ল্যাটিমারের ‘টেরারিয়াম’, যার ভেতরে আছে এক অন্য পৃথিবী

যে পৃথিবীর নিজস্ব বাতাস আছে, মাটি আছে, জল আছে, উদ্ভিদ আছে, এমনকি প্রাণীও আছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

রূপাঞ্জন গোস্বামী

ইংল্যান্ডের গালফোর্ড শহর থেকে ১৩ কিলোমিটার দূরে আছে, ইংল্যান্ডের সবচেয়ে বড় গ্রাম ক্রেনলে। ১৯৬০ সালে সেখানে বাস করতেন, পঁচিশ বছরের ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার ডেভিড ল্যাটিমার ও তাঁর স্ত্রী গ্রিচেন। অফিস থেকে ফিরেই ডেভিড ব্যস্ত হয়ে পড়তেন বাগান নিয়ে। বাগান করাই ছিল তাঁর নেশা। বাড়িটিতে লাগিয়ে ছিলেন প্রচুর বিরল প্রজাতির গাছ। বড় গাছের নেশা ছিল না তাঁর। সহজে রক্ষণাবেক্ষণ করা যায়, এমন ছোট গাছই লাগাতেন বাড়ির বাগানে।

 ‘টেরারিয়াম’ বাগিচা

১৯৬০ সালের ১৭ এপ্রিল ছিল, ইস্টার সানডে। বাগানের পরিচর্যা করতে করতে ডেভিডের মাথায় এসেছিল ‘টেরারিয়াম বাগিচা’ বানানোর ভাবনা। ‘টেরারিয়াম’ হলো মুখবন্ধ কাঁচের পাত্র। যার ভেতরে ক্ষুদ্র বাগান তৈরি করা যায়। নাথানিয়াল ব্যাগশ নামের এক বিখ্যাত উদ্ভিদবিজ্ঞানীর লেখা পড়েছিলেন ল্যাটিমার। নাথানিয়াল ব্যাগশই বিশ্বের প্রথম মানুষ, যিনি ১৮৪২ সালে টেরারিয়ামের মধ্যে সুদৃশ্য বাগিচা তৈরি করেছিলেন। ভিক্টোরিয়ান যুগে ব্রিটেনের অভিজাতদের বাড়ির ড্রয়িংরুমে, রাখা থাকত গ্রীষ্মমণ্ডলীয় উদ্ভিদ দিয়ে সাজানো টেরারিয়াম। উদ্ভিদগুলি এশিয়া ও আফ্রিকা থেকে জাহাজে করে নিয়ে যাওয়া হতো ব্রিটেনে।

ভিক্টোরিয়ান যুগের টেরারিয়াম।

সব কাজ ফেলে বাজারে চলে গিয়েছিলেন ল্যাটিমার। তাঁর দরকার ছিল বড়সড় একটা কাঁচের বোতল। প্লাস্টিক বোতল এসে যাওয়াতে, বড় কাঁচের বোতলের বাজার পড়ে গিয়েছিল। ল্যাটিমার জানতেন, পুরোনো শিশি বোতলের দোকানে পাবেন বড় কাঁচের বোতল। যেগুলির নাম ছিল কারবয়। এগারো গ্যালনের যে বোতলটি ল্যাটিমার পেয়েছিলেন, সেটিতে রাখা হতো সালফিউরিক অ্যাসিড। বোতলটি বাড়ি নিয়ে এসে ভালভাবে পরিষ্কার করে রোদে রেখেছিলেন ল্যাটিমার।

বাগানে ছিল ‘স্পাইডার ওয়ার্টস’ নামে একধরনের কষ্টসহিষ্ণু উদ্ভিদ। যে উদ্ভিদটির বৈজ্ঞানিক নাম ‘কমেলিনা বেঙ্গালেন্সিস’।  উদ্ভিদটি পাওয়া যায় এশিয়া ও আফ্রিকায়। এই উদ্ভিদটিকে আমরা ঢোলপাতা, কানশিরে বা কানাইবাঁশি নামে চিনি। নীল রঙের তিন পাপড়ি বিশিষ্ট ফুল হয় উদ্ভিদটিতে। টেরারিয়াম বাগিচার জন্য এই উদ্ভিদটিকেই বেছে নিয়েছিলেন ল্যাটিমার।

‘স্পাইডার ওয়ার্টস’ উদ্ভিদ।

শুরু হয়েছিল ‘টেরারিয়াম বাগিচা’ বানানোর কাজ

কাচের জারটির তলায় প্রথমে পুরু করে বিছিয়ে দিয়েছিলেন অমসৃণ নুড়ি। তার ওপর বিছিয়ে দিয়েছিলেন মাটি মেশানো কম্পোস্ট সারের পুরু স্তর। কম্পোস্টের ভেতর সন্তর্পনে পুঁতে দিয়েছিলেন,স্পাইডার ওয়ার্টস উদ্ভিদটির কিছু চারা। দেখতে সুন্দর লাগার জন্য, কম্পোস্টের ওপর আবার এক স্তর নুড়ি পাথর বিছিয়েছিলেন। জারের ভেতরে স্প্রে করে দিয়েছিলেন প্রায় ২০০ মিলিলিটার জল। সব শেষে কাঁচের জারের মুখটা টাইট করে সিল করে দিয়েছিলেন। জারটিকে রেখেছিলেন সিঁড়ির নীচে, জানলা থেকে ছ’ফুট দূরে। দিনে একবার ঘণ্টা খানেক হালকা রোদ লাগত জারটির গায়ে।

বোতলের ভেতর ‘স্পাইডার ওয়ার্টস’ তৈরি করে নিয়েছিল নিজস্ব পৃথিবী। দিব্যি বেড়ে চলেছিল বাইরের পৃথিবী থেকে কোনও সাহায্য না নিয়েই। প্রথমবারের চেষ্টাতেই সফল হওয়ার পর, প্রচুর কারবয় বোতল কিনে এনে ল্যাটিমার আরও ‘টেরারিয়াম বাগিচা’ বানাতে শুরু করেছিলেন। তাঁর তৈরি করা ‘টেরারিয়াম বাগিচা’ বিভিন্ন নার্সারি বিক্রি করতে শুরু করেছিল। ল্যাটিমারের টেরারিয়াম বাগিচার সাফল্যে ভর দিয়ে, ঘুরে দাঁড়িয়েছিল প্রায় বন্ধ হতে বসা ‘কারবয়’ বোতলের ব্যবসা।

১৯৬০ সালের ১৪ এপ্রিল থেকে কাচের জারটিকে একই জায়গায় রেখে দিয়েছিলেন ল্যাটিমার। মাঝে মাঝে জারটির গায়ে জমা ধুলো মুছে দিতেন, জারটিকে  ঘুরিয়ে দিতেন, যাতে উদ্ভিদগুলির সবদিক সমান ভাবে সূর্যের আলো পায়। সাতাশ বছর  ধরে একই জায়গায় ছিল কাঁচের জারটি। ১৯৮৭ সালে চাকরি থেকে অবসর নিয়ে ক্রেনলে গ্রাম ছেড়ে ল্যাঙ্কাশায়ার চলে গিয়েছিলেন ল্যাটিমার দম্পতি। সঙ্গে নিয়ে গিয়েছিলেন টেরারিয়ামটিও। নতুন বাড়িতে একই জায়গায় রেখেছিলেন জারটিকে। ততদিনে জারটির চারভাগের সাড়ে তিনভাগই দখল করে নিয়েছিল ‘স্পাইডার ওয়ার্টস’।

কীভাবে  নিজস্ব পৃথিবী থেকেই রসদ গ্রহণ করে বেঁচে আছে ‘স্পাইডার ওয়ার্টস’!

স্পাইডার ওয়ার্টস উদ্ভিদগুলির জীবনধারনের জন্য দরকার ছিল, জল, খনিজ পদার্থ, কার্বন-ডাই-অক্সাইড, অক্সিজেন ও সূর্যালোক। সূর্যালোক বাদে সবকটি উপাদানই উদ্ভিদগুলি জোগাড় করে নেয় বদ্ধ জারের ভেতর থেকেই। দিনের বেলা  সৌরশক্তির সাহায্যে উদ্ভিদগুলি নিজের খাবার তৈরি করে। এর জন্য, জারের ভেতর থেকে টেনে নেয়, গতরাতে ত্যাগ করা কার্বন-ডাই-অক্সাইড। কম্পোস্ট মেশানো মাটি থেকে টেনে নেয় জল ও খনিজ লবণ।

খাবার তৈরি করার সময় গ্যাসজারের ভেতরে প্রচুর পরিমাণে অক্সিজেন ত্যাগ করে উদ্ভিদগুলি।  ত্যাগ করে অতিরিক্ত জলও। রাতের বেলা সেই অক্সিজেন   বাষ্পাকারে আবার টেনে নিয়ে শরীরের অনান্য জৈবনিক কাজ চালায় উদ্ভিদগুলি।  বাষ্পাকারে ত্যাগ করা জল, ঘনীভূত হয়ে জারের গা বেয়ে নেমে আসে জারের মাটিতেই। সেই জলই আবার টেনে নেয় তারা।

উদ্ভিদগুলির পাতা ঝরে পড়ে জারের নীচে। মাটিতে থাকা আণু্বীক্ষণিক জীবেরা পাতা পচিয়ে নিজেদের খাবার জোগাড় করে নেয়। পচা পাতাই হয়ে যায় উদ্ভিদটির সার। সেই সার থেকে উদ্ভিদগুলি গ্রহণ করে খনিজ পদার্থ। এভাবেই জারের ভেতর গড়ে উঠেছে একটি পৃথক বাস্তুতন্ত্র। এক পৃথক পৃথিবী। যার নিজস্ব  বাতাস আছে, মাটি আছে, জল আছে, উদ্ভিদ আছে ও প্রাণী আছে।

১৯৬০ সালের পর, মাত্র একবারই জারের ভেতরে জল দিয়েছিলেন ল্যাটিমার। সেই ১৯৭২ সালে, যখন নিক্সন ছিলেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট। তারপর থেকে আজ অবধি, প্রায় ৪৮ বছর ধরে জারটিকে সম্পূর্ণ সিল করা অবস্থায় আছে, পঁচাশি বছরের ডেভিড ল্যাটিমারের বাড়িতে। জারের ভেতরের পৃথিবীর সঙ্গে বাইরের পৃথিবীর কোনও সম্পর্ক নেই। ঐতিহাসিক টেরারিয়াম জুড়ে থাকা স্পাইডার ওয়ার্ট উদ্ভিদগুলি, মানুষের পৃথিবী থেকে কিছু নেয় না। তারা ঋণী একমাত্র সূর্যের কাছে।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More