মাঝেরহাট ব্রিজ — এবারে কোন বিপর্যয় অপেক্ষা করে আছে?

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায়
     কেউ জানে না এ বারে কী হতে চলেছে। মানুষের জীবনের ওপরে তার নিজের আর কোনও হাত নেই। সিস্টেম সম্পূর্ণ দখল করে নিয়েছে একদিকে বিলিয়ন ডলার লক্ষ কোটি টাকার মেগা কর্পোরেশন ও তাদের মিডিয়া। আর একদিকে চরম দুর্নীতিগ্রস্ত শাসকশ্রেণী এবং তাদের মাফিয়া।
     ভারতে এবং আমেরিকায় — আমার সারাজীবনের দুই প্রিয় দেশে — এখন এই বিপর্যয় দেখছি। আমার প্রিয় শহর কলকাতার নাভিশ্বাস দেখছি। একের পর এক মহাসঙ্কট দেখছি। অসহায় লাগছে।
    কিন্তু একে বলা হচ্ছে গণতন্ত্র। অথচ, গণতন্ত্রের অর্থ শুধু পাঁচ বছর অন্তর ভোট দেওয়া নয়। গণতন্ত্রের অর্থ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সিস্টেমে সাধারণ মানুষের সবসময়ে, সব বিষয়ে সক্রিয় অংশগ্রহণ।
    মাঝেরহাট ব্রিজ ধসে পড়ার ঘটনায় এ সব বড় বড় বিষয়ে আলোচনা করার কি কোনও দরকার আছে? অনেকে এই প্রশ্ন করবেন। তাঁরা বলবেন, এখন শুধু দেখতে হবে, কী ভাবে মানুষের জীবন বাঁচানো যায়, যাদের বাড়িতে মৃত্যু বা ভয়ঙ্কর আঘাত এসেছে, তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ানো যায়। বাকি সব কথা পরে হবে। আমার মতে, ঠিক এইসময়েই এসব “বড় বড়” আলোচনা করা দরকার। কারণ, দুদিন পরেই মানুষ সব ভুলে যাবে।
     এখন পৃথিবীতে এমন একটা অবস্থা এসেছে, যেখানে মানুষ আর কোনও আলাপ-আলোচনা, বিতর্ক, চ্যালেঞ্জ, প্রশ্ন, যুক্তিতর্ক করতে চায় না। এই দশা হলো মানবসভ্যতার সবচেয়ে ভয়াবহ সঙ্কট। এর আগেও অনেক সঙ্কট এসেছে। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পরমাণু বোমা বিস্ফোরণ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে লক্ষ নিরীহ পুরুষ নারী ও শিশুর বীভৎস মৃত্যু। হিটলারের ইহুদি নিধন এবং কনসেনট্রেশন ক্যাম্পের গণহত্যা। কম্বোডিয়ার গণহত্যা, রুয়ান্ডার গণহত্যা, ভিয়েতনাম, ইরাকের গণহত্যা।
    অনেক আগে নানা ধর্মের হিংস্র উগ্রবাদীদের ঘৃণা ও হিংসার ত্রাসে প্রাণ ও মর্যাদা দিতে হয়েছে অসংখ্য মানুষকে। এখনো দিতে হচ্ছে ভারতে বা আফগানিস্তানে বা সিরিয়াতে। কিন্তু কখনো বোধহয় এমন অবস্থা আসেনি, যেখানে মানুষ নিজে থেকে স্থির করেছে, সে আর কোনো প্রয়োজনীয় বিষয়ে প্রশ্ন, বিতর্ক, চ্যালেঞ্জ করবে না। সে শুধু বিলাসব্যসন, মল, শপিং অর্থসম্পদ, সিনেমা, নাচগান, পার্টি, গাড়ি বাড়ি, জমি, ক্রিকেট-ফুটবল-ফ্যাশন, ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টুইটার রঙ্গ রসিকতা আর ধর্ম জ্যোতিষ গ্রহরত্ন কুসংস্কার — এইসব নিয়েই ব্যস্ত থাকবে। যারা সিরিয়াস আলোচনা করবে, প্রশ্ন করবে, যুক্তিপূর্ণ আলোচনা করবে, তাদেরকে র‍্যাডিক্যাল অর্থাৎ বড্ড বেশি পলিটিক্যাল — এই ছাপ দিয়ে দেওয়া হবে। সে যেখানেই এসব আলোচনা তুলবে, তার কথা শোনার লোক খুঁজে পাওয়া যাবে না। তার নিজের বন্ধুবান্ধব আত্মীয় পরিজন মহলেই সে জনপ্রিয়তা হারাবে। এই যুগকে আমি এখন বলে থাকি, “উত্তর-যুক্তির যুগ।” ইংরিজিতে, “দ্য এরা অফ পোস্ট রিজ়ন।”
     মাঝেরহাট ব্রিজ পার হয়ে আমরা প্রতিদিন বেহালার দিকে যেতাম। আমার স্ত্রী ঠাকুরপুকুর বিবেকানন্দ কলেজে অধ্যাপিকার কাজ নেওয়ার পর আমরা সেই গোয়াবাগান থেকে উঠে এলাম বেহালা চৌরাস্তা আর সখেরবাজারের মাঝামাঝি ডগলাস ক্লাব মাঠের ঠিক উল্টোদিকে। কলকাতার সঙ্গে যোগাযোগ, অর্থাৎ এসপ্ল্যানেড, চৌরঙ্গী, ডালহৌসি, সিনেমা থিয়েটার পাড়া, ফুটবল ক্রিকেট, রবীন্দ্রসদন কলামন্দির একাডেমি — সবজায়গাতেই যেতাম ওই মাঝেরহাট ব্রিজ পার হয়ে।
    কলকাতায় থাকলে হয়তো আজকে ওই ব্রিজের ওপর দিয়ে মিনিবাসে করে যেতাম ঘামতে ঘামতে, মাথা নিচু করে জানলার বাইরে দিয়ে তাকাতে তাকাতে। হয়তো আজকে … ঠিক যেমন ওই ছেলেটার জীবন চলে গেল। আর কতজনের যে গেছে চাপা পড়ে। আর এক ফেসবুকের ভাই লিখেছে, তার বাবা ব্রিজ ভেঙে পড়ার ঠিক একটু আগেই ওখান থেকে বেরিয়ে গেছিলেন। এই ব্যক্তি লিখেছেন, “কলকাতা আগে সিসমিক জোন-৩ এ ধরা হতো। এখন জোন-৪ এ ধরা হয়। কিছু বদলায়নি। বিজেপি-শাসিত গৌহাটি জোন-৫। গোটা শহরে একটা ট্র‍্যাডিশনাল বাঁশের বাড়ি পাওয়া যায় না। ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডের এক লাইন কেউ মানে না। গত দু বছরে এক্সপোনেনশিয়াল হারে নির্মাণকাজ বৃদ্ধি পেয়েছে, সাথে মাফিয়ারাজ। এবং কোনওরকমের ডিজ়াস্টার ম্যানেজমেন্ট প্ল্যান ছাড়া। নেপাল ভূমিকম্পের পরে, সবচেয়ে ভালনারেবল শহর এখন।”
     কী সাংঘাতিক কথা! দিল্লি তো ভূমিকম্প ফল্টলাইনেই বসে আছে।
     কিন্তু এই বিষয় নিয়ে কোনও আলোচনাই তেমন নেই। কিন্তু জোক পাঠাচ্ছে কিছু লোক এখনও, এই সময়েও। ব্রিজ নীল রং বা লাল রং বা গেরুয়া রং করলে যে এই বিপর্যয়ের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যেত, সেই রসিকতা চলছে প্রবলবেগে — সোশ্যাল মিডিয়াতে। লোকে হাজার লাইক দিচ্ছে, ছড়িয়ে দিচ্ছে এসব জোক চারদিকে।
     বাঙালি কি তার সামান্য মানবিক সংবেদনশীলতা, আর মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলেছে এই উত্তর-যুক্তির দিনে?
     মানস নাথ লিখেছেন, “ঠাকুরপুকুরে থাকি। কাল ব্রিজ ভাঙ্গার চল্লিশ মিনিট আগে ওখান দিয়ে গেছি। ফেরার সময় যা ভোগান্তি হয়েছে আর কহতব্য নয়।”
     আমি তাঁকে তাঁর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আরো লিখতে বলেছিলাম। তিনি লিখেছেন, “বড়বাজারে গিয়েছিলাম। টিভিতে খবরটা দেখার পর থেকেই ক্রমাগত বন্ধুবান্ধব আত্মীয়স্বজনদের ফোন আসতে থাকে। বাস রুট অ্যাভয়েড করব বলে বড়বাজার থেকে এজরা স্ট্রিট হয়ে সেন্ট্রাল মেট্রো স্টেশনে চলে আসি। সেখানে তখন কাউন্টারের সামনে বিশাল লাইন। চারিদিকে প্যানিক। সবাই তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরতে চাইছে। ট্রেন আসতে দেখি অস্বাভাবিক ভিড়। ভিতরে দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার জোগাড়! সবাই ব্রিজ ভাঙ্গা নিয়েই কথা বলছে। বেহালা রুটের লোকেরা কী ভাবে বাড়ি ফিরবে সেই নিয়ে চিন্তিত। টালিগঞ্জে নেমে দেখলাম থিকথিক ভিড়। খালি মাথা ছাড়া আর কিছু দেখা যাচ্ছে না। এক একটা গাড়ির পেছনে পঞ্চাশ জন করে ছুটছে। বয়স্ক ও মহিলাদের অবস্থা করুণ। অনেকক্ষণ যুদ্ধ করে একটা শাটল গাড়িতে আরো ছজনের সাথে উঠলাম।”
    মাঝেরহাট ব্রিজের ঠিক পাশেই বিশাল কনস্ট্রাকশন। লোকে বলছে, ব্রিজ কাঁপছিল আগেই। আসল ভূমিকম্প হলে কলকাতার কী হবে? পালাবার রাস্তাও জানা নেই। একটা ম্যাপ নেই। কোনো রেসকিউ প্ল্যান নেই। কেউ করেনি কোনো ব্যবস্থা। না কংগ্রেস, না সিপিএম, না তৃণমূল। বিজেপি যেখানে যেখানে পাওয়ারে আছে, সেখানে কী করেছে? করলে ভালো। আমাকে জানাবেন।
     ভারতে, পশ্চিমবঙ্গে, কলকাতায় একটা ব্রিজ ধসে পড়ে গোটাকয়েক লোক মরে গেল। এর আগেও গেছে। আমরিতে আগুন লেগে মরে গেছে। লোকে ভুলে গেছে। পোস্তায় ব্রিজ চাপা পড়ে গেছে। লোকে ভুলে গেছে। এবারেও ভুলে যাবে।
    সামনে পুজো আসছে। ব্রিজ মেরামত না হলেও পুজোর মেগা প্যান্ডেল হবে। থিম হবে। ওদিকে বড় বড় পুজো হয়। কোটি কোটি টাকার নয়ছয় পুজো। মিডিয়া প্রাইজ ঘোষণা করবে। মুখ্যমন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী, গোধরামন্ত্রী, পূর্তমন্ত্রী, ব্রিজমন্ত্রী, জঞ্জালমন্ত্রী — সবাই আসবেন ফিতে কাটতে। লোকে হাততালি দেবে। লোকে যাবে। ছেলেরা, মেয়েরা, বাচ্চারা, বুড়োরা। পরের ব্রিজ ভেঙে পড়া পর্যন্ত, বা আগুন লাগা পর্যন্ত, বা আর একটা কোনো বড় ধরণের ঘটনা ঘটা পর্যন্ত কলকাতার মুষ্টিমেয় বাঙালি পুজো, রবীন্দ্র, সত্যজিৎ, ইত্যাদি নিয়ে ভালোই থাকবে।
     যারা থাকবে না, দুঃস্বপ্ন দেখে ঘুমোতে পারবে না, বা বেশি কথা বলবে — তাদের ওষুধ দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দেবে বাকি সব উত্তর-যুক্তির যুগের নতুন ফান-লাভিং বাঙালি জাতি।
     লেখক ডঃ পার্থ বন্দ্যোপাধ্যায় নিউ ইয়র্কে মানবাধিকার কর্মী ও শ্রমিক ইউনিয়নের শিক্ষক। তিনি কলকাতায় বড় হয়েছেন। প্রায়ই যাওয়া আসা করেন। মতামত লেখকের ব্যক্তিগত।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More