সুপ্রিম কোর্টের রায় কি মুছে দিতে পারল পঞ্চায়েত ভোটের বাস্তবতাকে!

0

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    শঙ্খদীপ দাস

     দীর্ঘ শুনানির পর অবশেষে শুক্রবার সকালে সুপ্রিম কোর্ট জানিয়ে দিয়েছে, পঞ্চায়েতে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় জেতা আসনগুলিতে ফলাফল ঘোষণা করে দিতে পারে রাজ্য নির্বাচন কমিশন ও রাজ্য সরকার। মনোনয়ন পেশ নিয়ে এর পরেও যদি কারও মনে ক্ষোভ থাকে, তা হলে তিনি গেজেট নোটিফিকেশনের তিরিশ দিনের মধ্যে ইলেকশন ট্রাইব্যুনালে আপিল করতে পারবেন।

    এ হেন রায় শুনে স্বাভাবিক ভাবেই স্বস্তিতে বাংলার শাসক দল। এমনকী, গোটা পঞ্চায়েত ভোটের সময় যে মানুষটিকে বলতে গেলে প্রায় দেখাই যায়নি, সেই পঞ্চায়েত মন্ত্রী সুব্রত মুখোপাধ্যায়ও সক্কাল সক্কাল বাড়িতে বসেই টিভি ক্যামেরায় বাইট দিয়েছেন। আস্ফালন করে বলেছেন, “বিরাশি সিক্কার থাপ্পড় খেয়েছে বিরোধীরা। হার জিত পরের কথা, ওদের আবেদন গ্রাহ্যই হয়নি।” সেই সঙ্গে সম্ভবত দলনেত্রীকে খুশি করতে বলেছেন, “সর্বভারতীয় স্তরে যে রাজনীতি মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় করতে চাইছেন, তার পথ প্রশস্ত হল।”

    বিপরীতে রায় শুনে নেতানো মুড়ির মতোই অবস্থা বিরোধী শিবিরের নেতাদের। বিশেষ করে বিজেপি। যেন তাঁরা ধরে নিয়েছিলেন, পঞ্চায়েত ভোটটাকেই অবৈধ ঘোষণা করে দেবে সুপ্রিম কোর্ট। এবং সেই রায়ের পিঠে চড়ে তাঁরা গাঁ গঞ্জে বাজার গরম করবেন। যাতে উনিশের ভোটের আগে খুব বেশি পরিশ্রম না করেই রাতারাতি জনভিত্তি মজবুত হয়ে যাবে তাঁদের।

    আরও পড়ুন : পঞ্চায়েত উৎ‘শব’

    আপাত ভাবে সুপ্রিম কোর্টের রায়ের পর এটাই দিনের ছবি।

    কিন্তু এই এক ছবিতেই কি পঞ্চায়েত ভোটের সবটাকে ধরা যাবে! ভোটের আগে, ভোটের দিন এবং গণনার সময়কার সব ছবি, সব কোলাজ, সব ফুটেজ ম্লান করে দিতে পারবে সুপ্রিম কোর্টের এই রায়? তা ছাড়া বাংলার মানুষের স্মৃতিশক্তি কি এতটাই দুর্বল যে বেমালুম ভুলে যাবে আগের সবকিছু!

    পঞ্চায়েত ভোটে বাংলায় সন্ত্রাস নতুন নয়। বরং বাম জমানার প্রথম দশ বছর বাদ দিয়ে গত তিন দশক ধরে সেটাই ট্রাডিশন হয়ে দাঁড়িয়েছে বাংলার। রাজ্যে পালা বদলের পরেও সেই মহান ঐতিহ্যের বদল হয়নি। এক সময়ে পঞ্চায়েত নির্বাচনের সময় বামেরা সন্ত্রাস চালাত। উন্নয়ন রাস্তায় দাঁড়িয়ে রয়েছে বলে রঘু ডাকাতের মতো তখন কেউ হয়তো টিভিতে বাইট দিত না। কিন্তু গ্রামের পর গ্রাম, ব্লকের পর ব্লকে মনোনয়নই জমা দিতে পারত না বিরোধীরা।‘বাড়াবাড়ি’ করলে জুটত মার, ভয়াণক মার। খুন খারাপিও বাদ যায়নি। এবং তখন এই সুব্রত মুখোপাধ্যায়রাই ‘ওরা সন্ত্রাস করে পঞ্চায়েত দখল করেছে’ বলে কান্নাকাটি করতেন সাংবাদিকদের সামনে। এখন সময় বদলেছে। সুব্রতবাবু পঞ্চায়েত মন্ত্রী। তাঁর বয়সও হয়েছে। শাসক দলের মদতে সন্ত্রাস হলেও চোখে বিশেষ দেখতে পান না!

     অথচ এ বারও পঞ্চায়েত ভোটের দিন দেখা গিয়েছে উত্তর থেকে দক্ষিণে রক্তা গঙ্গা বয়েছে। ভোটের আগের রাতেই কাকদ্বীপে জ্যান্ত পুড়িয়ে মারা হয়েছে সিপিএম দম্পতিকে। কোথাও গুলি খেয়েছেন বৃদ্ধা। কোথাও খুন হয়েছেন বিজেপি কর্মী। কোথাও বেধড়ক মার খেয়েছেন বিরোধী দলের প্রার্থীরা। শুধু ভোটের দিনই মারা গিয়েছেন ১৮ জনের বেশি।
    এবং সেখানেও থেমে থাকেনি সন্ত্রাস। যেখানে শাসক দলের কর্মীদের মনে হয়েছে ভোটাভুটিতে হেরে যেতে পারে সেখানে গণনার সময়েও গণ্ডগোল হয়েছে। আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছে গণনাকেন্দ্রে। যা অতীতে কখনও হয়নি। বরং অতীত প্রবণতার থেকেও এগিয়ে গিয়েছে কয়েক কদম। কচু কাটতে কাটতে যেমন হয়। ব্যতিক্রম বলতে জঙ্গলমহলের বেলপাহাড়ি, বাঁশপাহাড়িতে জনজাতি বিদ্রোহের কারণে তৃণমূলই সেখানে প্রার্থী দিতে পারেনি ভোটে।

    এ প্রসঙ্গে বলে রাখা ভাল, রাজ্য নির্বাচন কমিশন নামে সাইনবোর্ডটির ভূমিকা অতীতে যা ছিল, এখনও তাই। ওই সাইনবোর্ডের নীচে যাঁরা চেয়ার নিয়ে বসেছেন, মীরা পাণ্ডের মতো হাতে গোনা দুয়েক জন ছাড়া বাকিদের শরীরে মেরুদণ্ড আদৌ রয়েছে কিনা তা নিয়ে তখনও প্রশ্ন উঠেছে, এখনও প্রশ্ন তুলছেন বিরোধীরা।

    প্রশ্ন হল, গোটা দুনিয়া এ কথা জানে। সুপ্রিম কোর্ট কি তা জানে না! নাকি দেখেও দেখেনি।

    দেখুন সে দিনের ছবি:

    আইনজ্ঞরা বলছেন, আদতে সুপ্রিম কোর্টের কিছু হয়তো করারও ছিল না। আইনের গণ্ডির মধ্যে থেকে ভোট অবৈধ বলে ঘোষণা করাও সম্ভব ছিল না বিচারপতিদের। কারণ, যাঁরা ভোটাভুটিতে লড়ে জিতেছেন সে ক্ষেত্রে তাঁদের কী হবে! দ্বিতীয়ত, সাংবিধানিক ব্যবস্থায় মনোনয়ন পেশ করতে গিয়ে কেউ বাধা পেলে ট্রাইব্যুনালেই যাওয়ার কথা। সেখানে ভুক্তভোগীকেই ট্রাইব্যুনালে যেতে হয়। কোনও রাজনৈতিক দলের আপিল গ্রাহ্য হয় না। ফলে বিচারপতিরা আইন ও সংবিধান মোতাবেক পদক্ষেপ করেছেন। তবে বাংলায় পঞ্চায়েত ভোটের সময় ঘটনা পরম্পরা নিয়ে তাঁরা যে চিন্তিত, তা বার বার প্রকাশ পেয়েছে মামলার শুনানি চলাকালীন তাঁদের পর্যবেক্ষণে।

    তা হলে?

    ইদানীং বাংলায় শাসক দলের অনেক নেতাকেই বলতে শোনা যাচ্ছে রাজ্যকে বিরোধী শূন্য করে ছাড়বেন তাঁরা। পরিস্থিতি যদি তেমনই হয়, তা হলেও কি পঞ্চায়েত ভোটে সন্ত্রাস থেকে মুক্তি সম্ভব? একেবারেই নয়! কারণ, বাম জমানার শেষ থেকেই বাংলায় পঞ্চায়েতকে ঘিরে করে খাওয়ার রাজনীতি চলছে রম রম করে। সন্ত্রাসের মূলেও রয়েছে সেটাই। তৃণমূলের নেতারাও জানেন, রাজ্য বিরোধীশূন্য হয়ে গেলেও পঞ্চায়েতে নিজেদের মধ্যেই তখন মারপিট করবেন দলের কর্মীরা।

    প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর জমানায় পঞ্চায়েতি ব্যবস্থার সংস্কার হয়েছিল। পরবর্তী কালে আইন করে পঞ্চায়েতে ৫০ শতাংশ আসন মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত রাখারও ব্যবস্থা হয়েছে। হয়তো এ বার সময় আসন্ন আরও এক প্রস্ত সংস্কারের। পঞ্চায়েতকে ঘিরে ‘করে খাওয়ার’ রাজনীতির সুযোগ বন্ধ করতে পারলে হয়তো লাগাম পরানো যেতে পারে সন্ত্রাসেও। বাংলায় তা জরুরি বললে কম বলা হবে। অপরিহার্য। নইলে সন্ত্রাসের ট্রাডিশনই সমানে চলবে। সমানে।

    The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Leave A Reply

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More