মঙ্গলবার, নভেম্বর ১২

বর্ধমান মেডিক্যালে অদ্ভুত নিয়ম, ট্রলি চাইলে জমা রাখতে হচ্ছে ভোটার কার্ড, মোবাইল ফোন

দ্য ওয়াল ব্যুরো, পূর্ব বর্ধমান : রোগীর জন্য ট্রলি চাই? জমা দিতে হবে ভোটার কার্ড অথবা আধার কার্ড। সঙ্গে নেই? তবে জমা দিন ভর্তির কাগজপত্র। তাও নেই? তাহলে জমা রাখতে হবে আপনার মোবাইল ফোনটি। বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গিয়ে সঙ্গে থাকা অসুস্থ মানুষটির জন্য একটা ট্রলি পেতে এমনই নিয়মের ফাঁক দিয়ে এগোতে হবে আপনাকে। বোঝো ঠ্যালা। এই সর্বনেশে নিয়ম নাকি আবার তৈরি করেছেন হাসপাতালেই এক শ্রেণির কর্মী।

এমন নিয়মে প্রতিদিন চূড়ান্ত নাকাল হচ্ছেন রোগী ও তাঁদের পরিজনরা। অথচ নজরে পড়েনি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের।

ছবিটা তুলে ধরতে গত কয়েকদিনের কয়েকটি ঘটনার উল্লেখ না করলেই নয়।

কাটোয়া থেকে নিয়ে আসা হয়েছিল ট্রাক্টরের ধাক্কায় গুরুতর জখম অঙ্গনওয়ারি কর্মী স্বাগতা সিংহরায় বন্দ্যোপাধ্যায়কে। সিটি স্ক্যান করতে নিয়ে যাওয়ার জন্যে দীর্ঘক্ষণ ট্রলির খোঁজ করছিলেন তাঁর ভাই সম্রাট। শেষ পর্যন্ত ট্রলি মিলল, তবে ভোটার কার্ড জমা দিয়ে। জরুরি বিভাগে এসে ট্রলি ফেরত দেওয়ার পরে তবেই ভোটার কার্ড ফেরত পান সম্রাটবাবু।

বীরভূমের পাড়ুই থেকে মাকে নিয়ে হাসপাতালে এসেছিলেন দুর্গা সরেন। জরুরি বিভাগ থেকে রাধারানি ওয়ার্ডে তাঁকে ভর্তি করার কথা বলেন চিকিৎসকরা। অসুস্থ মাকে দুর্গার পক্ষে কোলে করে বা হাঁটিয়ে নিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না। তাই ট্রলি লাগবেই। কিন্তু ভোটার বা আধার কার্ড সঙ্গে কোনটাই নেই। বাধ্য হয়ে নিজের মোবাইল ফোনটি জমা রাখতে হল দুর্গাদেবীকে। তবেই মিলল ট্রলি। তারপর সেই ট্রলি ঠেলে অসুস্থ মাকে রাধারানি ওয়ার্ডে ভর্তি করলেন তিনি। ট্রলি ফেরত দেওয়ার পরে ফেরত পেলেন মোবাইল ফোন। দুর্গা বলেন, মোবাইল ফোন রেখে ট্রলি নিয়ে গিয়ে মাকে ভর্তি করলাম। ট্রলি ফেরত দেওয়ার পর মোবাইল হাতে নিয়ে দেখি উদ্বিগ্ন হয়ে বাড়ি থেকে অনেকেই ফোন করছেন। এটা কেমন নিয়ম বলুন তো?”

স্ত্রী হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ায় জরুরি বিভাগে নিয়ে এসেছিলেন আউশগ্রামের বৃদ্ধ সবুজ বন্দ্যোপাধ্যায়। তাঁর কথায়, “রাধারাণী ওয়ার্ডে পাঠানো হয় ওঁকে। আমার কাছে ভোটার কার্ড, আধার বা মোবাইল ছিল না বলে ভর্তির নথি দিয়ে তবেই ট্রলি মেলে। ৫০ টাকা দিতেই ট্রলি টানার লোকও মিলে যায়। রাধারানি ওয়ার্ডে স্ত্রীকে নামিয়ে ট্রলি ফেরত দিয়ে নথি নিয়ে আসি। তারপর ভর্তি করা হয় ওঁকে। তাঁর প্রশ্ন, “এর মধ্যে কিছু ঘটলে কে দায় নিত?”

বর্ধমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে গেলেই দেখা যাবে কোলে করে বা হাঁটিয়ে স্যালাইনের বোতল হাতে করে রোগীকে সিটি স্ক্যান, এমআরআই করাতে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিংবা ভর্তির জন্যে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে ওয়ার্ডে। অথচ হাসপাতালের জরুরি বিভাগে রুগীদের নিয়ে যাওয়ার জন্য রয়েছে পর্যাপ্ত ট্রলি। সেই ট্রলি পিছু একজন করে কর্মীও রয়েছেন।

জরুরি বিভাগের দুটি ঘরে তালা বন্ধ থাকে রোগীদের জন্য বরাদ্দ এই ট্রলিগুলি। সেই ট্রলি বের করতে গেলে রোগীর পরিজনদের জমা দিতে হয় ভোটার কার্ড, আধার কার্ড, মোবাইল ফোন। ট্রলি পিছু একজন করে কর্মী থাকলেও তাঁদের নাকি দেখা মেলা ভার। এমনটাই অভিজ্ঞতা এখানে আসা রোগীদের। অথচ সেখানেই নাকি দিনভর খোস গল্পে মেতে থাকেন তাঁরা। এমন নিয়ম চালু করে বেশ তৃপ্ত একজন বললেন, এখান থেকে ট্রলি নিয়ে চলে যায়। তারপর যেখানে কাজ সেখানেই ফেলে রাখে। কে খুঁজতে যাবে? তাই এমন নিয়ম চালু করেছি আমরা।

সব শুনে অবাক হলেন হাসপাতালের রোগী কল্যাণ সমিতির চেয়ারম্যান তথা রাজ্যের মন্ত্রী স্বপন দেবনাথ। বললেন ট্রলি নিতে রুগীর পরিজনদের ব্যক্তিগত নথি বা মোবাইল ফোন জমা রাখতে হচ্ছে শুনে অবাকই লাগছে। এটা তো কোনও নিয়ম হতে পারে না।আর হাসপাতাল সুপার প্রবীর সেনগুপ্ত বললেন, “দীর্ঘদিন ধরে এমন অব্যবস্থা চলতে পারে না। এই পরিস্থিতি বন্ধ করতেই হবে।

আদৌ কি তা সম্ভব? প্রশ্ন তুলছেন ভুক্তভোগীরা।

Comments are closed.