শুক্রবার, নভেম্বর ১৬

ধাপার মাঠের রূপকথা: ‘নোংরা’ ঘেঁটে হিরে খোঁজেন মাইকেল, সাংবাদিকতা পড়ে ‘কাগজকুড়ুনি’ রুক্মিনী

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

এলাকাটির পাশ দিয়ে পেরোনোর সময়ে তো বটেই, নামটুকু শুনলেও নাক কুঁচকোন অনেকে। আক্ষরিক অর্থেই কুঁচকোন, কারণ সারা শহরের নোংরা এবং দুর্গন্ধতম জায়গা হিসেবে এক ডাকে সকলে চেনে এই নাম। ধাপার মাঠ। শহরের ট্যাংরা অঞ্চলে রাস্তা থেকে বেশ খানিকটা দূরে দেখা যাওয়া বিশাল এক পাহাড়। সবটাই জঞ্জালের। প্লাস্টিকের বোতল থেকে শুরু করে মরা পশু, মলমূত্র থেকে শুরু করে পচা খাবার– কিচ্ছু বাকি নেই।

কিন্তু আপনার একটা জিনিস জানতে বাকি আছে। আরও অনেকের মতোই আপনিও জানেন না, এই ধাপার মাঠেই চলছে এক স্বপ্নের কারখানা। পড়াশোনা-নাচ-গান-আঁকা-সেলাই কিছুই বাকি নেই সেই কারখানায়। এ সব কারা শিখছে জানেন? শিখছে ওই ধাপার সঙ্গেই জুড়ে থাকা পরিবারগুলির খুদে সদস্যরা। আর কে গড়েছেন এই স্বপ্নের কারখানা? মাইকেল হপকিন্স নামের এক আইরিশ ব্যক্তি। সমাজসেবক ছাড়াও যাঁর আরও একটা পরিচয়, কলকাতাপ্রেমী। যাঁর বাংলা ভাষায় কথা বলা লজ্জা দিতে পারে আমার-আপনার মতো বাঙালিকেও। কারখানার নাম– ‘ফ্রেন্ডস অফ কলকাতা’ বা ফোক।

স্কুলবাড়ি।

১৯৯৭ সাল থেকে শুরু হয়েছে কাজ। তারও কয়েক বছর আগে মাইকেল কলকাতায় এসেছিলেন বিশেষ এক কাজে। বললেন, “কলকাতার সঙ্গে আমার ‘লাভ অ্যাট ফার্স্ট সাইট’ হয়ে গেছিল। একটা শহরে এত মানুষ, এত প্রাণ, এত বৈচিত্র্য! আমি তখন হলুদ ট্যাক্সিগুলো দেখেও মুগ্ধ হতাম, মনে হতো এর চেয়ে উজ্জ্বল রং আর কিছু নেই। মানুষের আন্তরিকতা, হৈ হৈ করা মনোভাব.. সব মিলিয়ে আমি জাস্ট প্রেমে পড়ে গেলাম।” সেই শুরু। মাথার মধ্যে ঘুরতে শুরু করে ছোট্ট এক পোকা, কিছু একটা করতে হবে এই শহরের জন্য। কারণ শহরের প্রাণচঞ্চলতা যতটা মুগ্ধ করেছিল মাইকেলকে, ততটাই কষ্ট দিয়েছিল শহরের যন্ত্রণাগুলো।

একটি স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের হাত ধরে কাজ শুরু হয় টুকটাক। আর সেই কাজের মাঝেই ১৯৯৭ সালে আবিষ্কার হয় এক অদ্ভুত সম্ভাবনাময় জায়গা। ধাপার মাঠ! মাইকেলকে বলছিলাম, ওটা তো শহরের সব চেয়ে নোংরা জায়গা। ভীষণ দুর্গন্ধ। ওই জায়গাটা কী ভাবে বেছে নেওয়া হল! মাইকেলের উত্তর, “তোমার কাছে যেটা নোংরা, কিছু মানুষের কাছে সেটাই রুটিরুজি। সেটাই সম্পত্তি। সেটাই ভাঙিয়ে দিনগুজরান করেন ওঁরা। সেই গুজরানই একটু সুন্দর হয় কি না, পরীক্ষা করে দেখতে মন চেয়েছিল আমার। সেই থেকেই জন্ম নেয় ফোক।” সত্যিই, আবিষ্কারই বটে। সম্ভাবনার আবিষ্কার। এ শহরে থেকেও যে সম্ভাবনাকে কখনও আবিষ্কার করতে পারিনি আমরা।

সত্যিই তো তাই। আমাদের কাছে যেটা কেবলই আবর্জনার পাহাড়, একটু তলিয়ে ভাবলে বোঝা যায়, কতগুলো পরিবার বেঁচে রয়েছে শুধু ওই আবর্জনার পাহাড়কে কেন্দ্র করেই! কেউ জঞ্জাল থেকে মৃত পশু খুঁজে বার করে চামড়া ছাড়িয়ে ট্যানারিতে পাঠাচ্ছেন, কেউ বা পরিত্যক্ত প্লাস্টিক বেছে আলাদা করছেন রি-সাইক্লিঙের জন্য। কেউ আবার জঞ্জালের পাহাড় থেকে ধাতব টুকরো-টাকরা আলাদা করে বেছে যথাস্থানে পাঠাচ্ছেন অন্য কাজে লাগানোর জন্য। আরও কত কী! গভীর ভাবে সবটা জানতে গেলে, পরতের পর পরত চমক। এবং আমাদের জানার পরিধি থেকে অনেকটা দূরে বাস করা এই পরিবারগুলির শিশুরাই শিক্ষার আলো পাচ্ছে মাইকেলের চেষ্টায়। শুধু আলোই পাচ্ছে না, তাদের মধ্যে থেকে কেউ কেউ রীতিমতো নক্ষত্র হয়ে ওঠার পথে এগোচ্ছে।

যেমন রুক্মিনী দাস। ছোট বেলা থেকে এক রকম ‘ময়লা ঘেঁটেই’ বড় হয়েছে। ‘কাগজকুড়ুনি’ বলেই জেনেছে নিজেকে। বাবা চন্দন দাস, পেশায় ছুতোর মিস্ত্রি। জঞ্জালের আনাচকানাচে লুকিয়ে থাকা কাঠের টুকরো সংগ্রহ করেন। বিভিন্ন জায়গায় কাজও করেন। মা-ও হাত লাগান একই কাজে। সেই রুক্মিনী এখন ডিরোজ়িও মেমোরিয়াল কলেজের জার্নালিজ়ম বিভাগের সেকেন্ড ইয়ারের ছাত্রী। বড় সাংবাদিক হওয়ার স্বপ্নে বিভোর রুক্মিনী দৃঢ় গলায় বলল, “ছোটবেলায় মাইকেল জ্যাকসনের স্কুলটা না পেলে আমি হয়তো আজও ময়লাই ঘাঁটতাম। শুধু পড়াশোনা নয়, মাথা উঁচু করে বাঁচতেও শিখেছি ওখানে। শিখেছি, আমিও পারি। আমরাও পারি। এবং আমার চ্যালেঞ্জ, পেরে দেখাব আমি। এক দিন ধাপার মাঠের রুক্মিনী দাসের নাম সারা দেশ জানবে তার কাজের জন্য।”

শুধু পড়া নয়। খেলাও।

মাইকেল জ্যাকসন। ভুল করে লেখা নয়। হপকিন্স সাহেবকে এই নামেই ডাকেন এলাকার লোকজন। শ্রদ্ধা করেন ঈশ্বরের মতো, ভালবাসেন ঘরের ছেলের মতো। প্রতি পদে স্বীকার করেন, মাইকেল জ্যাকসনের অনুপ্রেরণাই তাঁদের শিখিয়েছে, তাঁরাও মানুষ। তাঁরাও আর পাঁচ জনের মতোই মূল স্রোতের বাসিন্দা। তাঁদেরও অধিকার আছে শিক্ষার।

ফোক স্কুলের ইনচার্জ বরেন মণ্ডল জানালেন, বর্তমানে আট জন শিক্ষক-শিক্ষিকা পড়াচ্ছেন ওই স্কুলে। বিভিন্ন বয়সের ছাত্র-ছাত্রীর সংখ্যা দেড়শোরও বেশি। শুধু পড়াশোনা নয়, খেলাধুলো এবং নাচ-গানেও সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় সেখানে। প্রত্যেক বাচ্চার পরিবারই কোনও না কোনও ভাবে যুক্ত ধাপার সঙ্গে। বরেনবাবুর কথায়, “শুধু তাই নয়, পড়ুয়াদের কয়েক জন মা-কে সেলাই-ও শেখানো হয়েছে। কিনে দেওয়া হয়েছে মেশিন। তাঁদের কাছেই স্কুল ইউনিফর্ম বানানো হয়, যেগুলো পড়ে খুদেরা স্কুলে আসে। সবটা নিয়েই একটা বড়সড় কর্মযজ্ঞ চলছে।”

কর্মযজ্ঞই বটে। বেশ কয়েক বছর আগেও যে জায়গাটা ছিল দুষ্কৃতীদের আড্ডা, যেখানে নিয়মিত বসত মদ-জুয়ার আসর, একটু শিক্ষার ছোঁয়ায় আমূল বদলে গেছে সেই গোটা ছবিটা। ইউনিফর্ম পরে স্কুলে আসছে খুদেরা। সুর করে নামতা পড়ছে, ক্রিকেট খেলছে, বাঁচতে শিখছে। ধাপার মালিন্য স্পর্শ করে না তাদের। বরং তারাই আর পাঁচ জনকে শেখাচ্ছে, বাইরের ময়লা দিয়ে কখনও মানুষের ভিতরকে বিচার করতে নেই।

পাঁচ বছর ধরে ফোক-এ পড়াচ্ছেন বাইপাসের বাসিন্দা, শিক্ষিকা সীমা পাল। বললেন, “প্রায় ২৫ বছর হতে চলল এই প্রচেষ্টার। অপূর্ব একটা উদাহরণ এই ফোক। আক্ষরিক অর্থেই ময়লার পাহাড় ঘেঁটে হিরে বার করার কাজ করছেন তথা মাইকেল। এখানে কাজ করতে এসে দেখছি, কত অনন্ত সম্ভাবনা লুকিয়ে রয়েছে বাচ্চাদের মধ্যে। বাইরে থেকে কখনও বুঝিনি। একটু সাপোর্ট পেলেই কেমন সুন্দর বিকশিত হচ্ছে ওরা। রুক্মিনী, প্রিয়ারা তো রীতিমতো উদাহরণ।” প্রিয়া অধিকারীর গল্পও রুকমিনীর-ই মতো, ফোক-এর হাত ধরে অন্য মাত্রা পেয়েছে জীবন। বর্তমানে আইন নিয়ে পড়ছে সে।

আর এ সবের মাঝখানে হাসছেন মাইকেল। কলকাতার প্রাণপ্রাচুর্যের ভাণ্ডারে যেন রত্ন খুঁজে পেয়েছেন তিনি। সে রত্নের নাম ধাবা। যা সারা শহরের অস্বস্তির কারণ, সেটাই এই বিদেশি মানুষটার অহঙ্কার। কয়েক মাস ছাড়াই আসেন মাইকেল। দেখে যান আদরের স্কুল। “শুধু দেখে নয়, শিখেও যাই অনেক কিছু। প্রান্তিক সমাজে বাস করা মানুষের বুদ্ধিমত্তা তো আর প্রান্তিক নয়! সেটা কাজে না লাগানো অন্যায়। ওদেরও অনেক কিছু দেওয়ার আছে সমাজকে। সুযোগটুকু করে দেওয়া খুব জরুরি। সব চেয়ে বড় কথা, ওদের মধ্যে একটা সহজাত সারল্য আছে, যেটা ওদের বহু দূর নিয়ে যায়। শহরের আর পাঁচটা বড় স্কুলে পড়া, ‘সব পেয়েছির দেশে’র বাসিন্দা শিশুদের কাছে যেটা চট করে আশা করা মুশকিল।”– বললেন মাইকেল।

মাইকেল হপকিন্স।

মাইকেলের স্বপ্ন, বিশ্বের সমস্ত মডেল স্কুলগুলির মধ্যে এক দিন উঠে আসবে ফোক-এর নাম। আর প্রিয়া-রুক্মিনীদের সাফল্য বলছে, সে দিন হয়তো খুব দূরেও নয়। অপেক্ষা আরও একটু সময়ের, আরও বেশি সুযোগের, আরও খানিকটা সাপোর্টের। তা হলেই একা মাইকেলের নয়, সারা কলকাতার গর্ব হয়ে উঠবে এই ধাপার মাঠই!

Shares

Comments are closed.