ব্যস্ত শহরে হারানো পার্স ফেরানোর গল্প, আবার অধ্যবসায়ের কাহিনিও!

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

ফেসবুকে খুঁজে, পরিচিত বন্ধু হাতড়ে, শহরবাসীর মানিব্যাগ ফেরত দিলেন এক পড়ুয়া। মানিব্যাগ ফিরিয়ে দেওয়া হয়তো এখনও এ শহরে খুব বিরল ঘটনা হয়ে যায়নি। তবে এই ভিড়ে ঠাসা, ক্লান্ত শহরে, হাজারো মুখ-মুখোশের ভিড়ে ‘হারানো প্রাপ্তি সংবাদ’-এর যে পথটুকু তৈরি হল, তা যেন এই ভ্যাপসা গরমের দিনে এক ঝলক টাটকা বাতাসের মতো!

জানা গিয়েছে, বুধবার টালিগঞ্জের কাছে ঘটা এই ঘটনার নায়ক আয়ুষ কুমার। যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং শাখার দ্বিতীয় বর্ষের পড়ুয়া তিনি। সন্ধেয় পরিচিত এক সিনিয়রের বাড়িতে একটা কাজে গিয়েছিলেন আয়ুষ। সেই সিনিয়র তখন ছিলেন না, ফেরেন কিছু পরেই। সঙ্গে একটি মানিব্যাগ। জানান, মুচিপাড়া এলাকার একটি রাস্তায় পড়ে ছিল ব্যাগটি। টাকা আছে ভেতরে বেশ কিছু, আছে অনেক জরুরি কাগজপত্র। বলাই বাহুল্য পার্স হারিয়ে এত ক্ষণে হয়তো বেশ বিপদেই পড়েছেন পার্সের মালিক।

এর পরেই, কোনও সূত্র পাওয়া যায় কি না, তা জানার জন্য পার্সটি খোলেন আয়ুষ। অনেক কিছুর মধ্যে মেলে, একটি চশমার দোকানের বিল। সে দোকান যাদবপুরের, আয়ুষ চেনেন। সেই বিলেই লেখা ছিল একটি নাম, কৌশিক চ্যাটার্জী। তবে ওটাই যে পার্সের মালিকের নাম, তা নিশ্চিত ছিলেন না আয়ুষ।

তবে কোনও সূত্র নিশ্চয় মিলতে পারে, এমনটা ভেবে ফেসবুকে সার্চ করেন নাম। স্বাভাবিক ভাবেই বেশ অনেকগুলি প্রোফাইলের মধ্যে এক জনকে পাওয়া যায়, যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তনী। এবং সেই প্রোফাইলের বন্ধু তালিকায় মেলে যাদবপুরেরই আর এক প্রাক্তনী ছাত্র গৌরবের নাম, যিনি আয়ুষের বন্ধুতালিকাতেও আছেন। অর্থাৎ আয়ুষ ও কৌশিকের ‘মিউচুয়্যাল ফ্রেন্ড’ গৌরব।

সবটাই আন্দাজ। তবে একাধিক কৌশিক চ্যাটার্জীর প্রোফাইলের মধ্যে একটিতে মিউচুয়্যাল ফ্রেন্ডের উপস্থিতি দেখে, সেই মিউচুয়্যাল ফ্রেন্ড গৌরবকেই ফোন করেন আয়ুষ। জানতে চান, বন্ধুতালিকায় থাকা কৌশিক চ্যাটার্জীর ফোন নম্বর রয়েছে কি না তাঁর কাছে। ছিল। তার পরেই কৌশিককে ফোন করেন আয়ুষ, জানতে চান তাঁর কোনও পার্স হারিয়েছে কি না।

এই প্রশ্নটারই যেন অপেক্ষায় ছিলেন কৌশিক। জানান, সন্ধেবেলাতেই টালিগঞ্জের কাছে মুচিপাড়া এলাকায় পার্সটি হারিয়েছেন তিনি। পার্সে কী কী ছিল, তা-ও বলেন। তার পরে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বর্তমান ও এক প্রাক্তনীর দেখা করে পার্স ফেরত নিতে আর খুব বেশি সময় লাগেনি। ঘটনাচক্রে, তাঁদের বাড়িও খুবই কাছাকাছি।

তবে এই ঘটনাকে অবশ্য কোনও ভাবেই ব্যতিক্রমী বলে ভাবতে রাজি নন আয়ুষ নিজে। ফোনে তিনি বলেন, “এক জন নাগরিক হিসেবে, এক জন ছাত্র হিসেবে এটাই তো করার কথা ছিল আমার। ফেসবুক কাজটাকে সহজ করল। নইলে আবার থানায় জমা দিতে যেতে হতো। তবে উনি থানায় যেতেন কি না জানি না, না গেলে পেতেনও না। তার চেয়ে এই ভাল হল বেশ।”

আয়ুষের দাবি, তাঁর বন্ধুবান্ধবের সঙ্গেও এমন ঘটনা প্রায়ই ঘটেছে, ঘটে। প্রতি ক্ষেত্রেই পার্স খুলে মালিককে খুঁজে বার করার চেষ্টা করেছেন তাঁরা। না পেলে, এ ভাবেই ফেসবুকের সাহায্য নিয়েছেন তাঁরা, পরিচিতদের সাহায্য নিয়েছেন। তবু খোঁজ না পেলে, থানায় জমা দিয়েছেন। তাই এই ঘটনাটা আলাদা করে তাঁর জন্য কোনও ‘কৃতিত্ব’ নয়।

তবে অনেকেই বলছেন, প্রতি দিন যখন অভিযোগ উঠছে এ শহরের মানবিক মুখ ম্লান হয়ে যাওয়ার, অভিযোগ উঠছে শহরে বাড়তে থাকা নানা অপরাধের, রোজই যেন একটু করে নিজস্ব চার্ম হারিয়ে ফেলছে তিলোত্তমা, তখন আয়ুষের এই চেষ্টা খানিকটা হলেও প্রাণ সঞ্চার তো করেই। পার্সটা ফেরত দেওয়া বা পার্সে কতটা টাকা বা আর কী কী ছিল, সেটা হয়তো খুব গুরুত্বপূর্ণ নয়। কিন্তু এত ব্যস্ত সময়ে, ভিড়ে ঠাসা শহরে কোনও এক তরুণ যে এই ইতিবাচক চেষ্টাটুকু করলেন অচেনা কোনও মানুষের জন্য, সেটাই তো কত সুন্দর, আশাজনক– বলছেন সকলেই।

পার্স ফেরত পাওয়ার পরে কৌশিক চ্যাটার্জী জানান, স্বাভাবিক ভাবেই হারিয়ে ফেলার পরে আর ফেরত পাওয়ার আশা করেননি তিনি। এমনকী ঠিক কোথায় হারিয়েছে মানিব্যাগ, সেটাও মনে করতে পারেননি। কিন্তু ফোনটা পেয়েই অবাক হয়ে যান। কারণ তাঁর পার্সে তো ফোন নম্বর ছিল না! তার পরে আযুষ কী ভাবে ফোন নম্বর খুঁজে তাঁকে ফোন করেছেন, সেটা জেনে আরওই খুশি হন তিনি। অচেনা মানুষের অচেনা পার্স ফেরানোর জন্য এই অধ্যবসায়, এখনকার ব্যস্ত সময়ে অবাক করে বৈ কী!

কৌশিক বলেন, “হারিয়ে ফেলার পরে কোনও কিছু ফেরত পাওয়া সব সময়েই আনন্দের। কিন্তু তা পেতে গিয়ে যে এ ভাবে নিজেরই বিশ্ববিদ্যালয়ের জুনিয়রের সঙ্গে এত সুন্দর একটা যোগাযোগ তৈরি হবে, তা ভাবিনি।”

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More