বৃহস্পতিবার, নভেম্বর ২১
TheWall
TheWall

অমলবাবুর জীবন

অনিমেষ চট্টোপাধ্যায়

অমলবাবু আজকে একটু তাড়াতাড়ি সকাল শুরু করেছেন। রুদ্র আসবে। ভাষা অ্যাকাডেমির সেমিনার নিয়ে  একটু আলোচনার দরকার। ভাষা নিয়ে সেমিনারগুলো আজকাল  গরম হয়ে যাচ্ছে। তর্কাতর্কি হয়ে যাচ্ছে। রুদ্র প্রেসিডেন্সিতে অমলবাবুর ছাত্র ছিল। ব্রিলিয়ান্ট ।এই জন্যই রুদ্রর সঙ্গে কথাবার্তার দরকার। তারপর কলেজ । আজ দুটো ক্লাস আছে। অন্য দিন একটু ধীরে সকাল শুরু করেন। মন দিয়ে কাগজ দেখেন । পড়া নয়, দেখা । শিখিয়েছিলেন বিষ্ণুদা। পাইকপাড়ার বিষ্ণুদা। প্রেসিডেন্সিতে এক বছরের সিনিয়ার  ছিলেন। হিস্ট্রি অনার্স। চল্লিশ বছর আগের কথা। কিন্তু অভ্যেসে দাঁড়িয়ে গেছে। রিটায়ার করেছেন তাও তিন বছর হয়ে গেল। সপ্তাহে দু’দিন, বড়জোর তিন দিন কলেজে যান, স্পেশাল ক্লাস নিতে । বিকেলে সেমিনার, আলোচনা সভা থাকলে একটু বইপত্র সকালেও ঘাঁটতে হয়। মাথার ভেতর তো একটু টেনশন থাকেই। আজকে সেরকম কোনও প্রোগ্রাম নেই। শুধু দুপুরে দুটো  ক্লাস আছে কলেজ স্ট্রিট ক্যাম্পাসে।  রুদ্রর সঙ্গে আলোচনার জন্য বই–ম্যাগাজিন বের করছেন। রুদ্র এসে ঢুকল ।

”স্যার, ভাষা অ্যাকাডেমির  সেমিনারের কথার আগে লোকসাহিত্যের এসথেটিক্স, তার ওপর  সমাজের প্রভাব, এই নিয়ে একটু আপনার ধারণা  শুনতে চাই। বর্ধমানের একটা কাগজ লেখা চাইছে। এই টপিকের ওপর । সমাজের ডায়নামিক ইমপ্যাক্ট অন ফোক লিটারেচার।”

আলোচনা  চলছে । কাজের মেয়ে রিনা এসে ঘরে ঢুকল। সঙ্গে একটা  উঠতি বয়সের মেয়ে। ফ্রক পরে। সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ে গেল। রিনাকে ওর মেয়েকে আনতে বলেছিলেন। পড়া দেখিয়ে দেবেন। মেয়েটা অঙ্ক আর ইংরেজিতে ফেল করে টেনে উঠেছে। টেন পাশ করলে অঙ্গনওয়াড়িতে চাকরি হতে পারে। অমলবাবু  অবশ্য আরও পড়াতে বলেছেন। খরচও দেবেন কথা দিয়েছেন।

কিন্তু  রুদ্রকে কথা দেবার সময় রিনার মেয়ের কথা খেয়ালেই ছিল না।

“হ্যাঁ রে রিনা, তোর মেয়ে কতক্ষণ থাকবে?  আমি বিকেলে ফিরে পড়া দেখালে হবে?”

রিনা মুখে কিছু না বলে ঘাড় নাড়ল।

অমল বুঝলেন রিনার মনখারাপ হল। সত্যিই তো, সারাদিন এখন মেয়েটা বসে থাকবে! পড়াশোনা না  করে মাকে বাসন মাজায় সাহায্য করবে। যে জন্যে আসা তা হবে না। ওরা অনেক দূরে থাকে। সেই  বাসন্তী পেরিয়ে ৯নং লাটের কাছে। বিকেল পাঁচটায় বেরোলে বাড়ি ফিরতে আটটা বেজে যায়। বাড়ি থেকে ভোর পাঁচটায় বেরোয় ছ’টার ট্রেন ধরবার জন্যে। রিনাকে একটু আলাদা মনে হয়। ঠিকে ঝি বলতে যে জাঁতাকলে ছিবড়ে হয়ে যাওয়া কাজের মাসি বোঝায় রিনা তা নয়। কাজে ঢোকার কয়েক দিনের মধ্যে বলেছিল, ”কী গো, তোমরা বাংলা কাগজ রাখ না কেন? তাহলে পড়তাম।” বাসন মাজা, ঘর মোছা হয়ে গেলে মেঝেতে কাগজ খুলে বসে। সবার সামনে।

একদিন অমলবাবুর স্ত্রী জিজ্ঞাসা করেছিলেন । ”কী পড়িস কাগজে?”

”এই ভোট, ১০০ দিনের প্যালানে কবে টাকা আসবে। আবার দাঙ্গা লাগবে কিনা। আমাদের দাঙ্গাকে সবচেয়ে ভয়। ট্রেন বাস চলে নে। কাজ কামাই হয়। আমার বরের তো পুরো লোকসান।”

ওর বর বাসন্তী বাজারের ধারে মাটিতে চাদর বিছিয়ে ছিট কাপড় আর রেডিমেড ফ্রক–গেঞ্জি বেচে।  বাজার কমিটি আর পুলিশকে তোলা দিতে হয়। রিনার মা–শাশুড়ি নদী থেকে গামছা দিয়ে কুচো চিংড়ি আর ডিম ধরার কাজ করে। পরে একবার বলেছিল ওর শাশুড়ি মৎস্য কর্মী ইউনিয়নের নেতা। না, নেত্রী শব্দটা ওদের নেই।

মাঝে মাঝেই রিনার সঙ্গে গল্প অমলবাবুদের দুজনকেই পাটপাতার গন্ধ দেয়। ওর কাছেই শুনেছেন এখনও  নালতে শাক কথাটা চালু আছে।

আর একবার যখন জিজ্ঞাসা করেছিলেন, ”হ্যাঁ রে, মেয়ে কী করবে বড় হয়ে?”

”কী আবার। একটু ভাল কাজ। আমার মতো না। ভালো বিয়ে। বর গায়ে হাত তুললে চুপ করে থাকবে নে।”                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                                       রিনা না এসে অন্য কোনও কাজের মেয়েকে পাঠালে অমলের ফাঁকা লাগে। তাই রিনার মেয়েকে বসিয়ে রাখতে মনখারাপ লাগছে।

কিন্তু এসথেটিক্স, লোকসাহিত্য আর ভাষা সেমিনার! তাঁর দুষ্প্রাপ্য বই যা আছে তা থেকে অনেক অজানা তথ্য পাঠকমহলকে জানানো যায়।

“আচ্ছা রিনা, তোর মেয়েকে বসতে বল। আমি দেখছি, কী করা যায়।”

এসথেটিক্স শেষ হতে রুদ্র সেমিনার নিয়ে পড়ল।

“স্যার, আপনাকে ভাষা অ্যাকাডেমি ডাকবেই। তবে দিলীপবাবুরা অনেকে দলবেঁধে আসছেন। ওদের বক্তব্য  রাখতে। আপনাকে বলছি,  কারণ আপনি আমাদের তরফ থেকে বলবেন। ওঁরা চার–পাঁচজন।”

অমলবাবু হাসতে হাসতে বললেন ”মারবে নাকি। তাহলে এই বুড়ো বয়সে আমি নেই।”

বলছিলুম ”তৈরি হয়ে যাবেন। যদি মনে করেন, আমি এসে বই খুঁজে বার করে পেজ মার্ক দিয়ে যেতে পারি।”

প্রফেসর দিলীপ সেন বেশ নামকরা। বিদেশে অনেক দিন ছিলেন। নিজেকে বামপন্থী বলে থাকেন। মাঝেমধ্যে বিদেশ যান সেমিনার অ্যাটেন্ড করতে। আগাপাস্তলা অ্যাকাডেমিক ইন্টেলেকচুয়াল। হাবেভাবে অমলবাবুর ঠিক উল্টো। অমলবাবুর নির্ভুল ইংরেজিতে বিলিতি ঠাট নেই। দিলীপ সেনের বিদেশি যোগাযোগ, বিদেশি উচ্চারণ চোখ ধাঁধিয়ে দেয়। ভিড় হয়।

রুদ্রর সঙ্গে কথা শেষ করে কলেজ বেরোতে এগারোটা। রিনার মেয়ের মাথায় হাত দিয়ে বলে গেলেন ”তুই  কাল আয় মা। কিংবা পরের শনিবার। আমার ছুটি আর তোর স্কুল হাফ-ডে। চলে আয়,  সারাদিন তোর   পড়া দেখব।”                           সকালে বাজার যাবার পথে কিংবা কলেজ যাবার সময় মধু রিকশাওলার সঙ্গে টুকটাক কথা বলা। ফেরার পথে বাড়ির সামনে গলির মোড়ে পঞ্চু ইস্ত্রিওলার সঙ্গে পাঁচ মিনিট গল্প করতে অমলবাবুর ভালো লাগে। এটা সেই প্রথম জীবনের টিপছাপ।  রয়ে গেছে। সেই বি এ অনার্সের শেষ বছর আর এম এ–র দু’বছর। অমলের দিনগুলোয় গভীর ভাবে জড়িয়ে গিয়েছিল বিষ্ণুদা। বিষ্ণুদাই দেখিয়েছিল কলেজ স্ট্রিট আর কেয়াতলার বাইরের রাস্তাঘাট। অমলের বাড়ি অধ্যাপকের বংশ। দাদু ছিলেন চতুষ্পাঠীর পণ্ডিত,  বেশ ভালোই জমিজমা ছিল বংশগত যজমানি পেশা থেকে। কেয়াতলার বাড়ি সেই পারিবারিক রোজগারেই হয়েছিল। বাবা ল পাশ করেও প্র্যাকটিস বেশি করেননি। ল কলেজের প্রফেসর হিসেবেই জীবন কেটেছে। অমলবাবুর ছোটবেলা, কিশোরবেলা কেটেছে বই, সঙ্গীত আর গল্পের বইয়ের মধ্যে। বাড়িতে সব গল্পগাছাই জমত নানা উপন্যাসের চরিত্র আর ইতিহাস নিয়ে। বাবা, কাকা সবাই। এই আবহাওয়ার গন্ধ শীতকালের কুয়াশার মতো বাড়ির কোনে কোনে দুলত সেজান, মাতিসের ছবির প্রিন্টের আশপাশে। পাড়ার বন্ধুদের সঙ্গে বল পেটানো, পার্কে ফুটবল কমে যায় দাড়ির রেখা গজানোর সঙ্গে সঙ্গে। নতুন–পুরনো বইয়ের গন্ধ আর ক্লাসিক্যাল মিউজিক। বাবার ঘরে অনেক রাতে বাজত বাখ কিংবা শ্যুবারট। নারকেলডাঙা খালধারের কাছেও যে একটা জীবন আছে এবং শ্রমিক বস্তির ফ্রি স্কুল,  চোলাইয়ের ঠে্‌ক, হাফগেরস্থ মেয়েছেলের মুরগির ছাঁটের ঝালের ব্যবসা একসঙ্গে পাশাপাশি চলছে, এমন জীবন অমলের কল্পনার বাইরে ছিল। ছবির এই উল্টো পিঠটা দেখায় বিষ্ণুদা। নারকেলডাঙা থেকে উল্টোডাঙা খালধার, হাওড়ার হাঁসখালি পোলের পাশে করাতকলের মিস্ত্রিদের সন্ধেবেলার কীর্তন আর গাঁজার আসরের দুনিয়া।

ইভনিং ক্লাসঘরে নীচু গলায় কথা হতো। নীচু গলা কেন? জিজ্ঞাসা করতে প্রথম দিনেই নিবারণদা বলেছিল ”আমরা কি ক্লাসের জন্যে মামাকে টাকা দিই? দিই না তো? তাহলে পুলিশ ছেড়ে দেবে?” সাট্টার ঠেক, বনমালীর বউয়ের ব্যবসা, সবার আলাদা রেট ঠিক করা আছে। বনমালীর বউ হাফগেরস্থ ছিল। খদ্দের না থাকলে মুরগির দোকানের ছাঁটের ঝোল বিক্রি করত। অনেকদিন মুখের সামনে অ্যালুমিনিয়ামের প্লেটে মুরগির ঝোল রেখে যেত। একটা কথাও বলত না। কিছুতেই পয়সাও নিত না। পড়ার ঘরে মাদুর পাতা ছিল নিবারণদার কাজ। শিয়ালদা স্টেশনের কাছে স্টোভ মেরামতি দোকানে কাজ করত। মন দিয়ে পড়ে আসত। প্রহ্লাদ দাসের কাজ ছিল চুল্লুর আর সাট্টার ঠেকে জল সাপ্লাই দেওয়া। নিবারণদা একদিন প্রহ্লাদদাকে বলল, ”চুল্লু আর সাট্টা ঠেকের কাজ ছেড়ে দে। রিকশাভ্যান জোগাড় কর। খেটে খা, না হলে লোকে আমাদের দেখে দাঁত কেলাবে। বলবে পার্টির ক্লাস করছে আবার চুল্লুও চলছে।” ওখানে তখন অমলরা রিকার্ডোর লেবার থিয়োরি বোঝানোর চেষ্টা করছে।

এই  জগতটা বাখের পিয়ানো কনচের্টো, সফক্লিসের থেসবিয়ান ট্র্যাজেডি থেকে এত উল্টো দিকে যে অমলের দিনকাল যেন  টাটকা শিশিরধোয়া জুঁই ফুল, ফ্রেঞ্চ উইন্ডো, বন্ধ কাচের জানলার ফিলটার রোদ্দুরে বসে  কাটছিল। হঠাৎ ওকে বিষ্ণুদা খোলা বাতাসে নর্দমার পাঁক, চোলাই আর জলন্ত বিড়ির আগুনের সামনে  বসিয়ে দেয়। শুধু সমাজকে নয়,  সবকিছুকেই যে সমাজ আর তার ইতিহাসের সম্পর্ক দিয়ে দেখা যায় এটার হাতেখড়ি সেই থেকে। এমনকি ভাষার সঙ্গে সমাজের সম্পর্ক তখন থেকে অমল বুঝতে শুরু করেছিল। বিষ্ণুদা বলত ”ঠিকে ঝি, ন্যাকামি করে যাদের কাজের মাসি বলা হয়, তাদের চটির কোয়ালিটি দিয়ে ইকনমি বুঝতে হবে।”

বিষ্ণুদা ছিয়াত্তরের এক সন্ধেবেলায় হারিয়ে যায়। কোনও খবর, এমনকি বডিও পাওয়া যায় না। অমলের দিনকাল, খালধার, চুল্লুর ঠেকের পাশে ইভনিং ক্লাসে রিকার্ডোর শ্রমতত্ত্ব পড়ানো থেকে আবার আলাদা হয়ে যায়। অমল ফিরে এসেছিল তার স্যোশিওলজি পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন,  ফ্রেঞ্চ পোস্ট ইম্প্রেশনিস্ট পেন্টিং,  ক্লাসিক্যাল মিউজিক, বইয়ের আলমারির জগতে। কিন্তু সেই পাঁক, কীর্তন, মিস্ত্রিবস্তির খাটা পায়খানা, তার ফুটো মগ, ছাপ রেখে গেল।  আর এইজন্যেই অমলবাবুর  কথা লেখা বিদগ্ধ মহলে স্থায়ী আসন পায়। তাঁকে ঘিরে শ্রদ্ধা মাখা মিথ তৈরি হয়েছে।

ফলে লিটল ম্যাগ আর কফিহাউসের আড্ডায় বলাবলি হয়। অমলবাবু বুঝতে পারেন মেদিনীপুরের  মুসলমানের ভাষা আর মালদহের মুসলমানের ভাষার ফারাক। পাঁচ মিনিট কথা বললে উনি নাকি  বসিরহাটের লঙ্কাওলা আর বাসন্তীর বেগুনউলি মাসির বাড়ি কোথায় বলতে পারেন। তার সঙ্গে আছে তাঁর প্রবাদপ্রতিম পাণ্ডিত্য, মেধা। এই জন্যই তাঁকে অ্যাকাডেমিক মাস মাপা প্রোজেক্ট সার্ভে করা অধ্যাপকদের থেকে  আলাদা করে সবাই দেখত।

কয়েক দিন পর আজ সন্ধেবেলা মধুর সঙ্গে কথা বলার খালি সময় পেয়েছিলেন। জানতে পারলেন পুজো নিয়ে পলিটিক্স নতুন বাঁক নিচ্ছে। লালদল রমণী চ্যাটার্জি লেনের বাজারের কালীপুজোটা দখলে রেখেছে। সবুজ–সাদারা তাই মনসা দিয়ে বাজার দখল করতে চাইছে। আগে শীতলা ছিল পক্সের দেবতা। ঠান্ডা পুজোর ঠাকুর। এখন সাপখোপ শহরে কমে গেছে। মনসাকেও ঠান্ডা পুজো দেওয়া শুরু হয়েছে। ঠান্ডা পুজোর মানে পাল্টে যাছে। মনে মনে হাসলেন। সার্ভে করে এসব পাওয়া যায়? লোকজনের সঙ্গে মিশতে হয়। ভাষাটা অ্যাকাডেমিক দুনিয়ার কোম্পানির কাগজ নয়।

বাড়ি ঢোকার সময় সন্ধের মুখে বউয়ের ফোন এল। পুনে থেকে। গত দু’মাস মেয়ের কাছে গেছে। একটা ফুটফুটে নাতনি হয়েছে। আরও দু’মাস থাকবে।

”কী গো কেমন আছ? সব ঠিকঠাক?”

”সব ঠিকঠাক।”

”সকালে রিনা ভাত, জলখাবার করে দিচ্ছে?  শোনো, কালকে সকালে রিনা এলে আমাকে ফোন কোরো তো।  কী করছে, ঘরদোর পরিষ্কার করছে কিনা দেখব। কথা বলব। বিছানার  চাদর,  বেডকভার কবে পাল্টেছে  মনে আছে তোমার?”

”এত উত্তর একসঙ্গে দেব কী করে?  এ তো র‍্যাপিড ফায়ার।”

”ওই তো মুশকিল! দিনরাত বই মুখে বসে থাকবে। কোনও নজর দেবে না। রাত্তিরের খাবার বাজারের ছেলেটা ঠিকঠাক দিয়ে যাচ্ছে?”

মেয়ে ফোনে এল। নাতনির গলার আওয়াজ শোনাবার চেষ্টা করল। মনটা দৈনন্দিন থেকে বেরোতে চাইছে।

   ”বাবা একটু আধটু রিল্যাক্স করছ, নাকি?  শোনো, টিভিতে  দেখলাম  অ্যাকাডেমিতে নতুন নাটক হচ্ছে অরবিন্দকে নিয়ে। আর একটা তোমার ফেভারিট সাবজেক্ট। ফোক ফর্মে। জসিমুদ্দিনের কাব্য নিয়ে। যাও। খালি বই মুখে বসে থাকা,  না হয় কলেজ স্ট্রিট যাদবপুরের সেমিনারে। একটু বাইরে এলে ভালোই লাগবে।”

”ঠিক আছে রে বাবা। রুদ্রকে কিংবা শ্বেতা – পারমিতা কারুকে বলব টিকিট কাটতে।”

মনে মনে হাসলেন। বইয়ের মধ্যে তিনি যে সত্যিই আরাম পান এটা বোঝে না।

মনে পড়ল, অনেকদিন নাটক দেখেননি। এককালে বন্ধুদের সঙ্গে নিয়মিত নাটক দেখা হত। তারপর বাড়ি ফেরার পথে জোর তর্ক। কতদিন আগের কথা? সেই বিষ্ণুদা থাকতে। আজও ইচ্ছে করে আবার রাজাবাজার খালধারে যাই। প্রহ্লাদ দাস ইভনিং স্কুলের পেছনে অনেক খেটেছিল। হয়তো এখনও থাকে। আবার যাওয়া শুরু করলে হয়। আরও মেঠো ভাষায় পলিটিক্যাল ইকনমি বোঝাতে পারবেন। কিন্তু হয় না, হয় না। রিনাকে তো একবার বলেওছিলেন, ওদের ৯নং লাটে যাবেন। স্কুলে পড়াবেন, গরমের ছুটিতে। স্পেশাল ক্লাসে। কিন্তু হয় না। বউ শুনে শুধু মুখ টিপে হাসে।

ফোন শেষ হতে হতে বাড়ির কাছে। পঞ্চু এখনও তার গুমটিতে ইস্ত্রি চালিয়ে যাচ্ছে।

”কী গো পঞ্চু খবর কী? কেমন সব চলছে?”

”কি বলব স্যার। এখন শেষ দুপুরেও শাক আনাজের দাম কমছে না। বাসস্ট্যান্ডের হোটেলগুলোও এখন পড়তি বাজারে মাল কিনতে আসছে।”

অমলবাবু মনে মনে হাসলেন। এই হচ্ছে ভাষার বৈচিত্র্য। খবর কী বললে একজন মধ্যবিত্ত  রাজনীতি, পার্টি,  ভোট এইসব বুঝবে। শেয়ার মার্কেটের দালাল স্টক মার্কেট বুঝবে। আর পঞ্চু রোজের বাজারের যন্ত্রণা বুঝবে। এটা কি আমেরিকান স্কুল শেখাবে?

বেশিক্ষণ দাঁড়ালেন না। তাঁকে অ্যাকাডেমি প্রথম বলতে বলেছে। সবচেয়ে সিনিয়র। একটু বই দেখতে হবে। সেমিনারকে কখনও অমল অবহেলা করেন না। সে প্রফেসর দিলীপ সেন থাকুন আর না থাকুন।

এই শনিবার রিনাকে তার মেয়েকে আনতে বারণ করলেন। কথা দিলেন পরের সপ্তাহ থেকে প্রতি সপ্তাহে দু’দিন অন্তত ওর পড়া দেখে দেবেন। মনটা একটু খারাপ লাগল। মেয়েটা পড়তে চাইছে, একটু হেল্প করা কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। কিন্তু সেমিনার! আগুনের ফুলকি ঠিকরে ওঠে বুদ্ধির ঠোকাঠুকিতে। পড়েছেন,  তর্ক করতে করতে লেনিনের মুখ বেঁকে যেত। কষে থুতু জমত। খেয়াল থাকত না। অবশ্য লেনিন কখনও অ্যাকাডেমিক সেমিনারে যাননি ।

  ৩

   সেমিনার তাঁকে এমন বাজে প্যাঁচে জড়াবে ভাবতে পারেননি। বুঝলে হয়তো যেতেনই না। অমলবাবু বক্তব্য রাখার পর দিলীপের ছাত্ররা টিম করে একের পর এক বক্তব্য রাখল। ঠিক শেষ ছাত্রর আগে দিলীপ স্টেজে উঠেছিল। পাক্কা আমেরিকান অ্যাকসেন্ট। সামনের সারি থেকে অল্পবয়েসি প্রফেসরদের ঘাড় নাড়া, গুঞ্জন। আবার পুরনো কায়দা – হঠাৎ মডারেটারের কাছে দু’মিনিটের অনুমতি চাওয়া। প্রথমে মজা লাগছিল। তারপরে বিরক্তি। এক ঢোল এক কাঁসি আর কত? তবে মনে মনে মানলেন, নাঃ, শোম্যানশিপটা শিখেছে। মনে পড়ছিল হরেকৃষ্ণ কোঙারের মেঠো বক্তৃতার ম্যানারিজম। স্টাইলের উল্টো পিঠ। সবাই কি বোঝে না! বোঝে, বোঝে।  কিন্তু অধ্যাপককুল  বিদেশি উচ্চারণকে সমীহ করে। এবং হ্যাঁ, বাইরের ইউনিভার্সিটিতে ভিজিটিং লেকচারারের ডলার। সুতরাং ঘাড় নাড়া। বাংলিশে সমর্থন মাখা প্রশ্ন। চলতে লাগল। চলতেই লাগল। অমলবাবু উঠে বাইরে ভাঁড়ে চা খেতে গেলেন। একটু পরে দিলীপ এল আর এসেই,  একদম সরাসরি, ”দাদা, যাঃ, এটা ঠিক হল না। আপনি না শুনে চলে এলেন! শুনুন আগামী সপ্তাহে আবার বাংলা অ্যাকাডেমি সভা ডেকেছে। আপনি তো থাকবেনই। টেনশন নেবেন না। এটা শুধু একটা মাথার কসরত। তার বেশি কিছু ভেবে আমার ওপর রেগে যাবেন না যেন। বাঘবন্দি খেলা। এরকম খেলা আপনার ভাল লাগে না?”

”মনে হচ্ছে বুড়ো হচ্ছি। অনেক তো হল।”

”ও কে। চলি। দেখা হচ্ছে। টেক কেয়ার।”

বাড়ি ফিরতে ফিরতে মাথা গরম লাগল। মাথা ঝাঁ ঝাঁ করতে শুরু করেছে। মিনিবাস তখন যাদবপুর  পেরিয়ে যোধপুর পার্ক ক্রসিংয়ে। আস্তে আস্তে রাগটা কমতে লাগল কন্ডাক্টর যখন ”পার্ক সার্কাস পার্ক সার্কাস” বলে চেঁচাচ্ছে। অনেকদিন পর লড়াইয়ের স্বাদ পেলেন। ইন্টেলেকচুয়াল ব্যাটল। সেই প্রফেসরি জীবনের প্রথমকালের মতো। অন্যদের চমকে দিতেন আধুনিক অ্যাকাডেমিক তত্ত্ব আর বাস্তব উদাহরণ মিশিয়ে। ততক্ষণে বাস এসে গিয়েছে বাড়ির স্টপে। ঠিক করলেন সেমিনারে যাবেন না। কোনও নামকরা, এক নম্বর পত্রিকাতে ছাপতে দেবেন। কাল সকালেই নতুন করে পড়াশোনা শুরু করবেন। একদম প্রফেসরি জীবনের প্রথম পেপার তৈরির উত্তেজনা। মনের মধ্যে আরবি ঘোড়া খটাখট আওয়াজ তুলছে।

সকালে তাড়াতাড়ি কাগজ পড়া, চা-জলখাবার শেষ করে বই আলাদা করতে শুরু করলেন। টেবিল, পড়ার ঘরের বুক সেল্ফ থেকে বই আলাদা করতে করতে মনে হল কোনও ফাঁক রাখবেন না। ভাষার সমাজতত্ত্ব যে অনেক জটিল এটা নিশ্ছিদ্র ভাবে বোঝাতে হবে। অনেক পুরনো বই,  ম্যাগাজিন আছে যা আর কারও কাছে নেই। দুস্প্রাপ্য। সেখান থেকে রেফারেন্স। পুরনো বই সব ভেতরের ঘরে আছে। চেয়ার নিয়ে ওপরের তাকের বই পাড়তে গেলেন। চেয়ারে উঠে বই পাড়তে অসুবিধে হচ্ছে। দুটো ম্যাগাজিন তলায় পড়ে গেল। কতদিন ধুলো পরিষ্কার হয়নি। মাকড়শার জাল। বই সব আধঝোলা হয়ে বেরিয়ে আছে।

নাঃ থাক, রিনা এলে ওকে দিয়ে পাড়াব।

মাটিতে বসে তলার তাকের বই দেখতে শুরু করলেন। অনেকদিন পর।

কত পুরনো বই! কিছু প্রেসিডেন্সির দেওয়াল থেকে কেনা, কিছু মেডিকেল কলেজের ফুটপাথ থেকে। চোখে পড়ে গেল পুরনো পাঁজি, বৈঠকখানা বাজার আর দপ্তরিপাড়ায় পাওয়া যেত একমাত্র।

চোখের সামনে, কিভাবে লেখাটা সাজাবেন ভেসে উঠতে শুরু করল। আস্তে আস্তে অমলবাবু চিন্তার মধ্যে মগ্ন হতে লাগলেন।

হঠাৎ ওপর থেকে মোটা ম্যাগাজিন মাথার ওপর পড়ল, আলমারির মাথা থেকে। তারপর দুটো বই, ওপরের প্রথম তাক থেকে। হার্ড কভার। ঝরঝর করে বই পড়তে লাগল। পুরনো আলমারির তাক কি খুলে গেল? দু’পুরুষের কালেকশন। যেন তুষার হিমবাহ ঢেকে ফেলছে। অজস্র বইয়ের ক্লাউড বার্স্ট। পাহাড় হয়ে মাথা ছাড়িয়ে গেছে। অমল উঠতে, দাঁড়াতে পারছেন না। গলা শুকিয়ে যাচ্ছে। মোবাইল ফোনও হাতের কাছে নেই। দরজাও বন্ধ। ঘামতে শুরু করছেন। কতক্ষণ সময় কেটে যাচ্ছে বুঝতে পারছেন না। বসে থাকতে পারছেন না। অসহ্য পিঠব্যথা। বইয়ের ওপরেই শরীর এলিয়ে শুয়ে পড়লেন। কালী সিংহীর মহাভারতের ভীষ্মের শরশয্যার ছবিটা হঠাৎ ভেসে উঠল চোখের ওপর।

কতক্ষণ, কে জানে! বাইরের দরজায় বেল টেপার আওয়াজ এল। সঙ্গে রিনার গলা ”ও দাদু, দরজা খোলো।”

অমলবাবুর গলা থেকে প্রথমে শব্দ বেরোলো না । তারপর কোনও ভাবে ভাঙা ভাঙা স্বরে বললেন, ”রিনা আমি মাটিতে আধশোয়া হয়ে আছি। ঘাড়ে–মাথায় বই পড়ে গেছে। উঠতে পারছি না।”

রিনা চিৎকার করল ”সে কী গো, কী হবে?”   এই বলে দরজায় ধাক্কা মারতে মারতে খোলা রাস্তার দিকে তাকিয়ে রিনা চেঁচাল ”ও মধুদা, পঞ্চুদা একবার এসো, দাদুর ঘাড়ে–মাথায় বই পড়ে গেছে। দাঁড়াতে পারছে না। একবার এসো। দ্যাখো দরজা ভাঙতে হয় কিনা।”

”সে কী রে, দাঁড়া, আসছি।”

মধু, পঞ্চু লুঙ্গি মালকোঁচা মারতে শুরু করল।

          চিত্রকর: মৃণাল শীল

Comments are closed.