেড়ে বাঁচার অবকাশ। খিউ খোলা নামে ছোট্ট অথচ রূপসী এক নদী কলকল করে বয়ে চলেছে লিংতাম উপত্যকার বুক চিরে। তার তীর ধরে হেঁটে চলা, এক অনবদ্য অভিজ্ঞতা।

    এ এক চিরবসন্তের দেশ। হাড়কাঁপানো শীত নেই, গ্রীষ্মে গরম নেই, এমনকি বর্ষাতেও সিকিমের অন্যান্য স্থানের মতো ভীষণমূর্তি ধরে না আগমলোক। তাই আসতে পারেন সারা বছর। সাইকেল চালিয়ে চলে যেতে পারেন ঝর্নার কাছে। আর আছে পাখি। লিংতাম থেকে আগমলোক যাওয়ার পথে হাজার হাজার পাখির কলকাকলি আর প্রজাপতিদের সম্মেলনে মনে হবে স্বর্গ বুঝি এখানেই। আগমলোক থেকে সিঙ্গালিলা রেঞ্জ, ভুটানের পাহাড় সমেত নিচের ডাকলাইন এবং লিংতামের নয়নাভিরাম উপত্যকার দৃশ্য আপনাকে মন্ত্রমুগ্ধ করবে। এখানে রয়েছে অসামান্য সুন্দর একটি মনাস্ট্রি। মনাস্ট্রির দেওয়ালে ম্যুরালের কাজ আপনাকে আকর্ষণ করবে। আগমলোক মনাস্ট্রির চারপাশের পরিবেশ অসামান্য। আগমলোকের সানরাইজ পয়েন্ট থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা, কাবরু, রাতং প্রভৃতি শৃঙ্গরাজির মাথায় সূর্য রশ্মির প্রথম চুম্বন আপনাকে মোহিত করবে। সব কিছু ঘুরে দেখনোর জন্য গাইড হিসেবে পেয়ে যাবেন ডাকলাইন লিংতামের কুশনারায়ণ প্রধানকে। খুব ভালো মানুষ, চাষের কাজ করেন। আপনার সঙ্গে কাজ ফেলে ঘুরে বেড়াবেন। কাজের শেষে তাঁর পারিশ্রমিকও জোর করে হাতে গুঁজে দিতে হয়।

    গাইড কুশনারায়ন প্রধান (ডান দিকে)

    থাকবেন কোথায়
    আগমলোকে থাকার জন্য কয়েকটা হোম-স্টে, হোটেল থাকলেও, আমার মতে সেরা লোকেশন ও সার্ভিসের দিক থেকে সেরা হোটেল পালভেউ রিট্রিট। ডাকলাইন লিংতাম থেকে আগমলোক যাওয়ার পথে বাম দিকে পড়বে ছিমছাম হোটেলটি। এমবিএ পাশ করা বছর ছাব্বিশের যুবক রোহিত ইয়নজন চালান হোটেলটি। ভদ্র ও মার্জিত যুবক রোহিত জানালেন স্থানীয় অন্যান্য হোম-স্টের চেয়ে তাঁদের ট্যারিফ সামান্য বেশি। কিন্তু সার্ভিসে খুঁত পাবেন না। ঝকঝকে নতুন হোটেল।

    পালভেউ রিট্রিট

    খুব সুন্দর করে সাজানো লাউঞ্জ আর আটটি ঘর। লাউঞ্জে একটি অ্যাকোয়াস্টিক গিটার ঝঙ্কার তোলার অপেক্ষা করে আছে। বাজাতে জানলে শুরু করুন ‘লাভ ইন সি-মাইনর’ দিয়ে। পালভেউ রিট্রিটের ঘরে ঢুকলে বাইরে বেরোতে ইচ্ছে করবে না। কারণ, প্রতিটি ঘর থেকেই পাহাড়ের প্যানোরামিক ভিউ ও রোহিতের সদাহাস্য কর্মীদের দেওয়া ধূমায়িত সেকেন্ড ফ্ল্যাশ দার্জিলিং চা। বিভিন্ন মেজাজ ও বিভিন্ন রুচির পর্যটকের জন্য বইয়ের ব্যবস্থা রেখেছেন রোহিত। বইয়ের কালেকশন দেখে যে কোনও পর্যটকের চোখ  কপালে উঠবে। হোটেলকর্মীদের খাবার পরিবেশনের ধরন দেখে আপনার নিজেকে রাজা মনে হতে পারে। দার্জিলিং ও সিকিমের ট্যুরিস্ট স্পটের হোটেলগুলিতে এক ঘেয়ে মেনু নিশ্চয়ই বছরের পর বছর ধরে খেয়ে আসছেন, যেমন ব্রেকফাস্টে পুরি-সবজি চা। লাঞ্চে আন্ডাকারি, ডাল, ভাত, সবজি, পাঁপড়। বিকেলে অনিয়ন পকোড়া ও চা। ডিনারে রুটি চিকেনের মতো এক ঘেয়ে মেনু।

    রোহিত ইয়নজন

    এমবিএ পাস করা রোহিত সম্পূর্ণ অন্য হিসেবে চলেন। তিনি আপনাকে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ ডিনারে একগাদা অপশন দেবেন।কী খাবেন আপনি বলবেন, হোটেল নয়। এর জন্য হোটেলের নিচেই ধাপে ধাপে নেমে গেছে রোহিতের অর্গানিক ফার্ম। সেখানে আপনাদের জন্য তৈরি হচ্ছে টাটকা শাকসব্জি থেকে মাশরুম। শেষ দিনে নিখরচায় ক্যাম্প ফায়ার থেকে কাবাব হয়ে গুডবাই ড্রিঙ্কস সবই আপনার স্মৃতিতে দীর্ঘদিন অমলিন হয়ে থাকবে।

    বছরের যে কোনও সময় বেড়াতে বেরিয়ে পড়া বাঙালির বেড়ানোর নতুন ঠিকানা হতে চলেছে ডাকলাইন লিংতাম ও আগমলোক। কী ভাবছেন! ঘুরে আসুন না এই শীতেই।

    আগমলোক যেতে হলে আগাম যোগাযোগ করতে পারেন – সুকান্ত ভট্টাচার্য্য (+919564435570,+919126291762)

    আরও পড়ুন:

    এই গ্রীষ্মে ভুটান দেশে

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More