চোখে আমার রঙের নেশা! আলোয় ঝলমল ‘নটিং হিল কার্নিভাল’ যেন সাত সুরে বাঁধা

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    দিলীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

    খুব সুন্দর একটা সকাল। ক্যামেরা গুছিয়ে বেরবো বেরবো করছি। একটা মিষ্টি সুরেলা গলা ভেসে এল। সেই সঙ্গে আরও কিছু পুরুষালি কণ্ঠের হইহুল্লোড়ের শব্দ। হাল্কা ফুলের সুবাসও যেন মনকে আচ্ছাদিত করছে। মনে পড়ছে, দুর্গা পুজোর ঠিক আগে আগে পাড়ায় সেই জোর কদমে প্রস্তুতির কথা।সকালে ঘুম থেকে উঠেই কানে আসত হই-হুল্লোড়, গান বাজনার শব্দ। সব মিলিয়ে মন মাতাল করা পরিবেশ। বাড়ি থেকে বহু দূরে এসে আজ অনেক বছর বাদে সেই নস্ট্যালজিয়ায় ভেসে যেতে লাগলাম। সুরেলা গলার মূর্ছণা আমার চেতনার অদূরে সেই হারানো দিনের স্মৃতিকে ফের উস্কে দিতে লাগল।

    কোথাও যেন একটা ভেঁপু বেজে উঠল, আর আমার চিন্তার জালেও ছেদ পড়ল। যাই হোক, ভাবনার জগত থেকে বেরিয়ে দ্রুত পায়ে প্যাসেজ পেরিয়ে রাস্তায় এসে পড়লাম।তাই তো! বিদ্যুতের মতো মাথায় খেলে গেল, আজ তো লন্ডনে উৎসবের দিন! ‘নটিং হিল কার্নিভাল’ শুরু হয়েছে। তারই উদ্যোগ-আয়োজনে সকাল থেকেই উৎসব মুখর হয়ে উঠেছে লন্ডনের রাস্তা। অগস্টের রবিবার ও সোমবার ব্যাঙ্ক হলিডে। তাই এই দুটি দিন বেছে নেওয়া হয় উৎসবের জন্য। আজ, রবিবার ২৬ অগস্ট ভোর ৪টে থেকে শুরু হয়ে গেছে কার্নিভাল। শেষ হবে আগামিকাল সোমবার বেলা ৩টের সময়।

    এক দল ছেলেমেয়েকে দেখলাম নানা রঙের পোশাক পড়ে দৌড়োদৌড়ি করছে। পড়াশোনার জন্য আমার মেয়ে থাকে লন্ডনে। ছুটিতে তাই মেয়ের কাছেই এসেছিলাম। হোস্টেলের ভিতরেই সুন্দর থাকার ব্যবস্থা। গতকালই এই ছেলেমেয়েগুলোকে দেখেছিলাম হোস্টেলের লনে। প্রত্যেকেই ক্যারিবিয়ান। আজ ওদের দেখে চেনাই যাচ্ছে না। রঙ বেরঙের পোশাকে আজ কেউ পরী, কেউ প্রজাপতি, কেউ আবার জন্মদিনের মতো সাজে সেজেছে। আমাকে দেখে হাল্কা অভিবাদন জানাল। মনটা ভরে গেল।

    এই কার্নিভালের কথা আগে শুনেছিলাম, পড়েও ছিলাম। আজ সামনে থেকে দেখার অভিজ্ঞতা হল। আমি পেশায় একজন ফটোগ্রাফার। শুধু পেশা বললে ভুল হবে, আমার নেশাও ক্যামেরার সঙ্গেই বাঁধা। চোখ আর মনকে যা আনন্দ দেয়, তাকে ক্যামেরার লেন্সে ফুটিয়ে তোলার মধ্যে এক অপার্থিব শান্তি আছে। প্রতি মুহূর্তে এই উত্তেজনা আমার শিরায়, উপশিরায় অনুভব করি। কাজেই কার্নিভালের টান হোক বা ছবি তোলার কৌতুহল, চুম্বকের মতো ওই ছেলেমেয়েগুলোকে অনুসরণ করতে লাগলাম। ওরা চলছিল আগে আগে। কখনও হেঁটে, কখনও দৌড়ে, নাচতে নাচতে, গাইতে গাইতে। আমি চলছিলাম ওদের সঙ্গেই, কখনও ওদের পাশে, তাল রাখতে না পারলে ওদের পিছনে। হাঁটতে হাঁটতে যেন মিশে যাচ্ছিলাম ওদের আনন্দের সঙ্গে। ওদের খুশির প্রতিটা মুহূর্ত ভাগ করে নিতে নিতে কখন যেন ওদেরই একজন হয়ে উঠলাম জানতেও পারিনি।

    অনেক দূর হেঁটে ফেলেছি। সামান্য ক্লান্ত লাগছে। আশ্চর্য, ছেলেমেয়েগুলোর কিন্তু ক্লান্তি নেই। একই ভাবে নেচে চলেছে। টিউব ট্রেনে চেপে বসলাম। গন্তব্য নটিং হিল স্ট্রিট। কার্নিভালের মূল সুর বাঁধা রয়েছে ওখানেই। ট্রেনেও কী উন্মাদনা ছেলেমেয়েগুলোর। বয়স ২০-৩০। মদ্যপান করে চলেছে সমানে। আমাকে ধরিয়েছিল একটা রামের বোতল, তবে না করে দিয়েছি। আর মিনিট খানেকের মধ্যে পৌঁছে যাব গন্তব্যে।

    ট্রেন থেকে নেমেও অনেকটা হাঁটা। উৎসব প্রাঙ্গণে এসে চোখ ধাঁধিয়ে গেল। চারদিকে যেন রামধনুর রঙের ছটা। প্রকৃতির যত রঙ আছে সব যেন কার্নিভালের পোশাকে ঢেউ তুলেছে। গান, রকমারি বাদ্যযন্ত্র, খাবার-দাবারে সে এক এলাহি আয়োজন। বড় বড় গাড়ির উপর মঞ্চ সাজানো হয়েছে। নানা রকম বাদ্যযন্ত্রের মেলা। প্রায় ৩৮ রকমের সাউন্ড সিস্টেম। যতটা বুঝলাম সুরের সবটাই ওদের ঐতিহ্যের সঙ্গে খাপ খায়। Reggae, Meringue, Calypso, Rumba, Zouk মিউজিকের তালে তালে, ছন্দে ছন্দে নেচে চলেছেন অ্যাফ্রো-ক্যারিবিয়ান গোষ্ঠীর তরুণ-তরুণীরা। তামাটে রঙা সুন্দরীদের সঙ্গে আনন্দের গানে পা মেলাচ্ছেন সাদা চামড়ার মেমসাহেবরাও। ইউরোপ, আমেরিকা, চিন, আফ্রিকার নানা প্রান্ত থেকে মানুষজন জড়ো হয়েছেন উৎসবে। সাম্বার তালে তালে চলছে লম্বা প্যারেড। খানা-পিনারও এলাহি আয়োজন। সুস্বাদু স্ট্রিট ফুডের গন্ধে চারদিক ভরপুর। একটা বড় গাড়ির সামনে গিয়ে দেখলাম হরেক রকমের ডিশ রয়েছে। ক্যারিবিয়ান পছন্দের পাশাপাশি অন্যান্য দেশের কুইসিনও থরে থরে সাজানো। তবে, জার্ক চিকেন (জামাইকান চিকেনের একটা ডিশ), ক্যালালু এবং আফ্রিকার ফেভারিট গোট স্টুয়ের চাহিদা একটু বেশি। অ্যালকোহলের অবারিত দ্বার। প্রায় প্রত্যেকেই মদ্যপান করছেন।

    এই উৎসব এক সময় ছিল শুধু কালো মানুষদের জন্যই। বর্ণবিদ্বেষের শিকার নেটিভদের সংগ্রামের ফসল এই কার্নিভাল। ব্যাপারটা তাহলে একটু খুলেই বলি, এই কার্নিভালের জন্ম ১৯৬০-এর মাঝামাঝি। ব্রিটিশ সংস্কৃতি অবশ্য কার্নিভালের সঙ্গে পূর্ব পরিচিত।‘বার্থোলোমেও ফেয়ার’ এবং ‘সাউথওয়ার্ক ফেয়ার’  এক সময় খুব জনপ্রিয় হয়েছিল। তবে, নানা অসামাজিক কাজকর্মের জন্য পরে তাতে নিষেধাজ্ঞা জারি হয়ে যায়। নটিং হিল কার্নিভাল তার পরের স্টেজ বলা যায়।

    দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শেষে আফ্রিকান এবং ক্যারিবিয়ানরা হু হু করে ঢুকতে থাকে ব্রিটেনে। এই অনুপ্রবেশকারীদের কিছুতেই মেনে নিতে পারে না ব্রিটিশরা। ফলে শুরু হয় কালো হটাও অভিযান। ‘কিপ ব্রিটেন হোয়াইট’ স্লোগান তুলে অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের ডাক দেয় ব্রিটিশরা। নটিং হিল স্ট্রিটের উপর নির্মম ভাবে হত্যা করা হয় অসংখ্য অনুপ্রবেশকারীকে। প্রায় দু’সপ্তাহ ধরে চলে এই সংঘর্ষ। ১০৮ জন ব্রিটিশের বিরুদ্ধে চার্জ গঠন করা হয়। এই সংঘর্ষেরই প্রতিবাদ জানাতে শুরু হয় এই কার্নিভাল।

    আগে এর নাম ছিল ‘ক্যারিবিয়ান কার্নিভাল’। সেন্ট প্যানক্রিয়াস টাউন হলে প্রথম বর্ণবিদ্বেষের শিকার ব্রিটেনে অনুপ্রবেশকারী ক্যারিবিয়ানরা এই কার্নিভালের মাধ্যমে তাদের প্রতিবাদ জানাতে শুরু করে। ত্রিনিদাদের বাসিন্দা এক মহিলা সাংবাদিক ক্লডিয়া জোনস এই কার্নিভালের মূল উদ্যোক্তা। ‘দ্য ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান গ্যাজেট’ নামে তাঁর সংবাদপত্রে ফলাও করে এই কার্নিভাল এবং এর আড়ালে প্রতিবাদের কথা প্রকাশ্যে আনেন তিনি। ক্লডিয়াকে বলা হয় ‘দ্য মাদার অব নটিং হিল কার্নিভাল’। তখন অবশ্য এই উৎসব চার দেওয়ালের মধ্যেই বাঁধা ছিল।

    প্রথম একে প্রকাশ্যে রাস্তায় উদযাপন করা শুরু করেন রহনে ল্যাসলেট নামে এক মহিলা। তিনি ছিলেন একাধারে স্থানীয় মহিলা সমিতির সক্রিয় কর্মী, অন্যদিকে লন্ডন ফ্রি স্কুলের প্রেসিডেন্ট। নটিং হিল স্ট্রিটের উপর তিনিই এই কার্নিভালকে অন্য মাত্রা দেন। সেটা ১৯৬৬ সালে। তার পর থেকেই এই কার্নিভাল জনপ্রিয় হতে শুরু করে। শুধু ক্যারিবিয়ান নয়, বিশ্বের নানা দেশের মানুষ যোগ দিতে শুরু করেন এই উৎসবে। একদা বর্ণবিদ্বেষের প্রতিবাদে যে উৎসব শুরু হয়েছিল, সেটা ধীরে ধীরে হয়ে দাঁড়ায় মিলনের উৎসব। জাতি-ধর্ম-বর্ণ মিলে গিয়ে সাত সুর ও সাত রঙে মিশে যায় আনন্দের উৎসব।

    ‘এক্সকিউজ মি প্লিজ’…আমার পিছনে কখন যে এক তরুণ এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করিনি। লম্বা, ছিপছিপে গড়ন। একমুখ হাসি নিয়ে পোজ দিচ্ছে। আমার হাতে ক্যামেরাটা দেখেই হয়তো। তার সঙ্গে জুটে গেল কয়েকজন তরুণীও। নানা রঙের ঝলমলে পোশাকে এক ঝাঁক প্রজাপতি যেন। ছবি তোলার ফাঁকেই লক্ষ্য করলাম, লাইভ মিউজিক শুরু হয়ে গিয়েছে। আগামিকাল এখানেই হবে বিউটি কনটেস্ট। সঙ্গে প্যারেড। দুপুরের মধ্যেই সব গুছিয়ে ফের এরা যে যার জায়গায় ফিরে যাবে।

    সন্ধে হয়ে আসছে। এ বার ফিরতে হবে। আকাশও কিঞ্চিত মেঘলা। মরা আলোয় ফের একবার পিছনে ফিরে তাকালাম। ভিড় ধীরে ধীরে পাতলা হচ্ছে। নানা বাদ্যযন্ত্রের সুর এখনও ভেসে আসছে। আমাদের গ্রামবাংলায় মা-বউদের তুলসী তলায় শাঁখ বাজানোর কথা মনে পড়ল। গোধূলির মিইয়ে যাওয়া আলোয় সপ্তসুরে যখন চারদিক থেকে শাঁখের আওয়াজ ভেসে আসে কেমন যেন একটা উৎসবের মতোই লাগে। এই নটিং হিলেও একদিন অনেক মায়েরা তাঁদের সন্তানের জন্য চোখের জল ফেলেছিলেন। উৎসবের মাধ্যমে বোঝাতে চেয়েছিলেন যন্ত্রণার কথা। চোখের জল গান হয়ে না বলা কথা বাইরে এনেছিল। এখন এই উৎসব আধুনিক। প্রাচুর্যে ভরপুর।

    তাও কোথাও যেন সুদূর লন্ডন আর আমাদের গ্রামবাংলা মিলেমিশে এক হয়ে গেল। শেষবার ক্যামেরার লেন্সে চোখ রাখলাম..ক্লিক..হাজার ওয়াটের আলো জ্বলে উঠল।

    (লেখক একজন জনপ্রিয় চিত্রগ্রাহক। গোয়া থেকে গুজরাত, কাবুল থেকে কার্গিল—দেশের গন্ডি ছাড়িয়ে বিদেশেও তাঁর লেন্স কথা বলেছে।  India Today, Business Standard, Times Of India Group-সহ বহু নামী দামি সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন ইনি। )

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More