শনিবার, নভেম্বর ২৩
TheWall
TheWall

আনন্দ থাকুক, দূষণ নয়

শব্দই ব্রহ্ম। এরকম একটি কথা শোনা যায় বটে। তবে এ রাজ্যের বা বিস্তারিত ভাবে বলতে গেলে তামাম সাধারণ দেশবাসীর কাছে শব্দ এখন ব্রহ্মতালু বিদীর্ণ করে দেওয়ার জায়গায় এসে পৌঁছেছে।  এই কালীপুজো এবং দীপাবলিতে তার কোনও ব্যতিক্রম ঘটবে কিনা সেকথা ভাবতে গেলে যতটা আশায় বুক বাঁধতে হয় তা নেহাতই দুরাশা প্রমাণিত হয়েছে বিগত কয়েক বছর ধরে। শব্দবাজির উৎপাত শান্তিপ্রিয় নাগরিকদের অশান্তির কারণ হয়ে উঠবে, এমনটা প্রায় নিয়মে পরিণত হয়েছে। যারা শব্দবাজির পৃষ্ঠপোষক তাদের যুক্তি খুবই সরল। এ তো এক দিন, বড়জোর দু-তিন দিনের ব্যাপার। উৎসবের সময় মানুষ কি একটু আনন্দ করবে না। যদিও বোঝা দায় যে উৎকট শব্দে চমকে দিয়ে, কানফাটানো আওয়াজে ব্যতিব্যস্ত করে, অসুস্থদের উৎপীড়ন করে আনন্দের নামে যে শব্দতাণ্ডব তার সার্থকতা ঠিক কোথায়। না কি অন্যদের বিরক্ত করাই এখন আমাদের প্রধান আনন্দ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

শব্দবাজির উৎপাত রুখতে এই বছরেও নানা বিধিব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে শোনা যাচ্ছে। যেমন পরিবেশকর্মীদের একটি সংগঠন প্রস্তাব এনেছে নিয়ম ভেঙে বাজি ফাটালে স্পট ফাইন করা হোক। সাধু প্রস্তাব, তবে তা কতখানি কার্যকর হবে তা শেষ পর্যন্ত সন্দেহেরই বিষয়। “এনভায়রনমেন্ট প্রোটেকশন অ্যাক্ট ১৯৮৬” বলছে নিয়ম ভেঙে বাজি ফাটালে সর্বোচ্চ এক লক্ষ টাকা জরিমানা ও পাঁচ বছরের জেল হতে পারে। যদিও এখনও পর্যন্ত এরকম বা তার নিম্ন পর্যায়ের কোনও শাস্তি কখনও বলবৎ করা গিয়েছে বলে শোনা যায়নি।

তা ছাড়া বাজি ফাটানোর নিয়ম যে কী সে সম্পর্কে আমোদপ্রিয়দের কোনও ধারণা আছে কিনা জানা যায় না। যদি বা থাকে, তা তারা মানতে নারাজ।

সুপ্রিম কোর্টের রায় অনুযায়ী রাত ৮ টা থেকে ১০ টা অবধি বাজি ফাটানো যাবে। তবে নিষিদ্ধ শব্দবাজি নয়। একই সঙ্গে আদালতের নির্দেশ নিষিদ্ধ বাজি বন্ধ করার ক্ষেত্রে কোনও এলাকায় থানা তথা পুলিশবাহিনী ব্যর্থ হলে তার দায় তাদের উপরেই বর্তাবে।

সমস্যার কথা হল, আইন আইনের পথে চলবে এমন কথা প্রায়ই আমাদের কর্ণকুহরকে প্লাবিত করে কিন্তু হৃদয়কে আহ্লাদিত করে না। কারণ, কার্যক্ষেত্রে তার বিপরীত দেখতেই আমরা অভ্যস্থ।

এই বছর শব্দবাজি রোখার ব্যবস্থা হিসাবে আরও যা শোনা যাচ্ছে তার কতিপয় নমুনা দেওয়া যেতে পারে। যেমন, শহর জুড়ে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্যদের আটটি দল ঘুরবে। শব্দবিধি ভেঙে বাজি ফাটাতে দেখলে এফআইআর দায়ের করবেন দলের সদস্যরা। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে শহরের বহু কালীপুজোর নিরাপত্তার জন্য ২৭টি ওয়াচ টাওয়ার থাকবে। ১১৪ টি অটোয় চড়ে টহলদারি চালাবে পুলিশ। এ ছাড়াও কন্ট্রোল রুমে দূষণ নিয়ন্ত্রণ পর্ষদ ও দমকলের আধিকারিকরা থাকবেন। মানুষকে শব্দবাজি নিয়ে সচেতন করতে বহুতল আবাসনের ছাদে ক্যুইজের আয়োজন করা হয়েছে। এমনকি বহু আবাসনের ছাদের দরজায় তালাচাবি দিয়ে সেই চাবি থানায় নিয়ে রাখা হবে বলেও জানানো হয়েছে। এই সঙ্গে আরও দুটি বিপরীত তথ্য জানানো যেতে পারে। প্রথমটি হল, এই বছর শহরের বিভিন্ন জায়গায় পুলিশি হানায় যে পরিমাণ শব্দবাজি উদ্ধার হয়েছে তা গত বছরের তুলনায় দ্বিগুণ। দ্বিতীয়টি হল, এই বছর দুর্গাপুজোতেই যে পরিমাণ নিষিদ্ধ বাজি ফেটেছে তাকে কোনওমতেই স্বাভাবিকতার মধ্যে ধরা যায় না। ফলে কালীপুজো ও দীপাবলীতে আশঙ্কা আরও বাড়ছে তা বলাই বাহুল্য। এ ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কলকাতা শহর ও তার আশপাশের কথা চিন্তা করলেই চলবে না। আনন্দ ও উল্লাসের নামে শব্দদূষণ ও বায়ুদূষণের সংক্রামক ব্যধিটি ছড়িয়ে পড়েছে গ্রামেগঞ্জেও।

শাস্তির ভয় দেখিয়ে, আইনের কথা বলে যদি শব্দ তাণ্ডব বন্ধ না করা যায় তা হলে উপায় কী? উপায় প্রধানত দুটি। নিষিদ্ধ শব্দবাজি বানানোই যাতে বন্ধ করা যায় তার যথাযোগ্য ও সফল ব্যবস্থা নেওয়া। হাতের নাগালে যদি তা না আসে তা হলে ওই সব বাজি ফাটানোর সুযোগই থাকবে না। আর একটি উপায় হল, নিষিদ্ধ শব্দবাজি, শব্দদূষণ, বায়ুদূষণ নিয়ে মানুষের সচেতনতা বাড়ানো। প্রথমটি কার্যকর করার অধীশ্বর পুলিশ ও প্রশাসন। দ্বিতীয়টিতেও তাদের ভূমিকা রয়েছে। তবে ব্যক্তিগত সচেতনতা ততোধিক জরুরি। যে দূষণের আশঙ্কা করা হচ্ছে তা মাত্র একদিন না কয়েক দিনের সে কথা প্রকৃত বিচার্য নয়। শুধুমাত্র শব্দবাজির কথা বললেই বিষয়টি শেষ হয়ে যায় না। নিয়মের তোয়াক্কা না করে জলসা, সেখানে লাউড স্পিকার ও ডিজে বাজানোর অসুস্থ প্রতিযোগিতা, প্রচ্ছন্ন রাজনৈতিক মদত ইত্যাদিও শব্দদূষণের অন্যতম কারণ। সে সব বন্ধ করার যথেষ্ট প্রয়োজন রয়েছে। আতশবাজি পোড়াতে গেলেও নিয়ন্ত্রণ থাকা চাই। কারণ, যে কোনও বাজিই দূষণ ঘটায়। দায়িত্বজ্ঞানহীন অধিকার কোনও নাগরিক কর্তব্যের মধ্যে পড়ে না।

আসলে এই সংকট নিয়ে কথা বলার মূল উদ্দেশ্য ধার্য হওয়া উচিত আরও গভীর কারণে। যে প্রকৃতি আমাদের ধাত্রী তাকেই আমরা নানা ভাবে বিধ্বস্ত করে চলেছি। তা শুধু এই শহর, রাজ্য বা দেশের ক্ষেত্রে সত্যি, এমনটা নয়। সমগ্র পৃথিবীতে বায়ুদূষণ ও জলবায়ুর পরিবর্তন এখন আর চোখে আঙুল দিয়ে দেখাতে হয় না। তার পরিণতি নিয়েও বিজ্ঞানীরা, পরিবেশবিদরা বারবার সতর্ক করে চলেছেন। তবু আমাদের সম্বিত ফেরে না।

পরিহাসের ও পরিতাপের বিষয় হল, আমরা নিজেদের বিশ্বায়নের অংশ মনে করি ও সেখানে যুক্ত থাকতে চাই ততটুকুই, যতটুকু আমাদের স্বার্থসিদ্ধি করে। দূষণে পৃথিবী ধ্বংসের পথে গেলেও সেখানে আমাদের কোনও অন্যায় নেই বলে উটের মতো বালিতে মুখ গুঁজে বেঁচে থাকাটাই আপাতত সহজ প্রক্রিয়া। কাজেই উৎসব যে উৎপাতে পরিণত হচ্ছে সেই বোধটুকুই থাকে না। আনন্দ সঞ্চারিত হয় তখনই, যখন সে মনকে প্রসারিত করে। তা না হলে সে হয়ে দাঁড়ায় মনের দূষণ। আনন্দ থাকুক। দূষণ বন্ধ হোক।

Comments are closed.