বৃহস্পতিবার, মার্চ ২১

ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড কমায় প্রি-ম্যাচিওর ডেলিভারির আশঙ্কা!

চৈতালী চক্রবর্তী

নির্দিষ্ট সময়ের আগে জন্ম, বা জন্মের সময় অতিরিক্ত কম ওজন ভবিষ্যতে নানা শারীরিক সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারে। চিকিৎসরা জানাচ্ছেন, প্রি-ম্যাচিওর বার্থ শুধুই শারীরিক নয়, ডেকে আনতে পারে নানা রকমের মানসিক সমস্যাও। এই ধরনের শিশুদের ভবিষ্যতে দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল থাকে, মানসিক রোগে আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনাও থাকে অনেক বেশি। বিজ্ঞানীরা বলছেন প্রি-ম্যাচিওর বা প্রি-টার্ম ডেলিভারির (Preterm Delivery) ঝুঁকি কমাতে পারে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড।

স্বাভাবিক গর্ভাবস্থার সময় স্থায়ী হয় ৩৮-৪২ সপ্তাহ। তার আগেই শিশুর জন্ম হয়ে গেলে তাকে প্রি-টার্ম বার্থ বলে। ‘সাউথ অস্ট্রেলিয়ান হেলথ অ্যান্ড মেডিক্যাল রিসার্চ ইনস্টিটিউটের(SAHMRI)’ গবেষকরা জানিয়েছেন, গর্ভকালীন সময় নিয়মিত ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট নিলে প্রি-ম্যাচিওর ডেলিভারির ঝুঁকি কমে প্রায় ৪২ শতাংশ। কম ওজনের শিশু জন্মের সম্ভাবনা কমে প্রায় ১০ শতাংশ।

অধ্যাপক ও গবেষক ফিলিপে মিডলটনের কথায়, প্রি-টার্ম ডেলিভারি রোখার সেরকম কোনও নির্দিষ্ট উপায় নেই, সাবধানতা ও সঠিক ডায়েটই সে ক্ষেত্রে আদর্শ।  নির্দিষ্ট সময়ের আগে প্রসব ও গর্ভপাত রোধ করার জন্য নানা রকম গবেষণা চলছে বহু বছর ধরেই। তার মধ্যে একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট অনেকটা হলেও প্রি-ম্যাচিওর ডেলিভারির ঝুঁকি কমাতে সক্ষম।

কী ভাবে কাজ করে এই ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট?

পরীক্ষার জন্য SAHMRI এর গবেষকরা ১৯,৯২৭ জন মহিলার উপর সমীক্ষা চালান। এঁদের প্রত্যেকেই গর্ভকালীন নানা সমস্যার শিকার। গর্ভাবস্থার ১২ সপ্তাহের মধ্যে এই মহিলাদের প্রত্যেককে ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট দেওয়া শুরু হয়। প্রত্যেকের শারীরিক গঠন ও গর্ভকালীন নানা উপসর্গ দেখে ৫০০-১০০০ মিলিগ্রাম ডোজের সাপ্লিমেন্ট (কম করেও যে সাপ্লিমেন্টগুলির মধ্যে ৫০০ মিলিগ্রাম DHA রয়েছে) দেওয়া শুরু হয়। দেখা গেছে, প্রত্যেকেই নির্দিষ্ট সময়ে সুস্থ সন্তানের জন্ম দিয়েছেন।

ডঃ মল্লিনাথ মুখোপাধ্যায়

অস্ট্রেলিয়ার বিজ্ঞানীদের এই গবেষণা সম্পর্কে বিশদে জানতে ‘দ্য ওয়াল’-এর তরফে অ্যাপোলো গ্লেনেগেলস হাসপাতালের ইউরো-গাইনোকোলজিস্ট ডঃ মল্লিনাথ মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। প্রি-ম্যাচিওর ডেলিভারি রুখতে ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট কতটা জরুরি? আদৌ কি এই সাপ্লিমেন্ট প্রি-টার্ম ডেলিভারির ঝুঁকি কমাতে পারে? মল্লিনাথবাবু জানালেন, প্রি-টার্ম ডেলিভারি নিয়ে বিশ্বব্যাপী নানা গবেষণা চলছে। নানান ধরনের সাপ্লিমেন্ট নিয়ে বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করছেন। তার মধ্যে রয়েছে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিডও। ডাক্তারবাবুর কথায়, “এই সাপ্লিমেন্টের কোনও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই। যদিও গবেষণাটা এখনও পরীক্ষাধীন। তবে কিছু ক্ষেত্রে দেখা গেছে এই সাপ্লিমেন্ট নেওয়ায় সুফল মিলেছে।” কম ওজনের শিশুর জন্ম দিয়েছেন এমন মহিলা বা প্রি-ম্যাচিওর ডেলিভারি আগে হয়েছে এমন মহিলাদের এই সাপ্লিমেন্ট দেওয়ার ফলে দেখা গেছে তাঁরা পরবর্তী কালে সুস্থ ও স্বাভাবিক ওজনের সন্তানের জন্ম দিয়েছেন।

প্রি-ম্যাচিওর ডেলিভারি কী?

স্বাভাবিক গর্ভাবস্থা স্থায়ী হয় সাধারণত ৪০ সপ্তাহ। প্রসবের সময় এগিয়ে এলে জরায়ু সঙ্কুচিত হয় (Cervix), জরায়ুর মুখ পাতলা হয়ে খুলে যায়, ফলে বাচ্চা বেরিয়ে আসতে পারে। স্বাভাবিক গর্ভাবস্থায় এই প্রক্রিয়া হয় ৩৭-৪২ সপ্তাহের মধ্যে। কোনও কারণে যদি ৩৭ সপ্তাহের আগেই গর্ভবতী মহিলার নিয়মিত জরায়ু সঙ্কোচন শুরু হয় এবং জরায়ুর মুখ খুলে গিয়ে সন্তান প্রসব হয়ে যায় তখন তারে প্রি-টার্ম ডেলিভারি বলে। প্রি-ম্যাচিওর লেবারও (Premature Labour) বলা হয়ে থাকে।

মল্লিনাথবাবু জানালেন, প্রি-টার্ম লেবার হলে প্রি-টার্ম বার্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে। যদি গর্ভাবস্থার ২০-৩৭ সপ্তাহের মধ্যে বাচ্চা প্রসব হয় তবে তাকে প্রি-টার্ম বার্থ বলে এবং সেই বাচ্চা হয় প্রি-ম্যাচিওর। তবে, সব ক্ষেত্রেই যে প্রি-টার্ম লেবার হলে বাচ্চা প্রি-ম্যাচিওর হবে তার কোনও মানে নেই। অনেক সময় গর্ভকালীন জটিলতা Preeclampsia Affects এর কারণে গর্ভের মধ্যে শিশুর বৃদ্ধি বন্ধ হয়ে যাওয়া বা শিশুর মৃত্যু হতে পারে। তেমন সম্ভাবনা দেখা দিলে ৩৭ সপ্তাহের আগেই সিজার করে বাচ্চা বার করে আনা হয়।

আরও পড়ুন: মহিলাদের আতঙ্ক পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম(PCOS)! সত্যিই কি আতঙ্ক? কী বলছেন গাইনোকোলজিস্ট?

কেন হয় প্রি-ম্যাচিওর ডেলিভারি?

অনেকগুলো কারণে নির্দিষ্ট সময়ের আগে সন্তান প্রসব হয়ে যেতে পারে।

  • আগে যদি প্রি-টার্ম ডেলিভারি হয়ে থাকে তবে পরবর্তীতে ফের সেটা হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়।
  • মায়ের জরায়ুতে সঙ্কোচন বা Cervix-এর সমস্যা থাকলে প্রি-টার্ম ডেলিভারি হয়।
  • অনেক কম বয়সে (১৭ বছরের নীচে) গর্ভবতী হলে, বা বেশি বয়সে (৩৫ বছরের উপরে) প্রি-টার্ম ডেলিভারির ঝুঁকি থাকে।
  • গর্ভে যমজ বা একাধিক সন্তান থাকলে Amniotic fluid –এর পরিমাণ বেশি হয়ে নির্দিষ্ট সময়ের আগেই সন্তান প্রসব হয়ে যেতে পারে।
  • মায়ের যদি রক্তাল্পতা বা ডায়াবেটিস থাকে তাহলেই প্রি-টার্ম ডেলিভারি হতে পারে।
  • তা ছাড়া সিগারেট, অ্যালকোহল বা অন্য কোনও নেশায় আসক্তি থাকলে এবং গর্ভকালীন সময়েও নেশার অভ্যাস থাকলে এই ঝুঁকি অনেক বাড়ে।
  • প্রি-ন্যাটাল কেয়ার বা গর্ভকালীন পরিচর্যা না হলেও প্রি-টার্ম ডেলিভারির সম্ভাবনা অনেক বাড়ে।

ডাক্তারবাবুর কথায়, যৌনাঙ্গের সংক্রমণের কারণেও প্রি-টার্ম ডেলিভারি হতে পারে। কিডনিতে সংক্রমণ, নিউমোনিয়া বা প্লাসেন্টার (প্লাসেন্টা গর্ভাবস্থায় জরায়ুর ভিতরে দেওয়ালে তৈরি হয়। বেড়ে ওঠা ভ্রুণকে অক্সিজেন ও প্রয়োজনীয় পুষ্টি উপাদান সরবরাহ করে এবং শিশুর বর্জ বহিষ্কার করে) কোনও জটিলতা তৈরি হলে যেমন— প্লাসেন্টা প্রিভিয়া (Placenta Previa), প্লাসেন্টা অ্যাকরিটা (Placenta Accreta) বা প্লাসেন্টাল অ্যাবরাপশন (Placental Abruption) হলে প্রি-টার্ম ডেলিভারির ঝুঁকি বাড়ে। সে ক্ষেত্রে ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট এই প্লাসেন্টার জটিলতা অনেকটাই আটকাতে সক্ষম।

কী কী উপসর্গ দেখে বুঝবেন প্রি-টার্ম ডেলিভারির সম্ভাবনা রয়েছে?

  • যোনিপথে নির্গত স্রাবের পরিমাণ বাড়লে সতর্ক হওয়া উচিত।
  • অনেক সময়েই প্রি-টার্ম ডেলিভারি হওয়ার আগে যোনিপথে রক্ত বা কোনও রকম স্পট দেখা যায়।
  • ৩৭ সপ্তাহের আগেই জরায়ুর সঙ্কোচন অস্বাভাবিক বেড়ে গেলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া প্রয়োজন। সেই সঙ্গে তলপেটে ব্যথা, কোমর ও পিঠে ব্য়থা চিন্তার কারণ।
  • পেলভিক প্রেসার বেড়ে গেলে সতর্ক হতে হবে।

প্রি-ম্যাচিওর বাচ্চা জন্মের পরই নানা শারীরিক সমস্যায় ভোগে। অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় তার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ, শ্বাসের সমস্যা রয়েছে, হৃদস্পন্দন অত্যন্ত দুর্বল। তা ছাড়া, জন্ডিস, অ্যানিমিয়া, নানা ধরণের সংক্রমণ শিশুর শরীরে বাসা বাঁধে সহজেই। ডাক্তারবাবু জানালেন, সতর্ক হওয়াটা সবচেয়ে জরুরি। বিশেষত গর্ভকালীন সময় মায়ের পরিচর্চা ও নিয়মিত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়াটা দরকার। বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নিয়েই যে কোনও সাপ্লিমেন্টের ডোজ ঠিক করুন, আপনি যদি ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড সাপ্লিমেন্ট নিতে চান তাহলেও চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়েই।

Shares

Comments are closed.