সোমবার, আগস্ট ২০

চামচ দিয়ে কেটে কেটে, পোকা খান চেটে পুটে

চৈতালী চক্রবর্তী

মধ্য আমেরিকায় ঘুরতে গিয়ে স্ন্যাকস খাওয়ার খুব ইচ্ছা হয়েছিল রাহুলের (নাম পরিবর্তিত)। দোকানে নাম না জানা একটা ডিশের অর্ডার দিয়ে মোবাইল কিছুক্ষণের জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়েছিল সে। ধোঁয়া ওঠা ডিশটা যখনটা টেবিলে এল, গন্ধে চারপাশটা বেশ ম ম করছে। কিন্তু, খেতে গিয়ে চোখ কপালে। এমা, এটা কি? স্ন্যাকস কোথায়, এ তো একপ্লেট ভাজা পিঁপড়ে।

বিদেশ বিভুঁইয়ে ঘুরতে গিয়ে এমন অভিজ্ঞতা অনেক মানুষেরই হয়ে থাকে।  বিশেষত ব্রাজিল, ঘানা, চিন বা থাইল্যান্ডে ঘুরতে গিয়ে পোকার রকমারি পদের (cricket dish) সঙ্গে পরিচয় হয়নি বা চেখে দেখেননি এমন মানুষ বিরল। নাক কুঁচকে মুখ বেঁকিয়েছেন যাঁরা তাঁদের অনেকেই আজ রীতিমতো বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়েই পোকা খাওয়া শুরু করে দিয়েছেন।

চিনেরা আরশোলা খায় বলে যে টিপ্পনী আমরা কথায় কথায় ব্যবহার করতাম, তা যে একেবারে সুদে আসলে সত্যি হয়ে যাবে সেটা কে জানত! পোকা খাওয়া যে স্বাস্থ্যসম্মত এবং পুষ্টিকর সেটা বেশ ফলাও করেই প্রচার করা শুরু করেছেন বিজ্ঞানীরা। ‘ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন’ এবং ‘ম্যাডিসন নেলসন ইনস্টিটিউট ফর এনভায়োরনমেন্টাল স্টাডিজ’-এর গবেষকেরা জানিয়েছেন, কীট-পতঙ্গের মধ্যে রয়েছে প্রোটিন-সহ নানা পুষ্টিকর উপাদান। পাশাপাশি, এরা শরীরে বাসা বাধা ক্ষতিকর ব্যাকটিরিয়াগুলিকে নষ্ট করে, রোগ প্রতিরোধ শক্তি গড়ে তোলে। বিজ্ঞান পত্রিকা ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্ট’-এ প্রকাশিত হয় এই গবেষণার ফল।

‘ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন’-এর গবেষক স্টাল বলেছেন, আগে পোকা দেখলেই নাক সিঁটকাতেন অধিকাংশ মানুষ। বর্তমানে ইউরোপ ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বেশিরভাগ জায়গায় ‘ইনসেক্ট ইটিং কালচার’ শুরু হয়েছে। বিশ্বে ২০০ কোটিরও বেশি মানুষ এখন নানা রকম পোকা খাওয়া শুরু করেছেন। পরীক্ষা করে দেখা গিয়েছে, পিঁপড়ে (Ants), ছোট কীট বা পতঙ্গ (Bugs),  রেশম মথ (silkworm) এগুলির মধ্যে রয়েছে প্রোটিন, ভিটামিন, মিনারেলস এবং হেলদি ফ্যাট। পেট এবং হজমের সমস্যা দূর হয় নিয়মিত পোকা খেলে। অতিরিক্ত উত্তেজনা প্রশমিত হয় এবং নানা শারীরিক জটিলতা থেকে রেহাই মেলে।

একই মত ‘কলোরাডো স্টেট ইউনিভার্সিটি’র ফুড সায়েন্স অ্যান্ড হিউম্যান হেলথ বিভাগের গবেষক টিফানি ওয়েরেরও। তিনি বলেছেন, ‘‘পাশ্চাত্য ডায়েট থেকে পোকা খাওয়ার চল শুরু হয়ে গিয়েছে প্রাচ্যের দেশগুলিতেও। শরীরের ক্ষতিকর ব্যাকটিরিয়া মারতে এর থেকে পুষ্টিকর কিছু নেই।’’

কী ভাবে পুষ্টি জোগায় ইনসেক্ট মিল?

গবেষকেরা জানালেন, পোকার মধ্যে রয়েছে চিটিন নামে একপ্রকার ফাইবার যা সাধারণত ফল বা সব্জির ডায়েটারি ফাইবারের থেকে অনেক আলাদা। এই ফাইবার হজম শক্তি বাড়াতে সাহায্য করে। অন্ত্রে সাহায্যকারী ব্যকটিরিয়া ‘প্রোবায়োটিকস’ তৈরিতে সাহায্য করে, যেগুলি Gastrointestinal Tract-এ বাসা বাঁধা ক্ষতিকর ব্যকটিরিয়াগুলিকে সমূলে বিনাশ করে।

দু’সপ্তাহ ধরে ২০ জন পুরুষ ও মহিলার উপর পরীক্ষা করা শুরু করেন বিজ্ঞানীরা। যাঁদের প্রত্যেকের বয়স ১৮ থেকে ৪৮-এর মধ্যে। প্রত্যেককে প্রাতরাশে ২৫ গ্রাম করে গুঁড়ো ক্রিকেট মিল (নানা রকম পোকা দিয়ে তৈরি) খাওয়ানো শুরু হয়। প্রথম এক সপ্তাহ পরে প্রত্যেকের রক্ত, মলের নমুনা নিয়ে পরীক্ষা করেন বিজ্ঞানীরা। দ্বিতীয় সপ্তাহে আবার একই রকম পরীক্ষা হয়।

দেখা যায়, প্রত্যেকেরই হজম শক্তি আগের থেকে অনেক বেড়েছে। অন্ত্রে উত্তেজনা তৈরি করে এমন  রাসায়নিকের পরিমাণ কমেছে। পাশাপাশি, কয়েকজনের রক্তে প্রোটিন TNF-alpha-র পরিমাণ বিস্ময়কর ভাবে কমেছে। TNF-alpha হল একপ্রকার Inflammatory Protein  যা মানসিক অবসাদ এবং ক্যানসারের জন্য দায়ী।

শুধু তাই নয়, বিজ্ঞানীরা দেখেছেন নিয়মিত ক্রিকেট মিল যাঁরা খেয়েছেন তাঁদের দেহে সাহায্যকারী ব্যাকটিরিয়া বা ‘প্রোবায়োটিকস’ Bifidobacterium animalis (BB-12) অনেক বেশি কার্যকরী। এই ব্যাকটিরিয়া পেটের রোগ নিরাময়ে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

স্বাস্থ্য এবং পুষ্টির কথা যদি বাদই দেওয়া হয়, বিশ্বজুড়ে বিপুল খাবারের চাহিদা পূরণে আগামী দিনে ইনসেক্ট মিল সবচেয়ে বেশি কার্যকরী হবে বলেই মনে করছেন গবেষকদের একটা বড় অংশ। সেই ধারণাকেই বিশ্বজুড়ে প্রচারের জন্য কোমর বেঁধে নামে ‘দ্য ইকোনমিস্ট’। নানা ফ্লেভারের আইসক্রিমের উপর জ্যান্ত পোকা ছড়িয়ে অস্ট্রেলিয়ার ‘কুইন স্ট্রিট মল’ এবং ‘ইউনিভার্সিটি অব কুইনসল্যান্ড’-এ বিনামূল্য বিতরণ করা শুরু করেন কর্তৃপক্ষেরা। স্লোগান ছিল, ‘চকোলেট এবং ক্রিকেট, কে খাবেন?’

‘দ্য ইকোনমিস্ট’-এর কর্তৃপক্ষেরা জানান, গোটা আয়োজনটাই করা হয়েছিল ‘গ্লোবাল হেলথ’-এর কথা মাথায় রেখেই। পাশাপাশি, এর বাণিজ্যিক দিকটাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না। দক্ষিণ আফ্রিকার অধিকাংশ পরিবার এখন ইনসেক্ট ফার্মিং করেই সংসার চালাচ্ছেন। কারণ এতে আলাদা করে বিশেষ কোনও উপকরণের দরকার হয় না। ফার্মিংয়ের খরচও অনেক কম।

‘ইউনিভার্সিটি অব উইসকনসিন’-এর গবেষক স্টাল বলেছেন, জাম্বিয়াতে এখন উইপোকার চাষ করছেন মানুষজন। স্টালের কথায়, ‘এটি খেতে মুচমুচে পপকর্নের মতো। বেশ অয়েলি স্ন্যাকস।’ দেখুন আপনিও ট্রাই করবেন কি না!

Shares

Leave A Reply