‘এ তুমি কী করলে বাবা!’ স্বামীর মৃত্যুতে ডুকরে উঠেছিলেন তরুণী, কিন্তু কেন? জানুন মর্মান্তিক প্রেমের কাহিনি

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দ্য ওয়াল ব্যুরো: পরস্পরের প্রতি ভালবাসায় আকণ্ঠ ডুবে ছিলেন তরুণ-তরুণী। একুশের অম্রুতা আর তেইশের প্রণয়ের এই প্রমের গল্পে বাধা ছিল একটাই, প্রণয়ের পদবী। পেরুমাল্লা। দক্ষিণী দলিত পরিবারের ছেলে সে। অন্য দিকে ‘কুলীন’ ও ধনী বর্ষিণী পরিবারের মেয়ে অম্রুতা। তাঁর পরিবারের অমত ছিল এই বিয়েতে। ছিল সমাজের চোখরাঙানি। তবু সে সব উপেক্ষা করে ঘরও বেঁধেছিলেন তাঁরা গত বছরেই। তাঁদের বিয়ের ভিডিও এখনও জ্বলজ্বল করছে সোশ্যাল মিডিয়ায়। উজ্জ্বল নীল পোশাক, ভারী ফুলের মালা, দু’জনের হাসিখুশি চেহারা– সব মিলিয়ে যেন সিনেমার মতো সুন্দর এক দাম্পত্য শুরু করেছিল তারা।

    কিন্তু তখনও কেউ জানত না, এত আলো, হাসি, প্রেমের আড়ালে ওঁৎ পেতে বিপদ অপেক্ষা করছে তাদের জন্য।

    বিয়ের পরে একটা মাসও পেরোয়নি। ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলেন তাঁরা। আর ডাক্তারের চেম্বার ছেকে বেরোনো মাত্র প্রণয়ের উপর বিশাল ধারালো ভোজালি নিয়ে অতর্কিত আক্রমণ করে এক অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তি! এলোপাথাড়ি কোপ চলে মাথায়, ঘাড়ে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান প্রণয়। অন্তঃসত্ত্বা অম্রুতা জ্ঞান হারানোর আগে কেবল ফোন করতে পেরেছিলেন নিজের বাবাকে। ওইটুকু সময়েই তাঁর কাছে পরিষ্কার হয়ে গেছিল সবই। অম্রুতা ফোনে বলেন, “প্রণয়কে মেরে ফেলল! এটা তুমি কী করলে?”

    গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে তেলঙ্গানার এই ঘটনায় তদন্তে নেমে পুলিশ জানতে পারে, সম্মানরক্ষার্থে খুন হতে হয়েছে প্রণয়কে। এবং অম্রুতার বাবা নিজে নিপুণ পরিকল্পনায় এই খুনের ছক সাজিয়েছেন বহু দিন ধরে। অচ্ছুত, মধ্যবিত্ত, দলিত সম্প্রদায়ের প্রণয়ের সঙ্গে নিজের আদরের মেয়ের সম্পর্ক মোটেই মেনে নিতে পারেননি অম্রুতার বাবা, টি মারুতি রাও। তবে সেই অসম্মতি যে অসম্মানের অজুহাতে খুনও করতে পারে, তা ভাবতে পারেননি কেউই। এই বিংশ শতাব্দীতেও যে জাত-পাতের কারণে ধনী ও স্বচ্ছল পরিবারের খুনের ছক কষা হয়, তা দক্ষিণ ভারতে এই প্রথম এত নগ্ন ভাবে সামনে এল।

    ‘জাতের নামে বজ্জাতি’ এ দেশে কম ঘটে না। দক্ষিণ ভারতও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে এই অনার কিলিংয়ের ঘটনায় এখনও এগিয়ে আছে উত্তর ভারত। উত্তরপ্রদেশ, হরিয়ানা, ঝাড়খণ্ডে এমন নারকীয় ঘটনা সামনে আসে অনেক বেশি পরিমাণে। সেই দিক থেকে বরং দক্ষিণ ভারতীয়রা এ সব বাধা অতিক্রম করছেন দ্রুত। সেখানে শিক্ষার হারও বেশি। ভিন্ জাতে বিয়ের ঘটনাও প্রায়ই ঘটে সেখানে।

    কিন্তু অম্রুতা-প্রণয়ের এই ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, নিষ্ঠুরতা বা অশিক্ষা আসলে কোনও ভৌগোলিক সীমারেখা মানে না। বরং ভারত যখন দারিদ্র, অশিক্ষার সঙ্গে লড়াই করে বিশ্বের দ্রুতগামী বৃদ্ধিশীল অর্থনীতি তৈরির চেষ্টা করছে, তখন পুরনো ও অবান্তর ধ্যানধারণার বশবর্তী হয়ে প্রণয়ের এই খুন গোটা দেশের মানচিত্রে যেন একটা কালো ছোপ ফেলে দেয়।

    ২০১৭ সালের একটি গবেষণা-রিপোর্ট বলছে, দেশে যত বিয়ে হয়, তার মধ্যে মাত্র ৫.৮ শতাংশ অন্য জাতের বিয়ের ঘটনা সামনে আসে। শুধু তাই নয়, গত চার দশক ধরে দেশে আরও নানা রকমের পরিবর্তন ঘটলেও, এই সংখ্যার তেমন পরিবর্তন ঘটেনি। বরং খুবই হতাশাজনক ভাবে বেড়ে চলেছে ভিন্ জাতে বিয়ের কারণে অনার কিলিংয়ের ঘটনা।

    অম্রুতা এমনই ঘটনার শিকার হয়েছেন। শীর্ণ চেহারা, পানপাতার মতো মুখ। কোলে ছ’মাসের ছোট্ট সন্তান, যার হাসিটা নাকি একেবারে তার বাবার মতো। শ্বশুরবাড়িতে, অর্থাৎ প্রণয়ের বাড়িতেই রয়েছেন তিনি। বলছিলেন, “মেয়ের মতোই স্নেহ করেন শ্বশুরমশাই। নাতি তাঁর চোখের মণি।” অবশ্য এখন নয়, বিয়ের আগে থেকেই যখন প্রণয়ের সঙ্গে পরিচয় হয় অম্রুতার, তখন থেকেই প্রণয়ের পরিবারের স্নেহের পাত্রী ছিলেন তিনি। প্রণয়ের বাড়ি থেকে মিনিট পাঁচেকের দূরত্বেই অম্রুতার বাড়ি। কয়েক একর জায়গা নিয়ে বিলাসবহুল প্রাসাদ তাঁর বাবা, তেলঙ্গানার অসংখ্য চালকলের মালিক টি মারুতি রাও-এর। যদিও অম্রুতার কাছে ওই মানুষটির পরিচয় একটিই, প্রণয়ের খুনী।

    অম্রুতা জানালেন, তিনি যখন খুব ছোট ছিলেন, স্কুলে যেতেন, তখন থেকেই তাঁর বাবা-মা মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছিল, তিনি আর্য বৈশ্য পরিবারের মেয়ে। যে কোনও জাতের ছেলেমেয়ের সঙ্গে যেন না মেশেন তিনি। বিশেষ করে শিডিউল কাস্ট অর্থাৎ দলিতদের নিয়ে তীব্র ঘৃণা প্রকাশ করতেন তাঁরা। কিন্তু ভালবাসা কবেই বা এ সব ঠুনকো বিধির কাছে মাথা নত করেছে! তাই স্কুলে পড়ার সময় থেকেই স্কুলের দামাল অ্যাথলিট প্রণয়ের প্রতি আকৃষ্ট হন অম্রুতা। বন্ধুত্ব গড়ায় প্রেমে।

    এক দিন ধরাও পড়েন অম্রুতা। এই প্রথম মেয়েকে বেধড়ক মারেন মারুতি রাও। কেড়ে নেন তাঁর ফোন, ল্যাপটপ। এক রকম গৃহবন্দি করে রাখেন অম্রুতাকে। কিছু দিন পরে ভর্তি করিয়ে দেন অন্য স্কুলে। এর পরে কেটে যায় আরও ছ’বছর। স্কুল পেরিয়ে কলেজে পড়তে শুরু করেন অম্রুতা। এই ক’বছরে প্রণয়ের সঙ্গে মাত্র কয়েক বার দেখা হয়েছে তাঁর। কিন্তু ভালবাসা তাতে একটুও কমেনি। বরং আরও প্রত্যয়ী হয়েছেন তাঁরা।

    অম্রুতা বলছিলেন, “আমি একটু বড় হতেই আমার বিয়ের তোড়জোড় শুরু করে বাবা। আমার বিয়েটা নিয়ে অদ্ভুত পাগলামি ছিল বাবার। আমার ইচ্ছের কোনও মূল্য ছিল না। আমায় বাবা এ-ও বলেছিল, ‘উঁচু জাতের কোনও ভিখারির সঙ্গে তোমার বিয়ে দেব তা-ও ভাল, তবু নিচু জাতে বিয়ে দেব না। সে যত ভাল ছেলেই হোক’।”

    ফ্যাশন ডিজ়াইনিং নিয়ে পড়াশোনা করছিলেন অম্রুতা। এ দিকে চলছে বিয়ের জন্য ছেলে দেখা। এমন সময়েই প্রণকে সমস্ত জানান অম্রুতা। প্রণয়ও তত দিনে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ছেন অন্য কলেজে। তাঁরা ঠিক করেন, পালিয়ে যাবেন। গত বছরের ৩০ জানুয়ারি, বাড়ির সকলের অগোচরে, ছোট ব্যাগে নিজের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিয়ে বাড়ি ছাড়েন অম্রুতা। প্রণয়ও তৈরি ছিলেন।

    তাঁরা ঠিক করেছিলেন, বিয়ে সেরে নিয়ে অস্ট্রেলিয়া চলে যাবেন। সেখানে ব্যবসা শুরু করবেন দু’জনে মিলে। সেই মতো, খুব কাছের কয়েক জন বন্ধুবান্ধবকে নিয়ে হায়দরাবাদের আর্য সমাজে বিয়ে করে নেন তাঁরা। আবেদনও করে দেন পাসপোর্ট-ভিসার। অম্রুতা তাঁর বাড়িতে জানিয়েও দেন সব কিছু। প্রণয়ের বাড়ি থেকে কোনও আপত্তি ছিল না অবশ্য। কিন্তু মাস পাঁচেক পরে, সব যখন প্রায় ঠিক, তখন অম্রুতা অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়েন। তাঁরা ঠিক করেন, এখনই বিদেশে যাবেন না। বরং সবাই যখন সব জেনেই গিয়েছে, তখন তাঁরা সামাজিক ভাবে বিয়ের অনুষ্ঠানের পরিকল্পনা করেন।

    ১৭ অগাস্ট বেশ ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে যায় তাঁদের। অম্রুতার বাবা-মা অবশ্য আসেননি সেই বিয়েতে।

    দেখুন প্রণয় ও অম্রুতার বিয়ের ভিডিও।

    PRANAY ❤️ AMRUTHA #Wedding_video Such a cute couple #RIP_PRANAY

    Saikumar Gosala এতে পোস্ট করেছেন শনিবার, 15 সেপ্টেম্বর, 2018

    পুলিশ জানিয়েছে, যে সময়ে সামাজিক বিয়ে করছেন অম্রুতা আর প্রণয়, সে সময়েই দেড় লক্ষ ডলার খরচ করে, স্থানীয় এক রাজনৈতিক নেতার সঙ্গে ষড়যন্ত্র করে, প্রণয়কে খুন করানোর পরিকল্পনা করেন ৫৭ বছরের মারুতি রাও। প্রণয়ের ছবি তুলে দেন ভাড়াটে খুনির হাতে।

    সেপ্টেম্বর মাসের ১৪ তারিখে হাসপাতালে ডাক্তার দেখাতে গিয়েছিলেন অম্রুতা ও প্রণয়। সঙ্গে ছিলেন প্রণয়ের মা, প্রেমলতাও। হাসপাতালের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজে দেখাও গিয়েছে, হাসতে হাসতে বেরিয়ে আসছেন তাঁরা। কথা বলছেন পরস্পরের সঙ্গে। আচমকা পেছন থেকে হেঁটে এসে প্রণয়ের মাথায় ও ঘাড়ে ভোজালির কোপ চালিয়ে দিল এক দুষ্কৃতী! কেউ কিছু বুঝে ওঠার আগেই লুটিয়ে পড়েন প্রণয়। চিৎকার করে কেঁদে উঠে হাসপাতালে ছুটে যান অম্রুতা। তত ক্ষণে সব শেষ। এই সময়েই বাবাকে সবার আগে ফোন করেন অম্রুতা। ফোনে বলেন, “প্রণয়কে মেরে ফেলল! এটা তুমি কী করলে?”

    ঘটনার পরেই ক্ষোভে, প্রতিবাদে উত্তাল হয় েওঠে তেলঙ্গানার মিরয়ালাগুদা এলাকা। একজোট হন দলিতরা। প্রণয়ের পরিবারের পাশে দাঁড়ান তাঁরা। অম্রুতার নেতৃত্বে শুরু হয় ‘জাস্টিস ফর প্রণয়’ আন্দোলন। এলাকায় একটি ছোট মূর্তিও নির্মিত হয় প্রণয়ের।

    পুলিশি তদন্তে গ্রেফতার হন মারুতি রাও। যদিও আর্য বৈশ্য সমাজের একটা বড় অংশ মারুতি রাওয়ের পক্ষ নিয়ে মিছিল বার করেন এই সময়ে। আর্য বৈশ্য সমাজের সভাপতি ভূপতি রাজু বলেন, “এত ছোট বয়সের এই প্রেম কোনও ভাবেই সঙ্গত ছিল না। সে কারণেই খুন হতে হয়েছে প্রণয়কে। নিজের সন্তানের ভালর জন্য বাবা-মা অনেক কিছুই করেন।” শুধু তা-ই নয়, রাতারাতি তৈরি করা হয় ‘পেরেন্টস প্রোটেকশন অ্যাসোসিয়েশন’। এই অ্যাসোসিয়েশনের তরফে মিছিল করে জেলে মারুতি রাওয়ের সঙ্গে দেখা করতে যান বহু মানুষ।

    মারুতি রাওয়ের পক্ষের উকিল, শ্যামসুন্দর চিলুকুরি সওয়াল করেন, “একটি নিম্ন বর্ণের তরুণের সঙ্গে সংসর্গে জড়িয়ে পড়ে তাঁকে বিয়ে করেছেন অম্রুতা। এ ধরনের ঘটনাকে প্রশ্রয় দিলে সমাজের অন্য সব উচ্চ বর্ণের পরিবারের মেয়েরাও বিপথে যেতে পারে এ ভাবে। প্রেমের অজুহাতে অন্যায় ঘটে চলবে।”

    কয়েকটি ট্রায়লের পরে জামিনও পেয়ে যান মারুতি রাও।

    যদিও পুলিশ হাল ছাড়েনি। হাল ছাড়েননি অম্রুতাও। যথাসাধ্য লড়ে যান প্রণয়ের সুবিচারের দাবিতে। ৫৬ পাতার চার্জ শিট তৈরি করে পুলিশ। সেই সঙ্গে আদালতে পেশ করে একটি কল রেকর্ডিং। সেই রেকর্ডিংয়ে ছিল রাওয়ের সঙ্গে এলাকার স্থানীয় রাজনৈতিক নেতার কথোপকথন। যাতে ধরা পড়ে, ভাড়াটে খুনি ও রাওয়ের মাঝে মিডলম্যান হিসেবে কাজ করেছিলেন ওই নেতা। গ্রেফতার হন তিনি। ফের ধরা পড়েন রাও-ও।

    ইতিমধ্যে সন্তানকে জন্ম দেওয়ার সময় হয়ে যায় অম্রুতার। নিরাপত্তার কারণে হায়দরাবাদের একটি হাসপাতালে সন্তানের জন্ম দেন অম্রুতা। সঙ্গে ছিলেন প্রণয়ের মা-বাবা। অম্রুতা তাঁর সন্তানের নাম রেখেছেন নিহান।

    এখন নিহানের মুখ চেয়েই লড়ছেন অম্রুতা, লড়ছে প্রণয়ের পরিবার। বাবাকে যখন দেখা হল না নিহানের, বাবার খুনিদের যেন জেলের বাইরে দেখতে না হয়। আর দাঁতে দাঁত চেপে রয়েছেন অম্রুতা। বলছেন, “প্রণয়ের মৃত্য়ুর কারণ আমার পরিবার। কিন্তু আজ আমার বেঁচে থাকার কারণ, প্রণয়ের পরিবার।”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More