বুধবার, মার্চ ২০

পুরুষদের চেয়েও মহিলাদের হৃদরোগের ঝুঁকি বেশি! কী ভাবে সামলে রাখবেন হৃদয়কে

চৈতালী চক্রবর্তী

কথায় বলে নারী চরিত্র নাকি বেজায় জটিল। নারীর মনের কথা বোধকরি ভগবানও টের পান না। তা একরকম সত্যি। মনের মধ্যে সব কিছুকেই পুষে রাখা নারীদের জন্মগত অভ্যাস। তবে কথা চেপে রাখা একরকম, আবার রোগ গোপন করে রাখাটা অন্যরকম। হৃদয়ের অন্দরে ভাবনার জাল বিছাতে বিছাতে কখন যে চুপিসাড়ে হৃদরোগ বাসা বাঁধে সেটা টেরও পান না মেয়েরা। চেতনা ফেরে অনেক পরে যখন প্রথম ধাক্কাটা আসে। হার্ট অ্যাটাক মূলত পুরুষদেরই হয়, যুগ যুগ ধরে চলে আসে এই ভ্রান্ত ধারণাটাকে মিথ্যা প্রমাণ করেছেন গবেষকরা।

সমীক্ষা বলছে, ভারতে প্রায় ৫০ শতাংশ মহিলারই শরীরে কোলেস্টেরলের মাত্রা স্বাভাবিক নয়, এই বর্ধিত কোলেস্টেরলই হৃদরোগের আগাম বার্তা দেয়। অনেকেরই ধারণা, বিশেষত মহিলাদের যে স্রেফ সুষ্ঠু ডায়েট আর শরীরচর্চা দিয়েই এই সমস্যাকে দূর করা যায়। আদপে বিষয়টা তেমন নয়। আসলে আমাদের নানা ভুল সিদ্ধান্ত ও অজ্ঞতা এই অসুখের মূল কারণ। হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, পুরুষের হৃদ্‌গোলযোগ ধরা পড়লে, তার চিকিৎসা যতটা ফলপ্রসূ হয়, মেয়েদের ক্ষেত্রে তা ততটা কাজে দেয় না। কারণ, রোগ ধরা পড়ে অনেক দেরিতে। যার প্রধান কারণ মেয়েদের নিজের শরীরের প্রতি সীমাহীন অবহেলা এবং অসুখ লুকিয়ে যাওয়ার প্রবণতা।

শুধু ভারতে নয়, শারীরিক সচেতনতার অভাবে মেয়েদের হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে গোটা বিশ্বেই। ইংল্যান্ড ও ওয়েলসে গত দশ বছরে হার্টের অসুখে মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৮,২০০ জন মহিলার। ইংল্যান্ডের লিডস বিশ্ববিদ্যালয়ের হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ ক্রিস গেল বলেছেন, ‘‘কিছু ভুল ধারণা ও ভ্রান্ত বিশ্বাসের কারণে মেয়েদের মধ্যে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ছে। সামান্য বুকে যন্ত্রণাও অনেক সময় কার্ডিওভাসকুলার ডিজিজের (CVD)কারণ হতে পারে। সঠিক সময় চিকিৎসকের পরামর্শ না নেওয়ার কারণে বিপদে পড়ছেন মহিলারা।’’

ভারতে ৫০ শতাংশ মহিলার শরীরে থাবা বসায় এই সাইলেন্ট কিলার!

হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের সমীক্ষায় ধরা পড়েছে, ভারতে পঞ্চাশ শতাংশেরও বেশি মহিলা হার্টের রোগে ভোগেন। তার মধ্যে ৪৮ শতাংশেরই বয়স ৪৫-৬০ বছরের মধ্যে। পরীক্ষা করে দেখা গেছে, এই বয়সের প্রায় সব মহিলারই লিপিড প্রোফাইলের মাত্রা অস্বাভাবিক। লো ডেনসিটি প্রোটিন (LDL), হাই ডেনসিটি প্রোটিন (HDL) ও ট্রাইগ্লিসারাইড (Triglyceride) পরীক্ষায় দেখা গেছে, উত্তর ভারতের প্রায় ৩৩.১১ শতাংশ ও পূর্ব ভারতের প্রায় ৩৫.৬৭ শতাংশ মহিলার ট্রাইগ্লিসারাইড লেভেল খুব বেশি, আবার দক্ষিণ ভারতের ৩৪.১৫ শতাংশ মহিলার ক্ষেত্রে দেখা গেছে তাদের LDL ও ট্রাইগ্লিসারাইডের মাত্রা স্বাভাবিকের থেকে বেশি।

ব্রিটেনে প্রতি বছর ৬৯,০০০ জন মহিলা হার্টের রোগে আক্রান্ত হন। ২০০৩ সাল থেকে ২০১৩ সালের মধ্যে সেই সংখ্যাটা ছিল ৬,৯০,০০০। ২০১৬ সালে মার্কিন মুলুকে ২৮.১ মিলিয়ন প্রাপ্তবয়স্ক মহিলা ও পুরুষ হৃদরোগের শিকার হন।

কী কী লক্ষণ দেখে বুঝবেন হানা দিতে পারে হার্ট অ্যাটাক

  • হৃদরোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, গড়পড়তা হার্ট অ্যাটাকের রোগীদের মধ্যে ৩০ শতাংশেরই প্রথম বার অ্যাটাক হয়। তাই অভিজ্ঞতা না থাকায় লক্ষণ টের পান না তাঁরা। ডায়াবিটিকরাও অনেক সময় বুঝতে পারেন না হার্ট অ্যাটাকের লক্ষণ।
  • হার্ট অ্যাটাকের আগে বুকে ব্যথার চেয়েও চাপ বেশি অনুভব করেন মানুষ। যদি দেখা যায়, বুক, ঘাড়, চোয়াল বা তলপেটের কোনও অংশে চাপ বেশি হচ্ছে তৎক্ষণাৎ সতর্ক হতে হবে। শুধু বুক নয়, বাম ও ডান হাতেও একটানা ব্যথা হতে থাকলে চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
  • হাঁটতে গেলে হাঁপ লাগছে, দাঁড়িয়ে বা বসে পড়লে শ্বাসকষ্ট চলে যাচ্ছে মানেও বিপদ ধারেকাছেই ওঁত পেতে আছে।
  • ব্যথার সঙ্গে ঘাম হওয়াটাও হার্ট অ্যাটাকের আগাম লক্ষণ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হৃদপিণ্ডের উপর চাপ বেশি পড়লে রক্ত সঞ্চালনের জন্য অনেকটা বেশি পরিশ্রম করতে হয়, ফলে ঘাম তৈরি হয়। ব্যথা, চাপের সঙ্গে ঘাম হলে সঙ্গে সঙ্গে ঘাড়ে, মাথায় জল দিতে হবে।

কেন বাড়ছে মহিলাদের হৃদরোগের ঝুঁকি?

সবচেয়ে বড় কারণ স্ট্রেস ও মানসিক অবসাদ। তার উপর সেডেন্টারি লাইফস্টাইলের ডায়েট। এখনকার মেয়েদের ঘর এবং অফিস দু’টোই সামলাতে হয়। শিফট-এর কাজ হলে ঝক্কি অনেক। কম ঘুম এবং খিদে মেটাতে হোটেল-রেস্তোরাঁর কেক, পেস্ট্রি, রোল, চাউমিন, বিরিয়ানি। ফলে কোলেস্টেরল বাড়তে থাকে চড়চড় করে।

কর্মসূত্রে অনেক মহিলাই পরিবারের থেকে দূরে থাকেন। ফলে সারাদিনের অফিসের স্ট্রেস ও বাড়ি ফিরে একাকীত্ব গ্রাস করে অনেককেই। সেটাও হৃদরোগের অন্যতম বড় কারণ। চিকিৎসকদের মতে, ইদানীং দেখা গেছে ৩০ বছর বয়সি মেয়েদেরও অ্যাঞ্জিওপ্লাস্টি করতে হয়েছে।

মেনোপজের পরে হার্ট অ্যাটাক দেখা দিচ্ছে এমন মহিলার সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে। কারণ শরীরের প্রতি অবহেলা। মেনোপজের পর মহিলাদের শরীরের প্রতি প্রয়োজনের চেয়ে অনেক বেশি যত্নশীল হতে হয়, সে ক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়ে নিয়মিত চেকআপ ও ডায়েট মেনে চলা উচিত।

হৃদরোগের আরও একটি বড় কারণ নেশার প্রকোপ। রাত জেগে নাইটক্লাব, সেই সঙ্গে সিগারেটে সুখটান রীতিমতো নিমন্ত্রণ করে ডেকে আনছে হার্টের রোগকে। অ্যালকোহলের নেশাও সর্বনাশা।

যাঁরা টেনশন বেশি করেন, যে কোনও রোগই তাঁদের আগে ধরে। হার্টের অসুখ তো বটেই।

কী ভাবে দূরে রাখবেন এই সাইলেন্ট কিলারকে?

সবচেয়ে আগে স্ট্রেস কমানোর চেষ্টা করুন। তার জন্য, যোগাভ্যাস, প্রাণায়াম, আত্মীয়-বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটানো, এমনকি পার্লারে একটু রিল্যাক্স করে আসাও অনেক সময়ে কাজে দেয়।

রাতে পর্যাপ্ত ঘুম দরকার। মোবাইল, ল্যাপটপ বা যে কোনও ধরনের গ্যাজেট থেকে যতটা সম্ভব দূরে থাকার চেষ্টা করুন। ঘুমোতে যাওয়ার আগে কোনও ইলেকট্রনিক গুডসে চোখ রাখা একেবারেই চলবে না।

নিয়মিত শরীরচর্চার কোনও বিকল্প নেই। জিমে যাওয়ার সময় না পেলে, হেঁটে ঘাম ঝরানোর চেষ্টা করুন। সাঁতার কিন্তু হৃদয় সুস্থ রাখতে খুব ভাল ব্যায়াম।

একাকীত্ব কাটাতে কোনও সৃজনশীল কাজ করুন। অবসাদকে ধারে কাছে ঘেঁষতে দেবেন না।

মন মানতে না চাইলেও রোজের খাদ্যাভ্যাসে লাগাম টানুন। তেল-ঘি-মশলাদার খাবারকে বলুন গুডবাই। জাঙ্ক ফুড বা বাজারচলতি যে কোনও প্যাকেটজাত খাবার, রেডমিট এড়িয়ে চলুন। বাঙালির খাওয়া মানেই ভাত-রুটি দিয়ে পেট ভরানো— এমন স্বভাব বদলে প্রোটিন বেশি, ফলমূল-সব্জি ঠাসা একটা ডায়েটে অভ্যস্ত হয়ে উঠুন। চিনিও এড়িয়ে চলুন যতটা সম্ভব। হার্টকে সুরক্ষিত রাখতে এর চেয়ে ভাল আর কিছু নেই।

হার্টে সমস্যা না থাকলেও তিন মাসে একবার চেক আপ করান। দেখে নিন কোথাও কোনও গোলযোগ আসছে কি না। যাঁদের হার্টের অসুখ আছে তাঁরা চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার দিন অকারণে মিস করবেন না।

সুস্থ যৌনজীবন হার্ট ভাল রাখে। এতে শরীর থেকে প্রচুর হরমোন নিঃসৃত হয়, ফলে মানসিক চাপ কমে। হার্টকে তাজা রাখে।

তবে, সব তথ্যই বেকার যদি না মহিলারা নিজেদের শরীরের দিকে নজর দেন। একহাতে সব কাজ করার ‘দশভূজা’ ট্যাগটাকে যদি দৈনন্দিন জীবনে বাধ্যতামূলক করে ফেলেন, তাহলে শুধু হার্ট কেন, শরীরে যে কোনও কলকব্জাই বিকল হতে শুরু করবে। অতএব মেয়েরা সচেতন হন। ‘ওরা কোনও Law মানে না, তাই ওদের নাম ললনা’— এই ধারণাটাকে মিথ্যে প্রমাণ করার দিন এসে গেছে।

Shares

Comments are closed.