সোমবার, এপ্রিল ২২

৬ অগস্ট, ১৯৪৫, সকাল ৮-১৫: আমি হিরোশিমা বলছি…

রূপাঞ্জন গোস্বামী

৬  অগাস্ট, ১৯৪৫: মহাসাগরের  তিনিয়ান দ্বীপ থেকে টেক অফ করল মার্কিন বি-২৯ বম্বার এনোলা গে। উল্কাবেগে উড়ে চলল জাপানের হিরোশিমার  দিকে।

সকাল ৮:১৫ মিনিট, রৌদ্রোজ্জ্বল  হিরোশিমা শহরের ঘুম ভাঙেনি তখনও। বিমানটির ক্রু প্যারাশ্যুটে করে নামিয়ে দিলেন পেটমোটা লিটল বয়কে। সাড়ে তিন লাখ লোকের শহর হিরোশিমার ওপর। ১০ ফুট লম্বা,  ৪ হাজার ৪০০ কিলোগ্রাম ওজনের ‘লিটল বয়’-এর মাথায় ছিল সাড়ে ১৫ কিলোটন টিএনটি ক্ষমতা যুক্ত ৬৪ কেজির ইউরেনিয়াম।

মাটি থেকে  ৫৮০ মিটার উঁচুতেই ফাটে পৃথিবীর প্রথম অ্যাটম বোমা, ‘লিটল বয়’। বিস্ফোরণ স্থলের দু’কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বোমাটি তার বিধ্বংসী ক্ষমতা দেখিয়েছিল।  বিস্ফোরণ স্থল থেকে ৬০ কিলোমিটার দূর পর্যন্ত কম্পন অনুভব করেছিলেন ও পরমাণু বোমার  মাশরুম মেঘ দেখেছিলেন জাপানবাসীরা। আর, বিস্ফোরণস্থলের ৫০০ মিটারের মধ্যে সমস্ত কিছু নিমেষে বাষ্প হয়ে গিয়েছিল। হ্যাঁ, মানুষ জন, দোকান পাট, অফিস কাছারি, গাড়িঘোড়া সব। বিস্ফোরণ ঘটার সঙ্গে সঙ্গে প্রাণ হারিয়েছিলেন প্রায় তিন লক্ষ মানুষ। বেসরকারি মতে যার সংখ্যা দশ লক্ষ। বিস্ফোরণ মুহূর্তে  গ্রাউন্ড জ়িরোতে তাপমাত্রা উঠেছিল সত্তর লক্ষ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড।

বিস্ফোরণ ঘটালো লিটল বয়

‘এনোলা গে’-এর কো-পাইলট রবার্ট লুইস ধ্বংসের মাত্রা দেখে অনুশোচনায় চিৎকার করে উঠেছিলেন “হে ভগবান, এ আমরা কী করলাম!” কিন্তু অনুশোচনার লেশমাত্র ছিলোনা এনোলা গে’-র পাইলট পল টিবেটসের।
“জাপানে পরমাণু বোমা না ফেলে যদি আমেরিকা জাপানের সঙ্গে স্থলযুদ্ধ করত,  আপনাদের কোনও আন্দাজ আছে ঠিক কত আমেরিকান ও জাপানি মানুষ মারা যেতেন? যত মানুষ পরমাণু আক্রমণে প্রাণ হারিয়েছেন তার চেয়েও বেশি হতো সংখ্যাটা। আমি নিশ্চিন্তে ঘুমোতে পারছি, কারণ আমরা যা করেছি তার জন্যই অনেক মানুষ পুরো জীবন বাঁচবেন, হ্যাঁ  আমাদের জন্যই। আমায় যদি বলা হতো, আমি জার্মানিতেও পরমাণু বোমা ফেলতাম।যদি জার্মানি আত্মসমর্পণ না করত, বিমান নিয়ে আমি জার্মানি উড়ে যেতাম।” 

এনোলা গে-এর সামনে পল টিবেটস

ঝিকে মেরে বৌকে শিখিয়ে দিয়ে খুশি হয়েছিলেন তৎকালীন প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান। এক ঢিলে মেরে দিলেন বিশ্বযুদ্ধ ও রাশিয়ার দাদাগিরির দু’টো পাখি। শুরু হলো শীতল যুদ্ধের যুগ। সারা পৃথিবী নিন্দায় মুখর, হিরোশিমায় বোমা ফেলার তিন দিন আগে ট্রুম্যান সর্বসমক্ষে স্বীকার করে বসেছিলেন ‘জাপান শান্তির রাস্তা খুঁজছে’। কিন্ত সেই ট্রুম্যান মানব ইতিহাসের সব চেয়ে বড় সংগঠিত হত্যাকাণ্ডটি ঠান্ডা মাথায় ঘটিয়ে দিলেন। ট্রুম্যানের অনেক রাজনৈতিক পরামর্শদাতা চাননি হিরোশিমায় পারমাণবিক বোমা ফেলতে। কিন্তু তাঁরা তাঁদের কম্যান্ডর ইন চিফকে বোঝাতে অপারগ হয়েছিলেন।

প্রথম পরমাণু বোমা লিটল বয়

নিউক্লিয়ার চেন রিঅ্যাকশনের আবিষ্কারক ও অ্যাটম বোমার পিছনে মুল মাথা যাঁর, সেই হাঙ্গেরির বিজ্ঞানী ড. লিও জ়িলার্ডও বোমা না ফেলার জন্য ১৯৪৫ সালের জুলাই মাসেই পিটিশন পাঠান প্রেসিডেন্টকে। পিটিশনটিতে সই করেন ৬৮ জন বিজ্ঞানী। পিটিশনটিকে পাত্তাই দেননি ট্রুম্যান। কারণ, তিনি  হিরোশিমাকে বানিয়েছেন তাঁর ল্যাবরেটরি। গিনিপিগ হিসেবে পেয়েও  গেছেন  হিরোশিমার সাড়ে তিন লক্ষ মানুষ। সুবর্ণ সুযোগ হাতছাড়া করতে চাননি প্রেসিডেন্ট ট্রুম্যান। যার পরিণতি লক্ষ লক্ষ মানুষের মৃত্যু, অ্যাটম বোমার সাফল্য, বিশ্বযুদ্ধ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়া ও আমেরিকার বিশ্ব জুড়ে দাদাগিরি।

আরও পড়ুন:আত্মহত্যার কয়েক ঘণ্টা আগে উইল করান হিটলার, কী লেখা ছিল সেই উইলে ? 

ঠিক কত মানুষ ট্রুম্যানের গিনিপিগ হয়ে মারা গেছিলেন, তার হিসেব দেওয়া কঠিন। কারণ ‘হিবাকুসা‘দের সংখ্যা কেউ মনে রাখেনি। ‘হিবাকুসা’একটি  জাপানি শব্দ। এই শব্দের অর্থ  ‘বিস্ফোরণ আক্রান্ত’। কারা এই ‘হিবাকুসা?’ জাপানের  ‘দ্য অ্যাটমিক বম্ব সারভাইভারস রিলিফ’ আইন দিয়েছে তার সংজ্ঞা।
*যাঁরা  বোমা বিস্ফোরণস্থলের  কয়েক কিলোমিটারের মধ্যে ছিলেন।
* যাঁরা পরমাণু বোমা বিস্ফোরণের দু’সপ্তাহের মধ্যে  বিস্ফোরণস্থলের দু’কিলোমিটারের মধ্যে ছিলেন।
*যাঁরা  বিস্ফোরণ নিঃসৃত ইউরেনিয়াম তেজস্ক্রিয়তায় আক্রান্ত।

*এই  তিন অবস্থার মধ্যে থাকা গর্ভবতী মহিলারা।

হ্যাঁ, জাপানি আইনে এঁরাই  ‘হিবাকুসা’।

লিটল বয়ের এক শিকার

২০০৫ সালের মার্চ মাসে করা আদমসুমারি অনুযায়ী  এঁরা  সংখ্যায় ছিলেন ২ লাখ ৬৬ হাজার ৫৯৮ জন। এঁদের মধ্যে বেশির ভাগ  মানুষ বাস করেন  জাপানে। কয়েক হাজার ছড়িয়ে গেছেন দক্ষিণ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে, বিশেষ করে কোরিয়ায়।  হিবাকুসাদের ভুলে যায়নি জাপান। তাঁরা সবার আগে পান সব সরকারি সহয়তা। প্রতি মাসে তাঁদের অ্যাকাউন্টে চলে যায় সরকারি পেনশন। আজকের মতো, প্রতি বছর ৬ আগস্ট, স্মরণ করা হয় নিহতদের। প্রতি বছরের সভায় বিগত বছরে মৃত্যু হওয়া ‘হিবাকুসা’দের নাম ও ছবিতে ভরে যায়  হিরোশিমা শহর। মার্কিন পরমাণু বোমায় মৃতদের  স্মৃতিফলকে সংযোজিত হয় নাম, আজও। ২০০৫ সালে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী হিরোশিমায় পরমাণু বোমার তেজষ্ক্রিয়তায় পরবর্তী কালে মৃত  ‘হিবাকুসা’দের সংখ্যা ছিল ২ লক্ষ ৪২ হাজার ৪৩৭।

প্রতি বছর, বিশ্ব জুড়ে ৬ অগস্ট হিরোশিমা দিবস পালিত হয়। মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে বিশ্বব্যাপী ক্ষোভ-ধিক্কার ঘৃণার বিস্ফোরণ ঘটে। আমেরিকার বিবেকে যার অভিঘাত ৭৩ বছর আগেকার লিটল বয়ের ১৮ কিলোটন টিএনটির চেয়ে কম  নয়।

Shares

Leave A Reply