বুধবার, জানুয়ারি ২২
TheWall
TheWall

বিরিয়ানি-কাবাবে নবাবি আভিজাত্য, ’অওধ ১৫৯০’-এ মন কাড়ে আখতারির গান

Google+ Pinterest LinkedIn Tumblr +

চৈতালী চক্রবর্তী

কথায় বলে মাছে-ভাতে বাঙালি। তবে বাবুয়ানিতে বাঙালি কিছু কম নয়। ভাত-ডাল-মাছের অম্বলে অরুচি মানেই পাতে গরম বিরিয়ানির আমদানি করতে বাঙালি কখনও পিছপা হয়নি। দেশি আভিজাত্য যদি হয় পোলাও-কালিয়া তাহলে ভিন্ দেশি থুড়ি লখনউই আভিজাত্যের প্রলেপ মাখানো মাংস সর্বস্ব আতরগন্ধী ভাতের মোহ বাঙালি আজও কাটাতে পারেনি। বরং সেটা উত্তরোত্তর বেড়েছে। বাঙালি স্টাইলে হোক বা অওয়াধি স্টাইলে বিরিয়ানির ব্যাপারে বাঙালি কখনও ভেদাভেদ করে না, আজও করেনি। তাই বিরিয়ানির অওয়াধি ঘরানাকে আজও বজায় রেখেছে ’অওধ ১৫৯০’ ।

কলকাতার বিরিয়ানি মানেই নরম তুলতুলে মাংস আর গরম ধোঁয়া ওঠা সুগন্ধী চালের ফাঁক দিয়ে উঁকি দেওয়া পেলব আলু। অওয়াধি ঘরানা অবশ্য কখনওই আলুকে জাতে তোলেনি। তবে সুদূর লখনউ থেকে নবাবের হাত ধরে কলকাতায় এসে বিরিয়ানিতে এই নয়া সংযোজন শুধুমাত্র বাঙালির রসনাকে তৃপ্ত করতেই তৈরি। তার ব্যতিক্রম নয় অওধ রেস্তোরাঁও। খাস লখনউ নবাবি মহলের চাকচিক্য রেস্তোরাঁর আনাচ কানাচে, পরিবেশনের থালা-বাটিতে, রান্নার কৌশলে আর বাবুর্চিদের হাতের জাদুতে।

অওধ রেস্তোরাঁর গোড়াপত্তন অবশ্য দুই ভাই শিলাদিত্য এবং দেবাদিত্য চৌধুরীর হাত ধরেই হয়েছে। দেশপ্রিয় পার্ক থেকে বিবেকানন্দ পার্ক ছুঁয়ে বর্তমানে সল্ট লেকেও খুলেছে এই রেস্তোরাঁর শাখা। বিরিয়ানিপ্রেমীদের নবাবি মহলের আমেজ দিতে রেস্তোরাঁর প্রতিটা কোণা নিখুঁত কারিগরি দক্ষতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। কারণ শুধু খাবার খেলেই তো হল না, তার সঙ্গে পরিপাটি সাজে পরিবেশের মাধুর্য খাবারে একটা অন্য মাত্রা এনে দেয়। আর বাঙালি মানেই বাবুয়ানি তার প্রতিটি শিরা-উপশিরায়। তাই অওধে কান পাতলে নবাব ওয়াজিদ আলির সরোদের শব্দ আজও শোনা যায় কিনা জানা নেই, তবে সুস্বাদু খাবারের সঙ্গে সেখানে সঙ্গত করে আখতারির গান।

বিরিয়ানির অরিজিন অবশ্য সুদূর পারস্য দেশে। সেখান থেকে ইরানি পর্যটক ও বণিকদের হাত ধরে তার ভারতে আগমন। ভেড়া বা মুরগির মাংস সুগন্ধি সব মশলা ও ঘি মাখিয়ে, রাতভর ম্যারিনেট হয়ে, তবে তা আলিবাবাদের দেশে সার্ভ হত। এখন অবশ্য আর সেদিন নেই। তবু স্বাদে ও স্বতন্ত্রতায় বিরিয়ানি এখন বহুরূপে হাজির। নবাবের হায়দরাবাদের কিচেনে এক সময় শুনেছি, ঊনপঞ্চাশ রকম বিরিয়ানির চল ছিল। তার মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত ছিল কাচ্চি আখনি বিরিয়ানি। আর তৎকালীন অওধ রাজ্যের (অযোধ্যা) রাজধানী লখনউ-এর নবাব ওয়াজিদ আলি শাহের পছন্দের তালিকায় ছিল তাঁর বাবুর্চিদেরই তৈরি ‘অওয়াধি বিরিয়ানি’। ‘দমপোখ্‌ত’ বা ঢিমে আঁচে রান্না তিনিই নিয়ে আসেন কলকাতায়, বিশেষ করে বিরিয়ানি। এই ‘দমপোখ্‌ত’ই হল মুঘল আমলে লখনউ বাবুর্চিদের তৈরি রান্নার বিশেষ কৌশল যা ‘অওয়াধি কৌশল’ নামেও পরিচিত। অওধ রেস্তোরাঁ সেই ঘরানাই ধরে রেখেছে আজও।

খাস লখনউ শহর থেরে বাবুর্চি আনিয়ে রান্নার চল এখনও রয়েছে। দারুচিনি, লবঙ্গ ও এলাচের অনন্য ফ্লেভারে সুরভিত হলুদ ভাতের ফাঁকে ফাঁকে আলু ও মাংস গুঁজে হাঁড়িতে পুরে অওধ সটাইল হান্ডি বিরিয়ানি চাখতে চাখতেই পাতে চলে আসবে তুলতুলে গলৌটি কাবাব। চাইলেই কাকরি কাবাব, শাম্মি কাবাব, বটি কাবাব থেকে শিখ কাবাব-আপনার থালা আলো করবে। চামচ আর প্লেটের সঙ্গে সন্ধি করে জগৎ-সংসার ভুলে যত খুশি কাবাব খান, কে বারণ করেছে! মাংসে অরুচি হলে মারকাটারি মাছেরও নানা পদ হাজির করবেন শেফেরা। মাহি চাপ, ঝিঙ্গা বিরিয়ানি, মাহি কোফতার নাম না শুনে থাকলেও জিভের সঙ্গে একটিবার পরিচয় করাতে ভুলবেন না।

ভোজবিলাসে বাঙালি কখনও কার্পণ্য করেনি। পকেটে দু’পয়সা আমদানি মানেই কব্জি ডুবিয়ে কাবাব-কালিয়া-কোর্মা। সেই ট্রাডিশন এখনও চলছে। পুজো থেকে নববর্ষ, বড়দিন থেকে জামাইষষ্ঠী- উৎসব মানেই হোটেল-রেস্তোরাঁয় কচাকচ মুরগি-মটনের চর্বচোষ্য করে তবেই বাঙালির আশ মেটে। সে ক্ষেত্রে সাধারণ কোফতা-কারিকে একটু সরিয়ে রেখে অওধ স্পেশাল নার্গিসি কোফতা, মুর্গ ইরানি, মাহি কালিয়া, নেহারি খাস, রান বিরিয়ানি, পুর্দা বিরিয়ানি, মোটি বিরিয়ানি চেখে দেখলে ক্ষতি কি! ঝালে-ঝোলে-অম্বলে জিভের আড় ভাঙতে বাঙালি মন একটু মিষ্টি মিষ্টি করেই। সেখানেও নিরাশ করেনি অওধ। ফিরনির সঙ্গে শাহি টুকরা আপনার রসনায় ঝড় তুলবেই।

ধর্ম-জাত-সংস্কৃতি নিয়ে যতই হুলস্থুল থাক না কেন, এ শহর প্রতদিনই আপন করে নিচ্ছে ভিন্ ধর্ম, ভিন্ জাতের খাবারকে। আর বিরিয়ানি তো সেখানে আত্মার আত্মীয়। এ খাবারের ভাগ কোনওদিনও হবে না। এ যুগে বাঙালির সঙ্গে বাবুয়ানি থাক বা না থাক, পাতে যেন তার বিরিয়ানিটা শেষ দিন অবধি থেকে যায়। আর বিরিয়ানি-কাবাব মানেই তার সেরা ঠিকানা যে ‘অওধ ১৫৯০’ সেটা বলাই বাহুল্য। তবে,  ‘বাকিটা ব্যাক্তিগত’, কারণ অওধের  স্বাদের গোপন জাদুমন্ত্রটা মোটেই ফাঁস করা যাবে না।

Share.

Leave A Reply