বৃহস্পতিবার, জুন ২০

মাই নেম ইজ গওহর জান

কুশল ভট্টাচার্য

সময়টা জানুয়ারি মাস, দিনের হিসেবে জানুয়ারির সতেরো, সন ১৯৩০। ভারত স্বাধীন হতে তখনও ১৭ বছর দেরি। প্রবল ঠান্ডায় কাঁপছে মহীশূরের মাঝরাত। গোটা শহর ঘন কুয়াশার চাদরের নিচে ঢাকা।

মহীশূর রাজার প্রাসাদোপম বাগানঘেরা দরবারবাড়ি থেকে ঘোড়ায় টানা গাড়ি এসে নিঃশব্দে দাঁড়ালো শহরের উপান্তে একটি একটেরে দোতলা বাড়ির সামনে। গাড়ি থেকে নেমে ঈষৎ ঝুঁকে দাঁড়ালেন সাহেব ডাক্তার এলবার্ট। স্বয়ং মহীশূরের মহারাজ কৃষ্ণরাজ ওয়াদিওরের তলবে এই মধ্যরাত্রে তাঁর আগমন। সেজবাতি নিয়ে কানিজ খানুম, সাহেবকে নিয়ে গেলো সিঁড়ি দিয়ে বাড়ির দোতলায়। ঘরে ঢুকতেই সাহেবের কানে এলো, মৃদুস্বরে গ্রামোফোনের আওয়াজ। মৃদু আলোয় চোখে পড়লো পালংকে শুয়ে আছেন মধ্যবয়স্কা এক অপূর্বসুন্দরী রমণী। ঠিক বিগতযৌবনা না হলেও, ঈষৎ পৃথুলা, তবুও জৌলুশ এই স্বল্প আলোতেও চোখে পরে। রেশমের চাদরের ওপর বিস্রস্ত দেহে অসুখের চিহ্ন স্পষ্ট, রোগিণীর চোখে মুখে একটা পান্ডুর ছায়া। কপালে দুই ভ্রুর মাঝখানে যেখানটায় জোড়া সেই বিন্দুতে একটা প্রবল অস্বস্তির ভাব, ছটফটানি। মাথার কাছে ৭৮ আর.পি.এম, গ্রামোফোনের চাকা ঘুরছে ধীরলয়ে, বাজছে সেকালের সেরা তোয়াইফ মালকা জানের গলায়,..”বাবুল মোরা…নৈহার ছুটো হি যায় !”

গওহরের রোগপান্ডুর মুখে ডাক্তারকে দেখার পর একটা তাচ্ছিল্য খেলে গেলো কয়েক মুহূর্তের জন্যে। খুব কষ্টে চোখ মেলে ডান হাতটা তুলে দাসীকে ইঙ্গিত করে বললেন, ডাক্তারকে চলে যেতে। এই দীর্ঘ অপ্রণয়ের রোগ সারাবে, কোনো ডাক্তারের সাধ্য কি ! এলবার্ট সাহেব গম্ভীর ভাবে পরীক্ষা করলেন তারপর কয়েকটা ওষুধ মাথার কাছে রেখে, দাসীকে সমস্ত বুঝিয়ে বেরিয়ে গেলেন ধীরপায়ে। ওষুধে কাজ হলোনা, প্রায় ভোররাত্তিরে সারারাত কষ্ট সওয়ার পর রাতের ধ্রুবতারার মতো শান্ত, স্তিমিত হয়ে থেমে গেলো ৫৬ বছরের গওহর জানের কোকিলকন্ঠ। পরাধীন ভারতবর্ষের প্রথম ও শেষ রেকর্ডিং রয়ে গেলো যাঁর গলায়। প্রায় ৬০০ রও বেশি রেকর্ডে যিনি তাঁর কণ্ঠের মণিমুক্তো ছড়িয়ে গেছেন হিন্দুস্তানী ধ্রুপদী সংগীতের আকাশে, সেই গওহর তাঁর মহীশূরের দিনগুলিতে, প্রায় কপর্দকশূন্য অবস্থায় ছেড়ে গেলেন তাঁর নক্ষত্রখচিত জীবন !

কিন্তু এমনটা হওয়ার কথা ছিলোনা। কিন্তু বারবার নিজের ভুলে বিব্রত, বিরক্ত, বিধ্বস্ত গওহর উত্তর দিয়েছেন জীবনের অবুঝ প্রশ্নের কাছে। প্রথম স্বামী সৈয়দ আব্বাস, তাঁর ব্যক্তিগত সহকর্মী ও তবলচিকে ভালোবেসে বিশ্বাস করে বিয়ে করেছিলেন ২৮ বছর বয়েসে। কিন্তু সেই সম্পর্ককে ব্যবহার করতে চরম নীচে নামতে দ্বিতীয়বার ভাবেননি তাঁর স্বামী। শুধুমাত্র কোর্টকাছারি ও মামলা মোকদ্দমায় গওহরের আজীবনের সম্পদ ধুলোয় মিশিয়েছেন তিনি। শুধু তিনি তো নন, বাংলার জমিদার নিমাই সেন, সোনায়, হীরেয়, জহরতে মুড়ে রেখেছিলেন তাঁকে, শুধু দায়িত্ব নিতে পিছিয়ে গেছেন শেষ পর্যন্ত। গওহরের গহন নরম মনের কোনো মূল্যই কি তিনি পেয়েছেন তাঁর দয়িতদের কাছ থেকে ? অমন যে রূপবান, সংস্কৃতিবান, অমৃত নায়েক, গুজরাটি থিয়েটারের, মঞ্চের প্রাণপুরুষ, তিনিও কি রইলেন তাঁর সাধের ”গৌড়ার” কাছে ? মাত্র চার বছরের সুখস্বপ্নের মধ্যে গহরের সংসারের সাধ মিটিয়ে তিনি চলে গেলেন। জীবনে কোনো সংসার, কোনো প্রণয় যাঁর ঘর বসাতে পারেনি, সেই গওহর বুঝিবা গভীর অভিমানেই চলে গেলেন মাত্র ৫৬ বছর বয়েসে।

গহরের জীবনের বর্ণময়তার গভীরে প্রবেশ করা ভারী দুঃসাধ্য ব্যাপার। জন্মানোর সময় নাম ছিল এঞ্জেলিনা এওয়ার্ড ! ১৮৭৩ এর ২৬ জুন উত্তর প্রদেশের আজমগড়ে জুনের প্রবল গরমে এলাকার সবার প্রিয় আর্মেনিয়ান সাহেব দম্পতির ঘরে জন্মালেন গওহর। পিতা উইলিয়াম রবার্ট এওয়ার্ড ছিলেন স্থানীয় বরফ কলের ইঞ্জিনিয়ার ও মা ভিক্টরিয়া হেমিংস ব্রিটিশ পরিবারভুক্ত হলেও আদপে ছিলেন ভারতীয় বংশোদ্ভূত। বাবা মায়ের বিবাহও সুখের ছিলোনা গহরের। তাঁদের বিচ্ছেদের পরে দীর্ঘদিনের প্রণয়ী খুরশেদ আলমকে বিবাহ করে গহরের মা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করলেন, নাম হলো মালাক জান! সাধের কন্যা এঞ্জেলিনা হলেন গওহর… গাওহরজান। খুরশেদের থেকে সম্পর্কে ঘা খেয়ে, নৃত্যগীতের জগতে প্রবেশ করলেন মা, মালাক জান। কত্থক শিখলেন, ঠুমরি শিখলেন, স্বয়ং উস্তাদ ইমদাদ খানের তত্বাবধানে সারেঙ্গির সুরে মজলিস আলো করে গান গাইতেন মালাক আর মায়ের পাশে বসে তাল মেলাতেন বালিকা গওহর। দ্রুত বাংলার আকাশে ছড়িয়ে পড়লো তাঁর শিল্পের সৌরভ।

১৮৮৩ সালে নবাব ওয়াজিদ আলী শাহের ব্যক্তিগত অনুরাগিণী ও নর্তকী হিসেবে দ্বিতীয় সম্পর্কে জড়ালেন মালাক। বিবাহবিচ্ছিন্ন অবস্থায় মা ও মেয়ের সেই প্রথমবার কলকাতায় আসা। কলকাতার চিৎপুর, অধুনা রবীন্দ্র সরণিতে বাড়ি কিনলেন মালাক। সেই বাড়িতেই পড়াশোনা, গান ও নাচের তালিম বেনারস ঘরানার বিরাট বিরাট শিল্পীদের হাতে ছোট গওহরের। ঠুমরি, দাদরা, কাজরী, চৈতি, গজল থেকে রবীন্দ্রসংগীত, কি শেখেননি গওহর ? ধ্রুপদ, ধামার, বিষ্ণুপুরী থেকে কীর্তন পর্যন্ত তাঁর অনায়াস করায়ত্ত ছিল।১৮৮৭ তে দ্বারভাঙার রাজাদের সরকারিভাবে নিয়োজিত নর্তকী হিসেবে দীর্ঘদিন থাকার পর ১৮৯৬ সালে কলকাতার বুকে প্রথম বিশ্বমানের পাবলিক পারফরম্যান্স। একে একে আসমুদ্রহিমাচল জয় করতে রূপসী, বিদুষী গওহরের বেশি সময় লাগেনি। ভারতবর্ষে একের পর এক স্টেট রাজসভায় গওহরের নাচ, গান ও রূপে মুগ্ধ রাজারাজড়ার দল। এমনকী রাজা পঞ্চম জর্জের রাজ্যাভিষেক উৎসবে দিল্লি থেকে বিশেষ আমন্ত্রণ এলো শুধুমাত্র তাঁরই জন্যে। ১৯০২ সালে যখন সারা বিশ্বে ধীর লয়ে পাখা মেলছে রেকর্ডিং ইন্ডাস্ট্রি, সে সময়ে ভারতের প্রথম রেকর্ডেড শিল্পী হিসেবে একের পর এক রেকর্ডে গান রেকর্ড হয়েছে সেকালের সর্বসেরা বক্স আর্টিস্ট, গহরজান !

একটা নয়, দুটো নয়, প্রায় দশ বারোটি ভাষায় অনায়াস গাইতে পারতেন তিনি। তাঁর লেখা উর্দু ও হিন্দি নজম গান রূপে সুরারোপিত হয়েছে বহুবার, প্রকাশিত হয়েছে জাতীয় সংগীত পত্রিকায়। এমন এক জন নক্ষত্র তাঁর শেষ জীবনে বহু অর্থ ও বহু যশের অধিকারিণী হয়েও প্রায় কপর্দকশূন্য অবস্থায় নিভে গেলেন মহীশূরের শীতল জানুয়ারি মাসের রাত্রে ! বহু বর্ণময়তার, খ্যাতির শিখরে পৌঁছনো এই রূপসীর কণ্ঠ শুধু ধরা রইলো ৭৮ আর.,পি.এমের ঘড়ঘরে রেকর্ডিংয়ে।

যাঁর গানের শেষে কান পেতে শুনলে শুনতে পাবেন, তাঁর দৃঢ়, প্রত্যয়ী কণ্ঠের স্পষ্ট সিগনেচার কণ্ঠস্বর, “মাই নেম ইজ গওহর জান” !

(লেখক এক জন শিল্পী। পেশাগত ভাবে গ্রাফিক ডিজাইনার হলেও, ফোটোগ্রাফার এবং লেখক হিসেবে আলাদা পরিচিতি রয়েছে। সঙ্গীতের প্রতি বিশেষ অনুরাগ তাঁর সহজাত শিল্পীসত্ত্বারই আরও একটা দিক।)

Leave A Reply