শনিবার, অক্টোবর ১৯

ওঁরা আসলে গণতান্ত্রিক ভারতবর্ষের বিরুদ্ধে

 

জিষ্ণু বসু

হাসপাতালের সামনে দুর্ঘটনা ঘটেছে। আহতদের ঘিরে হাসপাতাল চত্বরে বিভিন্ন লোক। পথচলতি সদাশয় বাবু, নার্সিংহোমের এজেন্ট, ওষুধের দোকানদার, কম্পাউন্ডার, ডিউটিতে জয়েন করতে আসা ডাক্তারবাবু। এক সদাশয় পথিক বেঁকে যাওয়া হাত মালিশ করে সোজা করছেন। তিনি ভাল মনে করছেন, কিন্তু তিনি জানেন না ভিতরে চুরচুর হয়ে যাচ্ছে হাড়। ডাক্তার ধমক দিলেন, স্ট্রেচারে করে আহতদের তোলা শুরু হল। ভিড়ের মধ্যে একজন অতি উৎসাহে এগিয়ে এসেছিলেন। পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে তিনি কিছুটা হতাশ হয়েই ফিরে গেলেন। শেষ ব্যক্তিটি শববাহী গাড়ির চালক। মানুষ না মারা গেলে তাঁর বিশেষ লাভ নেই।

দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে মহারাষ্ট্র পুলিশ মাওবাদীদের মদতদাতা বুদ্ধিজীবীদের গ্রেফতার করেছে। বর্ষীয়ান কবি সদাশয় মানুষ। তিনি কষ্ট পেয়েছেন। উষ্মা প্রকাশ করেছেন। হয়তো বোঝেননি ভিতরে চুরচুর হয়ে যাচ্ছে ভারতীয় গণতন্ত্রের এক একটা অস্থি।

সভাকবি যিনি, তাঁর ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিরোধিতা করে এখানে একটি কবিতা লেখা অবশ্য কর্তব্য। কিষাণজি, মানে কোটেশ্বর রাও তাঁর মাওবাদী জীবন শুরু করেছিলেন ভারভারা রাওয়ের ‘রেভলিউশনারি রাইটার্স অ্যাসোসিয়েশন’-এ যোগ দিয়ে। ২০১১ সালে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সরকারের হাতে যেদিন কিষাণজি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করলেন, কিষাণজির ভাইঝিকে নিয়ে ভারভারা রাও নিজে পশ্চিমবঙ্গে এসেছিলেন মৃতদেহ শনাক্ত করতে। সেদিনও কবি কাঁদতে পারতেন, কিন্তু সভাকবির কি সবসময় কাঁদা সাজে?

রাহুল গান্ধীর পরিবারের সকলেই ভারতীয় গণতন্ত্রের উপরেই মসনদ চালিয়েছেন। ভারতবর্ষ টুকরো টুকরো হলে আখেরে তাঁর বা তাঁর দলের ক্ষতিই হবে, তবু রাজনৈতিক বিরোধিতার এতবড় সুযোগ ছাড়া একেবারেই উচিত নয়। অনেকটা ওষুধের দোকানদারের মতো, রোগী বেঁচে ফিরুক তবে অনেকটা ওষুধপথ্য খেয়ে।

কাগজ জুড়ে উত্তর সম্পাদকীয় লিখছেন বাম বুদ্ধিজীবীরা। দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র শেষ হয়ে গেলে কমিউনিস্ট হিসেবে সিপিএম, সিপিআই-এর দাম থাকবে নাকি? তারা চান না মাওবাদীরা জিতুক। ভারতে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা থাকুক, না হলে সীতারাম সাহেবের সীট আর আরাম কোনওটাই থাকবে না। কতকটা হরি কম্পাউন্ডারের মতো। তবে এর মধ্যেই মুখ বাড়িয়েছেন ভারভারা রাওদের প্রকৃত সমর্থক। তার মনে প্রাণে দামামা বাজছে। ‘’ভারত, তেরে টুকরে হোঙ্গে, ইনশাল্লা ইনশাল্লা।‘’ এই বিরাট ভারতবর্ষ টুকরো টুকরো না হলে তাদের কোনও লাভ নেই। তারা সেই শববাহী গাড়ির চালক। ভারতবর্ষের মৃত্যুই তার মুখে হাসি ফোটাতে পারে।

যে পাঁচজন গ্রেফতার হয়েছেন, সেই ভারভারা রাও, সুধা ভরদ্বাজ, অরুণ ফেরেরা, গৌতম নওলাখা বা ভার্নন গঞ্জালভেসের মানবাধিকারের জন্য লড়াইটা নতুন নয়। এই অতিবামপন্থীদের চোখে ভারতবর্ষ সম্পর্কে একটা স্বপ্ন আছে। সেটা খণ্ড-বিখণ্ড, টুকরো টুকরো দুর্বল ভারতবর্ষের। পূর্ব ইউরোপের একটা মডেল তাদের সামনে আছে। রোমানিয়া, পোল্যান্ড, বুলগেরিয়া, আলবেনিয়ার মতো দেশগুলি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে সোভিয়েত রাশিয়া এদের দখল করে তাদের বশংবদ কমিউনিস্টদের বসিয়ে দেয়। তাই ভারতবর্ষ স্বাধীন হওয়ার পর থেকেই এমনই লেখাপড়া জানা বুদ্ধিজীবীদের মাথায় সোভিয়েতের দখলে থাকা টুকরো টুকরো রাজ্যের কল্পনা আসে।

দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই ভারতের কমিউনিস্ট নেতারা রাশিয়ায় গিয়ে জোসেফ স্ট্যালিনের সঙ্গে দেখা করে আসেন। ফিরে এসে মাকিনেনি বাসবপুন্নাইয়া তার বিখ্যাত থিসিস প্রকাশ করেন। প্রকারান্তরে যা রাশিয়াকে ভারত দখলের আহ্বান। কিন্তু ১৯৬২ সালের ভারত-চিন যুদ্ধের পরে তাদের স্বপ্নটা পাল্টে গেল। উঠে এল পরিমল দাশগুপ্ত থিসিস।

সোভিয়েত রাশিয়া নয়, মাও সে তুংয়ের চিন। চিন ভারত দখল করে টুকরো টুকরো ভারত এই সব মাওবাদীদের হাতে দিয়ে যাবে। তারই জন্য এলাকাভিত্তিক স্বায়ত্তশাসন। সেই অতৃপ্ত বাসনা নিয়েই ঘুরছেন ভারভারা রাও।

কলকাতার শ্রদ্ধেয় এক কবি বলেছেন, কেন্দ্রে ফ্যাসিস্ত সরকার, তাই গ্রেফতার হয়েছেন কবি ভারভারারা। তাই কি? আসলে কেন্দ্রে কংগ্রেস আছে, না বিজেপি সেটা আদৌ বিষয় নয় ভারভারা রাওদের কাছে, বিষয় হল ভারতীয় গণতন্ত্র আছে, একটা শক্তিশালী রাষ্ট্রব্যবস্থা আছে। ২০০৯ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর ভারভারা রাও নিজেই বলেছেন যে, সিপিএমের মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য আর বিজেপির মুখ্যমন্ত্রী রমন সিংহ, তাদের কাছে সমান শত্রু।

তেমনি ২০১০ সালের ১৪ অক্টোবর বুদ্ধদেববাবু এক সাংবাদিক সম্মেলনে বলেছিলেন, মাওবাদীরা আসলে সন্ত্রাসবাদী। তাঁর সরকার রাজ্যে মাওবাদীদের সন্ত্রাসের রাজনীতির বিরুদ্ধে লাগাতার লড়াই করছে। ইউপিএ-২ সরকারের দুই প্রধান রাজনেতা মনমোহন সিংহ এবং পি চিদম্বরম একাধিক বার বলেছেন, সেদিনের ভারতবর্ষের প্রধান সমস্যা ছিল মাওবাদ। সেদিনও বার বার উঠে এসেছে ভারভারা রাওয়ের নাম। আজ যখন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে হত্যার ষড়যন্ত্রের অভিযোগ উঠেছে এঁদের বিরুদ্ধে, তখন মনে রাখা প্রয়োজন, সেটা কোনও ব্যক্তিকে হত্যার বিষয় নয়। ভারতীয় গণতন্ত্রের সাংবিধানিক অন্যতম প্রধানকে হত্যা, তার ওই আসনে মনমোহন সিংহ আছেন না নরেন্দ্র মোদী, সেটা ভারভারা রাওদের কাছে সামান্যই মহত্ব রাখে।

একটা মানুষকে ঠান্ডা মাথায় খুন করতে হলে তার শরীরের রোগের খবর রাখতে হবে। আর সেই অসুখ যাতে আরও বাড়ে তার ব্যবস্থা করতে হবে। ভারভারা রাও বা গৌতম নওলাখারা সেই কাজই করছেন। ভারতবর্ষের সমাজের সবচেয়ে বড় ব্যধি জাতিভেদ। ওই ব্যধির উপশম না করে যদি বাড়িয়ে দেওয়া যায় তবে ভারতবর্ষ অবশ্যই টুকরো টুকরো হবে।

বিগত এক দশক ধরে ভারতবর্ষের যতগুলো জাতিদাঙ্গা হয়েছে তার কেন্দ্রবিন্দুতে আছে অতি বাম পরিকল্পনা। ‘ভীমা কোরেগাঁও’ এমনই একটি বিতর্কিত বিষয়। মহারাষ্ট্রে পেশোয়া সাম্রাজ্যের শেষ দিকে জাতিভেদ এক ভয়ানক ব্যধির রূপ নিয়েছিল। অন্ত্যজ মাহারদের পেশোয়া তার সেনাবাহিনীতে যোগ দিতে দেয়নি। মাহাররা বিদেশি ইংরেজের পক্ষ নিয়ে দেশীয় রাজা পেশোয়াদের হারিয়ে দেয়। এই দু’শো বছরের পুরাতন জাতিভেদের আগুনকে উস্কে দিতে প্রত্যক্ষ ভূমিকা ছিল এই বুদ্ধিজীবীদের। কিন্তু আরও ১৫০ বছর আগে যে মারাঠা রাজা শিবাজী তফশিলি উপজাতি মাওয়ালি সেনা নিয়ে একের পর এক মুঘল দুর্গ জয় করেছিলেন, সেটাকে স্মরণ করা যায় না?

না, সেটা তো সামাজিক সমরসত্তার উদাহরণ। জাতিভেদের আগুনে ঘৃতাহুতি দেওয়ার কাজটাই এঁরা করবেন। কারণ তাঁদের মূল উদ্দেশ্য দেশটাকে টুকরো টুকরো করা। এদের প্ররোচনাতেই বহু বছর বাদে পুণেতে আবার ‘ভীমা কোরেগাঁও’ বিবাদ নিয়ে জাতিদাঙ্গা হয়েছে এ বছর জানুয়ারি মাসে।

দিল্লির বা কলকাতার কোনও বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মাস গেলে দেড় লক্ষ বেতন পান। বস্তারের আদিবাসীরা কেন ল্যান্ডমাইন ব্যবহার করবে, তার সমর্থনে তিনি বক্তব্য রাখেন, খবরের কাগজের পাতা জুড়ে উত্তর-সম্পাদকীয় লেখেন। প্রথম বর্ষের ছাত্রদের অতিবাম ভাবনায় দীক্ষা দেন। একটু ঘনিষ্ঠ হলেই দেখা যায় যে, ওই অধ্যাপক ভদ্রলোক ব্যক্তিজীবনে এক নিপাট পেটি বুর্জোয়া। ওই অতিবাম পন্থা হল তাঁর ‘স্টাইল স্টেটমেন্ট’। একটা ‘টু-স্টেজ ল্যান্ডমাইন’ বস্তারের জঙ্গলে লাগাতে খরচ হয় কমবেশি ৪০ হাজার টাকা। ওই টাকায় গোটা একখানা বনগ্রামের গরিব আদিবাসীদের কয়েকদিন পেট ভরে খাওয়ানো যায়। কিন্তু, চিন বা পাকিস্তান ওই গরিব আদিবাসীদের খাবার জন্য টাকা দেবে না, ল্যান্ডমাইন দেবে। এই সত্যি কথাটা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনের একটি নিরক্ষর রিকশাচালক বোঝেন, শিক্ষিত ওই ভদ্রলোক বোঝেন না। আজকের দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের এটাই সবচেয়ে বড় সমস্যা। দান্তেওয়ারায় দেশের জওয়ানদের নৃশংসভাবে হত্যা করা হলে এই বুদ্ধিজীবীদের নেতৃত্বে শিক্ষক-ছাত্রেরা একসঙ্গে মদ-মাংসের উৎসব করেন। তার পর রাতে বিজয় মিছিল হয়।

ভারতবর্ষের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা ধ্বংস করাই এই অতিবামপন্থীদের মূল লক্ষ্য। এই কাজে যে কোনও মত বা পথের লোকই তাদের বন্ধু। আপাত ভাবে নাস্তিক অতিবামপন্থীরা ভারতবর্ষে তাদের সবচেয়ে কাছের বন্ধু হিসেবে জেহাদি মৌলবাদী শক্তিকে বেছে নিয়েছে। আজকের কাশ্মীরে হিজবুল মুজাহিদিন বা জইশ- ই-মহম্মদের মতো সংগঠনগুলির উগ্র ইসলামি মৌলবাদ ছাড়া আর কোনও আদর্শই নেই। কাশ্মীরের নিরীহ পণ্ডিতদের খুন করে, অত্যাচার করে, ধর্ষণ করে ওই উগ্রপন্থীরা উপত্যকাছাড়া করেছে। তাদের অত্যাচারে আজও কাশ্মীরের হিন্দুরা নিজের দেশেই উদ্বাস্তু। আর ওই নিষ্ঠুর উগ্রপন্থীদের নিয়েই দিল্লিতে সম্বর্ধনা সভার ব্যবস্থা করেন এই বুদ্ধিজীবীরা। সেখানে স্লোগান ওঠে, ‘ভারত তেরে টুকরে হোঙ্গে, ইনশাল্লা, ইনশাল্লা!”

২০১০ সালে কলকাতার সেন্ট্রাল ফরেনসিক ল্যাবরেটরির ডাইরেক্টর এক সাংঘাতিক তথ্য প্রকাশ করেছিলেন। ভারতবর্ষে প্রথম রেডিও কন্ট্রোল্ড এক্সপ্লোসিভ বা রিমোট কন্ট্রোল্ড এক্সপ্লোসিভ প্রযুক্তি এনেছিল মাওবাদীরা। তারা আফগানিস্তানের তালিবানদের কাছ থেকে কাশ্মীরের মুজাহিদিনদের মাধ্যমে এই হাই ফ্রিকোয়েন্সি অপারেটেড সিস্টেম বা আল্ট্রা-হাই ফ্রিকোয়েন্সি ডিটোনেটর প্রযুক্তি ভারতে এনেছে। তাই সহজ ভাবে বললে বলা যায় যে, এই শিক্ষিত সরল চেহারার বুদ্ধিজীবীদের সহযোগিতা না পেলে খাগড়াগড়ের মতো ভয়ানক বিস্ফোরণের ঘটনা হত না। কারণ বর্ধমানের বিস্ফোরণে যে ইম্প্রোভাইজড এক্সপ্লোসিভ ডিভাইস (আইইডি) ব্যবহার হয়েছে সেখানেও একই প্রযুক্তি।

আরেকটা মজার বিষয় হল এই ‘মানবাধিকার’ কথাটা। যাঁরা তালিবানদের কাছ থেকে বিস্ফোরণের প্রযুক্তি আনলেন, যাঁরা দান্তেওয়ারায় দেশের বীর জওয়ানদের অনৈতিক ভাবে হত্যা করলেন, যাঁরা ভারতবর্ষের গণতন্ত্রকে খতম করার জন্য দিনরাত কাজ করছেন, তাদের ‘মানবাধিকার’ যেন কোনও ভাবেই নষ্ট না হয়। এই মানবাধিকার রক্ষার জন্য সব চেয়ে নামকরা আইনজীবীকে দাঁড় করানো হয়, কোটি কোটি টাকা আকাশ থেকে চলে আসে। তাদের জন্য রোমিলা থাপারের মতো অধ্যাপিকা পিটিশনার হন, অরুন্ধতী রায়ের মতো লেখিকা বিশ্বজুড়ে অর্থ সংগ্রহ করেন। কিন্তু মাওবাদীরা তো মাও সে তুংয়ের দেখানো পথে ভারত গড়ার স্বপ্ন দেখেন। সেই মাও সাহেবের চিনে মানবাধিকার কতটুকু আছে? তিয়ান-আন-মেন স্কোয়ারে এতগুলো মানুষের কোনও মানবাধিকার ছিল না? চিন কূটনৈতিক ভাবে সবচেয়ে অসহযোগী দেশ। ভারতের সঙ্গে তো বটেই, সোভিয়েত রাশিয়া, ভিয়েতনামের মতো সাম্যবাদী দেশের সঙ্গেও চিনের প্রবল বৈরিতা ছিল।

চিনের সাম্যবাদের উজ্জ্বল নমুনা হায়নান প্রদেশের স্পেশাল ইকনমিক জোন। সেখানে সারা পৃথিবীর সব পুঁজিপতিরা ভিড় করেছেন। সেখানে দিনে গড়ে ১২/ ১৩ ঘণ্টা কাজ করতে হয় ওই এস ই জেডের শ্রমিকদের। কোনও মহিলা সন্তানসম্ভবা হলে তার জন্য কোম্পানির কোনও সুবিধা দেওয়ার দায় নেই। আদতে পৃথিবীর কোনও পুঁজিপতি দেশের শ্রম আইনের থেকেও অনেক খারাপ হায়নানের নিয়ম। মে দিবসের অঙ্গীকার অনুযায়ী শ্রমিকদের ৮ ঘণ্টার কাজ, ৮ ঘণ্টা বিনোদন আর ৮ ঘণ্টা বিশ্রামের অর্জিত অধিকার পায়ে পিষে দিয়েছে চিনের এস ই জেডের নিয়ম। সিঙ্গুরের সময় কৃষি জমি অধিগ্রহণের বিরুদ্ধে সরব হয়েছিলেন ভারভারা রাও। কিন্তু হায়নানের এস ই জেডের নীচে চাপা পড়ে গেছে কয়েক হাজার সিঙ্গুর, নন্দীগ্রাম। সেই কৃষকদের মানবাধিকারের কী হলো? আচ্ছা একটা সহজ প্রশ্নের উত্তর দিন ভারভারা রাও। বেজিংয়ের রাস্তায় দুটি কলেজ ছাত্রীকে পুলিশ গান্ধীবাদী পোস্টার লাগাতে দেখল। তারপর তাদের কী হবে? সরল উত্তর, মেয়ে দুটিকে আর কেউ কখনো খুঁজে পাবে না। যাঁরা নিজেরা ক্ষমতায় এলে বিরোধীদের মানবাধিকারের বিন্দুমাত্র তোয়াক্কা করবেন না, তাঁরাই মানবাধিকারের জন্য সবচেয়ে বেশি চিৎকার করছেন?

তবে নরেন্দ্র দামোদর মোদীর একটা অপরাধ অবশ্যই আছে। ভারতবর্ষের ইতিহাসে ইউপিএ-১ এবং ইউপিএ-২ ছিল মাওবাদের স্বর্ণযুগ। সাউথ এশিয়া টেররিজম পোর্টালের ২০১০ সালের রিপোর্টে দেখা যায়, যে অন্ধ্রপ্রদেশ, বিহার, ছত্তীশগড়, দিল্লি, ঝাড়খণ্ড, কর্ণাটক, কেরল, মধ্যপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, গুজরাত, ওড়িশা, উত্তরপ্রদেশ, তামিলনাড়ু বা পশ্চিমবঙ্গে এমন কোনও সপ্তাহ যায়নি যেখানে কোনও না কোনও মাওবাদী উপদ্রব হয়েছে (http://www.satp.org/satporgtp/countries/india/terroristoutfits/cpi_m_timeline10.htm)। সেখান থেকে মাওবাদীরা গত পাঁচ বছরে আজ কাগজের বাঘে পরিণত হয়েছে। এই রাহুমুক্তির মূল কাণ্ডারী অবশ্যই নরেন্দ্র মোদী। তাই মোদীকে নিকেশ করা মাওবাদীদের তথাকথিত বিপ্লবের জন্য অবশ্যই একটা বড় সাফল্য হবে। প্রধানমন্ত্রীকে হত্যার চক্রান্ত সত্যিই হয়েছে। তাই পুলিশের সন্দেহের তীর মাওবাদের জাতীয় স্তরে মদতদাতাদের দিকে যাওয়াটা কি খুব অস্বাভাবিক?

আজ ভারতবর্ষের শিক্ষিত তরুণ প্রজন্মকে ভাবতে হবে, যে এই তথাকথিত কতিপয় শিক্ষিত মানুষের চিনের প্রতি, মাওয়ের প্রতি রোমান্টিক স্বপ্নের খেসারত দেশের মানুষ আর কতদিন দেবে? ভারতের অনেক সমস্যা আছে, দারিদ্র আছে, বঞ্চনা আছে, দুর্নীতি আছে, জাতিভেদ আছে। কিন্তু তার সমাধান কখনোই দেশটাকে টুকরো টুকরো, খণ্ডবিখণ্ড করে হবে না। ভারতবর্ষের গণতন্ত্রকে হত্যার চক্রান্তকে আজ কঠোর হাতে দমন না করলে ভারতের ভবিষ্যৎ পল পটের কাম্বোডিয়ার মতো হবে। সুতরাং মাওবাদীদের জাতিদাঙ্গার ফাঁদে পা দিলেই মুর্খামি হবে। গণতন্ত্রের বিকল্প গণতন্ত্রই, মাওবাদের মতো কোনও একদলীয় ব্যবস্থা কখনওই না। তাই এই সব বুদ্ধিজীবীরা মাওবাদের সমর্থনে যে কটি ফ্রন্টাল অর্গানাইজেশন চালাচ্ছেন, সেগুলির মুখোশ খুলে আসল চেহারা জনসমক্ষে আনতে হবে। ক্ষুদ্র দলীয় স্বার্থ ভুলে সকলে মিলে ভারতবর্ষের গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। এ দেশে গণতন্ত্র বাঁচলে তবেই কেবলমাত্র মানবাধিকার সুরক্ষিত থাকবে।

ড. জিষ্ণু বসুসাহা ইনস্টিউট অফ নিউক্লিয়ার ফিজিক্স এ কর্মরত। বাংলায় প্রবন্ধগল্প ও উপন্যাস লেখেন।

মতামত লেখকের ব্যক্তিগত

Comments are closed.