শুক্রবার, নভেম্বর ১৫

দারিদ্র্য দূরীকরণে নতুন দৃষ্টিভঙ্গির সন্ধান দিয়েই অর্থনীতিতে নোবেল অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়ের

অচিন চক্রবর্তী
(অর্থনীতির অধ্যাপক ও নির্দেশক, ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ)

২০১৯ সালে অর্থনীতিতে নোবেল পুরস্কার পাচ্ছেন অভিজিৎ বিনায়ক বন্দ্যোপাধ্যায়, এস্থার ডাফলো ও মাইকেল ক্রেমার। এঁরা তিনজনই উন্নয়নের অর্থনীতির যে বিশেষ দিক নিয়ে চর্চা করেন তা হল, দারিদ্র্য দূর করতে হলে কোন প্রকল্প কতটা কার্যকরী হতে পারে সে বিষয়ে প্রয়োজনীয় জ্ঞানভাণ্ডার গড়ে তুলতে হলে কী পদ্ধতিতে এগোতে হবে। যে গবেষণা পদ্ধতি তাঁরা ব্যবহার করেন তার পোশাকি নাম ব়্যান্ডামাইজড কন্ট্রোল ট্রায়াল। চিকিৎসার গবেষণায় ওষুধের কার্যকারিতা নির্ধারণ করতেও এমন পদ্ধতিই নেওয়া হয়, কিন্তু উন্নয়ন প্রকল্প ভাবনায় যে এমন পদ্ধতি অনেক কাজে দিতে পারে তা প্রথম এঁরাই দেখালেন। শুধু দেখিয়েই থেমে থাকলেন না, এমআইটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অভিজিৎ-স্থাপিত ‘পভার্টি অ্যাকশান ল্যাব’ গত পনেরো বছরেরও বেশি সময় ধরে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রায় চারশোর ওপর এমন ট্রায়ালের ফলাফলের রিপোর্ট প্রস্তুত করেছে।

আরও পড়ুন- বাঙালির হাতে ফের নোবেল! অর্থনীতিতে অমর্ত্যর পরে অভিজিৎ

উন্নয়নের অর্থনীতিকে যদি ১৯৫০-এর দশক থেকে বিচার করা যায় তা হলে দেখা যাবে তখন এক ধরনের গ্র্যান্ড জেনারেলাইজেশনের দিকে ঝোঁক ছিল। উন্নয়নের তত্ত্বগুলি ছিল জাতীয় আয়ে বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তাকে ঘিরে, ফলে নীতিভাবনায় জোরটি ছিল সঞ্চয় ও বিনিয়োগ বাড়ানোর ওপর। ১৯৭০-এর দশকে এসে দেখা গেল এভাবে দারিদ্র্যের সমস্যাটিকে মোকাবিলা করা যাচ্ছে না একেবারেই। তখন আলাদা করে দারিদ্র্য দূরীকরণে জোর দেওয়ার ভাবনা এল।  দারিদ্র্যের মাপজোকের পদ্ধতিকে জোরালো ভিত্তির ওপর দাঁড় করানো এবং  দারিদ্র্যের কারণগুলির নানা ভাবে ব্যাখ্যা করা শুরু হল এবং এ নিয়ে রাষ্ট্রের ভূমিকাকে প্রধান অবস্থানে দেখা শুরু হল। কোন দেশ কী প্রকল্প হাতে নিচ্ছে, তাতে কাজ কেমন হচ্ছে, সেসব বিচার করা শুরু হল।  পুরো বিষয়টি নিয়ে নতুন করে পর্যালোচনা শুরু হল। তখন দারিদ্র্য দূরীকরণের যে দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তাকে ‘টপ ডাউন’ দৃষ্টিভঙ্গি বলে পরে সমালোচনার মুখেও পড়তে হয়।  উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, সেই সময়ে আমাদের দেশে চালু হয়েছিল আইআরডিপি বা ইন্টিগ্রেটেড রুরাল ডেভেলপমেন্ট প্রোগ্রাম (নিবিড় গ্রামোন্নয়ন প্রকল্প)।  এই প্রকল্পের অধীনে প্রাণীসম্পদ বিতরণ করা শুরু হয় দরিদ্রদের আয়ের উৎস তৈরির লক্ষ্য নিয়ে।  কিছুদিন পরেই দেখা গেল এই বিপুল ব্যয়সাপেক্ষ প্রকল্পটি আশানুরূপ ফল দিতে ব্যর্থ হল। এর ব্যর্থতার কারণগুলিও দুর্বোধ্য নয়। এত বড় আকারে এত সংখ্যক গবাদি পশু বিতরণ গ্রামীণ অর্থনীতিতে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটাতে পারে, এই প্রকল্পের গ্রহীতারাই বা সেই পশু নিয়ে তাকে কতটা ব্যবহার করতে পারছে আয় বাড়ানোর লক্ষ্যে, এসব খুঁটিয়ে দেখা হয়নি।

কোন প্রকল্প কোথায় কতটা কার্যকর হচ্ছে, অভীষ্ট ফল পাওয়া যাচ্ছে কিনা, না গেলে কেন যাচ্ছে না, এসব বোঝার জন্য প্রয়োজন প্রচুর পরিসংখ্যান আর নির্দিষ্ট পদ্ধতি।  ব্যাপারটিকে চিকিৎসার সঙ্গে তুলনা করা যেতে পারে।  অর্থাৎ খতিয়ে দেখা, কোন ওষুধে কতটা কাজ হচ্ছে।  আর তখন থেকেই গ্র্যান্ড জেনারেলাইজেশন থেকে মাটির কাছাকাছি এসে দেখা শুরু হল কোথায় কোন নীতি প্রয়োগে কতটা কাজ হচ্ছে।  একইসঙ্গে দেখা শুরু হল এই প্রকল্প দরিদ্র্যদের মধ্যে কোথায় কতটা কার্যকর হবে এই পরিমাপ করার বিষয়টি।  অর্থাৎ একেবারে তৃণমূল স্তরে কাজ শুরু করার প্রয়োজন অনুভূত হল। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়, এস্থার ডাফলো এবং তাঁদের টিমের অন্যরা এ নিয়ে পনেরো বছরের বেশি সময় ধরে নিরন্তর কাজ করে চলেছেন। ‘পুওর ইকোনমিক্স’ নামে ২০১১ সালে তাঁদের একটি বইও প্রকাশিত হয়েছে যেখানে পুরো বিষয়টি তাঁরা ব্যাখ্যা করেছেন। বইটি অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল বিভিন্ন মহলে, শুধুমাত্র একাডেমিক চৌহদ্দির মধ্যে নয়।  দারিদ্র্য দূরীকরণের ব্যাপারে আন্তর্জাতিক যেসব প্রতিষ্ঠান কাজ করে, বিভিন্ন দেশকে পরামর্শ দেয়, সে বিশ্বব্যাঙ্ক হোক বা ইউএনডিপি, তারাও বইটি নজর করে এবং মনে করে বইটি দারিদ্র্য দূরীকরণ নীতিভাবনায় নতুন দিশা দেখাতে পেরেছে।  নোবেল কমিটির বক্তব্যেও এই বিষয়টিকেই চিহ্নিত করা হয়েছে, বিশেষভাবে এঁদের তিনজনের গবেষণায়।

আরও পড়ুন- বাঙালির গর্ব নোবেলজয়ী অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়কে চিনুন ১০ তথ্যে

তার মানে এই নয় যে এর কোনও সমালোচনা হয়নি।  তাঁদের দৃষ্টিভঙ্গি, তাঁদের পদ্ধতি প্রভৃতির সমালোচনাও হয়েছে। দারিদ্র্যের সমস্যাটিকে এভাবে অতি ‘মাইক্রো’ দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখায় এর পিছনের ‘ম্যাক্রো’ রাজনৈতিক, আর্থনীতিক কারণগুলি যে উহ্য থেকে যাচ্ছে, এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন কেউ কেউ। কিন্তু মনে রাখতে হবে, এই ধরনের বিতর্কের মধ্য দিয়েই উন্নয়নের অর্থনীতির ক্ষেত্রে আমাদের ধ্যানধারণা এগিয়ে চলে। এই গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কটি তাঁদের জন্যেই যে উঠে এল তা অনস্বীকার্য। সার্বিক তত্ত্ব থেকে, সামান্যীকরণের ঝোঁক থেকে বেরিয়ে এসে একটা বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে এগিয়ে যে অত্যন্ত কার্যকরী জ্ঞানভাণ্ডার গড়ে তোলা যায়, যা দারিদ্র্যের মতো জ্বলন্ত সমস্যা মোকাবিলার লক্ষ্যে নতুন দিশা দেখাতে পারে, এই তিনজনের কাজ থেকে আমরা তা জানতে পারি।  আর এই কাজেরই তাঁরা স্বীকৃতি পেয়েছেন।

আরও পড়ুন- নোবেলজয়ী এস্থার ডাফলো হতে চেয়েছিলেন ইতিহাসবিদ, প্রেমের হাত ধরে বদলে যায় লক্ষ্য

এ ব্যাপারে কয়েকটি উদাহরণ দেওয়া যাক।  শিশুদের টিকাকরণ কর্মসূচির কথাই ধরা যাক।  টিকাকরণের ব্যাপারে দরিদ্রদের মধ্যে অনীহা কাজ করে।  এর কারণ অজ্ঞতাও হতে পারে, আবার টিকারণের জন্যে সময় বের করে, হয়তো এক দিনের মজুরি ত্যাগ করে, যদি যেতে হয় দূরে, সে কারণেও অনীহা থাকতে পারে। তখন এটা পরীক্ষা করে দেখার প্রয়োজন হয়।  দেখা গেছে, টিকা দেওয়ালে এক কিলো ডাল দেওয়া হবে এমন প্রকল্পের ফলে টিকাকরণ ১৭ শতাংশ বেড়ে গিয়েছিল।  উন্নয়ন ঘটানোর জন্য এই ধরনের জ্ঞান থাকা প্রয়োজন।

আরও পড়ুন- অভিজিতের গর্বিত মা, বললেন ‘ও যা করতে চেয়েছে, তাতেই আমার সায় ছিল’

আফ্রিকার উপরে মাইকেল ক্রেমারের গবেষণা রয়েছে মশাবাহিত রোগের সমস্যা নিয়ে।  কোন ক্ষেত্রে সরকার মশারি বিনামূল্যে দিলে কাজ হবে, কোন ক্ষেত্রে ভর্তুকি দিয়ে দিলে তাতে কাজ হবে, আবার কখন লোকে তা নিজের তাগিদেই কিনবেন, তা নিয়ে তিনি কাজ করেছেন। মনে রাখতে হবে, বিনামূল্যে মশারি দিলেই সকলে ব্যবহার করবেন, এমন নাও হতে পারে।  স্তরে স্তরে কাজ করে তাঁরা দেখাতে পেরেছেন কোথায় কোনটা কার্যকরী হবে।  তিনিও এ বছরই অর্থনীতিতে নোবেল পাচ্ছেন।

আরও পড়ুন- নোবেল জিতেই অভিজিৎ বললেন, ভারতের অর্থনীতির মন্দগতি উদ্বেগজনক

সরকারি হাসপাতালের পরিষেবা নেওয়ার ক্ষেত্রেও তাঁদের গবেষণা আছে। একসময়ে ভাবা হত মানুষ যেহেতু নানা ধরনের স্বাস্থ্য পরিষেবা অর্থের বিনিময়ে কিনে থাকেন, অতএব সরকারি হাসপাতালে পরিষেবা সম্পূর্ণ বিনামূল্যে না দিয়ে মূল্য ধার্য করলে সরকারের কিছুটা ব্যয়ভার লাঘব হতে পারে। কিন্তু এঁদের গবেষণায় দেখা গেল, সামান্য মূল্য ধার্য করলেই কিছু মানুষ আর পরিষেবা নিচ্ছেন না। অতএব মুল্য ধার্যের ব্যাপারটা খুব সতর্কতার সঙ্গে খতিয়ে দেখতে হবে।  এই তিন অর্থনীতিবিদ যে দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে কাজ করেছেন তাকে সরাসরি মূলধারার অর্থনীতির কাজ বলা যায় না। এখন অবশ্য  মূলধারার অর্থনীতি বলতে তেমন কিছু নেই। আমিও একে উন্নয়নের অর্থনীতির মধ্যেই রাখব। বেশ কিছুকাল ধরেই অর্থনীতিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ এবং আকর্ষণীয় গবেষণাগুলি হচ্ছে উন্নয়নশীল দেশের সমস্যাগুলি নিয়ে, যে ধারাকে আরও সমৃদ্ধ করতে এই তিনজন অতি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

হয়তো সেই ছোট্ট গ্রামে দেখেছি বাঞ্ছারামকে: মনোজ মিত্র

Comments are closed.