বুধবার, জুন ১৯

বড্ড অপমান, কিন্তু নিরাপদে তো আছি! বলছে বিকৃত লালসা থেকে বাঁচতে বৃহন্নলা সাজা কিশোরী

তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

খুব ছোটো বয়সে তাকে বেচে দিয়েছিল মা-বাবা। হ্যাঁ। ঠিকই পড়ছেন। কলকাতা শহর থেকে বেশ খানিকটা দূরের এক জেলায়, গরিব পরিবারের পরপর কয়েকটি কন্যাসন্তান জন্মানোর খারাপতম প্রভাবটি এসে পড়েছিল, এই মেয়েটির উপর। ‘পরিচিত’ এক ব্যক্তির মাধ্যমে তাকে তুলে দেওয়া হয়েছিল অচেনা কোনও ‘বাবু’র ‘কোলে’। বাবুর আড়ালে ছিলেন ‘বিবি’, যিনি মেয়েটিকে বড় করছিলেন ভবিষ্যতের ভোগ্যপণ্যা হিসেবে তৈরি করার জন্য। কিশোরী বয়স ছুঁতে-না-ছুঁতে সেই আঁচ পাওয়ার পরেই, এক গভীর রাতে নিঃশব্দে পালিয়েছিল সে। তার পর থেকে পথই সঙ্গী হয়েছিল মিনির। হ্যাঁ, এই নামেই ডাকা হতো তাকে। বাপ-মায়ের দেওয়া নাম মনে নেই তার।

গল্পের শুরু এখান থেকেই, মিনির পালানোর পর থেকে।

এই পালানো সিনেমায় হলে হয়তো, পালিয়ে যাওয়া মেয়ের জীবনে এমন কোনও অপ্রত্যাশিত বাঁক আসত, যাতে ধাক্কা খেতে খেতে কোনও এক অ্যাডভেঞ্চার সাগরে পৌঁছত মিনি। ঢেউ ঠেলে ঠেলে, হয়তো পৌঁছতো কোনও সাফল্যের চুড়োয়। হয়তো সিন্ড্রেলার গল্প হয়ে উঠতে পারত গোটা জীবনটাই।

কিন্তু সিনেমা বাস্তব থেকে অনুপ্রাণিত হলেও, বাস্তব প্রায়ই সিনেমা থেকে বহু যোজন দূরে অবস্থান করে। তারই প্রমাণ যেন হাড়ে হাড়ে টের পেল মিনি। টের পেল, এই সমাজে একলা মেয়ের চালচুলোহীন ভাবে, পরিচয়হীন ভাবে বেঁচে থাকা ঠিক কেমনতর হয়। ‘বাবু’র বাড়ি থেকে পালিয়ে অনেকটাই দূরে চলে এসেছিল মিনি। কারণ বয়স কম হলেও তার এটুকু বুদ্ধি ছিল, ধরা পড়ে যাওয়ার পরিণাম কী হতে পারে।

প্রথম প্রথম পথে পথেই ঘুরে বেড়াত সে। কেউ খেতে দিত, কেউ তাড়িয়ে দিত। ফুটপাথ, স্টেশন, বাসস্ট্যান্ড, রাতে ঘুমোনোর জায়গা জুটে যেত কোথাও। কখনও জুটত স্নেহের হাতও। এক বার এই স্নেহের লোভেই বিপদ হল। খেতে দেওয়ার নাম করে আড়ালে ডেকে নিয়ে গিয়েছিলেন এক ‘ভদ্র’লোক। “আড়ালে নিয়ে গিয়ে জোর করে আমার বুকে হাত দিয়েছিল লোকটা। মুখ চেপে ধরে নীচেও…. ব্যথা পেয়েছিলাম। লজ্জা বা অপমানের বোধ ছিল না। ভীষণ ব্যথা। সেই সঙ্গে ভয়।”– বলছিল পিঙ্কি। মিনির নামই এখন পিঙ্কি (পরিবর্তিত)। বয়স তারুণ্যের দোরগোড়ায়।

আর এই মিনি থেকে পিঙ্কি হয়ে ওঠার ঘটনাই আজও চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় এই সমাজের নগ্নতা।

সে দিনের শারীরিক নিগ্রহের পর থেকেই সতর্ক হয়ে গিয়েছিল মিনি। কিন্তু সতর্ক যতই হোক, লোলুপ দৃষ্টি এড়িয়ে থাকা সম্ভব হচ্ছিল না মিনির সদ্যকিশোরী শরীরের পক্ষে। নানা অছিলায় তা যেন নিশানা হয়ে উঠছিল ভদ্রতার মুখোশ পরা কিছু মানুষের কাছে। আমাদেরই আশপাশে ছড়িয়ে থাকা মানুষের কাছে। এলাকা বদলেও অবস্থা বদলাল না। বছর ১৩-১৪র একলা মেয়ে, পাগলি মেয়ে, ভবঘুরে মেয়ে। তাতে কী! মেয়ে তো!

কয়েক বছর আগের কথা মনে করছিল পিঙ্কি– “বুকে হাত দিত, পিঠে হাত ঢোকাত। রাতে ঘুমিয়েও শান্তি ছিল না। চমকে উঠেছি, চেঁচিয়ে উঠেছি। ভয় করত সব সময়। বহু বার ভেবেছি পালিয়ে যাব। পালিয়ে কোথায় যাব, কত বার কত দূরে পালাব! আর যেখানেই পালাই, এই শরীরটা তো সঙ্গে নিয়েই যেতে হবে। শরীরের দিকেই সবার নজর।”

এই সময়েই পথেই দেখা হয় শর্মিলার সঙ্গে। শর্মিলা তার দল নিয়ে এলাকায় এসেছিলেন, বাচ্চা হওয়ার খোঁজ পেয়ে। শর্মিলারা বৃহন্নলা। রাস্তায় ঘুরে ‘জুলুম করে’ টাকা রোজগার করা আর ‘বাচ্চা নাচানো’ই তাঁদের কাজ। তাদের সঙ্গেই হঠাৎ দেখা কিশোরী মিনির। তাদের শরীর মেয়েদের মতোই, অথচ চলনবলনের দাপটে হুট করে কাছে ঘেঁষে না পুরুষ। সাধারণ মানুষের কামের শিকার চট করে হয় না তারা।

মিনি বোধ হয় এমনটাই চাইছিল। চাইছিল, নারী শরীরের জন্য যেন তার বড় বিপদ না ঘটে যায়। সাহস করে শর্মিলাকে সব জানায় মিনি। তার পরেই মিনি থেকে পিঙ্কি হয়ে ওঠা শুরু। কিশোরী মিনিকে নিজেদের ‘ঠেকে’ নিয়ে আসেন শর্মিলা। তার নতুন নাম হয়, পিঙ্কি। ধীরে ধীরে, বছর খানেকের মধ্যেই সে শিখে নেয় চালচলন, শিখে নেয় কাজকর্ম। শরীরি সাজে মেয়ে থেকে ‘হিজড়ে’ হয়ে ওঠে ধীরে ধীরে। না, জোর করে নয়। স্বেচ্ছায়। নিজের শরীরকে সমাজের চোখ থেকে লুকোনোর জন্য আর কোনও পথ ছিল না তার।

“বড্ড অপমান এখন। ট্র্যাফিক সিগন্যালে গিয়ে হাত পাততে যে কত কথা শুনতে হয়! তবে অপমান হলেও, অনেক বেশি নিরাপদে আছি।”– বলছিল পিঙ্কি। তার কথায় বোঝা যাচ্ছিল, মিনির শরীরটা লোভের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য, পিঙ্কির বেশ এবং পেশা তার জন্য বাধ্যতা! যেখানে নিরাপত্তার জন্য অপমান সয়ে নেওয়াটাও ভাল বলে মনে করে একা বাঁচতে না-পারা এক কিশোরী!

কয়েক দিন আগেই রিলিজ় হয়েছিল পরিচালক কৌশিক গঙ্গোপাধ্যায়ের সিনেমা, নগরকীর্তন। শরীরের দিক থেকে ছেলে ও মনের দিক থেকে মেয়ে হয়ে জন্মানো পরীর ভবিতব্য হয়ে দাঁড়িয়েছিল, বৃহন্নলাবৃত্তি। শেষমেশ অবশ্য করুণতম পরিণতি হয় তার।

কিন্তু সিনেমার পর্দার বাইরে, মিনির জীবনের গল্পে নারী-পুরুষ বা শরীর-মনের দ্বন্দ্ব ছিল না। শরীরে ও মনে পরিপূর্ণ এক নারীর অসহায়তা ছিল, যে সমাজের লালসার শিকার হয়ে বাধ্য হল বৃহন্নলাবৃত্তিতে নামতে। নিরাপত্তার স্বার্থে সম্মানের সঙ্গে আপস করতে হল মিনিকে, আমাদের আশপাশে ঘুরে বেড়ানো বহু চালচুলোহীন মেয়ের মতোই একটি মেয়েকে।

Comments are closed.