শনিবার, মার্চ ২৩

সরযূ নদীর বুকে জমা ঘন কুয়াশার আড়ালে আজও ঘুরে বেড়ান রহস্যাবৃত গুমনামি বাবা

রূপাঞ্জন গোস্বামী

দিনটি ছিলো ১৯ সেপ্টেম্বর, সাল ১৯৮৫। ভারতের জাতীয় পতাকায় মুড়ে রাম ভবন থেকে বের করে আনা হয়েছে মানুষটির পার্থিব শরীর। “রাম নাম সত্য হ্যায়’ ধ্বনি তুলে শুরু হল শবযাত্রা। শবযাত্রী মাত্র ১৩ জন। শবযাত্রা এসে পৌঁছালো গুপ্তার ঘাটে। ছলছল চোখে দাঁড়িয়ে রইলেন ডা. আর পি মিশ্র, সরস্বতী দেবী শুক্লা, ডা. প্রিয়ব্রত বন্দ্যোপাধ্যায় ও  রামকিশোর পাণ্ডা। জ্বলে উঠলো চিতার লেলিহান শিখা।  উত্তরপ্রদেশের  অযোধ্যা-ফৈজাবাদের বুক চিরে বয়ে চলা হিন্দু পুরাণের পবিত্র নদী সরযূ্র তীরে শুরু হলো গুমনামি বাবার শেষকৃত্য। ডুকরে কেঁদে উঠলেন রামকিশোরজী। কাঁদতে কাঁদতে বললেন, “যে মানুষটিকে শেষ বিদায় জানাতে ১৩ লাখ মানুষের উপস্থিত থাকার কথা, আজ তাঁর পাশে  মাত্র ১৩ জন রয়েছি!” ঘন্টা দুয়েক পর পবিত্র সরযূ্র জল দিয়ে নেভানো হলো চিতা। নিভে গেলো চিতা, কিন্তু সরযূ্ নদীর তীর ছেড়ে ভারতের আকাশে ঘনীভূত হতে লাগলো এক রহস্যময় কুয়াশা।

১৯৮৫ সালের ২৫ অক্টোবর স্থানীয় হিন্দি দৈনিক ‘নয়া লোগ” ছেপে ছিলো ভারত কাঁপিয়ে দেওয়া এক হেডিং।

“ফৈজাবাদে অজ্ঞাতবাসে থাকা নেতা সুভাষচন্দ্র বোস আর নেই?”

‘নয়া লোগ’ দৈনিকে সেই হেডিং

দাবানলের আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়লো খবরটি ভারত জুড়ে। জাতীয় সংবাদ মাধ্যম ছুটে গেলো  অযোধ্যা-ফৈজাবাদে। নেতাজির মৃত্যু রহস্য, সম্ভবত ভারতের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত রহস্য। আর এই রহস্যটির সঙ্গে সবার অলক্ষে জড়িয়ে গেলো আরেকটি রহস্য, যা এখনও ভেদ করা সম্ভব হয়নি। হয়তো কোনও দিন সম্ভবও হবে না। তবুও, উত্তর ভারতের  অনেক মানুষ একটা কথা মানেন। অযোধ্যা-ফৈজাবাদে লোকচক্ষুর অন্তরালে বসবাসকারী গুমনামি বাবা ওরফে ভগবানজীই হলেন ভারত মায়ের বীর সন্তান, আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু। 

কে এই গুমনামি বাবা!

ষাটের দশকের শুরুতে, এক জন সুদর্শন, দীর্ঘদেহী বর্ষীয়ান সাধুর  আবির্ভাব হয় উত্তপ্রদেশের নেমিসা এলাকায়। নেমিসার অযোধ্যা-বস্তি এলাকায়  বাস করতে শুরু করেন তিনি৷ সাধুবাবা লোকজনের সঙ্গে মিশতেন না। কেউ তাঁর দর্শন পেতো না। একান্ত প্রয়োজন হলে কথা বলতেন পর্দার আড়াল থেকে। বাইরে বার হতেন না। কখনও বার হলে মুখ ঢেকে রাখতেন সাদা চাদরে। স্থানীয় অতি উৎসাহী কেউ সাধুবাবার নাম জানতে চাইলে, বাবা বলতেন তিনি বহুদিন আগেই মৃত। তাঁর কোনও নাম নেই৷ কখনো তিনি নিজের নাম বলতেন মহাকাল, মহাভূত কখনও বা মৃতভূত৷  তাঁরা সাধুবাবাকে ডাকতেন ভগবানজী নামে বা গুমনামি বাবা নামে। পর্দার অন্তরালে থাকা বাবার কাছে কেউ পৌঁছতে না পারলেও, বাবার কাছে যাবার অনুমতি পেয়েছিলেন নেতাজির ঘনিষ্ঠ অনুগামী ও শ্রীসঙ্ঘের প্রতিষ্ঠাত্রী লীলা রায় ও আরও কিছু বাঙালি বিপ্লবী ও স্বাধীনতাসংগ্রামী। এরপর থেকে ১৯৮২ সাল পর্যন্ত গুমনামি বাবা সারা উত্তরপ্রদেশ ঘুরে বেড়িয়েছেন। মাঝে মাঝে তাঁকে বিভিন্ন জায়গায় দেখা গেছে। কিছুদিন সেই স্থানে পরে আবার আলেয়ার মতো হঠাৎ মিলিয়ে গেছেন।

এরপরে গুমনামি বাবার খোঁজ মেলে ১৯৮২ সালে উত্তরপ্রদেশেরই ফৈজাবাদে। ফৈজাবাদের অভিজাত ও প্রভাবশালী সিংহ পরিবারের আলিশান ম্যানসনের পিছনে ছিলো বেশ কয়েকটি ছোট একতলা বাড়ি। বাড়িগুলি ভাড়া দিতেন সিংহ পরিবার। ১৯৮২ সালে এক স্থানীয় ডাক্তার, এরই একটি বাড়ি ভাড়া নেন এক সাধুবাবার নামে। ৩০০ স্কোয়ার ফুটের বাড়িটির ভাড়া ৪০০ টাকা। বাড়িটিতে এসে ওঠেন সেই দীর্ঘদেহী, বিরলকেশ, শ্মশ্রুমণ্ডিত, ধবধবে ফরসা চেহারার গুমনামি বাবা। মৃত্যুর  পর্যন্ত এই বাড়িতেই বাস করেছেন গুমনামি বাবা। ১৯৮৫ সালে গুমনামি বাবার মৃত্যুর পর, সিংহ পরিবারের সদস্য ও বিজেপি নেতা শক্তি সিংহ প্রকাশ্যে আনেন অজ্ঞাতবাসে থাকা গুমনামি বাবার কাহিনী। গুমনামি বাবাই নেতাজি, একথা জোর দিয়ে জানালেও  শক্তি সিংহ জানিয়েছিলেন, তিনি জীবনে বাবার মুখ দেখেননি। কারণ বাবা সারাক্ষণ ঘরেই থাকতেন। খুব সামান্য লোকেরই তাঁর ঘরে প্রবেশাধিকার ছিলো। শক্তি সিংহ সংবাদ মাধ্যমকে বলেছিলেন, “তিনি সব সময় আমাদের সঙ্গে জানলা দিয়ে কথা বলতেন। তাঁর মুখ দেখা যেত না”।  বাবা নাকি রোলেক্স ঘড়ি পছন্দ করতেন, দামী ৫৫৫ সিগারেট খেতেন, তাঁর কাছে আনকোরা নোটও দেখেছেন কেউ কেউ। মাটন কিমা খেতে ভালোবাসতেন। পছন্দ করতেন বাঙালিদের প্রিয় শুক্তো।

বিজেপি নেতা শক্তি সিংহ

গুমনামি বাবাই নেতাজি, এই তত্ত্বে বিশ্বাস করতেন উত্তরপ্রদেশের বিখ্যাত সাংবাদিক অশোক ট্যান্ডন৷ তিনি বলেছিলেন, নেতাজির অনেক আত্মীয় রাম ভবনে এসে নাকি ‘গুমনামি বাবা’র সঙ্গে দেখা করে যেতেন৷  তিনি দাবি করেছিলেন, ১৯৮৫ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর গুমনামি বাবার মৃত্যুর পরে সিংহ পরিবারের পক্ষ থেকে নেতাজির পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয়। নেতাজির ভাইঝি ললিতা বসু, গুমনামি বাবার বাসভবনে (রাম ভবন) এসেছিলেন৷ গুমনামি বাবার ঘরে  প্রবেশ করে, বাবার ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখে ললিতা দেবী নাকি কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন। এবং তিনি স্বীকার করেছিলেন ব্যবহৃত জিনিসপত্রগুলি সবই তাঁর কাকা নেতাজি সুভাষের। এরপরে  ললিতা বসু গুমনামি বাবার আসল পরিচয় জানতে চেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হন ৷ পাশে পেয়েছিলেন  ‘সুভাষ চন্দ্র বসু বিচার মঞ্চ’ নামে স্থানীয় একটি একটি সংগঠনকে৷ আদালত বিষয়টির গুরুত্ব বুঝে একটি বিচারবিভাগীয় কমিশন গঠনের নির্দেশ দেয়৷ গুমনামি বাবার ঘর থেকে বাবার ব্যবহৃত জিনিসপত্র ২৪টি ট্রাঙ্কে করে চলে যায়  ফৈজাবাদ জেলা ট্রেজারির ডাবল লক সেকশনে।

খোলা হচ্ছে ট্রাঙ্ক

কী ছিলো গুমনামি বাবার  ট্রাঙ্কে!

১৯৯৯ সালে নেতাজির মৃত্যুরহস্য নিয়ে বসানো হয় মুখার্জী কমিশন। আদালতের রায়ে মুখার্জী কমিশনের সামনে ফৈজাবাদ জেলা ট্রেজারি অফিসাররা আনেন টিনের বাক্স। গুমনামী বাবার ব্যবহৃত প্রায় ৩০০০ সামগ্রীর মধ্যে ৮৭০টি সামগ্রী মুখার্জী কমিশন পরীক্ষা করেন। বাক্স খুলে স্তম্ভিত হন উপস্থিত সবাই। মৃত্যুর আগে বা পরে যে মানুষটির একটা  ছবিও তুলতে পারেননি কেউ, তাঁরই ব্যক্তিগত সংগ্রহে প্রচুর ছবি। বেশিরভাগ ছবিই নেতাজী সুভাষের পরিবারের।

গুমনামি বাবার ব্যবহৃত জিনিসপত্র

একটি বাঁধানো ছবি ছিলো, সেটি নেতাজীর পিতা জানকীনাথ ও মাতা প্রভাবতীর। এছাড়াও ছিলো ভাইবোনদের সঙ্গে ছোটবেলায় নেতাজীর ছবি। তিনটে ‘হাফ-বেন্ট ডাবলিন’ ধূমপানের পাইপ। জার্মানি ও ইতালির সিগার। গোল ফ্রেমের চশমা, বাইনোকুলার, রোলেক্স অয়েস্টার পার্পেচ্যুয়াল ঘড়ি, স্পুল ক্যাসেট টেপ রেকর্ডার, পোর্টেবল বেলজিয়ান টাইপরাইটার, একটি রেডিও। এছাড়াও ছিলো ভারতীয় রাজনীতির ওপরে লেখা অজস্র বই। সুভাষচন্দ্রের জীবনীমূলক বই। আর ছিলো স্বাধীনতার আগের ও পরের বহু সংবাদপত্র  ও আনন্দবাজার পত্রিকার বিপুল সংগ্রহ।

বাক্সগুলিতে পাওয়া গিয়েছিল, প্রচুর চিঠিপত্র ও নথি। নথির মধ্যে ছিলো, আজাদ হিন্দ ফৌজের পরিচিতদের তালিকা ও হাতে আঁকা সাইবেরিয়ার মানচিত্রও।  এর মধ্যে বেশকিছু বই অজ্ঞাত কোনও ‘বোন’-এর কাছ থেকে উপহার পেয়েছিলেন গুমনামি বাবা। পাওয়া গেছিলো বেশ কয়েকটি টেলিগ্রাম। যেগুলো দুর্গা পুজো এবং ২৩ জানুয়ারি নেতাজির জন্মদিন উপলক্ষে গুমনামি বাবাকে পাঠিয়েছিলেন আজাদ হিন্দ ফৌজের প্রবীণ সেনানায়করা।

রহস্য ঘনীভূত করলো একটি চিঠি

গুমনামি বাবার আরেকটি নামই সবাই জানতেন। সেটি হলো ‘ভগবানজি’। কিন্তু রহস্য আরও গভীর করে তুললো, রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের দ্বিতীয় প্রধান এম এস গোলওয়াকরের লেখা এক চিঠি। ১৯৭২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর গুমনামি বাবাকে লেখা এক চিঠিতে গোলওয়াকরজী  গুমনামি বাবাকে সম্বোধন করছেন ‘ পরম পূজ্যপাদ বিজয়ানন্দজী মহারাজ’ নামে। চিঠির প্রসঙ্গ জানা না গেলেও, গোলওয়াকরজী  লিখছেন, “আপনার ২৫ অগস্ট থেকে ২ সেপ্টেম্বরের মধ্যে লেখা চিঠি আমি ৬ সেপ্টেম্বর পেয়েছি। আমি আপনার বলা তিনটে জায়গার সম্পর্কে খোঁজ নেবো।  এর মধ্যে যেকোনও একটি জায়গার কথা আপনি যদি বিশেষ ভাবে উল্লেখ করেন তাহলে আমার পক্ষে কাজটা সুবিধের হতো।

রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবক সঙ্ঘের দ্বিতীয় প্রধান এম এস গোলওয়াকর

 মুখার্জী কমিশন বনাম সহায় কমিশন 

১৯৮৫ সালে মৃত্যু হয় সাধক গুমনামি বাবার। কিন্তু মুষ্টিমেয় যে কজন তাঁকে কাছ থেকে দেখেছেন, তাঁরা গুমনামি বাবার মুখের সঙ্গে নেতাজির  অদ্ভুত মিল পেয়েছেন।  গুমনামি বাবা কে, তা জানতে নেতাজীর  ভাইঝি ললিতা বোস  ১৯৮৬ সালে ও  বিজেপি নেতা শক্তি সিংহ ২০১০ সালে আদালত দুটি পিটিশন দাখিল করেন। এছাড়াও কেন্দ্রীয় সরকারের declassification of netaji files নামক পদক্ষেপের পর, বিজেপি নেতা শক্তি সিংহ ও নেতাজি গবেষক অনুজ ধর-সহ অনান্য গবেষক, সাংবাদিক ও নেতাজী ভক্ত মিলে এলাহাবাদ হাইকোর্টে একটি আপিল করেন। তাঁদের বক্তব্য ছিল, “গুমনামি বাবার পরিচয় জানতে একটি তদন্ত কমিশন গঠন করা হোক”। এরপর আদালতের আদেশে ২০১৬ সালের ২৬ জুন, উত্তরপ্রদেশ সরকার এলাহাবাদ হাইকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি বিষ্ণু সহায়ের নেতৃত্বে সহায়  কমিশন গঠন করে। তদন্তের শেষে ৩৪৭ পাতার রিপোর্টে সহায় কমিশন বলেছে, অধিকাংশ সাক্ষীই জানিয়েছেন গুমনামি বাবাই নেতাজি ছিলেন। সাক্ষীদের মধ্যে কয়েকজন অবশ্য বলেছেন, তিনি নেতাজি ছিলেন না।

জাস্টিস সহায় ও জাস্টিস মুখার্জী (ডান দিকে)

গুমনামি বাবা কী নেতাজি? এ প্রসঙ্গে কী বলছে মুখার্জী কমিশন? ওপেন প্ল্যাটফর্ম ফর নেতাজি’র মুখপাত্র সায়ক সেন তথ্য জানার অধিকার আইনের মাধ্যমে এই প্রশ্নটির উত্তর ভারতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রকের কাছে জানতে চেয়েছিলেন। সেই প্রশ্নের উত্তরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক জানিয়েছিলো, গুমনামি বাবা ও ভগবানজির সম্বন্ধে কিছু তথ্য মুখোপাধ্যায় কমিশনের রিপোর্টের ১১৪-১২২ পাতায় রয়েছে। মুখার্জী কমিশন তার  সিদ্ধান্তে জানিয়েছে, গুমনামি বাবা ওরফে ভগবানজি, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু ছিলেন না।

গুমনামি বাবা প্রসঙ্গে কী বলেছিলেন নেতাজীর মেয়ে অনিতা! 

হিন্দুস্তান টাইমস: যেহেতু বিমান দুর্ঘটনার পক্ষে প্রমাণ বেশি, আপনি কি মনে করেন নেতাজির মৃত্যু নিয়ে  বিতর্ক এবার থামা উচিত?

অনিতা:  আমারও সেটাই মনে হয়। অর্থহীন তত্ত্ব নিয়ে এগোনো উচিত নয়। কেউ কেউ বলেন, তিনি এখনও জীবিত আছেন। এটি সবচেয়ে ভালো জানেন একমাত্র ঈশ্বর। আর তিনি নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস।তিনি ‘গুমনামি বাবা’ সাজতে যাবেনই বা কেন? যে দেশের জন্য এত ত্যাগ করলেন, সেই দেশে (স্বনামে) ফিরলেন না, পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে যোগাযোগ করলেন না। এটা কীভাবে সম্ভব?  এসব অর্থহীন বিতর্কে আমি সত্যিই বিরক্ত।

নেতাজি কন্যা অনিতা বসু পাফ

কী বলেছিলেন নেতাজি পরিবারের অনান্য সদস্যরা

নেতাজির পরিবারের বেশিরভাগ মানুষ ‘গুমনামি বাবাই নেতাজি’  এই তত্ব মানেন না। নেতাজির ভাইপো অর্ধেন্দু বোস। বর্তমানে ব্যবসায়ী, একসময়ের বিখ্যাত মডেল অর্ধেন্দু বোস জানিয়েছিলেন,” গুমনামি বাবা কোনও দিন তাঁদের পরিবারের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করেননি। এমন কি আমার বাবা শৈলেশচন্দ্রের মুখেও এই গুমনামি বাবার কথা শুনিনি”।

 এত কিছুর পরও কেন উত্তরহীন এই  ২৩ টি প্রশ্ন

১) কীসের ভিত্তিতে গুমনামি বাবার বিশ্বাসভাজন রামকিশোর কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলেন, যাঁকে শেষ বিদায় জানাতে ১৩ লাখ মানুষের উপস্থিত থাকার কথা তাঁর মৃত্যুর পর মাত্র ১৩ জন রয়েছি?

 ২) কেন গুমনামি বাবা তাঁর ব্যক্তিগত সংগ্রহে রেখেছিলেন বসু পরিবারের ব্যক্তিগত ছবিগুলি ? বোস পরিবারের প্রতি গুমনামি বাবার এত মোহ থাকার কারণ কী?
 ৩)  গুমনামি বাবার সঙ্গে তাঁর মৃত্যু পর্যন্ত আজাদ হিন্দ ফৌজের কয়েকজন অতি গোপনে কেন  যোগাযোগ রাখতেন?
 ৪) গুমনামি বাবার মৃত্যুর পর নেতাজির ভাইজি ললিতা বসু  গুমনামি বাবার ঘরে ঢুকে তাঁর ব্যবহৃত জিনিসপত্র দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েছিলেন কেন ? কীসের ভিত্তিতে তিনি বলেছিলেন ব্যবহৃত জিনিসপত্রগুলি সবই তাঁর কাকার? গুমনামি বাবার কাছে নেতাজির জিনিস কী ভাবে ও কেন এসেছিল?

এটিও ছিলো গুমনামি বাবার সংগ্রহে

৫) নেতাজির অন্তর্ধানের চার বছর পর, কলকাতার গোয়েন্দা অফিসার অনিল ভট্টাচার্য একটি সিক্রেট নোট লিখেছিলেন। তাতে লেখা ছিলো “ধারওয়ার (বম্বে) হইতে ভিড়াইয়া রুদ্রাইয়া কাম্বলি শ্রী শরৎ বসুকে জানাইতেছে যে, ‘সাধু’ ভাল আছে। এবং স্ট্যালিন কবে ভারতে আসিবে লেখক তাহা জানিতে চাহিতেছে”। এই নোটের অর্থ কী ও সাধু কে? তিনি কী গুমনামি বাবা?

৬) গুমনামি বাবার দাঁতের DNA এবং বসু পরিবারের কিছু সদস্যের রক্তের DNA পরীক্ষা করা হলেও কোন মিল পাওয়া যায়নি। মুখার্জী কমিশন এই তথ্যটি কমিশনের রিপোর্টে পেশ করেছিলেন! পরবর্তীকালে এলাহাবাদ হাইকোর্টের মাননীয় প্রধান বিচারপতি তাঁর রায়ে মুখার্জী কমিশনের দেওয়া DNA সংক্রান্ত রিপোর্টকে কেন সরাসরি খারিজ করে দিয়েছিলেন ?
৭) কীসের ভিত্তিতে  অখিলেশ যাদব সরকার তদন্ত কমিশনের জন্য সাড়ে ১১ কোটি টাকা বরাদ্দ করেছিল?

৮)  সহায় কমিশন জানিয়েছিল, কংগ্রেস সরকারের এক মন্ত্রী গুমনামি বাবার সঙ্গে দেখা করেছিলেন। রবীন্দ্র শুক্লা নামে এক ব্যক্তি, কমিশনে একথা জানিয়েছিলেন। সেটা ছিল ১৯৮১-৮২ সালের ঘটনা।  রবীন্দ্র শুক্লাকে গুমনামি বাবা বলেছিলেন, এক বাঙালি ভদ্রলোককে এক জায়গায় পৌঁছে দিতে। সেই  ভদ্রলোককে রবীন্দ্র শুক্লা নিজের মোটরসাইকেলে চড়িয়ে বাজারে নিয়ে যান। কানহাইয়া লাল বলদেবের দোকান থেকে কাপড়ও কেনেন সেই ভদ্রলোক। এরপর রবীন্দ্র শুক্লা তাঁকে বিড়লা ধরমশালায় নামিয়ে দেন। পরে রবীন্দ্র শুক্লা টেলিভিশনে দেখে বুঝতে পারেন সেই ভদ্রলোক আসলে একজন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী। এই তথ্য লিখিত ভাবে রবীন্দ্র শুক্লা সহায় কমিশনকে জানিয়েছিলেন। গুমনামি বাবার কাছে গোপনে কেন গিয়েছিলেন কংগ্রেস সরকারের এই বাঙালি মন্ত্রী?
৯) বিশেষজ্ঞরা গুমনামি বাবার  হস্তাক্ষরের সঙ্গে নেতাজির হাতের লেখার মিল পেয়েছিলেন ? নেতাজি ও গুমনামি বাবার হস্তাক্ষরের অস্বাভাবিক মিল কি নিছকই কাকতালীয়?

সরযূর তীরে গুমনামি বাবার সমাধি

১০) গুমনামি বাবা যদি ভারতীয় সাধু হন,  সমকালীন ভারত ও  বিশ্ব-রাজনীতি নিয়ে গভীরভাবে পড়াশোনা করতেন কেন?

১১) গুমনামি বাবার সংগ্রহে স্বাধীনতার আগের ও পরের বহু সংবাদপত্র ছিলো। তার মধ্যে প্রচুর লাইন কেন পেন দিয়ে কেটে দিয়েছিলেন বাবা?

১২) বাবার সংগ্রহে প্রচুর বিদেশি বই ছিল। এর মধ্যে বেশকিছু বই উপহার পেয়েছিলেন এক অজ্ঞাত ‘বোন’-এর কাছ থেকে। কে এই ‘বোন’?

১৩) গুমনামি বাবা সর্বত্যাগী ভারতীয় সাধু হলে কী ভাবে নির্দ্বিধায় দামী দামী জিনিসপত্র ব্যাবহার করতেন এবং আমিষ খেতেন?   বিদেশি টাইপরাইটার-বাইনোকুলার-ক্রোনোমিটার-কম্পাস ও প্রচুর গুরুত্বপূর্ণ নথি একজন সাধুর কী কাজে লাগে?

১৪) নেতাজির সহযোদ্ধা লীলা রায় ও ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল আর্মির গোয়েন্দাকর্তা পবিত্রমোহন রায়ের সঙ্গে ১৯৬০-এর দশক থেকে মৃত্যুর আগে পর্যন্ত বাবার সম্পর্ক ছিল কেন?

১৫) ২০১০ সালে, এক ডকুমেন্টারি ছবিতে মুখার্জী কমিশনের  জাস্টিস মুখার্জী, অফ-ক্যামেরা কেন বলেছিলেন তিনি “100 per cent sure”, যে তিনিই (গুমনামি বাবা) নেতাজি।

১৬) নেতাজির পরিবারের কেউ মানতে চান না যে গুমনামি বাবাই নেতাজি। তাহলে তাঁদের পরিবারের ললিতা বসুর  বক্তব্য বাকিদের সঙ্গে মেলেনি কেন?

১৭) একটি মানুষের মৃত্যুর আগের বা পরের  একটিও ছবি নেই কেন? রেশন কার্ড বা অন্য কোনও সরকারি নথি ছিল না কেন?

১৮) গুমনামি বাবাকে অর্থ সাহায্য করতেন কারা?

১৯)  ১৯৬৩ সালে খবরের শিরোনামে আসেন শৌলমারীর এক সাধু কে কে ভাণ্ডারী।  যাঁরা সেই সাধুকে  দেখেছেন তাঁরা জানিয়েছিলেন সেই সাধু আর কেউ নন‚ স্বয়ং নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বোস। কিন্তু  অচিরেই এই দাবি কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। কিন্তু আজও কেন  ঘুরে ফিরে আসছে গুমনামি বাবার নাম?

২০)  ভারতেই ছিলেন, অথচ আজও জানা গেলো না গুমনামি বাবা কে? তাঁর আদি নিবাস কোথায়? কী তাঁর আসল নাম? তাঁর পদবীই বা কী?

২১)  রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের দ্বিতীয় প্রধান এম এস গোলওয়াকরের মতো মানুষ যখন গুমনামি বাবাকে চিঠি লিখছেন। তিনি কি সাধারণ কোনও মানুষ হতে পারেন?

২২,  রাষ্ট্রীয় স্বয়ং সেবকসঙ্ঘের দ্বিতীয় প্রধান এম এস গোলওয়াকর চিঠিতে গুমনামি বাবাকে ‘বিজয়ানন্দজী’ বলে সম্বোধন করেছিলেন কেন? গুমনামি বাবার আশ্রমিক নাম কি বিজয়ানন্দ? কোনও আশ্রম থেকে তিনি দীক্ষা নেন? তাঁর দীক্ষাগুরু কে ছিলেন?

২৩)  অন্যান্য সাধুর মতো গুমনামি বাবার কোনও সন্ন্যাসী চেলার সন্ধান মেলেনি কেন? কেন তাঁর ভক্তরা সবাই গৃহী?

জও নেতাজি জাতির মননে চিরজাগ্রত

প্রশ্নগুলির উত্তর  সম্ভবত পাওয়া যাবে না। তবে, আজন্ম স্বাধীনচেতা, উন্নতশির, আজাদ হিন্দ ফৌজের সর্বাধিনায়ক নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসু,  তাঁরই স্বাধীন করা দেশে কাপুরুষের মতো গুমনামি বাবা হয়ে অজ্ঞাতবাসে থাকবেন, এটাও মানা সম্ভব নয়। কারণ, তিনি জনসমক্ষে এসে আহবান করলে, কোটি কোটি ভারতবাসী সব ফেলে ছুটে যেতেন তাঁর কাছে। উত্তাল হয়ে উঠতো আসমুদ্র হিমাচল। লালকেল্লায় তিনিই উত্তোলন করতেন জাতীয় পতাকা। নিবন্ধটির শেষে মূল প্রশ্ন একটাই উঠে এলো। যিনি জীবনে বলেননি তিনিই নেতাজি, সেই গুমনামি বাবা যদি নেতাজি নাই হন, তিনি তবে কে ??

রূপাঞ্জন গোস্বামী

Shares

Comments are closed.