দিলীপ-মধুবালার সম্পর্কে তখন চরম বিপর্যয়, সেলিম-আনারকলির প্রেম কিন্তু ৬০ বছর পরেও অমর

৬০ বছর পার করল মুঘল-ই-আজম।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

বলিউডে প্রেমের কাহিনি সব সময়ই জনপ্রিয়তার শিখরে থেকেছে। কখনও মিলনাত্মক লাভস্টোরি কখনও বা বিরহ দিয়েই শেষ। কিন্তু বলিউড বারবার বানিয়েছে লাভস্টোরি-ভিত্তিক ফিল্ম। আর এই গোত্রের ছবির প্রথম ও উজ্জ্বল নামটি হল ‘মুঘল-ই-আজম’। ৬০ বছর পূর্ণ করল আজ এই ছবি। ‘মুঘল-ই-আজম’-এর ইতিহাস এবং রিয়েল থেকে রিল লাইফে তার প্রভাব কিন্তু বরাবরই অনস্বীকার্য।

মোগল বাদশাহ আকবর পুত্র শাহজাদা সেলিম এবং রাজসভার নর্তকী আনারকলির প্রেমের আখ্যান ‘মুঘল-ই-আজম’। ভারতীয় ছবিতে সার্থক প্রেমের মহাকাব্য রূপে ‘মুঘল-ই-আজম’ আজও আইকনিক। ছবির ভাবনা কিন্তু এসেছিল ভারতবর্ষ স্বাধীনতা পাওয়ার আগেই। পরিচালক কে আসিফ ‘মুঘল-ই-আজম’ চলচ্চিত্র তৈরির পরিকল্পনা করেছিলেন চল্লিশের দশকের প্রথম ভাগেই।

কিন্তু এই ছবির সৃষ্টির শিকড় লুকিয়ে তারও আগে, নির্বাক ছবির যুগে। ১৯২২ সালে সেলিম-আনারকলি প্রেমাখ্যান কেন্দ্রিক চিত্রনাট্যের একটি নাটক মঞ্চস্থ করেন নাট্যকার ইমতিয়াজ আলি। ‘সেলিম ও আনারকলি’ নামে এই নাটক তুমুল জনপ্রিয় হয়। মঞ্চের নাটকটির অনুকরণে আরদাশির ইরানি ‘আনারকলি’ নামের আরও একটি ছবি তৈরি করেন ১৯২৮ সালে। সবাক চলচ্চিত্র যুগে ১৯৩৫ সালে ছবিটি নতুন করে মুক্তি পায় শব্দসংযোজন-সহ।

চল্লিশের দশকের শুরুতে যখন বিশ্বযুদ্ধ চলছে, তখন প্রযোজক সিরাজ আলি এবং নবীন পরিচালক কে আসিফ পরিকল্পনা করেন সেলিম-আনারকলি কাহিনি নিয়ে বড় বাজেটের হিন্দি ছবি বানাবেন। এ জন্য আমানুল্লাহ খান, ওয়াজাহাত মির্জা, কামাল আমরোহি এবং এহসান রিজভিকে দায়িত্ব দেওয়া হয় চিত্রনাট্য ও সংলাপ লেখার। ছবির শিল্পীও স্থির করা হয়। চন্দ্রমোহন, ডি.কে.সাপ্রু ও নার্গিসকে নেওয়া হয় আকবর, সেলিম ও আনারকলির চরিত্রে। বিখ্যাত বম্বে টকিজ স্টুডিওতে ছবির কাজ শুরু হয় ১৯৪৬ সালে।

কিন্তু এরই মধ্যে বদলে যায় রাজনৈতিক আবহাওয়া। ভারতবর্ষ তখন অশান্ত। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ইংরেজের বিরুদ্ধে ‘ভারত ছাড়ো’ আন্দোলনে বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে সারা দেশ। ১৯৪৭ সালে এল বহু প্রতীক্ষিত স্বাধীনতা। কিন্তু দেশভাগের ফলে পরিস্থিতি হয়ে গেল আরেও ঘোলাটে। প্রযোজক সিরাজ আলি নিজেই চলে যান পাকিস্তানে। ছবির কাজও বন্ধ হয়ে যায়। ১৯৪৯ সালে আবার চন্দ্রমোহন আকস্মিক হৃদরোগে প্রয়াত হন। ছবির অন্যতম চিত্রনাট্যকার কামাল আমরোহি তখন নিজেই ছবিটি পরিচালনা করতে উদ্যোগী হন। কিন্তু কে আসিফ তাঁকে বাধা দেন। কারণ ‘মুঘল-ই- আজম’ একান্ত ভাবে তাঁরই স্বপ্ন ছিল।

বন্ধ হয়ে যাওয়া ছবির ভাবনা আবার বাস্তবায়িত হয় পঞ্চাশের দশকে। ধনী পার্সি ব্যবসায়ী শাপুরজি পালনজি প্রযোজক হিসেবে টাকা ঢালতে রাজি হন কে আসিফের ছবিতে। এই পার্সি ভদ্রলোক চলচ্চিত্রের কিছুই বুঝতেন না। কিন্তু সেলিম-আনারকলির কালজয়ী প্রেমকাহিনি তাঁকে আকৃষ্ট করে। তাই তিনি রাজি হন। এবার আবার বদলে যায় ছবির চরিত্র-চিত্রণ। আকবর, সেলিম ও আনারকলির ভূমিকায় এবার চূড়ান্ত হন পৃথ্বীরাজ কাপুর, দিলীপ কুমার ও মধুবালা। সুরাইয়া কিন্তু প্রথম চয়েস ছিলেন আনারকলির চরিত্রে। সুরাইয়া রাজি না হওয়ায় মধুবালা করেন আনারকলি।

১৯৫৩ সালে শুরু হয় ছবির কাজ। কিন্তু ছবির কাজে বারবার বাধা আসতে থাকে। এবার সমস্যা হয় দিলীপ কুমার-মধুবালা র ব্যক্তিগত সম্পর্কের কারণে। কারণ ‘মুঘল-ই-আজম’ ছিল এই জুটির বাস্তব প্রেমেরও শেষ আখ্যান। শুধু তাই নয় পরিচালক কে আসিফ এই সময়েই বিয়ে করেন দিলীপ কুমারের বোনকে। যা নিয়ে আবার তাঁর সঙ্গে মনোমালিন্য হয় দিলীপ কুমারের। সব মিলিয়ে যেন বাধাই বাধা।

https://youtu.be/H4y8tXUlJjA

দিলীপ কুমার-মধুবালার বাস্তব জীবনের প্রেম যেমন ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যাচ্ছিল শুধুমাত্র ইগো আর অভিমানের কারণে, তেমনই ‘মুঘল-ই-আজম’ এও সেলিম-আনারকলি প্রেমের দর্পণ ভেঙে গেছিল। ভাঙা আয়নায় কি মুখ দেখতে পেরেছিলেন আনারকলি? না পারেননি। এই ছবির শ্যুটিং চলাকালীন মধুবালা বারবার অসুস্থ হয়ে পড়তেন হার্টের সমস্যা নিয়ে। কিন্তু তিনি বদ্ধপরিকর ছিলেন, যতই শরীর না দিক, এই ঐতিহাসিক ছবির কাজ তিনি শেষ করবেনই।

সেই সঙ্গে মধুর ছিল মানসিক বিপর্যয়। এই ছবির শ্যুটিংয়ে দিলীপ কুমার ও মধুবালা একে-অপরের সঙ্গে কথা বলতেন না। সেটা ছবির পর্দায় দেখে কি বোঝা যায়!

মধুবালা আর দিলীপ কুমারের প্রেমের শুরু হয়েছিল ‘তারানা’ ছবির সেটে। এরপর এই জুটির প্রেম গাঢ় হয়, তাঁরা পরপর ছবি করতে থাকেন। কিন্তু দুজনের মাঝে বাধা হয়ে দাঁড়ান মধুবালার পিতা আতাউল্লা খান। ‘নয়া দৌড়’ সিনেমার সেট পড়ে এক বিতর্কিত জায়গায়। কারণ সেখানে অন্য ছবির শ্যুটে অন্য এক নায়িকার পোশাক ছিঁড়ে দিয়েছিল মত্ত জনতা। সেই ভয় এড়াতে মধুর বাবা চাননি তাঁর মেয়ে সেখানে গিয়ে শ্যুট করেন। কিন্তু ছবির প্রযোজক ও পরিচালক বিআর চোপড়া শ্যুটিং স্পট পরিবর্তন করতে রাজ হননি। তখন মধুর বাবা কোর্টে কেস করেন বি আর চোপড়ার বিরুদ্ধে। কোর্টে কেস উঠলে ‘নয়া দৌড়’ ছবিতে মধুর বিপরীতে নায়ক দিলীপ কুমার সমর্থন করেছিলেন বি আর চোপড়াকে, মধুর বাবাকে নয়। উল্টে দিলীপ কুমার কোর্টে দাঁড়িয়ে মধুর বাবাকে বলেছিলেন ‘আপনি একজন স্বৈরচারী।’

এই কথা শুনে মধুবালার বাবা তীব্র রেগে গিয়ে মেয়েকে বেরিয়ে আসতে বলেন ওই ছবি থেকে। তাঁর সঙ্গে দিলীপ কুমারের ইগোর লড়াই শুরু হয়। দিলীপ কুমার মধুকে বলেন বাবাকে ছেড়ে তাঁর কাছে চলে আসতে। মধু বলেন, আমাদের বাড়ি এসে বাবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নাও। আমরা আবার এক হই। দিলীপ নিজের ইগো খুইয়ে তা করেননি। সেই শুরু ভাঙনের। শেষমেষ স্বপ্নের ছবির কথা, বড় বাজেটের কথা ভেবেই দিলীপ-মধু ছবিতে কাজ করতে রাজি হন। কিন্তু দুজনের মধ্যে ছিল বিস্তর দূরত্ব। যদিও ছবির রোম্যান্টিক দৃশ্য দেখে বোঝার উপায় নেই সে সব। আর মুঘল-ই-আজম ছবিতে মধুর পিতার মতোই ভিলেন হয়ে দাঁড়ান পৃথ্বীরাজ কাপুর। ঠিক যেন বাস্তবের চিত্রনাট্য হয়ে ওঠে ছবিটি।

ছবির সঙ্গীত পরিচালক ছিলেন নৌশাদ। গীতিকার ছিলেন শাকিল বাদ্যয়ানি। পরিচালক আসিফ নৌশাদের হাতে টাকার ব্রিফকেস দিয়ে বলেছিলেন, মুঘল-ই-আজমের জন্য তিনি এমন গান চাইছেন যা আগে বলিউড শোনেনি। টাকার বিনিময়ে কাজের মান ভাল করার প্রস্তাব পছন্দ হয়নি নৌশাদের। তিনি তাঁর স্ত্রীকে অবাক করে টাকা জানালা দিয়ে ছুড়ে ফেলে দিয়েছিলেন। পরবর্তীকালে নৌশাদের স্ত্রীর মধ্যস্থতায় দুজনের মধ্যে আপস হয় এবং আসিফ ক্ষমা প্রার্থনা করেন। এভাবেই নৌশাদ এই ছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার প্রস্তাব গ্রহণ করেছিলেন।

‘প্যায়ার কিয়া তো ডরনা ক্যায়া’ গানে নাচার সময় মধুবালা হার্টের সমস্যার কারণে বারবার মূর্চ্ছা গেলেও মনের জোরে অমন মন্ত্রমুগ্ধ পারফরম্যান্স করেছিলেন। মুজরো নাচে যত নায়িকাই আসুক, পরে মধুবালা রয়ে গেছেন রেখা-মাধুরীদের কাছে অনুকরণযোগ্য।

‘প্যায়ার কিয়া তো ডরনা ক্যায়া’ গানে দরকার ছিল লতা মঙ্গেশকরের কণ্ঠের প্রতিধ্বনি। কিন্তু তখন ইকো সাউন্ড তৈরি করার যন্ত্র আসেনি ভারতে। কী করা যায়! স্টুডিওর বাথরুমে গিয়ে ‘প্যায়ার কিয়া তো ডরনা ক্যায়া’ গান গাইলেন লতা, ইকো হল, সেটাই রেকর্ড হল। সিনেমায় যে গানের বিকল্প আজও এল না। ভাবা যায়. ঐতিহাসিক গানটি বাথরুমে রের্কড করা!

https://youtu.be/6Au_J6jHKE0

এই মধুবালার নাচে যে শীসমহল তৈরি করা হয়, তার বাজেট ছিল সে সময়ে দাঁড়িয়ে পনেরো লাখ টাকা। আয়নার প্রতিবিম্ব ও চোখ ধাঁধানো এই সেট তৈরি করতে লেগেছিল প্রায় দুবছর। বেলজিয়াম থেকে কাচ আমদানি করা হয় শীসমহল বানাতে। হাজার ডান্সার এই ছবিতে নেচেছিলেন মধুবালার সঙ্গে তালিম নিয়ে। যুদ্ধের দৃশ্যে ২০০০ উট, ৪০০০ ঘোড়া, ৮০০০ সেনা তৎকালীন ভারতীয় সেনাদলের থেকে ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। ১২ বছর ধরে নির্মাণ পর্বের পরে ‘মুঘল ই আজম’  ছবি রিলিজ করে ৫ই অগস্ট ১৯৬০। ছবি ঘিরে তুমুল দর্শক উন্মাদনা ছিল সঙ্গত কারণেই।

ছবির রিভিউতে লেখা হয়, পৃথ্বীরাজ কাপুরের অনবদ্য অভিনয়ে ইতিহাসের পাতা থেকে জীবন্ত হয়ে ওঠেন সম্রাট আকবর। পৃথ্বীরাজ কাপুর নিজের ভারী কস্টিউমের জন্য নানাবিদ সমস্যার সন্মুখীন হয়েছিলেন। খালি পায়ে মরুভূমিতে হাঁটার একটি দৃশ্যের সময় তাঁর পায়ে ফোস্কা পড়ে গিয়েছিল। তিনি কম খেতেন সে সময়ে, যাতে ভারী কস্টিউম পরে ওজন একটু হ্রাস হয়। দিলীপ কুমারের মাথায় যে চুল ব্যবহার করা হয়েছিল তা আনা হয় লন্ডন থেকে।

বক্স অফিসের অতীতের সব রেকর্ড ভেঙে বলিউডের সর্বকালের সর্বোচ্চ আয় করা চলচ্চিত্রের তালিকায় স্থান করে নেয় ‘মুঘল-ই-আজম’। এই রেকর্ড ১৫ বছর অক্ষুণ্ন ছিল। অসংখ্য পুরস্কারের পাশাপাশি মুঘল-ই-আজম একটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার, তিনটি ফিল্ম ফেয়ার পুরস্কারও লাভ করে।

আরও একটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হল, এই প্রথম কোনও ভারতীয় চলচ্চিত্র নতুন করে কালার ডিজিটাইলেজেশন করে ২০০৪ সালে বাণিজ্যিক ভাবে পুনরায় রিলিজ় করা হয় এবং আবারও ব্যবসায়িক সফলতা পায় ছবিটি। সময় ও যুগ পাল্টে ২০০৪ সালেও আইনক্স মাল্টিপ্লেক্স জমিয়ে দেয় রঙিন ‘মুঘল-ই-আজম’। কালারে যেন আরও মন্ত্রমুগ্ধকর হয়ে উঠল চোখধাঁধানো ছবি। রঙিনেও দিলীপ কুমার-মধুবালা প্রেমাখ্যানের জনপ্রিয়তা অটুট রইল নতুন প্রজন্মের কাছে।

আজ সেই ৫ অগস্ট ২০২০। ‘মুঘল-ই-আজম’ ছয় দশক পূর্ণ করল। কিন্তু ষাটটি বসন্ত পার করেও জরা স্পর্শ করতে পারেনি সেলিম-আনারকলির প্রেমে, চিরসবুজ ভালবাসায় আজও আলিঙ্গনাবদ্ধ দিলীপ কুমার-মধুবালা।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More