বুধবার, মার্চ ২০

ব্রণ, বলিরেখাকে বলুন গুডবাই, ত্বকের খুঁত ঢাকতে সস্তায় সুরক্ষিত পদ্ধতি মাইক্রোনিডিলিং

দ্য ওয়াল ব্যুরো: কবি জীবনানন্দ বলেছিলেন ‘চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা, মুখে তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য।’

কবির ভাষায় মুখের কারুকার্য শ্রাবস্তীর মতো হবে কিনা জানা নেই, তবে ব্রণ, ফুসকুড়ি আর বলিরেখারা যদি অনাবশ্যক মুখের পেলব ত্বকে কারিগরি করা শুরু করে তাহলে চিন্তার বিষয়। প্রেমিকের সঙ্গে ডেটে যাওয়ার ঠিক আগে, বিয়েবাড়ি বা অফিস পার্টির আগের মুহূর্তে নাকের পাশে, ঠোঁটের কোনে হাল্কা লাল দাগ বা সাদা ফুসকুড়িরা যখন নৃত্য শুরু করে, তখন আঁতকে উঠে তাদের শাপশাপান্ত করা ছাড়া আর উপায় থাকে না। বাজার চলতি ক্রিম, লোশনে কাজ না হলে হাত দিয়েই খোঁচাখুঁচি করে সেগুলোকে বাড়িয়ে কেলেঙ্কারি করার উদাহরণও অসংখ্য। তার পর গোদের উপর বিষফোঁড়ার মতো রয়েছে, চোখের নীচের কালচে দাগ, গলার চামড়ায় একাধিক ভাঁজ।

বয়স ত্রিশ পেরোলে তো কথাই নেই। বয়সের চাকা ঘুরতে না ঘুরতেই চোখের নীচের ছোপ, বলিরেখাগুলো অনেক কষ্টেও লুকোতে পারছে না আয়নাটা। আর এ সবের চক্করে আপনার আত্মবিশ্বাসের পারদটাও ক্রমশ সিঁড়ি বেয়ে নামছে নীচের দিকে। তবে সব সমস্যারই সমাধান থাকে। গাঁটের কড়ি কম খসিয়ে মধ্য চল্লিশেও যদি কুড়ির লাবণ্য পেতে চান তাহলে একজন ভালো ডার্মাটোলজিস্টের পরামর্শ নিয়ে ত্বকে মাইক্রোনিডিলিং(Microneediling) করিয়ে নিন। সদ্য কলেজে পা দেওয়া তরুণী থেকে অফিসে কর্মরতা যুবতী— ত্বকের এই চিকিৎসার দিকে এখন ঝুঁকছেন অনেকেই। লেসার ট্রিটমেন্টের থেকে অনেকটাই সস্তা, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও বিশেষ নেই। অবশ্য চর্মরোগ বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়েই ত্বকের যে কোনও চিকিৎসা শুরু করা উচিত।

মাইক্রোনিডিলিং(Microneediling)কী?

ডার্মাটোলজিস্টদের মতে, মাইক্রোনিডিলিং আসলে ত্বকের একরকম সার্জারি। বিউটিফেকশনও বলা যায়। ডেড সেল সরিয়ে চকচকে ত্বক পেতে এই পদ্ধতি ব্যবহার করছেন ডার্মাটোলজিস্টরা। মাইক্রোনিডিল পেনের মতো দেখতে একরকমের যন্ত্র। যার মুখে লাগানো থাকে অসংখ্য সূক্ষ পিন। ব্যাটারি বা ইলেকট্রিকে চলে মাইক্রোনিডিল। গোটা ত্বকেই হালকা করে ঘোরানো হয় পিনগুলি। ফলে ত্বক সামান্য ফেটে গর্ত তৈরি হয়। ভাববেন না, তাতে খুব যন্ত্রণা হয় বা রক্ত বার হয়। একেবারেই না। মাইক্রোনিডিলিং থেরাপির মূল উদ্দেশ্য হল ত্বকের কোলাজেন তৈরি। ছোট ছোট গর্তমুখ গুলোতে আপনা থেকেই কোলাজেন তৈরি হয়। মাইক্রোনিডিলিং-এর সময় ত্বকের মরা কোষ বাইরে বেরিয়ে আসে। আবার নতুন করে ত্বকের কোষ তৈরি হয়। চামড়া টানটান দেখায়। ত্বকের ঔজ্জ্বল্যও বাড়ে।

চর্ম বিশেষজ্ঞেরা বলেন, মাইক্রোনিডিলিং শেষ হওয়ার পর অনেকেই মনে করেন ত্বকে গর্ত থেকে যাবে। তার জন্য রেটিনয়েক অ্যাসিড ব্যবহার করে চিকিৎসকরা। বিশেষ মলমও লাগানো হয়। যাতে ত্বকে কোনওরকম ছিদ্র বা স্কার না বোঝা যায়।

কী ভাবে বলিরেখার মোকাবিলা করে মাইক্রোনিডিলিং

ত্বকের স্থিতিস্থাপকতা আসে ইলাস্টিন নামক উপাদান থেকে।  ত্বকের আর্দ্রতা ধরে রাখতেও সাহায্য করে এটি। বয়স বাড়লে কোষ বিভাজনের গতি কমে যায়। পাতলা হয়ে আসতে শুরু করে ত্বকের ডারমিস স্তর। কমে যায় ইলাস্টিনের পরিমাণও। ত্বকের সবচেয়ে গভীর স্তর ঝুলে পড়ে, ফলে সেই প্রভাব পড়ে ত্বকের অন্যান্য স্তরের উপর। শুকিয়ে যায় ত্বকের তৈলগ্রন্থিও। ফলে ক্রমশ শুষ্ক হতে শুরু করে ত্বক। চামড়া কুঁচকে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কালচে ছোপও ধরতে থাকে ত্বকে। অনেকের আবার ত্বক শুষ্ক হয়ে র‍্যাশের সমস্যা দেখা দেয়।

এই কালচে এবং কুঁচকে যাওয়া ত্বককেই টানটান করে মাইক্রোনিডিলিং। চামড়াকে টানটান করে ধরে রাখতে সাহায্য করে কোলাজেন নামক একটি বিশেষ প্রোটিন। বয়স বাড়লে যেটির অভাব দেখা দেয়। মাইক্রোনিডিলিং-এর মাধ্যমে ত্বকে যে সূক্ষ ছিত্র বা গর্ত তৈরি হয় সেগুলো ভরাট করে এই কোলাজেন। ফলে ত্বকের কোষও নতুন করে তার প্রোটিন ফিরে পায়।

তবে বলিরেখার সমস্যা শুধু বয়স বাড়লেই হয় তা নয়, বর্তমান প্রজন্ম এতটাই মোবাইল, ল্যাপটপ, কম্পিউটারে মজে থাকে যে ত্বকের সমস্যা এখন ঘরে ঘরে। রাত জেগে স্মার্টফোন, ল্যাপটপে চোখ মারাত্মক ক্ষতি করে ত্বকের। ওই সব যন্ত্রের নীলচে আলো সূর্যের অতিবেগুনি রশ্মির মতোই ত্বকে কালচে ছোপ ফেলতে পারে। তাতে ত্বকের স্থিতিস্থাপক কোষ (ইলাস্টিক টিস্যু) নষ্ট হয়। অকাল বার্ধক্যের ছাপ পড়ে মুখে। ত্বককে পুনরায় জেল্লাদার করতে মাইক্রোনিডিলিং সেখানে অনেক সহজ পদ্ধতি।

পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া খুব কম মাইক্রোনিডিলিং-এর, তবে সতর্কতা আবশ্যক

মাইক্রোনিডিলিং মূল মুখের ত্বকে ব্যবহার করা হলেও, শরীরে যে কোনও অংশের স্কার বা প্রেগন্যান্সির পরবর্তী স্ট্রেচ মার্স দূর করতেও এই পদ্ধতি প্রয়োগ করা হয়। অনেকেই মাইক্রোনিডিলিং-এর পর ত্বকে হালকা ব্যথা অনুভব করেন। সঠিক ভাবে প্রয়োগ না করলে ত্বকে লালচে দাগ বা র‍্যাশ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে।

সবসময় ভালো জায়গা থেকে, বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়েই মাইক্রোনিডিলিং করা উচিত। কারণ, অনেক জায়গাতেই হাইজিন না মেনে এই পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। পিনের সূক্ষ মুখে কোষ জমে থাকে। যা পরবর্তীতে যার উপর প্রয়োগ করা হবে তার ত্বকে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

মাইক্রোনিডিলিং-এর পর ত্বকের সঠিক পরিচর্চা দরকার। দিনের আলোয় বার হলে সান প্রোটেকশন লোশন অবশ্যই দরকার। কোনও রকম মেকআপ ব্যবহারের আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া দরকার।

প্রেগন্যান্সির সময় বা ত্বকের কোনও রোগ বা সংক্রমণ থাকলে মাইক্রোনিডিলিং করানোর আগে ডার্মাটোলডিস্টের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।

সাধারণত ৩০ মিনিট ধরে তিন থেকে চারটে সিটিংএ মাইক্রোনিডিলিং করা হয়। খরচও লেসার ট্রিটমেন্টের থেকে অনেক কম।

Shares

Comments are closed.