শুক্রবার, ডিসেম্বর ১৪

কেন হয় স্ট্রোক? জানেন ঠেকানোর কী কী মাস্টারস্ট্রোক?

চৈতালী চক্রবর্তী

চায়ের দোকানে বসে আড্ডা মারাটা একরকম শখ অনিকেতবাবুর। বছর পঞ্চাশ বয়স। অবসরের ঢের দেরি। ছুটির দিন মানেই পাড়ার চায়ের দোকানে জমাটি আদা চা সহযোগে বিস্কুট। কোনওদিন নেশা করতে তাঁকে কেউ দেখেননি। মুখে হাসি লেগেই রয়েছে। একদিন চা খেতেই খেতেই ঢলে পড়লেন বেঞ্চে। ঘামে ভেজা শরীর। হাসপাতালে নিয়ে গেলেই ডাক্তাররা জবাব দিলেন স্ট্রোক হয়েছে।

আইটি সেক্টরের ঝকঝকে তরুণ ঋষি। স্ত্রীয়ের সঙ্গে পার্টিতে গিয়ে হঠাৎই শরীরে কষ্ট। সঙ্গে মাথার মধ্যে এক অচেনা ব্যথা। জিভ আড়ষ্ট।  ঘামে ভেজা শরীরটা আচমকাই পড়ে গেল মাটিতে। চিকিৎসকরা জানালেন মিনিট খানেক আগেই মৃত্যু হয়েছে ঋষির।

স্থান-কালভেদে আলাদা হলেও দু’টি ঘটনায় একটি বিষয়ে মিল রয়েছে। সেটা হল স্ট্রোক নামক ব্যধির আচমকা আগমন। বর্তমান বিশ্বে মানুষের মৃত্যুর চতুর্থ কারণ হিসেবে স্ট্রোককে চিহ্নিত করা হয়। আচমকা এই মারণ ব্যধির হানায় দেখ দেয় নানাবিধ শারীরিক অক্ষমতা। স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া,  প্যারালিসিস বা পক্ষাঘাত হওয়া, দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া, কথা বন্ধ হয়ে যাওয়া, অঙ্গ বিকৃতির মতো শারীরিক অক্ষমতা থাবা বসায় শরীর জুড়ে। তাই আগেভাগেই সতর্ক হওয়াটা দরকার।

এই সতর্কতার দিকগুলি কী? স্ট্রোক তো আর বলে কয়ে চিঠি লিখে আসে না। ধূমকেতুর মতো আছড়ে পড়ে তছনছ করে দিয়ে যায় একটি তাজা প্রাণকে। এই সচেতনতার প্রসার বা প্রচারের জন্যই ওয়ার্ল্ড স্ট্রোক অর্গানাইজেশন বা ডব্লিউএসও ২০০৬ সালে ২৯ অক্টোবর দিনটিকে বিশ্ব স্ট্রোক দিবস হিসেবে পালন করার সিদ্ধান্ত নেয়। প্রতি বছরই নানা থিম থাকে ডব্লিউএসও-র। এ বছরে তাদের থিম, ‘সাপোর্ট ফর লাইফ আফটার স্ট্রোক।’ স্ট্রোক আক্রান্তদের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। উপযুক্ত চিকিৎসা এবং রিহ্যাবিলিটেশনের মাধ্যমে রোগীকে সুস্থ জীবনে ফিরিয়ে আনাই এ বারের থিমের বিশেষ উদ্দেশ্য। পাশাপাশি, রোগের আচমকা আগমন ঠেকাতে সতর্কতা বাড়িয়ে তোলাও দরকার। তাই এর উপসর্গগুলিও জেনে রাখাও এ বারের থিমের একটা বিশেষ দিক।

স্ট্রোকের সাধারণ উপসর্গগুলি জেনে রাখার জন্য ডব্লিউএসও-র নয়া ফর্মুলা ‘FAST’।

এফ (F for drooping Face): মুখের অভিব্যক্তির আচমকা বদল, মুখের বিকৃতি দেখলেই সাবধান হতে হবে। হাসি মিলিয়ে যাওয়া, চোখ ছোট হয়ে যাওয়া, ক্লান্তির ছাপ বা তীব্র যন্ত্রণার অভিব্যক্তি কারওর মুখে ওঠা মানেই সেটা স্ট্রোকের আগমন হতে পারে।

এ (A for numb Arms) : হাত-পায়ে হঠাৎ করে ব্যথা, দুর্বলভাব স্ট্রোকের অন্যতম প্রধান উপসর্গ। যদি দেখেন কোনও সুস্থ মানুষ সহজে তার হাত, পা স্ট্রেচ করতে পারছে না তাহলেই সাবধান হতে হবে।

এস (S for difficulty in Speech) জিভে আড়ষ্টভাব, কথা বলতে সমস্যা স্ট্রোকের আরও একটা উপসর্গ।

টি (T stands for Time) : উপরের সবকটি উপসর্গই যদি একসঙ্গে থাকে তাহলে চিকিৎসকের কাছে যাওয়াটা একান্ত জরুরি।


স্ট্রোক কেন হয়
?

মস্তিষ্কের কোনও রক্তবাহী ধমনীতে কোনও ভাবে রক্ত চলাচল বাধাপ্রাপ্ত বা বন্ধ হয়ে মস্তিষ্কের কোনও অংশের কোষে রক্ত সরবরাহের ঘাটতি দেখা দিলে ওই নির্দিষ্ট অংশটি অচল হয়ে পড়ে। একেই চিকিৎসার পরিভাষায় স্ট্রোক বলা হয়। বিশেষজ্ঞদের কথায়, স্ট্রোক নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারণা আছে মানুষের স্ট্রোক মস্তিষ্কের একটি রোগ। হৃদযন্ত্রের ধমনীতে রক্ত সরবরাহ ব্যাহত হলে হয় হার্টঅ্যাটাক। আর মস্তিষ্কের ধমনীতে রক্ত চলাচল বাধা পেলে বা ধমনী কোনও কারণে ছিঁড়ে গেলে হয় ব্রেনস্ট্রোক।

স্ট্রোক সাধারণত দু’রকমের ইসকিমিক স্ট্রোক এবং হেমারেজিক স্ট্রোক।

  • মস্তিষ্কের রক্তনালীতে কোলেস্টেরল বা লিপিড জাতীয় পদার্থ জমে গিয়ে রক্ত চলাচল বন্ধ হলে বলা হয় ইসকিমিক স্ট্রোক। এতে মস্তিষ্কের যে অংশে রক্ত চলাচল বন্ধ হয়ে যায়, সেই অংশের কোষগুলি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রক্তে চর্বি বা কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গিয়ে সাধারণত এ ধরনের স্ট্রোক হয়ে থাকে।
  • মস্তিষ্কের কোনও রক্তনালী ছিঁড়ে ওই অংশে রক্ত ছড়িয়ে যায় এবং কোষগুলিকে ক্ষতি করে। এই ধরনের স্ট্রোককে হেমারেজিক স্ট্রোক বলে। সাধারণত উচ্চ-রক্তচাপের জন্য এ ধরনের স্ট্রোক হয়। একে ‘ইনট্রা সেরিব্রাল হেমারেজ’ও বলা হয়।

কী কী কারণে বাড়তে পারে স্ট্রোকের ঝুঁকি?

• মস্তিষ্কে রক্ত চলাচল বন্ধ হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ উচ্চ রক্তচাপ। বিশেষ করে অনিয়ন্ত্রিত রক্তচাপ থাকলে স্ট্রোকের ঝুঁকি বাড়ে।

• রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়া স্ট্রোকের আরও একটা প্রধান কারণ। এলডিএল ও ভিএলডিএল কোলেস্টেরল ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রাধিক্য স্ট্রোকের সম্ভাবনা বাড়ায়।

• বিশেষজ্ঞরা বলেন, স্ট্রোকের ঝুঁকি কমাতে হলে খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনাটা সবচেয়ে আগে দরকার। জাঙ্ক ফুডকে একেবারে বলতে হবে গুডবাই। ভাজাভুজি, যে কোনও ধরনের জাঙ্ক ফুড, প্যাকেটবন্দি খাবার নৈব নৈব চ।

• মাত্রাতিরিক্ত অ্যালকোহলে আসক্তি, ধূমপান স্ট্রোকের সম্ভাবনা বাড়ায়।

• শরীরচর্চার ঘাটতি এই রোগের জন্য রাস্তা তৈরি করে দেয়। দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ, নিয়মিত শরীরচর্চার অভ্যাস না থাকা, অতিরিক্ত ওজন এবং ওবেসিটি রোগের সম্ভাবনা বাড়িয়ে দেয় কয়েকগুণ। দেখা গেছে. ১৯ শতাংশ স্ট্রোকের রোগীর সেন্ট্রাল ওবেসিটি আছে।

• ডায়াবেটিস এই রোগের আরও একটা কারণ। এর জন্য সঠিক ডায়েট এবং নিয়মিত চেক আপে থাকাটা একান্ত জরুরি।

• বিশেষজ্ঞরা বলছেন প্রতিটা রিস্ক ফ্যাক্টর নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব। তার জন্য লাইফস্টাইলের বদলটা আগে দরকার। কারণ দেখা গেছে, এক বার স্ট্রোক হলে পরের বার স্ট্রোক হওয়ার আশঙ্কা ১০%। দ্বিতীয়বার স্ট্রোক হলে এই ঝুঁকি বেড়ে যায় পাল্লা দিয়েই। তার জন্য কোলেস্টেরল, ডায়াবেটিস, উচ্চ-রক্তচাপ, মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।

সাবধান থাকবেন কী ভাবে?

• চিকিৎসকদের মতে, যেহেতু এই রোগ জানান দিয়ে আসে না, তাই অনেকেই বিপদের সেই ইঙ্গিতকে গুরুত্ব দেন না। শরীরের সামান্য সমস্যা এড়িয়ে গেলেই বড় বিপদ হতে পারে। হঠাৎ কারও হাতে বা ঘাড়ে যন্ত্রণা হতে শুরু হলে বেশিরভাগ মানুষই ভাবেন হয়তো শোওয়ার দোষে বা অন্য কোনও কারণে হচ্ছে। মাথা ব্যথা করলে ভাবেন অ্যাসিডিটি হয়েছে। এগুলি যে স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে সে কথা কিন্তু কেউ আগে থেকে ভাবেন না।

• তা ছাড়া, কোনও অঙ্গ অবশ হয়ে পড়লে বা কথা জড়িয়ে গেলে নিয়মিত ফিজিওথেরাপি, স্পিচথেরাপি করে তা ঠিক করতে হবে। দ্রুত চিকিৎসা করা না হলে স্ট্রোক থেকে প্যারালিসিস বা পক্ষাঘাত এমনকী মৃত্যুও হতে পারে।

• ওজন প্রধান সমস্যা। বাড়তে থাকা ভুঁড়িকে বাঙালি তাদের ঐতিহ্য বলে এড়িয়ে গেলে ভবিষ্যতে বিপদে পরবেন নিজেরাই। নিয়মিত শরীরচর্চা ও সুষম আহারের কোনও বিকল্প নেই।

• জল খান মেপে। খুব বেশি জল যেমন ক্ষতিকারক, তেমন খুব কম জলও কাজের কথা নয়। শারীরিক গঠন ও রোগের উপর নির্ভর করবে কতটা জল খাবেন। এই বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ নিন।

চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একটা কথা আছে, ‘প্রিভেনশন ইজ বেটার দ্যান কিওর।’ রোগ হানা দেওয়ার আগেই তার রাস্তা অবরোধ করুন। জীবনশৈলীর সামান্য পরিবর্তনই আপনাকে উপহার দিতে পারে সুস্থ ও সুন্দর জীবন।

Shares

Comments are closed.