শনিবার, মার্চ ২৩

নিভৃতে অতলে

অটলবিহারীর আত্মা নিশ্চয়ই মুখ টিপে হাসছে। তাঁর স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে। বাপরে! হল কী!

হঠাৎ উথলে ওঠা আবেগ-মথিত বন্দনার শেষ পর্যায় চলছে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত দলের দু’আনা-তিন’আনা নেতা থেকে শুরু করে একেবারে মাথার মাতব্বরেরা পর্যন্ত যে ভাবে গদগদ মুখে মাথায় কাঁধে অস্থি-কলস নিয়ে ছুটে বেড়ালেন ও বেড়াচ্ছেন- তাতে তো মনে হয় দেশের একটা নদী-খাল-বিলও বাকি থাকবে না।

হলফ করে বলুন তো, গত কয়েকবছরে আপনার এই ভদ্রলোকের কথা মনে পড়েছে? কিংবা, আজ যাঁরা তাঁর এই চিতাভস্ম নিয়ে এত বাড়াবাড়ি রকমের আদিখ্যেতা করছেন, তাঁরাই বা আপনাকে কত বার মনে পড়িয়েছেন? তাঁদের কথায় বার্তায়, কাজে-কর্মে কতবার প্রাসঙ্গিক হয়েছেন বাজপেয়ীজি?

সেই ২০১৪ সালে ‘সকলকে নিয়ে’ সরকার চালিয়ে দেশকে সোনালি চতুর্ভুজে মুড়ে ফেলা সত্ত্বেও, কর্মযজ্ঞের বিপুল অঙ্গীকার সত্ত্বেও, অপ্রত্যাশিত পরাজয়ের পর থেকেই নিজেকে সক্রিয় রাজনীতি থেকে ধীরে ধীরে সরিয়ে ফেলার শুরু। বার্ধক্য ও অসুস্থতার কারণে তার দু’তিন বছরের মধ্যে পুরোপুরি লোকচক্ষুর আড়ালে চলে গেলেন তিনি।

তিনি আড়ালে থাকাকালীন দু’টো সাধারণ নির্বাচন দেখল দেশ। প্রথমটায় তাঁর দোসর লালকৃষ্ণ আডবাণীর স্বপ্ন বাস্তবায়িত হল না। প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু দেশ সেই ম্যানডেট দিল না। দ্বিতীয়টায় অবশ্য আসমুদ্রহিমাচল উথাল পাথাল করে যিনি তখতে বসলেন, যাঁকে একদা এক প্রাদেশিক কুর্সি থেকে আর একটু হলে নামিয়ে দিচ্ছিলেন এই অটলবিহারীই। ‘রাজধর্ম’ স্মরণ করিয়েই থেমে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি যে বেজায় চটেছিলেন নরেন্দ্র ভাইয়ের উপর, তা গল্পকথা নয়। গুজরাতের ন্যক্কারজনক দাঙ্গা ও তার নিয়ন্ত্রণে মুখ্যমন্ত্রী মোদীর অপারগতা বাজপেয়ী- শাসনকালে অন্যতম কলঙ্ক তো বটেই।

তাই তিনি যতই ‘অচ্ছে দিন’-এর স্বপ্ন দেখিয়ে বেরোজগারি অবসানের অঙ্গীকার করেন, তরুণ প্রজন্মকে উদ্বেলিত করে ক্ষমতায় আসীন হোন না কেন, ভারতের সমাজ ও সংস্কৃতিতে সহিষ্ণুতার প্রশ্নে বড়সড় প্রশ্নচিহ্ন যে উঠে যাবে, তা কি খুব আশ্চর্যের?

সুতরাং, আশ্চর্যের কিছু নেই যে গত কয়েকবছরে বাজপেয়ী বিস্মৃত ছিলেন। অসুস্থতায় আচ্ছন্ন বৃদ্ধকে বদান্যতা দেখানোর জন্য আনুষ্ঠানিক ‘ভারতরত্ন’ প্রদান ও জন্মদিনের দিন নিয়মরক্ষার পুষ্পস্তবক-এর বাইরে তাঁর কি প্রাসঙ্গিকতা ছিল?

তাঁর দীর্ঘ রাজনৈতির জীবনের পটভূমি যে মতাদর্শই হোক না কেন, তিনি ছিলেন সহিষ্ণুতার ও সহাবস্থানের প্রতীক। এই দেশ ও জাতির দৈনন্দিন জীবনে তারই কি নিদারুণ অভাব আমরা দেখছি না? ক্রমশ কি বাড়ছে না অবিশ্বাস, অনাস্থা ও বিদ্বেষের বাতাবরণ?

প্রত্যক্ষভাবে না হলেও, ক্ষুদ্র রাজনীতির স্বার্থে পরোক্ষভাবে কারা একে প্রশ্রয় দিয়েছেন? মানুষের কোনও বিশেষ পরিচয়ের জন্য তাঁকে রাতারাতি ‘অপরাধী’ সাব্যস্ত করে পেটানো হচ্ছে আর রাজনৈতিক দাদারা সেই নির্মম প্রহারকারীদের সমর্থনে কথা বলছেন।

তাই এঁরা যখন অটলবিহারীর শরীরের স্মৃতি নিয়ে বাড়বাড়ি করেন, তা যে এই প্রচারলোভী রাজনীতির স্বার্থে, তা নিয়ে সংশয়ের অবকাশ থাকে না। যে মানুষটাকে শ্রদ্ধা প্রদর্শনের দাবি তাঁরা করছেন, সেই মানুষটার দর্শন ও আদর্শকে তাঁরা বিন্দুমাত্র রেয়াত করেন কি?

এই প্রশ্নের উত্তর পাওয়ার আগেই দেখবেন আবার বিস্মৃতির অতলে তলিয়ে গিয়েছেন মোদীমহাশয়ের ‘সাহাব’ অটলবিহারী।

একটুও আশ্চর্য হবেন না।

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন

Shares

Leave A Reply