বৃহস্পতিবার, জুন ২৭

প্রলোভন দেখিয়ে নাৎসিদের ঠান্ডা মাথায় খুন করতো মিষ্টি মেয়ে ফ্রেডি

 রূপাঞ্জন গোস্বামী

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। নাৎসি জার্মানীর দাপটে ইউরোপ দিশেহারা। লক্ষ লক্ষ মানুষ বেড়াল, কুকুরের মতো স্রেফ মরে যাচ্ছেন রাস্তাঘাটে, কনসেনট্রেশন ক্যাম্পে। সমাজের বুদ্ধিজীবী শ্রেণিকে রাস্তার চৌমাথায় লটকে দিচ্ছে হিটলারের নৃশংস SS (Schutzstaffe) প্যারা মিলিটারি বাহিনী  হিটলারের এই বাহিনীর ভয়ে তখন মানুষ লুকিয়ে বেড়াচ্ছে। সেরকমই  একটি মেঘাচ্ছন্ন দিনে, হল্যান্ডের নর্থ হারলেম শহরের রাস্তায় নির্ভয়ে সাইকেল নিয়ে নামল চোদ্দ বছর বয়সী এক বালিকা। নাম তার ফ্রেডি ওভারস্টিজেন। এক মাথা কালোচুল।

বালিকা ফ্রেডি ওভারস্টিজেন

শরীরে  যৌবন এসে গেছে। পরনে ফুলফুল স্কার্ট। মাথার চুলে রিবন বাঁধা। দুরে মর্টার মেশিনগানের আওয়াজ। কিন্তু বালিকার তা নিয়ে বিন্দুমাত্র ভয় আছে বলে মনে হয় না। রঙিন প্রজাপতি হয়ে মনের আনন্দে প্রায় ফাঁকা রাস্তায় সাইকেলের হরেক কেরামতি  দেখাতে দেখাতে এগিয়ে যাচ্ছে। রাস্তায় নাকাবন্দী করেছে হিটলারের SS বাহিনী। বাচ্চা মেয়েটাকে আমল দেয় না কেউ । নির্দ্বিধায় চেক পোস্ট পেরিয়ে যায় ফ্রেডি। বাচ্চা মেয়েটা নির্জন রেল লাইনের পাশের রাস্তায় যাচ্ছে। রাইফেল পিঠে ঝুলিয়ে সাইকেলেই তাকে অনুসরণ করে এক মধ্য বয়স্ক  জার্মান SS অফিসার। ফ্রেডির সাইকেল থেকে ঠিক কয়েকশ’ মিটার দুরত্ব রেখে চলছে। ধর্ষণটা এখন বিনোদনের একমাত্র  উপায় SS গার্ডদের। কচি মেয়ে বেশি জোর খাটাতে হবে না। রেললাইনের পাশের জঙ্গলটা ক্রমশ ঘন হয়ে আসছে। মেয়েটা দাঁড়িয়ে পড়ে একটা বুনো ফুল তুলছে। বেশ উত্তেজনা অনুভব করে অফিসার। হাসতে হাসতে এগিয়ে যায় মেয়েটার দিকে,মেয়েটাও হাসছে। মেঘ না চাইতেই জল। ভীষন খুশি কম্যান্ডার, মারধর না করেই কাজটা সারা যাবে। আশপাশে লোকজন নেই। রাইফেলটা গাছের গুঁড়িতে হেলান দিয়ে রেখে মেয়েটার দিকে এগিয়ে যান অফিসার। মেয়েটি তখনও হাসছে। মেয়েটির হাতে ফুলের সাজি, তাতে ফুল ভর্তি। মেয়েটিকে ধরে কাছে টানেন কম্যান্ডার। এগিয়ে এসে মেয়েটি অফিসার বুকে লেপ্টে যায়। তখনই  ‘খুট’ করে একটা শব্দ হয়। কাটা কলাগাছের মতো লুটিয়ে পড়েন জার্মান SS অফিসার। তার পেটের কাছের ইউনিফর্মে তৈরি হয়েছে এক গর্ত। সেখান থেকে ফিনকি দিয়ে বেরিয়ে আসছে টাটকা নাৎসি রক্ত। সাজির ফুলের তলায় পিস্তলটা আবার লুকিয়ে রাখে ফ্রেডি। অফিসারের রাইফেলটাও তুলে নিয়ে  জঙ্গলের কোনও নির্জন স্থানে লুকিয়ে ফেলে বালিকা। তারপর আবার সাইকেলে চাপে।

হিটলারের কুখ্যাত SS বাহিনী

খুঁজে বেড়ায় নির্জন স্থান আর পরের শিকার। যারা মূলত  ছিল  SS বাহিনীর নারী-মাংস লোভী সৈনিক ও অফিসার এবং কিছু বিশ্বাসঘাতক হল্যান্ডবাসী। এই ভাবে দীর্ঘদিন ফ্রেডি তার পিস্তলের গুলি খালি করে যায়। কিন্তু তাকে সন্দেহ করে না SS বাহিনী। কারণ ফুলের মত মিষ্টি ফ্রেডিকে দেখে  কারওর সন্দেহ হওয়ার কথাই নয়। তাই ঠান্ডা মাথায় একের পর এক SS বাহিনীর সদস্যদের খুন করে গেছে এই দুঃসাহসী মেয়ে। একটুও হাত কাঁপেনি। যে সব  বিভিন্ন পানশালায় জার্মান সৈনিকরা ভিড় জমাতো, সেখানে টোপ ফেলত ফ্রেডি। নাৎসি সৈনিক ও অফিসারদের সঙ্গে আলাপ জমিয়ে, তাদের যৌনতার লোভ দেখিয়ে কোনও জনবিরল স্থানে নিয়ে গিয়ে  ঠান্ডা মাথায় চিরকালের জন্য ঘুম পাড়িয়ে দিত।

ডাচ প্রতিরোধ বাহিনী

সেই সময় নাৎসিদের বিরুদ্ধে হল্যান্ডে গড়ে উঠেছিল ডাচ প্রতিরোধ বাহিনী। নাৎসিদের ধারণা ছিল তাদের বিরুদ্ধে  গেরিলা আক্রমণ করত এই বাহিনীর পুরুষরা । আর নাৎসি বিরোধী পুস্তিকা বিলি বা লিফলেট ছড়ানোর কাজটা করত এই  বাহিনির মেয়েরা। নাৎসি বাহিনীর সদস্যরা স্বপ্নেও ভাবতে পারেনি তাদেরকেই শিকার করে দেশরক্ষায় নেমেছে ১৪ বছরের পুঁচকে এ্ক মেয়ে। যার মূলধন হিটলারের  SS বাহিনী ও তার চরদের যৌনলালসা।  আমস্টারডাম শহর ও সংলগ্ন অঞ্চলে একের পর এক  জার্মান বাহিনীর অফিসার ও বিশ্বাসঘাতক ডাচদের  নিঃশব্দে হত্যা করে গেছে  গুপ্তঘাতক বাহিনীর সদস্যা বালিকা ফ্রেডি।সাত সদস্যের এ মহিলা গুপ্তঘাতক  বাহিনীটিতে ফ্রেডি ওভারস্টিজেন  ও তাঁর দিদি ছিলেন। মহিলা গুপ্তঘাতক বাহিনীটিতে ১৯৪৩ সালে আরও এক জন সদস্যা যোগ দেন। তিনি হলেন আইনের ছাত্রী হ্যানি শাফট।

ফ্রেডি ও তার দিদি ট্রুস (ছবির ডানদিকে)

ফ্রেডি আর হ্যানি শাফট দিনের পর দিন ডিনামাইট দিয়ে রেললাইন আর ব্রিজ উড়িয়ে দিয়েছেন। জার্মানদের শহরে ঢোকা আটকাতে। জীবনের ঝুঁকি নিয়ে তাঁর চেয়ে দুই বছরের বড় দিদি ট্রুসের সঙ্গে নাৎসি কনসেনট্রেশন ক্যাম্প থেকে ইহুদি শিশুদের চুরি করে নিয়ে সীমান্ত পার করে নিরাপদ হাতে তুলে দিয়েছেন। হল্যন্ডের ওই বয়েসের ছেলেমেয়েদের কাছে  যা  ছিল অকল্পনীয়।

পরবর্তী কালে তাঁকে যখন কেউ জিজ্ঞাসা করতেন, তিনি কতজন  জার্মান  SS সৈনিক বা চরদের মেরেছেন। তিনি বলতেন,”আমি সৈনিক, সৈনিকরা লাশ গোনে না।” কখনও বলতেন, “একজন সৈনিককে এসব জিজ্ঞাসা করা উচিত নয়।”  সামান্যতম অনুতাপ ছিলনা ফ্রেডি ওভারস্টিজেনের। সাংবাদিকদের আজীবন বলে এসেছেন , ‘আমাকে ওদের মারতে হতোই।  যারা ভালো মানুষের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল, তাদের মৃত্যুই সঠিক শাস্তি”।

নাৎসি ক্যাম্পের বাইরে ফ্রেডির দিদি ট্রুস(পুরুষের পোশাকে) ও হ্যানি শ্যাফট

১৯৯৬ সালে দুই বোনে গড়ে তুলেছিলেন ন্যাশন্যাল হ্যানি শাফট ফাউন্ডেশন নামে এক সংস্থা। তাঁদের বিপ্লবী সঙ্গী হ্যানি শাফটের স্মরণে। যাঁকে নাৎসিরা ধরে ফেলে এবং নির্মম ভাবে হত্যা করে। ফ্রেডি বলতেন ,হ্যানি শ্যাফট হলেন নারী প্রতিরোধের জাতীয় প্রতীক।

হল্যান্ডের সবচেয়ে বিখ্যাত নারী প্রতিরোধ বাহিনীর একমাত্র জীবিত সদস্যা এই ফ্রেডি ওভারস্টিজেন চলতি বছর সেপ্টেম্বর মাসের ৫ তারিখে প্রয়াত হলেন। তাঁর জন্মদিনের ঠিক আগের দিন ,৯৩ বছর বয়েসে । তাঁর প্রাণের শহর হারলেম থেকে ৮ কিলোমিটার দূরের এক নার্সিং হোমে। পিছনে রেখে গেলেন ভয়ংকর অথচ বিপ্লবী চেতনায় সদানিয়ত ট্রিগার টেপা এক বিস্ময়কর  ইতিহাস।

Comments are closed.