শনিবার, নভেম্বর ১৬

ইন্দো-ওয়েস্টার্ন স্থাপত্যের সঙ্গে মিশে আছে এক অন্য ইতিহাস,যোধপুরের এই উমেদ ভবনেই বসছে প্রিয়ঙ্কা-নিকের বিয়ের আসর

চৈতালী চক্রবর্তী

বিদেশি বরের দেশি বিয়ে। ঠিকই ধরেছেন ‘দেশি গার্ল’ প্রিয়ঙ্কা চোপড়ার বিয়ে সামনেই। পাত্র মার্কিন পপ তারকা নিক জোনাস নিউ ইয়র্ক থেকে পত্রপাঠ ভারতে। বিয়ের দিন যদিও ঘোষণা হয়নি, তবে বলি মহলে গুঞ্জন পাঁজি মিলিয়ে আগামী ২৯ নভেম্বর থেকে ২ ডিসেম্বরের মধ্যেই সেই শুভ দিন। মেহেন্দি-সঙ্গীত-গায়ে হলুদ নিয়ে একেবারে ঠাসা অনুষ্ঠান। গ্র্যান্ড ওয়েডিংয়ের অতিথি তালিকাও দীর্ঘ। বলি থেকে হলি, নামী তারকার ভিড় সেখানে। তবে, পাত্রপাত্রী দু’জনেই যেহেতু দেশের বাইরেই রাজ্যপাঠ সামলাচ্ছেন, তাই বিয়ের জন্য আর দেশের চৌহদ্দির বাইরে বিয়ে থুড়ি ‘ডেস্টিনেশন ওয়েডিং’ বেছে নেননি। যোধপুরের ঐতিহ্যশালী উমেদ ভবনেই বসছে বিয়ের আসর।

সদ্য দিল্লিতে এসে পৌঁছেছেন নিক। সেখানেই সোনালি বসুর ছবি ‘দ্য স্কাই ইজ পিঙ্ক’-এর শ্যুটিং করছেন প্রিয়ঙ্কা। ২৯ নভেম্বর হতে পারে মেহেন্দি ও সঙ্গীতের অনুষ্ঠান। পরের দিন অর্থাৎ ৩০ নভেম্বর হবে ককটেল পার্টি। তবে সেটা কোথায় হবে, তা নিয়ে এখনও পর্যন্ত কিছু জানা যায়নি। প্রিয়ঙ্কার গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান হবে ১ ডিসেম্বর। ভারতীয় মতে বিয়ে ২ ডিসেম্বর। রিসেপশন পার্টি বা খ্রিষ্টান মতে বিয়ের দিন এখনও প্রকাশ্যে আনেনি প্রিয়ঙ্কা ও নিকের পরিবার।

৩৬ বছরের প্রিয়ঙ্কার সঙ্গে ২৭ বছরের নিকের প্রেম নিয়ে জলঘোলা তো কিছু কম হয়নি, তাঁদের ডেট থেকে হাত ধরে ক্যামেরার সামনে পোজ, রসায়নের মুচমুচে তাজা খবর সবসময়েই থেকেছে শিরোনামে। এখন সবচেয়ে আলোচ্য বিষয় হল তারকা জুটির বিয়ের ভেন্যু। দীপিকা-রণবীর বেছেছিলেন আল্পস পর্বতের কোলে লেক কোমোর ধার ঘেঁষে ইতালির রোম্যান্টিক ওয়েডিং স্পট ‘ভিলা দেল বলবিয়েনেল্লো’, রূপে-গুণে যার কোনও কমতিই নেই। তবে বিয়ের জন্য ‘দেশি গার্ল’ বেছেছেন দেশের মাটিকেই। প্রিয়ঙ্কা ও তাঁর পরিবারের অতি পছন্দের জায়গা রাজস্থানের যোধপুরের উমেদ ভবন প্যালেস। নামেই রাজকীয়, অন্দরে প্রবেশ করলে ইতিহাসের সঙ্গে স্থাপত্যের এক মনকাড়া যুগলবন্দী। সেই সঙ্গে বিলাসব্যসনের অফুরন্ত ভাণ্ডার। পাহাড়ে ঘেরা নীল-সবুজ লেক কোমোর নৈসর্গিক শোভা না থাকুক, মরু শহরে রাজপুতদের বীরত্বের ইতিহাস নিয়ে মাথা তুলে স্বগর্বে অতিথিদের আপ্যায়ণ করে উমেদ ভবন।

যোধপুরের মহারাজা উমেদ সিংহের নামেই এই প্রাসাদের নাম উমেদ ভবন প্যালেস। বর্তমানে এই প্রাসাদ তাজ হোটেলের মালিকানাধীন। উমেদ সিংহের নাতি গজ সিংহ এই প্রাসাদের সত্ত্ব তাজ হোটেলকে দিয়ে দেন। প্রাসাদের অন্দরকেই পাঁচ তারা হোটেলের রূপ দিয়ে পর্যটক আকর্ষণের কেন্দ্র করে তুলেছেন তাজ কর্তৃপক্ষ। এটি বিশ্বের ষষ্ঠ বৃহত্তম ব্যক্তি মালিকানাধীন প্রাসাদ।

যোধপুর শহরের প্রাণকেন্দ্র থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে চিত্তোর হিলসের উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে এই প্রাসাদ। এ বার ঢুঁ মারা যাক অন্দরমহলে। রাজার প্রাসাদ রাজকীয় চাকচিক্যে ভরপুর। ২৬ একর জমির উপর এই প্রাসাদের ১৫ একরেই বাগান। সবুজের গালিচার মাঝখানে সোনালী-হলুদ স্যান্ডস্টোনের প্রাসাদের অন্দরসজ্জায় রয়েছে মারকানা মার্বেল-বার্মিজ টিক উডের কারুকাজ। প্রাসাদের মেঝে ব্ল্যাক গ্রানাইট পাথরের ও লাউঞ্জ সাজানো হয়েছে পিঙ্ক স্যান্ডস্টোন দিয়ে। প্রাসাদের অন্দরে রয়েছে ৩৪৭টি ঘর এবং একটি বিশাল ব্যাঙ্কোয়েট হল। এতে প্রায় ৩০০ অতিথির আপ্যায়নের জায়গা। তা ছাড়া রয়েছে দুর্বার হল, বিশাল ডাইনিং রুম, বল রুম, লাইব্রেরি, সুইমিং পুল ও স্পা। বিলিয়ার্ড রুম, চারটে টেনিস কোর্ট ছাড়াও রয়েছে দু’টো মার্বেল সজ্জিত স্কোয়াশ কোর্ট। প্রাসাদের আনাচ কানাচে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য স্থাপত্য-ভাস্কর্যের মিশেল। প্যারিসের প্রখ্যাত Beaux-Art  এর প্রভাব যেমন দেখা গেছে, তেমনি প্রাসাদের অন্দরসজ্জায় কাম্বোডিয়ার আঙ্কোরভাট মন্দিরের ভাস্কর্যের ছাপও সুস্পষ্ট।

 উমেদ ভবন প্যালেস তৈরি হয়েছিল যোধপুরের রাথোর সাম্রাজ্যের সময়। এই প্রাসাদ শুধুমাত্র রাজাদের ভোগবিলাসের জন্য তৈরি হয়নি, বরং এর পিছনে রয়েছে এক অন্য ইতিহাস। রাথোর বংশের প্রভাবশালী রাজা প্রতাপ সিংহের ৫০ বছর রাজত্বের শেষে গোটা এলাকায় ভয়াবহ খরা দেখা দেয়। খাদ্যাভাব ও জলাভাবে মানুষ মরতে শুরু করে। রাজ্যের পরিস্থিতি ভয়ানক আকার নেয়। রাজসিংহাসনে সে সময় রাথোর বংশের ৩৭ তম রাজা উমেদ সিংহ। প্রজারা তাঁর কাছে গিয়ে প্রাণভিক্ষা করে। প্রজাদের অন্নসংস্থানের জন্য তিনি সে সময় এই প্রাসাদের নির্মাণ শুরু করেন। স্থপতি হেনরি ভন ল্যাঞ্চেস্টারের তত্ত্বাবধানে ১৯২৯ সাল থেকে শুরু হয় নির্মাণ কাজ। ১৪ বছর ধরে একটু একটু করে গড়ে ওঠে প্রাসাদ। ২০০০-৩০০০ শ্রমিকের নিরলস পরিশ্রমে নির্মাণ শেষ হয় ১৯৪৩ সালে। প্রাসাদটি তৈরি করতে খরচ পড়ে প্রায় এক কোটি টাকা।

এক ঝলকে উমেদ ভবনের অন্দর থেকে বাহির

Gal10
Gal11
gal6
Gal9
gal1
gal8
gal7
gal5
gal2
gal3
Gal4
Gal12

তাজ গ্রুপ এই প্রাসাদের মালিকানা নেওয়ার পর এখানে ঝাঁ চকচকে ৬৪টি স্যুট তৈরি করে। রাজকীয় ধাঁচের এই স্যুটগুলি ভাগ করা হয়েছে কয়েকটি ভাগে যেমন, মহারানি স্যুট, মহারাজা স্যুট, রয়্যাল স্যুট, রেগাল স্যুট ও ডিলাক্স রুম। অতিথিদের মনোরঞ্জনের জন্য রয়েছে স্পা ও যোগা স্টুডিও। এক রাতের জন্য একটি স্যুট ভাড়া করতে খরচ হবে ন্যূনতম ৪৭ হাজার টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত। স্যুটের সৌন্দর্য এবং চাকচিক্যের অনুপাতে ভাড়াও বাড়বে সেটা বলাই বাহুল্য।

দেশ-বিদেশের অনেক নামী দামি ব্যক্তিত্বেরই পছন্দের জায়গা উমেদ ভবন প্যালেস। ২০০৭ সালে হলিউড স্টার লিজ হার্লের সঙ্গে অরুণ নায়ারের বিয়ে হয়েছিল এই প্রাসাদে। ২০১৩ সালে মুকেশ-পত্নী নীতা অম্বানীর ৫০তম জন্মদিনও আয়োজিত হয়েছিল এই প্রাসাদে। দু’দিনের অনুষ্ঠানে খরচ হয়েছিল ২২০ কোটি টাকা।

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন 

Comments are closed.