রবিবার, মার্চ ২৪

ব্রা-এ লাগানো বায়োসেন্সরই বলে দেবে আপনি স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত কিনা!

চৈতালী চক্রবর্তী

ব্রা’য়ের মধ্যে লাগানো সেন্সর। শরীরে পড়লে সেই ব্রা-ই বলে দেবে মহিলা স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত কিনা। এমন অভিনব আবিষ্কারে সাড়া পড়ে গেছে গোটা বিশ্বেই। আশ্চর্য়ের বিষয় এমন ব্রা-এর আবিষ্কর্তা কোনও নামী গবেষক নন, বরং বছর উনিশের এক মেক্সিকান কিশোর। নাম জুলিয়ান রিয়স কান্টু।

জুলিয়ানের বয়স তখন তেরো। মায়ের অসুখের পর থেকেই মানসিক অবসাদ গ্রাস করতে শুরু করে তাকে। স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত মা। ধীরে ধীরে তাঁকে মৃত্যুর মুখে যেতে দেখেছে কিশোর। প্রাথমিক ভাবে ভুল চিকিৎসা, পরে চিকিৎসকরাই জানান আগে থেকে রোগ নির্ণয় হলে তার মাকে বাঁচানো যেত হয়তো। নিজের মাকে বাঁচাতে পারেনি জুলিয়ন। তবে মায়ের যন্ত্রণাকে কাছ থেকে দেখার অনুভূতিই তাকে বিশ্বের সব মেয়েদের জন্য চিন্তিত করে তোলে। তাঁর মায়ের মতো কোনও মহিলাকে যাতে সেই যন্ত্রণার মুখোমুখি হতে না হয়, তার জন্যই ক্যানসার সনাক্তকরণে এমন অভিনব ব্রা তৈরি করে ফেলছে সে।

তিন জন বন্ধুর সঙ্গে জুলিয়ান খুলে ফেলেছে একটি ছোটখাটো কোম্পানি। নাম হিজিয়া টেকনোলজি। উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে এই সংস্থা মহিলাদের স্বাস্থ্যবিধির উপর গবেষণা করে। কী ভাবে কোনও রোগ নির্ণয় করা যায় এবং তার প্রতিকারের সহজ পন্থা কী, সেটাই এই সংস্থার মূল লক্ষ্য। হিজিয়া টেকনোলজির মাধ্যমেই নিজের ভাবনাকে বাস্তবের রূপ দিয়েছে জুলিয়ন।

তার আবিষ্কারের নাম ‘ইভা’। উন্নত প্রযুক্তির এই ব্রা-এ লাগানো রয়েছে বায়োসেন্সর। শরীরের সংস্পর্শে এলেই কাজ করা শুরু দেয় ইভা। স্তনের তাপমাত্রা তার সেন্সরগুলিকে অ্যাক্টিভেট করে দেয়। এই সেন্সর যুক্ত থাকে কোনও মোবাইল অ্যাপ বা কম্পিউটারের সঙ্গে। সেন্সরের মাধ্যমে বার্তা সেভ হয়ে যায় অ্যাপে। তার পর সেই ডেটাকে নিরিখ-পরখ করে দেখা হয় কোনও মহিলার স্তনের গঠনে কী কী পরিবর্তন এসেছে। সেই সব পরিবর্তন ভবিষ্যতে মারণ রোগের চেহারা নেবে কিনা।


কী ভাবে কাজ করে সেন্সর লাগানো ‘ইভা ব্রা’
?

জুলিয়ানের কথায়, এই ব্রা-এ রয়েছে ২০০টি বায়োসেন্সর। স্তনের মাপ মতো ব্রায়ের ভিতরে বিশেষ কাপ লাগানো রয়েছে। তাতেই থাকে সেন্সরগুলি। এগুলি ব্লু-টুথের মাধ্যমে স্মার্টফোন বা কম্পিউটারের সঙ্গে যুক্ত থাকে। স্তনের ত্বকের সংস্পর্শে এলেই কাজ করা শুরু করে দেয় সেন্সর। মূলত স্তনের কোনও নির্দিষ্ট অংশের আকার, রং এবং তাপমাত্রার কোনও পরিবর্তন হলে বায়োসেন্সরে তা তৎক্ষণাৎ ধরা পড়বে এবং এই পরিবর্তনের তথ্য ফুটে উঠবে মোবাইল অ্যাপে বা কম্পিউটার স্ক্রিনে।

শুধু প্রযুক্তিগতভাবেই উন্নত নয় ইভা, এর কমফোর্ট জোনের দিকেও বিশেষ নজর রেখেছে জুলিয়ান। ইভা খুবই আরামদায়ক, কোনওরকম পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হওয়ার সম্ভাবনা নেই। দিনে মাত্র একবার এক ঘণ্টার জন্য পড়লেই তার প্রয়োজনীয় কাজ সেরে নেবে ইভা। এই এক ঘণ্টায় স্তনের ত্বকের সংস্পর্শে তার যাবতীয় তথ্য বন্দি হয়ে যাবে ব্রা-এর সেন্সরে।

চরিত্র বদলে বিপুল আগ্রাসী হয়ে উঠছে স্তন ক্যানসার। গত আট-ন’বছরের মধ্যে তার স্বভাব পাল্টে গোটা বিশ্বেই এমন বিধ্বংসী রূপে তা দেখা দিচ্ছে যে প্রমাদ গুণছেন উদ্বিগ্ন চিকিৎসকেরাই।

নিজের স্তনের গঠন এবং তাতে ক্রমাগত হয়ে চলা পরিবর্তন লক্ষ্য রাখেন ক’জন মহিলা? শরীরের এই বিশেষ অঙ্গটির পরিচর্যার দিকে নজর রাখেন না অনেকেই। আবার নজরে পড়লেও লজ্জা ও সংকোচের জন্য সেটা লুকিয়ে যান অধিকাংশ মহিলা। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্তন ক্যানসার সম্পর্কে অজ্ঞতা, স্তন নিয়ে অহেতুক স্পর্শকাতর হওয়া, লজ্জা পাওয়া এবং ‘সেল্ফ এগজামিনেশন’ বা নিজেই নিজের স্তন কী ভাবে পরীক্ষা করা যায়, সে সম্পর্কে ধারণা না-থাকার জন্য এই রোগে আক্রান্তের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে।

 

কী কী লক্ষণ দেখে বোঝা যাবে আপনি স্তন ক্যানসারে আক্রান্ত?

  • স্তনের স্বাভাবিক আকার বা গঠন বদলে যায়।
  • স্তনবৃন্তের আকারে পরিবর্তন।
  • স্তনে লাম্প তৈরি হওয়া স্তন ক্যানসারের কারণ হতে পারে।
  • স্তনবৃন্তের চারপাশে বা স্তনের ত্বকে র‍্যাশ দেখা যায়।
  • আঙুল দিয়ে চাপ দিলেই স্তনের ত্বক বসে যাওয়া।
  • স্তন বা আর্মপিটে যন্ত্রণা এবং কোনও রকম চাপ ছাড়াই অস্বাভাবিক ক্ষরণ।
  • স্তন বৃন্ত লাল হয়ে যাওয়া এবং চারপাশের ত্বকের কোষ মোটা হয়ে যাওয়া, অনেক সময় লাল-কমলা ছাপও দেখা যায় স্তনের চারধারে।

হু-র একটি সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী, ১৯৯৯ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত শুধুমাত্র ভারতে স্তন ক্যানসারে ৮২ শতাংশ মৃত্যু বেড়েছে। যার মধ্যে ৩০ থেকে ৪০ বছরের মধ্যে মহিলাদের সংখ্যাটাই বেশি। ১৮ বছরের পর থেকে প্রত্যেক মহিলাকেই মাসে অন্তত একদিন সেল্ফ একজামিনেশন করতে বলেন চিকিৎসকেরা। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেই নিজের স্তন পরীক্ষা করাটা একান্তই বাঞ্ছনীয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ধরা পড়লে স্তন ক্যানসার নিরাময় সম্ভব বলে জানিয়েছেন চিকিত্সকেরা। কিন্তু বেশির ভাগ মহিলাই তা করেন না। ফলে ক্যানসার ধরা পড়ে অনেক দেরিতে।

জুলিয়ানের ‘ইভা ব্রা’ নিয়ে দ্বিধায় গবেষকরা:

এই ব্রা আদৌ কাজ করে তো? কতজন মহিলার ক্ষেত্রে এর ব্যবহার ক্যানসারের স্পষ্ট ইঙ্গিত দিয়েছে? এমন নানা প্রশ্নের এখনও কোনও সদুত্তর মেলেনি। সেন্সর লাগানো ব্রা মহিলাদের স্বাস্থ্যের জন্য় কতটা উপকারি সেটা নিয়েও যথেষ্ট চিন্তিত গবেষকদের একাংশ। ব্রিটেনের একদল গবেষকের মতে, পরীক্ষা নিরীক্ষা ছাড়াই এমন ব্রা হঠাৎ করে ব্যবহারে শারীরিক কোনও সমস্যা দেখা দিচ্ছে কিনা সেটা আগে জেনে নেওয়া দরকার। এক ঘণ্টা ত্বকের কোষের সঙ্গে তার কোনও বিরূপ প্রতিক্রিয়া হচ্ছে কিনা সেটাও পরীক্ষণীয়।

অক্সফোর্ড জার্নালে বিজ্ঞানী লিজ স্যাভেজের একটি গবেষণায় ক্যানসার-সনাক্তকারী ব্রা নিয়ে অনেক তথ্য় উঠে এসেছিল। লিজ জানিয়েছিলেন, দশ বছর আগে বিজ্ঞানীরা ক্যানসারের আগাম আঁচ পাওয়ার জন্য ‘হিট-সেন্সিং ব্রা’-এর তৈরির কথা ভেবেছিলেন। প্রাথমিক পরীক্ষার কাজও হয়েছিল, তবে সেই গবেষণা তেমন ফলপ্রসূ হয়নি। অবসরপ্রাপ্ত চিকিৎসক এবং বর্তমানে স্কটল্যান্ডের গ্লাসগো ইউনিভার্সিটির গবেষক হুগ সিম্পসন দীর্ঘদিন ধরেই এই সংক্রান্ত গবেষণায় ব্যস্ত। সিম্পসন ছাড়াও ইংল্যান্ডের বল্টন ইউনিভার্সিটির পিএইচডি স্কলার এলিয়াস সিয়োরেস ও তাঁর সতীর্থরা তৈরি করেছেন ‘স্মার্ট ব্রা’, যা স্তনের কোষের পরিবর্তন জরিপ করতে সক্ষম।  টিউমার তৈরির আগে স্তন কোষের পরিবর্তন এবং রক্তনালীর মধ্যে রক্তপ্রবাহের সামান্য পরিবর্তন বা যে কোনও প্রদাহ জনিত উপসর্গকে মুহূর্তের মধ্যে সনাক্ত করতে পারে এই ব্রা। তবে এই গবেষণা সংক্রান্ত সমীক্ষা এখনও চলছে।

 

কেন আগ্রাসী হয়ে উঠছে স্তন ক্যানসার?

ক্যানসার আক্রান্ত কোষ

স্ত্রী-রোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, অপেক্ষাকৃত অল্পবয়সীদের মধ্যে থাবা বসাচ্ছে এই রোগ। যাঁদের বয়স ২৫-৫০। বর্তমান লাইস্টাইল, খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন, অতিরিক্ত নেশার প্রকোপ নানা করণেই ক্যানসারের প্রচলিত ওষুধ অনেক ক্ষেত্রেই কার্যহীন হযে পড়ছে। এমনও দেখা গেছে, প্রাথমিক পর্যায়ে রোগ ধরা পড়লেও কয়েক মাসের মধ্যে হু হু করে সেটা বেড়ে গিয়ে স্টেজ-ফোরে পৌঁছে যাচ্ছে। উন্নত মানের কেমোথেরাপিও রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। এক বার রোগ সেরে যাওয়ার কয়েক বছরের মধ্যে দ্বিতীয়বার ক্যানসারের কবলে পড়েছেন এমন উদাহরণ অজস্র।

সুতরাং, প্রথম স্টেজে ধরা পড়লে স্তন ক্যানসার সম্পূর্ণ সেরে যাবে, এই ধারণাও সব সব সঠিক প্রমাণিত হচ্ছে না। স্বাস্থ্য মন্ত্রকের সাম্প্রতিকতম তথ্য অনুযায়ী, ভারতে ৭-৮ বছর আগেও এই ধরনের স্তন ক্যানসার হতো মোট স্তন ক্যানসার-আক্রান্তদের ১০-১৫ শতাংশের। এখন যা দাঁড়িয়েছে ৩১-৪০ শতাংশ। চিকিৎসাশাস্ত্রে এর নামট্রিপল নেগেটিভ ব্রেস্ট ক্যানসার।

স্তন ক্যানসার দ্রুত চিহ্নিত করার জন্য আল্ট্রাসোনোগ্রাফি বা ম্যামোগ্রাফির মতো পদ্ধতি রয়েছে। এতে স্তনের স্থিতিস্থাপকতা কমে যাওয়া ধরা পড়বে যা স্তন ক্যানসারের অন্যতম ইঙ্গিতবাহী। তবে যে কোনও রোগেরই আগাম সতর্কতা এবং প্রয়োজনীয় সচেতনতা দরকার, যেটা অধিকাংশেরই নেই।

বছর উনিশের জুলিয়ান তার আবিষ্কারের জন্য আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে। স্তন ক্যানসার নিয়ে গোটা বিশ্বেই অনেক কর্মশালা এবং প্রসার-প্রচার চলছে। তবে নিজে থেকে সচেতন না হলে এই রোগ প্রতিকার করার সাধ্য কারোর নেই। স্ত্রী-রোগ বিশেষজ্ঞরাই বলেন, অনেক মহিলা স্তনে মাংসপিণ্ড টের পেয়েও পুরুষ ডাক্তারকে কী ভাবে দেখাবেন, কোথায় মহিলা ডাক্তার খুঁজবেন, এটা ভাবতে ভাবতে দেরি করে ফেলেন। আবার অনেক পুরুষও চিকিৎসকের কাছে আসতে দেরি করেন। কারণ স্তন ক্যানসার যে ছেলেদেরও হয়, এই ধারণাটাই অনেকের নেই।

The Wall-এর ফেসবুক পেজ লাইক করতে ক্লিক করুন 

Shares

Comments are closed.