মাত্র ২২ বছরে ট্রান্স-হিমালয় সাইকেলে, বাংলার অ্যাডভেঞ্চার-আকাশে উজ্জ্বল ‘জ্যোতিষ্ক’ করিমপুরের তরুণ

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    তিয়াষ মুখোপাধ্যায়

    কিলোমিটারের অঙ্ক, ৭ হাজার ৮৯১। দিনের হিসেব, ১৮৬। অথচ বয়স, মাত্র ২২।

    দু’চাকায় দুনিয়া না হলেও, দু’চাকায় গোটা হিমালয়কে আড়াআড়ি ভাবে চষে ফেলে বাংলার অভিযাত্রী মহলে সে এক উজ্জ্বল ‘জ্যোতিষ্ক’। শুধু সাফল্যে নয়, নামেও তাই। করিমপুরের জ্যোতিষ্ক বিশ্বাস। সাইকেলে করে পশ্চিম প্রান্ত থেকে পূর্ব প্রান্তে ট্রান্স হিমালয় অভিযান সদ্য শেষ করে ঘরে ফিরছেন। ফিরেই মায়ের হাতের পনির রান্না খাবেন। তার আগে, জলপাইগুড়ি থেকেই এক্সক্লুসিভ সাক্ষাৎকার দ্য ওয়ালকে।

    একা একাই বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়েছিলেন এক চাঁদিফাটা রোদের দিনে। ১৩ মে। সঙ্গী একটা সাইকেল, আর ছোট্ট স্যাডেল ব্যাগে ও ন্যাপস্যাকে গোছানো কিছু জিনিস। উদ্দেশ্য, কাশ্মীরের গুলমার্গ থেকে অরুণাচলের পাসিঘাট পর্যন্ত সাইকেল সফর। তবে পাহাড়ি পথে এত দিন ধরে এত প্রতিকূল একটা যাত্রাকে শুধু সফর বলা যায় না, এ যেন এক স্বপ্নের অভিযান। শুধু পথ নয়, শুধু হিমালয়ের সৌন্দর্য নয়। নয় শুধু সাইকেল চালানোর ক্লান্তিও। এ সব কিছুর সঙ্গে মিশে গিয়েছে অনেক মানুষ, অনেক অভিজ্ঞতা, অনেক শিক্ষা। সবটা মিলিয়ে যেন জীবনের এক রূপকথা-সম অধ্যায়। মাত্র বাইশ বছর বয়সেই যাকে প্রত্যক্ষ করে ফেললেন জ্যোতিষ্ক।

    অভিযানের মানচিত্রটা এক বার শুনে নেওয়া যাক জ্যোতিষ্কর মুখেই। করিমপুরের বাড়ি থেকে সাইকেল নিয়ে বেরিয়ে, পৌঁছোন সোজা কলকাতা। সেখান থেকে বারাণসী। তার পরে সেখান থেকে লক্ষ্ণৌ, দিল্লি হয়ে গুলমার্গ। শুরু হয় আসল অভিযান। গুলমার্গ থেকে পাড়ি দেন নুব্রা ভ্যালির দিকে। ডিসকি, হুন্ডার, তুরতুক হয়ে পৌঁছন ভারতের সব চেয়ে উত্তরের গ্রাম থ্যাং। তারপর খারদুং লা পেরিয়ে লে শহরে এসে, পরিচিত পথে মানালি। ফের রোতাং পাস পেরিয়ে স্পিতি ভ্যালি, বিশ্বের সর্বোচ্চ গ্রাম কিব্বের। তার পরে সিমলা দিয়ে বেরিয়ে আসেন নিজের রাজ্যের দিকে। এই বাংলার উত্তরের পথ ধরে উত্তর-পূর্বের আসাম। অরুণাচল প্রদেশের পাসিঘাটে গিয়ে যাত্রা শেষ হয় জ্যোতিষ্কের।

    এ তো গেল ভূগোলটুকু। কিন্তু ১৮৬ দিনের এই গোটা পর্বে অভিজ্ঞতা যেন ইতিহাস-সম। “আমার অভিযান শুরুর আগেই কুচবিহারে সব শেষ হয়ে যেতে বসেছিল। করতেই পারতাম না কিছু।”– বললেন জ্যোতিষ্ক। ভাগ করলেন, গোটা অভিযানের ভয়ঙ্করতম অভিজ্ঞতা। কোচবিহার থেকে সাত কিলোমিটার দূরের দাওয়াগুড়িতে, ভরসন্ধেয় সাত-আট জন ছিনতাইবাজের পাল্লায় পড়েন জ্যোতিষ্ক। মানিব্যাগ কেড়ে নেয় তারা। বিপদ বুঝে এক দৌড়ে পালান জ্যোতিষ্ক। আর তখনই পেছন থেকে উড়ে আসে একগাদা পাথর। “কান ঘেঁষে বেরিয়ে গিয়েছিল পাথরগুলো। একটা যদি মাথায় লাগত, সেখানেই শেষ।”– জ্যোতিষ্কর গলার স্বরে এখনও ট্রমা ধরা পড়ছে।

    তবে অভিজ্ঞতা এইটুকু নয়। কিছু পরে ওই স্থানীয় ছিনতাইকারীরা খবর পায়, তারা যার সঙ্গে এমন করল, সে ট্রান্স-হিমালয় সাইকেল অভিযানে বেরিয়েছে। খবর পেয়ে নিজেরাই গিয়ে মানিব্যাগ পেরত দিয়ে আসে জ্যোতিষ্ককে। ক্ষমাও চেয়ে নেয়। “একে তো ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম, তার মধ্যে ওরা আবার আমার কাছে এসেছে দেখে ভেবেছিলাম, এ যাত্রা আর বাঁচব না। কিন্তু আমায় চমকে দিয়ে ক্ষমা চাইল ওরা। ফেরত দিল মানিব্যাগও, হাজার টাকা ইনট্যাক্ট ছিল। বলল, ওরা বুঝতে পারেনি যে আমি এত বড় অ্যাডভেঞ্চারে বেরিয়েছি।”– বললেন জ্যোতিষ্ক।

    এরকমই আরও এক চমকের মুখোমুখি হয়েছিলেন স্পিতি ভ্যালিতে। কাজ়া থেকে বেরোনোর কয়েক কিলোমিটার পরেই সাইকেলের ব্রেক শ্যু খারাপ হয়ে সমস্যায় পড়েন জ্যোতিষ্ক। ফের কাজ়া ফিরে গিয়ে সাইকেল সারানোর প্রয়োজন। লিফ্ট পাওয়ার উদ্দেশে দাঁড়িয়েছিলেন, কাজ়া ফিরবেন বলে। জিপসি ভ্যান নিয়ে সামনে দাঁড়িয়েছিলেন বছর চল্লিশের বিদেশিনি। প্রথমে হিন্দিতে, তার পরে পরিচয় বিনিময় হওয়ার পরে ঝরঝরে বাংলায় কথা বলে মন জয় করে নিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ার কিম। বছর ১২ আগে ভারতে ঘুরতে এসে কলকাতার প্রেমে পড়েন কিম। প্রেমে পড়েন বাংলা ভাষার। তার পরেই শিখে নিয়েছেন নিজের উৎসাহে। বাঙালি সাইক্লিস্ট পেয়ে যারপরনাই খুশি তিনিও। শুধু তা-ই নয়, মাঝরাস্তায় জ্যোতিষ্ককে চমকে দিয়ে চটপট গাড়ি থেকে বার করে ফেলছিলেন সাইকেল সারানোর সরঞ্জাম। নতুন ব্রেক শ্যু-ও! কিছু ক্ষণের মধ্যেই প্রবলেম সলভড্! “তখন যেন আমার জন্যই ওইখান দিয়ে গাড়ি নিয়ে যাচ্ছিলেন কিম! ওঁর একটা হোটেল আছে কাজ়ায়, সেখানে সাইকেল সারানোর ব্যবস্থা আছে। সেই সব জিনিসপত্রই কিনে নিয়ে যাচ্ছিলেন গাড়ি করে, পথে পড়ে গেলাম আমি! অপ্রত্যাশিত ভাবে সাহায্য পেলাম!”– কৃতজ্ঞতা উপচে পড়ে জ্যোতিষ্কর গলায়।

    শুধু মানুষ নয়, চমকে দিয়েছে পরিস্থিতিও। খারদুং লা পাস পেরিয়ে লে-র দিকে নামার সময়ে যখন বিশাল ট্রাকটা প্রায় পিষে দিচ্ছিল, তখন আর কোনও উপায়ই ছিল না বাঁচার। ডান দিক ঘেঁষে বাঁক নিচ্ছিল ইয়াব্বড় ট্রাকটা, আর বাঁ দিক ঘেঁষে চালাচ্ছিলেন জ্যোতিষ্ক। ট্রাক আর সাইকেলের মাঝে কয়েক মিলিমিটারও আর তফাত নেই প্রায়, এ দিকে বাঁ দিকে আর একটুও জায়গা নেই। খাড়াই খাদ নেমে গিয়েছে। “ওই মুহূর্তটা আর মনে নেই আমার। শুধু মনে আছে, একটা বড় পাথরে সামনের চাকাটা বাউন্স করল। আর আমি সটান ডান দিকে ছিটকে পড়লাম সাইকেল নিয়ে। চলন্ত ট্রাকের সামনে দিয়েই। ট্রাকটা বেরিয়ে গেল। পাথরটা না থাকলে চাকা বাউন্স করত না, চাপাই পড়তাম বোধ হয়। অথবা খাদে পড়ে যেতাম সাইকেল নিয়ে। কী ভাবে যে বাঁচলাম!”– উত্তেজনা সামলাতে পারেন না জ্যোতিষ্ক।

    দেখে নিন, জ্যোতিষ্কর অভিযানের কিছু ঝলক।

    তবে গোটা অভিযানে সব চেয়ে বেশি মন ছুঁয়ে যাওয়া মুহূর্ত মনে করতে গিয়ে দুই অসমবয়সি মানুষের কথা জানালেন জ্যোতিষ্ক। সত্তর ছুঁই-ছুঁই মাইকেল, ইংল্যান্ডের সাইক্লিস্ট। কয়েক মিনিটের পরিচয়ে জ্যোতিষ্ককে শিখিয়েছেন অ্যাডভেঞ্চারের প্রকৃত অর্থ। স্পিডোমিটার নেই, ক্যামেরা নেই, এমনকী একটা স্মার্টফোনও নেই। এভাবেই ৩০ বছর ধরে পাহাড়ে পাহাড়ে সাইকেল নিয়ে ঘুরছেন মাইকেল। চল্লিশ বছর বয়সে বিবাহবিচ্ছেদ হওয়ার পর থেকে পথই সঙ্গী। “আমরা অভিযান বলতে যা যা বুঝি, তার একটা বড় অংশ থাকে, শো অফ। নিজের কাছে, মানুষের কাছেও। আমি কতটা চালালাম, কত ভাল ছবি তুললাম, আর পাঁচ জনকে কতটা অবাক করতে পারলাম… এ সব কিছু মিলিয়ে আমরা অ্যাডভেঞ্চার করি। কিন্তু মাইকেল শেখাল, অ্যাডভেঞ্চার মানে হারিয়ে যেতে হবে। নিজেকে নিয়ে। অন্যের জন্যে নয়, নিজের জন্য। সেখানে ভাল-খারাপের মাপকাঠি নেই, প্রশংসা-সমালোচনার ফাঁদ নেই। সবটাই নিজের আনন্দ এবং নিজের ইচ্ছে। এখানে কিলোমিটারের অঙ্ক, ক্যালেন্ডারের হিসেব– এ সবই গৌণ।” বললেন জ্যোতিষ্ক।

    আর অন্য দিকে, মাত্র ১৮ বছর বয়সে একা সাইকেল নিয়ে জার্মানি থেকে ভারতে চলে আসা সদ্য-তরুণী শার্লট। “ওইটুকু মেয়ে, কিন্তু কী অসমসাহস! কী ভীষণ পরিণত! আমার প্রতিদিন খেতে বসে খাবার নষ্ট করা অভ্যেস। ছোট থেকে অনেক বকুনি খেয়েও কারও কথা শুনিনি। কী সুন্দর করে বোঝাল শার্লট, আর আমি নষ্ট করি না খাবার।”– বললেন জ্যোতিষ্ক। বিশ্বশান্তির বার্তা নিয়ে টেমস নদী বরাবর সাইকেল অভিযানের স্বপ্ন বেঁধেছেন শার্লটের সঙ্গে। ঠিক করেছেন, দু’জনেই প্রতি মাসে একটা করে গাছ লাগাবেন। পুরোপুরি নিরামিশাষি হয়ে যাওয়ারও চেষ্টা করবেন তাঁরা। শার্লটের কথা বলতে গিয়ে জ্যোতিষ্ক অবশ্য বারবার মনে করিয়ে দিতে ভুললেন না, “ও কিন্তু ‘শুধুই’ আমার বন্ধু।”

    শৈশবে অরুণাচল প্রদেশে অনেকটা সময় কাটিয়েছেন জ্যোতিষ্ক। পাহাড় ভালবাসার সেই শুরু। মা জয়ন্তী বিশ্বাস খুব ভালবাসতেন গাছপালা। সব সময় তকতকে রাখতেন ঘরদোর। ছোট্ট জ্যোতিষ্কের বুকে তখন থেকেই বীজ বোনা হয়েছিল প্রকৃতিপ্রেমের। “আমার মায়ের তো নামেই পাহাড়। মা কখনও তেমন আলাদা করে কিছু করত না, কিন্তু প্রতিটা মুহূর্তে পাহাড়ের প্রতি, প্রকৃতির প্রতি মায়ের ভালবাসা কোনও না কোনও ভাবে ফুটে উঠত। আমারও ভীষণ ভাল লাগতে শুরু করে পাহাড়। বন্ধু তেমন ছিল না তখন। সঙ্গী বলতে প্রকৃতি আর পাহাড়ই বুঝতাম। বয়স যত বেড়েছে, একটু একটু করে গাঢ় হয়েছে সম্পর্ক। বড় হওয়ার সময়ে স্বপ্ন দেখতাম, অনেক ঘুরব পাহাড়ে। কিন্তু কী ভাবে সম্ভব হবে জানতাম না। অনেকেই বলেছিল পারবি না। তাতেই জেদ চেপে যায়। পারব কি না দেখতে গতবছর সাইকেল নিয়ে মেঘালয় চলে যাই। দেখলাম বেশ তো পারি। বেড়িয়ে পড়লেই হয়। এক সময় বেরিয়ে পড়লাম। সাইকেল নিয়েই। তখনও আনন্দটাই আসল লক্ষ্য ছিল, অভিযানটা নয়। তার পরে আস্তে আস্তে হয়ে গেল পুরোটাই।”– বললেন জ্যোতিষ্ক।

    গত বছর সাইকেলেই ট্রান্স হিমালয় অভিযান করেছিলেন বাংলার আরেক যুবক চন্দন বিশ্বাস। জ্যোতিষ্কর অন্যতম অনুপ্রেরণা এই চন্দন। চন্দন বললেন, “মাত্র এই বয়সে ওর এই সাফল্য কল্পনাতীত। আমরা যারা এ ধরনের অ্যাডভেঞ্চার করি, তারা জানি কত প্রতিকূলতা সামাল দিয়ে বেরোতে হয়। সেখানে ও রীতিমতো উদাহরণ। চোখধাঁধানো হাজার স্পোর্সের ভিড়ে ও যে সাইকেল বেছে নিয়ে পাহাড় পাড়ি দিল, গোটা হিমালয় চষে সুস্থ অবস্থায় ঘরে ফিরতে পারল– রীতিমতো অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার। ওর অভিযান জীবনের প্রতি অসংখ্য শুভেচ্ছা রইল।”

    বাংলার আর এক এভারেস্টজয়ী পর্বতারোহী সত্যরূপ সিদ্ধান্ত না থাকলে অভিযানটা হয়তো হতোই না, জানালেন জ্যোতিষ্ক। বললেন, “দাদা অনেকটা স্পনসর জোগাড় করে দিয়েছেন। নইলে এত টাকা কোথায় পেতাম! উনি সাহায্য না করলে অভিযান হয়তো হতো, কিন্তু এত বড় করে হতো না। সফলও হতো না হয়তো।”

    আর সত্যরূপের কথায়, “এই নবীন অভিযাত্রীরাই তো আমাদের গর্ব। ওদের তো সাহায্য করতেই হবে। নইলে নতুন প্রতিভাগুলো সুযোগ পাবে কী করে! জ্যোতিষ্ক আমাদের চমকে দিয়েছে। এতগুলো দিন সাইকেল নিয়ে পাহাড়ে কাটানো যে কী কঠিন, সেটা যাঁরা পাহাড়ে যান তাঁরাই বুঝবেন। জ্যোতিষ্ক সমস্ত বাধা হারিয়ে দিয়েছে, বাংলার মুখ উজ্জ্বল করেছে। জ্যোতিষ্ককে দেখে আরও অনেকে এগিয়ে আসুক, আরও অনেকে ভালবাসুক পাহাড়কে। মন থেকে এটাই চাই।”

    জ্যোতিষ্কর স্বপ্ন এবার দক্ষিণ আমেরিকা। বলিভিয়া থেকে আর্জেন্টিনা, আন্দিজ পাহাড়ে ১০ হাজার কিলোমিটারের সাইকেল অভিযান। পর্যাপ্ত স্পনসরশিপ জোগাড় করতে পারলেই বেরিয়ে পড়বেন।

    এ দিকে, করিমপুরের বাড়িতে ছেলে ফেরার অপেক্ষায় দিন গুনছে জ্যোতিষ্কের পরিবার। “ও ছোট থেকেই অন্য রকম। ভীষণ ভালবাসে পাহাড়। বেরিয়ে পড়ল এভাবে, ভয় একটু পেয়েছিলাম। কিন্তু ও যা করে দেখাল, তাতে সত্যিই ভীষণ ভাল লাগছে।” — জ্যোতিষ্কর বাবা, পেশায় স্কুলশিক্ষক নীতিশ বিশ্বাসের গলায় গর্ব চাপা থাকে না। মা জয়ন্তী অবশ্য চিন্তায় করছেন একটু। টানা সাইক্লিংয়ের ফলে বেশ দুর্বল হয়ে পড়েছেন জ্যোতিষ্ক। এমনকী তাঁর ওজনও প্রায় অর্ধেক হয়ে গিয়েছে। আপাতত ছেলেকে চোখে দেখার অপেক্ষাতেই দিন কাটছে মায়ের।

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

You might also like

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More