খুঁজে পেলাম ব্যোমকেশের ‘খোকা’-কে…

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

    আজ ২২ শে সেপ্টেম্বর ব্যোমকেশ বক্সীর স্রষ্টা সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের আটচল্লিশতম মৃত্যু দিবস। দিন দুয়েক আগে মুম্বই শহরে খুঁজে পাওয়া গেল শরদিন্দুর কনিষ্ঠ পুত্র শান্তনু ব্যানার্জীকে। এক সান্ধ্য আড্ডায় পুত্র শান্তনুর নিবিড় স্মৃতিচারণায় উঠে এল পিতা শরদিন্দু সম্বন্ধে নানা অজানা তথ্য। শুনলেন অর্ঘ্য দত্ত

    যদিও এঁর বয়স নব্বই ডিঙিয়েছে। নামও খোকা নয়। তবু ব্যোমকেশের গল্পগুলো পড়তে পড়তে আমাদের যেমন মনে হতো ব্যোমকেশ এবং তার স্রষ্টা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় যেন একই ব্যক্তি, তারা যেন মিলেমিশে একাকার, তেমনি এনাকেও প্রথম দেখেই কেন জানি আমার মনে হল, ইনিই ব্যোমকেশের সেই খোকা। এতদিনে যেন আসল ‘খোকা’-কে খুঁজে পেলাম! এনার নাম শান্তনু ব্যানার্জী। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের একমাত্র জীবিত পুত্র। আর হ্যাঁ, ইনি নিজের নামের পরে বন্দ্যোপাধ্যায় নয়, ব্যানার্জীই লেখেন।

    একদিন সন্ধ্যাবেলায় সটান হাজির হলাম ওঁর ফ্ল্যাটে। মুম্বইয়ের আন্ধেরি অঞ্চলে। একমুখ হাসি নিয়ে যে মানুষটি অভ্যর্থনা করলেন তার বয়স যাই হোক, তার শরীরী ঋজুতায়, কথা বলার উৎসাহ ও উত্তেজনায়, অম্লান স্মৃতিতে, বন্ধুত্বপূর্ণ আন্তরিকতায় আমার তাকে যুবক বলেই মনে হচ্ছিল। লক্ষ করছিলাম সোফার পেছনে দেওয়ালে টাঙানো পিতা শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় তেল রঙে আঁকা পোট্রেটের সঙ্গে ওর মুখের মিলটুকুও। সেই বুদ্ধিদীপ্ত উজ্জ্বল চোখ, তীক্ষ্ণ নাক, ধারালো চিবুক।

    “আপনিই তাহলে ব্যোমকেশের খোকা? আপনাকে কি আপনার বাবা খোকা বলেই ডাকতেন?”

    হাসলেন একচোট। তারপর বললেন, ” না, না, বাবা তাঁর তিন পুত্রের কাউকেই খোকা বলে ডাকতেন না। সবার আলাদা আলাদা ডাকনাম ছিল। আমাকে ডাকতেন টুনু বলে”

    “ব্যোমকেশ চরিত্রের মধ্যে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় নিজে কতটুকু ছিলেন বলে আপনার মনে হয়?”

    “অনেকটাই। আমার তো মনে হয় ব্যোমকেশ বাবার সেল্ফ প্রজেকশান। এমনকি ব্যোমকেশের চেহারাটার বর্ণনা পর্যন্ত যেন বাবার নিজের চেহারার কথা। ধারালো নাক, বেশ লম্বা, দোহারা চেহারা। জানো তো, বাবার উচ্চতা ছিল ছ ফুটেরও বেশি। আউটডোর গেমে খুব ভাল ছিলেন। তেমনি ভাল ব্রিজও খেলতেন। বুদ্ধি ছিল তীক্ষ্ণ। তাছাড়া ব্যোমকেশের চিন্তাভাবনা, মূল্যবোধ, বিশ্বাস এসব আসলে বাবার নিজেরই। আমি তো এই কারণেই এখনও বারবার ব্যোমকেশের গল্পগুলোই পড়ি। মনে হয় যেন বাবাকে ছুঁতে পারি।”

    শান্তনু ব্যানার্জীর সঙ্গে আলাপচারিতায় অর্ঘ্য দত্ত

    “ব্যোমকেশের বিচিত্র সব বিষয়ে জ্ঞান ছিল।”

    ” হ্যাঁ। এবং বাবারও আগ্রহ ছিল বিচিত্র সব বিষয়ে। ওকালতি তো তাঁর বিষয় ছিলই। তাছাড়াও হিউম্যান অ্যানাটমি নিয়ে রীতিমত পড়াশোনা করতেন। হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা, অ্যাস্ট্রোনমি, কসমোলজি এসব বিষয়েও বাবা প্রচুর পড়াশোনা করতেন।”

    “বাবা হিসাবে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় কেমন ছিলেন?”

    দেওয়ালের ছবির দিকে তাকিয়ে থাকলেন কিছুক্ষণ। তারপর বললেন, “স্নেহশীল। কোনও দিনও বকেননি। কোনও সন্তানকেই নয়। কোনও কিছু জোর করে চাপিয়ে দেননি। অথচ তাঁর সব মূল্যবোধ আমাদের দিয়ে গেছেন। এমনকি ওর বিভিন্ন বিষয়ে ইন্টারেস্ট, ওর ভালোলাগাগুলোও। মনে আছে, সেই ছোট বেলায় নানান কঠিন বিষয়ে সহজ করে গল্প বলতেন। এমনকি স্যার জেমস জিনসের ‘স্টারস ইন দেয়ার কোর্সেস’ বা স্যার আর্থার এডিংটনের ‘দ্য ইউনিভার্স অ্যারাউন্ড আস’-এর মতো বই নিজেও পড়তেন আমাদেরও পড়তে উৎসাহিত করতেন।”

    “ব্যক্তিগত জীবনে কেমন ছিলেন? রক্ষণশীল না প্রগতিশীল?”

    “একটা গল্প বললে তুমি হয়তো বুঝতে পারবে। আমার স্ত্রী তখন সদ্য মা হয়েছেন। তার ক’দিন বাদেই বংশের কারও মৃত্যুতে পরিবারে অশৌচ পালন করা হচ্ছে। বাবা আমার স্ত্রীকে অশৌচের নিয়ম কানুন মানতে বারণ করে দিলেন। এবং শুধু তাই নয় যেহেতু আমাদের সদ্যোজাত সন্তান তখনও দুগ্ধপোষ্য তাই আমার স্ত্রীকে ওই অশৌচ চলাকালীন সময়েও হাফ বয়েল ডিম খাওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। ওই সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে এই ঘটনাকে নিশ্চয়ই প্রগতিশীলতাই বলবে! পরিবারের মেয়েদের তিনি যথেষ্ট স্বাধীনতা দিয়েছিলেন। ওই যে ‘বেণীসংহার’ গল্পে নাতনি লাবণি নাচ শিখছে জেনেও বেণীমাধব যেমন এতটুকু অসন্তুষ্ট হলেন না, বাবা নিজেও আসলে তেমনি ছিলেন। এবং সে কারণেই গল্পেও লাবণিকে নাচ শিখতে পাঠাতে পেরেছিলেন। নাচ না শিখে লাবণি গান শিখলেও গল্পের কাহিনির কিছইু তারতম্য হতো না। যে সময়ের গল্প সে সময় তো নাচের থেকে গানই শিখত বেশিরভাগ ভদ্রঘরের বাঙালি মেয়েরা। কিন্তু বাবা যেন ওই সময়ের বাঙালি মেয়েদের নাচ শেখাটাকে স্বীকৃতি দিলেন।”

    “শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের কোনও বিশেষ শখ!”

    “কোনটা ছেড়ে কোনটা বলব? হোমিওপ্যাথি চিকিৎসা করার শখ ছিল। করতেনও। তারপর ধরো শিকার করার খুব শখ ছিল। তখন তো এই ব্যাপারে এত সরকারি নিয়মের কড়াকড়ি ছিল না। এয়ারগান নিয়ে বেরিয়ে পড়লেই হল। মনে আছে, একবার মুম্বইয়ের উত্তরে ভাসাইয়ের নির্মল গাঁওয়ে আমাকেও সঙ্গে করে নিয়ে গিয়েছিলেন পাখি শিকারে। অ্যাস্ট্রোনমির শখ ছিল। জ্যোতিষচর্চা করতে ভালবাসতেন। মানুষের কোষ্ঠী-ঠিকুজি বানাতেন। এই বিষয়ে তাঁর সঙ্গী ছিল অভিনেতা অশোককুমার। আমাদের মালাডের বাড়িতে তিনি প্রায়ই আসতেন এবং বাবার সঙ্গে এই বিষয়ে কথা বলতেন। ফিল্মলাইনের কতো মানুষই তখন সন্তান হলেই বাবার কাছে আসতো কোষ্ঠী বানাতে।
    খুব ভালো ব্রিজ খেলতেন। শখ ছিল প্ল্যানচেট করারও।”

    “ভূতে বিশ্বাস করতেন?”

    খুব একচোট হাসলেন প্রশ্নটা শুনে। বললেন, “বাবা ভূত সম্বন্ধে একটা ভারি মজার কথা বলতেন। বলতেন, আমি ভূতে বিশ্বাস করি না। ভূতে শুধু ভয় পাই।”

    “পাঠক হিসাবে সাহিত্যিক শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের মূল্যায়ন…”

    “দেখো, তুমি বললে না আমাকে দেখে তোমার ব্যোমকেশের খোকার কথা মনে পড়ছে। আমিও বোধহয় ওই খোকা হয়েই লেখাগুলো পড়ি। মানে সন্তান হয়েই পিতাকে পড়ি। একজন লেখক এবং পাঠকের মধ্যে যে পক্ষপাতহীন দূরত্ব থাকে, সাহিত্যের সঠিক বিচার করার জন্য যে দূরত্ব থাকা উচিত, আমার আর বাবার লেখার মধ্যে তা নেই। তবে ওই যে বললাম, আমি নিজে ব্যোমকেশের গল্পগুলো বারবার পড়ি। আমার বেশি ভালো লাগে। গল্পগুলো সম্বন্ধে একটা কথা বলতে চাই যে এগুলো কিন্তু শুধুই গোয়েন্দা গল্প নয়। একটু মন দিয়ে পড়লেই যে কোনো মনোযোগী পাঠক কিন্তু ওই গল্পের মধ্যে দিয়ে ছুঁতে পারবেন সেই সময়টাকে। বাবা কিন্তু খুব যত্ন করে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অব্যবহিত আগে পরের সময়টাকে ধরেছেন তাঁর গল্পগুলোতে। যদিও সেটাই হয়তো মূল উদ্দেশ্য ছিল না। তবু সে সময়ে বাংলা সমাজের অবক্ষয়, মানুষের লোভ, হঠাৎ যেন তেন প্রকারেণ অর্থ উপার্জনের লিপ্সা, নারীদের সামাজিক অবস্থানের দ্রুত পরিবর্তন এই সবকিছুরই একটা ডকুমেন্টেশন গল্পগুলোর মধ্যে রয়ে গেছে। এটার একটা আলাদা গুরুত্ব আছে বলে আমি মনে করি। আর একটা কথাও বলব, এই গল্পগুলো কিন্তু উনি লিখেছিলেন পরিণত বয়স্ক বুদ্ধিদীপ্ত পাঠকদের জন্য। কিশোরপাঠ্য হিসাবে নয়। তাই কাউকে ফেলুদার গল্পের সঙ্গে ব্যোমকেশের গল্পের তুলনা করতে দেখলে খুব বিরক্ত লাগে। এ যেন আপেলের সঙ্গে কমলালেবুর তুলনা করা।”

    “ব্যোমকেশ আজও এত জনপ্রিয় কেন?”

    “একথাটা আমিও খুব ভাবি। শুধু বাঙালিই নয় অবাঙালিদের মধ্যেও ব্যোমকেশ পরিচিত এবং জনপ্রিয়। আজকাল তো দেখছি নানান মানুষ নানান ভাবে ব্যোমকেশকে নিয়ে সিনেমা-দূরদর্শনেও কাজ করতে চাইছেন। নানান ভাষায়! এই জনপ্রিয়তার কারণ কোনও পন্ডিত বা গবেষক হয়তো ভালো বলতে পারবেন!”

    “দিবাকর ব্যানার্জী-র হিন্দি সিনেমা ‘ডিটেকটিভ ব্যোমকেশ বক্সী’ কেমন লেগেছে?”

    ” ভালো না। আমার দেখে মনেই হচ্ছিল না বাবা যে ব্যোমকেশ বক্সীকে সৃষ্টি করে গেছেন এর সঙ্গে তার কোনও সম্পর্ক আছে। তবে হ্যাঁ, আমার মেয়ে-নাতিদের কিন্তু অতটা খারাপ লাগেনি। নাতি তো দেখে এসে বলল, কুল মুভি।” বলে হেসে উঠলেন হো হো করে।

    আপ্যায়নের ব্যবস্থাও করেছিলেন। তাতেও গেল কিছটা সময়। বাইরে উৎসবের রাত। মুম্বাই শহরে এগারো দিনের গণপতি পুজো। সারা শহর সেজে উঠেছে আলোয়। ঘড়ি দেখলাম, রাত প্রায় দশটা। উঠে পড়ার আগে বললাম,

    “আপনার বাবার সম্বন্ধে বিশেষ কোনও স্মৃতি!”

    জানলা দিয়ে অনেকক্ষণ রঙিন আলো ঝলমল বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকলেন। তারপর মৃদুস্বরে বললেন, “আমার একটাই আফশোস রয়ে গেছে জানো!”

    “কী?” উদগ্রীব হয়ে প্রশ্ন করি।

    “আমার অন্য দুই দাদাদের বাংলা সাহিত্যের প্রতি আগ্রহ একটু কম ছিল। যদিও তাঁরা দুজনেই কৃতী ছিলেন তাঁদের নিজস্ব কর্মক্ষেত্রে। আমি যেহেতু খুব পড়তে ভালোবাসতাম, বাবা আমাকে লিখতে উৎসাহ দিতেন। বিশ্বাস করতেন আমি চাইলে ভালো লিখতেও পারব। কিন্তু আমি কোনও দিনও নিজের মধ্যে লেখার তাগিদ অনুভব করিনি। মারা যাবার আগে বাবা আমাকে বলেছিলেন, শোন, বুঝতে পারছি না আর লিখতে পারবো কিনা!’বিশুপাল বধ’ লেখা শুরু করেছি। তুই শেষটা শুনে রাখ, তাহলে আমি আর লিখে  যেতে না পারলে তুই লেখাটা শেষ করতে পারবি।’ আমি তখন শুনিনি জানো! আসলে আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি যে বাবা  মৃত্যুশয্যায়। আমি বলেছিলাম, তুমি ভালো হয়ে নিজেই লিখতে পারবে। আমাকে বলতে হবে না।”

    আমার মনে হল, সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ রহস্য উন্মোচনের চাবিটুকু যাওয়ার সময় তার খোকার হাতেই তুলে দিয়ে যেতে চাইবেন এটাই তো স্বাভাবিক।

    ছবি সৌজন্যে: পার্থ প্রতিম চ্যাটার্জী

Get real time updates directly on you device, subscribe now.

Comments are closed, but trackbacks and pingbacks are open.

This website uses cookies to improve your experience. We'll assume you're ok with this, but you can opt-out if you wish. Accept Read More