সোমবার, সেপ্টেম্বর ১৬

ভেঙে পড়েছে বসতভিটে, হৃদরোগ কেড়ে নিল বৃদ্ধার প্রাণ! এখনও বাড়ি ভাঙছে বৌবাজারে

দ্য ওয়াল ব্যুরো: এক দিকে একের পরে এক বাড়ি ভেঙে পড়ার বিপর্যয় চলছেই। তার মধ্যেই আরও খারাপ খবর এল বৌবাজার-কাণ্ডে। আচমকা হার্ট অ্যাটাক হয়ে মারা গেলেন বৌবাজারের বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হওয়া এক অশীতিপর বৃদ্ধা। সব মিলিয়ে, এলাকা জুড়ে এবার বাড়ছে ক্ষোভের আঁচ। অভিযোগ উঠেছে, এত দিন তাঁরা মেনে নিয়েছেন সব রকম অসুবিধা, কিন্তু এবার বাড়ি-ঘরের একটা নিশ্চয়তা না পেলেই নয়।

সমস্যার শুরু ১০ দিনেরও বেশি আগে থেকে। ইস্ট-ওয়েস্ট মেট্রোর সুড়ঙ্গের জন্য টানেল বোরিং মেশিনের কাজ চলছিল বৌবাজার এলাকার মাটির নীচে। সেই কাজ চলার সময়েই বৌবাজারেের দুর্গা পিথুরি লেনে আচমকা ভেঙে পড়ে একটি বাড়ি। আতঙ্ক তৈরি হয় মানুষের মধ্যে। সৌভাগ্যক্রমে, সে দিন কেউ হতাহত হননি। কিন্তু তদন্ত শুরু হতেই বড় বিপদের আশঙ্কা পরিষ্কার হয়।

ইঞ্জিনিয়াররা জানিয়ে দেন, ওই এলাকার মাটির তলায় প্রচুর জল রয়েছে। সুড়ঙ্গ কাটতেই জল জমে মাটি আলগা হয়ে গেছে, ভেঙে পড়েছে বাড়ি। এলাকার সব বাড়িই বিপদের মুখে। তড়িঘড়ি বউবাজারের একাধিক বাড়ি খালি করে পুলিশ। কয়েক ঘণ্টার নোটিসে ঘর ছাড়া হয় প্রায় ৫০ পরিবার। রাতারাতি হোটেলে গিয়ে ওঠেন ৪০০-৫০০ মানুষ।

তাঁদেরই মধ্যে ছিলেন ৮০ বছরের অঞ্জলি মল্লিক। বাড়ি ছাড়ার পরে ভেঙে পড়ে তাঁদের বাড়িও। চোখের সামনে হুড়মুড়িয়ে বসতভিটে ভেঙে পড়া স্বাভাবিক ভাবেই মেনে নিতে পারেননি কেউই। মেনে নিতে পারেননি, সব জিনিসপত্র ফেলে ঘর ছেড়ে হোটেলে থাকাও। প্রাণে বেঁচে গেলেও, নিজেদের বানানো বাড়ি মুহূর্তে ধূলিস্যাৎ হয়ে যাওয়া যে কতটা কষ্টের তা সকলের কাছেই স্পষ্ট।

অঞ্জলিদেবী বৌবাজারের স্যাকরা পাড়া এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। মধ্য কলকাতার খোলামেলা বাড়িতে থাকা অভ্যাস আজীবন। কিন্তু বাড়িটি ভেঙে পড়ার পরে অন্যদের মতো তাঁকেও গিয়ে উঠতে হয় চাঁদনি চকের একটি হোটেলে। স্বাভাবিক ভাবেই হোটেলের পরিবেশের সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারছিলেন না তিনি। ঘুমের অসুবিধা হচ্ছিল, অসুবিধা হচ্ছিল খাওয়ারও। দুশ্চিন্তা তো আছেই।

এই ভাবে এত দিন থাকার পরে মঙ্গলবার রাতে আচমকাই অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। বুকে তীব্র ব্যথা হয়। সঙ্গে সঙ্গে হাসপাতালেও নিয়ে যাওয়া হয় তাঁকে। কিন্তু চিকিৎসকেরা জানিয়ে দেন, হাসপাতালে আনার আগে, হোটেলেই মৃত্যু হয়েছে তাঁর। বৃদ্ধার শেষ ইচ্ছা অনুযায়ী, এদিন তাঁর দেহ বউবাজারের সেই বাড়ির ধ্বংসস্তূপের সামনেই আনা হয়।

১ সেপ্টেম্বর থেকে আতঙ্কে দিন কাটছে বউবাজারের বাসিন্দাদের। একের পর এক ভেঙে পড়ছে বাড়ি। মঙ্গলবারই কেএমআরসিএল এলাকায় এসে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে গিয়েছে। তার পরে ফের ভেঙে পড়ে একটি বাড়ির একাংশ। এ সব খবরই পৌঁছচ্ছিল অঞ্জলিদেবীর কাছেও। পরিবারের অভিযোগ, দুশ্চিন্তার কারণেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে পড়েন তিনি। মারা যান রাতেই।

তাঁর মৃত্যুর খবর শোনার পর থেকেই থমথম করছিল এলাকা। এই সময়েই, বুধবার সকালে স্যাকরা পাড়া লেনে ফের ভেঙে পড়ে একটি দোতলা বাড়ির সামনের অংশ। মঙ্গলবার রাতের বৃষ্টিতে সম্ভবত এই ভাঙন আরও তাড়াতাড়ি হল। বৌবাজারের একাধিক এলাকা এখন কার্যত জনশূন্য, তাই এই ঘটনায় তেমন কোনও ক্ষয়ক্ষতি হয়নি বলেই খবর।

সরকারি সূত্রের খবর, বৌবাজার এলাকায় ভেঙে ফেলতে হবে মোট দশটি বিপজ্জনক বাড়ি। আগেই পাঁচটি বাড়ি ভেঙে ফেলার কথা জানিয়েছিল কলকাতা মেট্রো রেল কর্পোরেশন লিমিটেড। প্রাথমিক পরীক্ষার পর আরও পাঁচটি বাড়ি ভেঙ্গে ফেলার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। মেট্রো প্রোজেক্টের কাজের জন্য ইতিমধ্যেই ন’টি বাড়ি ভেঙে পড়েছে। অর্থাৎ মোট ১৯টি বাড়ি সম্পূর্ণ ভেঙে ফেলা হবে ওই এলাকায়।

এত বড় বিপর্যয়ের দায় নিয়ে মেট্রো কর্তৃপক্ষ নতুন বাড়ি তৈরির কথা বলেছেন। প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আপদকালীন আর্থিক সাহায্যও করেছেন। সাহায্য মিলেছে রাজ্য সরকারের তরফেও। কিন্তু এক সপ্তাহ কেটে গেলেও আতঙ্ক এখনও কাটেনি। একই সঙ্গে ধৈর্য্যের বাঁধ ভাঙছে সরিয়ে দেওয়া বাসিন্দাদেরও। নিজের বাড়ি ছেড়ে, ন্যূনতম জিনিসপত্র নিয়ে এ ভাবে কত দিন থাকা যায়, প্রশ্ন তুলেছেন তাঁরা। সকলেরই পড়াশোনা, কাজকর্মের বিপুল ক্ষতি হচ্ছে। এ ছাড়া দৈনন্দিন অসুবিধা তো আছেই।

যে ভাবে রোজ বাড়ি ভাঙছে, তাতে ওই এলাকায় যে আর নিরাপদে ফেরা হবে না, তা আন্দাজ করছেন অনেকেই। কিন্তু এর পরে কী হবে, তা বলতে পারছেন না কেউ-ই।

Comments are closed.