সোমবার, অক্টোবর ২১

ভক্তা

উজ্জ্বল রায়

“কি রে তুই বাপি লোস?”

ফাঁক ফাঁক হলুদ দাঁত বের করে আমার দিকে তাকিয়ে হাসল লোকটা। চোখে মুখে কৌতুকের ছটা।

লোকটির বয়স আমার মতোই হবে। পঞ্চাশের কাছাকাছি। বরং দু’এক বছর ছোট হলেও হতে পারে। পরনে ধুতির ওপর হাফ-হাতা পাঞ্জাবি। কিছুটা মলিন। বেঁটে-খাটো চেহারা। মাথায় ছোট করে ছাঁটা চুল। ডান হাতে কালো ব্যান্ডের রিস্ট-ওয়াচ।

অলসভাবে সমুদ্রের জলে পা ভিজিয়ে হাঁটছিলাম আমরা দু’জনে। আমি আর মনো। মনোরমা, আমার স্ত্রী। বাকিরা, মানে আমার বন্ধু তমাল আর ওর স্ত্রী ঈশিতা আর মনো’র বন্ধু সায়ন্তিনী আর তার হাজব্যান্ড প্রদীপবাবু, হোটেলই রয়ে গেছে।

অনেকদিন পর একটু বেড়াতে আসা। কাজের চাপে আমাদের দু’জনেরই সময় হয় না কোথাও বেরনোর। যার যার ছেলে-মেয়েরা সব বড় হয়ে গেছে। সবাই নিজের নিজের কাজে ব্যস্ত। আমরা বন্ধুরা তাই প্ল্যান করে একসঙ্গে এসেছি বেড়াতে।

সকালবেলা মাছভাজা সহযোগে বিয়ার খেয়ে খুব একপ্রস্থ স্নান হয়েছে সমুদ্রের জলে। তারপর দুপুরে খেয়ে-দেয়ে টেনে একটা ঘুম দেবার পর এই সবে বেরিয়েছি। কিছুক্ষণ হল সূর্য ডুবেছে। আকাশ একটু একটু করে কালো হতে শুরু করেছে। সমুদ্রের জল একটু একটু করে বাড়ছে। আমরাও একটু একটু করে পিছিয়ে আসছি।

লোকটার কথা শুনে আমি দাঁড়িয়ে পড়ি। খানিকটা বিরক্তও বোধ করি। এইরকম মনোরম পরিবেশে হঠাৎ ভূতের মতো উদয় হয়ে লোকটা আমার মুডটাই নষ্ট করে দিল। ভুরু কুঁচকে তাকাই লোকটির দিকে। কেমন যেন চেনা চেনা মনে হল মুখটা।

আমার বিরক্তির আরও একটা বড় কারণ হল, এরকম একটা বাজে ধরনের চেহারার লোক আমাকে ‘তুই’ বলল বলে। যেন আমরা কতদিনের পুরনো বন্ধু! আমাকে ‘তুই’ বলে ডাকা লোক এখন পৃথিবীতে গুটিকয় জন মাত্র বেঁচে আছে। তার মধ্যে সবাই আমার খুবই নিকটাত্মীয় ও প্রিয়জন। তাছাড়া ঘরের দু’একজন ছাড়া আমার ‘বাপি’ নামটাও কেউ জানে না। সব মিলিয়ে বেশ অস্বস্তি হল আমার। রাগও হল প্রচণ্ড।

আমাকে অমন বোকার মতো হাঁ করে তাকিয়ে থাকতে দেখে লোকটা ফের দাঁত বের করে হাসল। “আমাকে চিনতে পারচু নি? আমি ভক্তা রে, ভক্তা।”

আমি ভেতরে ভেতরে একটু নড়ে-চড়ে বসলাম।

ঝপ্‌ করে একটা ঢেউ এসে আমার পাজামাটা ভিজিয়ে দিয়ে গেল। আমি দু’পা পিছিয়ে এসে বিস্ময় প্রকাশ করে বললাম, “ভক্তা! না না এই নামে আমি কাউকে চিনি না। আপনি কোথাও ভুল করছেন।”

লোকটা আমার চেয়ে দু’গুণ বেশি বিস্ময় প্রকাশ করে বলল, “তুই আমায় আপনি বলচু কী রে? তদের বাড়ির বাগাল ছিনু যে রে আমি…. ছেলেবেলায় তরা গরমের ছুটিতে বাড়ি এলে গোরু বাঁধতে গিয়ে মাটে আমরা একসঙে কত খেলেচি ধুজনে…. বোস্‌টুমি ঠাগ্‌মাকে মনে লেই তর? আমি তার লাতি রে, ভক্তা!”

মনো আমার মুখের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে। সম্ভবত ও আমার রিঅ্যাকশন কী হতে পারে ভাবছিল। ভয় পাচ্ছিল, এই বোধহয় কিছু একটা বিস্ফোরণ ঘটল বলে! আমার মতো একজন টপ র‍্যাঙ্কের এগ্‌জিকিউটিভ… সাধারণ লোকেরা যার চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে কথা বলতে সংকোচ বোধ করে, তাকে এমন নির্দ্ধিধায় এরকম একটা মামুলি ছোটলোক যে ‘তুই’ বলে ডাকতে পারে, মনো বোধহয় স্বপ্নেও কোনওদিন ভাবেনি। মনোর মুখের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে আমার অস্বস্তি দ্বিগুণ বেড়ে গেল। আমি লোকটার ঔদ্ধত্য দেখে ভীষণ রেগে গেলাম।

আমরা বালি ভেঙে ওপরের দিকে উঠে এলাম। আমার একপাশে মনো আর একপাশে লোকটা হাঁটছিল। লোকটা একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছিল। হাঁটতে হাঁটতে সে বিস্মিত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল, “তর বাড়ি সাত্‌খণ্ডে লয়? তুই গৌরদাদুর লাতি লোস?”

লোকটা আচ্ছা নাছোড়বান্দা তো! আমি গভীরভাবে দু’দিকে মাথা নেড়ে বললাম, “না, না। বলছি তো আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে। আমি বাপিও না, আমার দাদুর নাম গৌরও না। আর ওই কী একটা জায়গার নাম বললেন, সেই জায়গায় আমার বাড়িও না। আমি থাকি কলকাতায়। ঢাকুরিয়ায়।”

লোকটা আমার মাথা নাড়া দেখে ঘাবড়ে গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওর শরীরটা কুঁচকে এতটুকু হয়ে গেছে। মনোও বোধহয় বুঝতে পেরেছে কোথাও একটা গন্ডগোল হচ্ছে। আমার বাঁ হাতটা চেপে ধরে ও টানে। ইশারায় সরে আসতে বলে। আমি যথেষ্ট রেগে গেলেও কোনওরকমে নিজেকে সংযত করি। ঠান্ডা গলায় লোকটিকে বললাম, “এরকম ভুল অনেকেরই হয়ে থাকে। ঠিক আছে, এখন আসুন। আমরা একটু বাজারের দিকে যাব।”

বাজারের কাছে এসে মনো বলল, “লোকটা অদ্ভুত না?  কী করে ও তোমার এত সব নাড়ি নক্ষত্র জানলো বলো তো? তুমি একটু ভালো করে মনে করে দ্যাখ….

মনো কি আমায় সন্দেহ করছে? ওর সন্দেহ কাটানোর জন্য আমি সহজ গলায় বললাম, “আরে এসব জায়গায় কত ঠগ জোচ্চোর ঘুরে বেড়ায় জানো? এ সব টুরিস্ট স্পট…. লোকেরা এখানে আসে একটু এনজয় করতে, রিল্যাক্স করতে…. সেই ফাঁকে এই শালারা ঠকিয়ে বেড়ায়। যতসব ধান্দাবাজ লোক এরা। তুমি এদের চেনো না।”

“কী রকম ধান্দাবাজ? ধরো লোকটাকে যদি তুমি চিনতেই পারতে, তাতে ওর কী লাভ হত?”

“লাভ হত বৈকি। প্রথমে সেন্টিমেন্টে সুড়সুড়ি দিত, তারপর ইনিয়ে-বিনিয়ে নিজের দুঃখের কথা বলত…. বৌ-এর অসুখ, কী ছেলেমেয়েদের পড়াশোনার খরচ, এইসব বলে শেষে হাত পাততো… এটাই ওদের ধান্দা। আবার কী!” বলে,  আমি হাত আড়াল করে লাইটার জ্বালিয়ে একটা সিগারেট ধরালাম।

কেন জানি না, হোটেলে ফিরে এসে সান্ধ্য মদের আড্ডায় আমি ঠিক এনজয় পারলাম না। দু’পেগ খেয়ে বাইরে বারান্দায় এসে দাঁড়ালাম।

সমুদ্র এখন অনেকখানি এগিয়ে এসেছে। উত্তাল ঢেউয়ের গর্জন শোনা যাচ্ছে। জলের রঙ ঘন কৃষ্ণবর্ণ। আছড়ে পড়া ঢেউয়ের সাদা ফেনা বালির ওপর আলপনা এঁকে যাচ্ছে। বেশ কিছু অতি উৎসাহী ও সাহসী ছেলেমেয়েরা এখনও সমুদ্রের জল মাড়িয়ে মাড়িয়ে হাঁটছে।

আমি একটা সিগারেট ধরালাম।

…কতদিন বাদে দাদুর নামটা শুনলাম। গৌরহরি। মনো’র এই নামটা জানার কথা নয়। জানেও না। কতদিন হল মারা গেছে দাদু। এখন অনেক কষ্ট করেও দাদুকে মনে পড়ে না। আবছা আবছা ভাসে মাত্র। আমার এই ব্যস্ত জটিল জীবনে দাদুর প্রয়োজন কবে ফুরিয়েছে। অথচ একসময় এই দাদু ছিল আমার প্রাণ। কী ভালই না বাসত আমায় দাদু! ….দাদু যখন মারা যায়, আমি তখন দিল্লিতে। সবে নতুন চাকরিতে জয়েন করেছি। ছুটি পাইনি। খবরও পেয়েছিলাম অনেক দেরিতে। তখন তো এত ভালো কমিউনিকেশন ছিল না। তার ওপর বৃটিশ কোম্পানি। রোজ দাড়ি কেটে অফিস যাওয়া ছিল বাধ্যতামূলক। থাকতামও মেসে। আমার জন্য কে আর আলাদা করে নিরামিষ রেঁধে দেবে! কাজেই অশৌচ পালন করা হয়নি। মনে আছে চাকরির প্রথম মাইনে পেয়ে দাদুকে একটা ধুতি আর পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছিলাম। কতদিন সাতখন্ডে যাইনি। দেশের বাড়ি। তিনতলা মাটির বাড়ি। লাল রঙ করা টিনের চাল। ঠাকুমা, বড়পিসি। গোয়াল ঘরে দু’হাঁটুর মধ্যে বালতি চেপে বসে বড়পিসির দুধ দোয়ানো…. কালো পাথরের থালায় ঠাকুমার সর মাড়া। ঘোল।  ঘোল দিয়ে মুড়ি মেখে খাওয়া, সঙ্গে আখের গুড়….. পোয়াল ছাতুর বাটি চচ্চড়ি। গুগলির ঝাল। কে জানে দেশের বাড়ির এখন কী হাল! ভেঙেই পড়েছে হয়ত!

মনটা বিষণ্ন হয়ে গেল।

ভক্তা ছিল আমাদের বাড়ির বাগাল। ওর কাজ ছিল রোজ সকালে এসে আমাদের গোরুগুলোকে মাঠে নিয়ে যাওয়া। ফিরে এসে গোয়াল ঘর পরিস্কার করা। খড় কেটে গোরুগুলোকে জাবনা দেওয়া। ঘুঁটে পুড়িয়ে মশা তাড়ানো। আমরা যখন ছুটিতে দেশের বাড়ি যেতাম, আমার চব্বিশ ঘন্টার খেলার সাথি ছিল ভক্তা। আমি ওর গায়ে এঁটুলির মতো লেগে থাকতাম। ওর সঙ্গে গোরু চরানো থেকে শুরু করে খড় কাটা, জাবনা দেওয়া, কী না করেছি। এই ভক্তাই ছিল আমার প্রথম যৌন শিক্ষক। গোরু চরাতে গিয়ে তালবাগানের মাঠে বসে বসে কী সব রোমহর্ষক যৌন কাহিনি শোনাত ভক্তা। আমি খিল খিল করে হেসে গড়িয়ে পড়তাম ওর গায়ে। উত্তেজনায় কান গরম হয়ে যেত।

ভক্তার মা বাবা ছিল না। অনেক ছোটো বয়েসে মারা গিয়েছিল। ভক্তা থাকত ওর ঠাকুমার কাছে। আমরা সবাই ওকে বোষ্টুমি ঠাকুমা বলে ডাকতাম। থাকত গ্রামের এক টেরেয় একটা ছোট্ট কুঁড়েতে। দু’হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে একমনে মাটির পুতুল বানিয়ে যেত। শুকিয়ে গেলে খড়ি গুলে রাঙাত পুতুলগুলোকে। ওইরকম দুই বাহু দুই দিকে প্রসারিত টিকালো নাকওলা পুতুল আমি আর জীবনে কাউকে বানাতে দেখিনি। কোথাও দেখিও না বিক্রি হতে।

দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে আমার চোখের সামনে আমার কৈশোর হেঁটে চলে বেড়াতে লাগল। ….সাতখণ্ড, খাটুল বাজার, বামনাকুলির শ্মশান, পোস্টাপিসের ডাকিয়া ফেলু কাকু, ডাক্তারদাদুর ডিসপেনসারি, দধিবামুনের মন্দির, বলাপদ্মা, অর্জুন আর বাঁশঝাড়…

ভক্তার কাছে নিজের পরিচয় গোপন করে এখন কেমন ছোট মনে হচ্ছে নিজেকে।

ঘরের ভেতর থেকে প্রদীপবাবুর গান ভেসে আসছে। চমৎকার গান গান ভদ্রলোক। ভরাট গলা। ….সুনীল সাগরে পাঠালে আমায় ঝিনুক কুড়োতে তাই/ তুমি বলেছিলে…..

এমনসময় পেছন থেকে সায়ন্তিনী এসে ডাকল। “কী ব্যাপার উজ্জ্বলদা, একা একা এখানে দাঁড়িয়ে? ঘরে চলুন। ও কেমন সুন্দর গান গাইছে…..

আমি আমার কৈশোরকে এক ঝটকায় সরিয়ে সহজ গলায় বললাম, “হ্যাঁ চলো। প্রদীপবাবু আজ আসর জমিয়ে দিয়েছেন মনে হচ্ছে। যাই বলো, তোমার কত্তাটির কিন্তু গড গিফিটেড গলা! হারমোনিয়ম ছাড়াই কী অসাধারণ গাইছেন! তুমি যাও, আমি সিগারেটটা শেষ করেই আসছি।”

“কেন আমি পাশে থাকলে আপত্তি আছে?” বলে, হাসল সায়ন্তিনী।

মনো’র যে ক’জন স্কুল ফ্রেন্ডের সঙ্গে এখনও সম্পর্ক রয়ে গেছে, তার মধ্যে সায়ন্তিনী অন্যতম। ওরা সব পুনের লোহেগাঁও-এ এক সঙ্গে থাকত। একই সঙ্গে কে.ভিতে পড়াশোনা করেছে। বছরে একবার কোথাও না কোথাও ওরা মিট করে। তখন সারাদিন শুধু চুটিয়ে আড্ডা মারে। সায়ন্তিনীকে দেখতে মন্দ নয়। একটু চাপা রঙ, কিন্তু মুখখানা মিষ্টি।

আমি তুড়ি মেরে সিগারেটের ছাই ফেলে বললাম, “কী যে বলো, ইটস মাই প্লেজার! তবে প্রদীপবাবুকে সামলাতে পারবে তো, উনি তোমার যা ন্যাওটা! দেখবে এক্ষুনি হয়ত গান থামিয়ে বৌ খুঁজতে বেরিয়েছেন।”

এইকথায় আমি আর সায়ন্তিনী দু’জনেই হো হো করে হেসে উঠলাম।

ঠিক সেইসময় মনো এসে হাজির। “কী ব্যাপার, দু’জনে মিলে কী এত হাসির কথা হচ্ছে শুনি?”

“ওই…, আমার বরকে বলছিলেন আপনি, আর দেখুন আপনার গোয়েন্দা গিন্নি এসে হাজির।” সায়ন্তিনী ফুট কাটে।

“আহা, গোয়েন্দা গিন্নির কী হল? আমি দেখতে এলাম উজ্জ্বল হঠাৎ উঠে গেল কোথায়!”

“তোকে ছেড়ে যাবে কোথায়! সে মুরোদ আছে নাকি ওনার? … গান গাইছে বলে আমি উজ্জ্বলদাকে ডাকতে এসেছিলাম। আমি যাই…তোরা আয়। দেরি করিস না।”

সায়ন্তিনী চলে গেলে মনো আমার গা ঘেঁসে দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করল, “একা একা এখানে দাঁড়িয়ে কী ভাবছ? হঠাৎ উঠে চলে এলে?  জানোই তো প্রদীপবাবু কেমন ইমোশানাল টাইপের লোক… উনি গান গাইছেন আর তুমি উঠে চলে এলে… চলো চলো। তুমি তো আর ড্রিংকস্‌ও নিলে না। শরীর ঠিক আছে তো?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ সব ঠিক আছে। তুমি ঘরে গিয়ে বোসো না, আমি আসছি।” আমার কথায় বোধহয় উষ্মা প্রকাশ পেয়েছিল। মনো আমার দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে বলল, “আই অ্যাম অ্যাফ্রেড, ইউ লুক বিট ডিস্টার্বড। ওই লোকটার কথা ভাবছিলে নাকি?”

ভাবলাম ভক্তার কথাটা জানিয়েই দি মনোকে। কিন্তু কী যেন এক গভীর সংকোচে বলতে পারলাম না। গম্ভীর গলায় বললাম, “কারুর কথাই ভাবছি না। আই অ্যাম ওকে। অন্ধকারে সমুদ্রের রূপ দেখছি। বাইরে বেশ হাওয়া। ঘরের মধ্যে সাফোকেটেড লাগছিল। চলো।” বলে আমি সিগারেটটা ফেলে দিয়ে ঘরে এসে বসলাম।

সকালবেলা আমার ঘুম ভাঙল অনেক ভোরে। মনো তখন অকাতরে ঘুমচ্ছে। ভোরে ওঠা আমার অভ্যেস। শরীরের কারণেই আমায় রোজ মর্নিংওয়াকে বেরতে হয়। গায়ে পাজামা পাঞ্জাবি চড়িয়ে বেরিয়ে পড়লাম। তখনও আকাশের কালো ভাব কাটেনি। তারাগুলো জ্বলজ্বল করছে। একটু পরেই সূর্যোদয় হবে। একেই বলে বোধহয় ব্রাহ্মমুহূর্ত। হোটেল ছেড়ে অনেকেই বেরিয়ে পড়েছে সানরাইজ দেখতে। বিচে লোক গিজগিজ করছে। এত চেঁচামেচি সহ্য হচ্ছিল না আমার। বেশ খানিকটা সামনে এগিয়ে গেলাম আমি।

এখন সমুদ্র অনেক পেছিয়ে। রাতে জোয়ারের জল অনেকখানি উঠে এসেছিল ওপরে। তাই বালুতট এখনও ভিজে। বেশ কিছু ডাবের খোলা, সিগারেট ও পান পরাগের প্যাকেট পড়ে আছে বিচের যত্রতত্র। আমরা যে কবে পরিবেশ সচেতন হব!

কোলাহল থেকে কিছুটা দূরে, একটু ফাঁকা মতো জায়গায় এসে দেখি, ভক্তা বসে। হাতে বিড়ি। সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে। আমি থমকে দাঁড়ালাম। ভক্তা তখনও আমায় দেখতে পায়নি।

সূর্য উঠব উঠব করছে। আকাশ একটু একটু করে রঙ পালটাচ্ছে। কী অপার্থিব দৃশ্য! এইসব মুহূর্তে মানুষের মনে বোধহয় কোনও পাপ বোধ জন্মায় না। কঠিন নাস্তিকেরাও বোধহয় অনেকে মনে করেন নিজেকে ঈশ্বরের সন্তান। ভক্তাকে দেখে আমার মধ্যে গতকালের ঘটনাটা পিন ফোটাতে লাগল। একবার মনে হল ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াই। পরমুহূর্তেই ভাবলাম, না থাক, এইসব লোককে পাত্তা দিলেই শালারা মাথায় চড়ে বসে।

অথচ ওর কাছে জমা আছে আমার দেশের স্মৃতি…. দাদু, বোষ্টুমি ঠাকুমা, মাটির পুতুল। ওর গায়ের ঘামে মিশে আছে আমার কৈশোর। আমার যৌবনের মিষ্টি কাম-গন্ধ!

ভক্তা আমাকে দেখে কি চমকে উঠল? না কি ভয় পেল? দেখলাম, ও উঠে উলটো দিকে হাঁটা শুরু করেছে। আমি ছুটে গিয়ে ওকে পেছন থেকে ডাকলাম, “এই ভক্তা দাঁড়া, কোথায় যাচ্ছিস?”

ভক্তা তবু  দাঁড়াল না। আমি আর একটু জোরে হেঁটে ওকে ধরে ফেললাম। ওর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বললাম, “কী রে ডাকছি তোকে, শুনতে পাচ্ছিস না?”

ও মুখ নিচু করে বলল, “আমি ভক্তা নই।”

বুঝলাম ওর খুব অভিমান হয়েছে। আমি নিজেকে খানিকটা ডিফেন্ড করার চেষ্টা করে বললাম, “না রে, আসলে কাল আমি তোকে সত্যি চিনতে পারিনি। বিশ্বাস কর। পরে রাত্রেবেলা শুয়ে…

ভক্তা একটুখানি হাসল। “আমি জানি, বৌ-এর সামনে আমার পারা ছোটোলোক মানষের পরিচয় দিতে তোর সরমে লাগছিল, লয়? তুই এখন সাহেব হয়ে গেচু। কত বড় মনিষ্যি। কত পয়সা। দেশের কতা মনে থাকবে ক্যানে? আমার পারা ছোটোলোক…”

ভক্তা এখন ছুঁচ ফুটিয়ে কথা বলছে। আমার রেগে যাওয়ারই কথা। তবু আমি রাগলাম না। আমি এসব অস্বস্তিকর প্রশ্ন এড়াবার জন্য ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুই এখানে কী করিস ভক্তা? পায়ে কী হয়েছে তোর? আগে তো এমন খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটতিস না!”

“অ্যাকসিডেন হয়েছিল। লরিতে লরিতে। আমি ত্যাখন খালাসি ছিনু। সে অনেককাল আগের কতা। মরেই যেতুম। খুব বাঁচান বেঁচে গেছি। গরিবের প্রাণ কই মাচের জান! মরে গেলে কী ক্ষেতি ছিল আমার!”

“কেন বিয়ে থা করিসনি?”

“আমারে কে মেয়ে দেবে! চাল নেই চুলো নেই, তারওপর খোঁড়া। কবে মা বাপ খেয়ে বসে আছি। ঠাগমা বেঁচে থাগলে তা-ও না হয় ছিল।”

“তো এখানে কী করিস?”

“হোটেলে কাজ করি। ওই বাসন ধোয়া, কুটনো কাটা, ঘরে ঘরে জলের বোতল রেখে আসা, ফাইফরমাস খাটা। কাল তোকে দেকছিনু সন্দেবেলা বারান্ডায় ডাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকচিলি।”

“তুই কি আমাদের হোটেলের সামনে ঘোরাঘুরি করছিলিস নাকি?” আমি বেশ ভয় পেয়ে যাই।

“না না, ঘুরব ক্যানে। ওখানেই তো আমি থাকি। সানরাইজ হোটেলে। ওই ক্ষণিকের তরে বেরিয়েছিনু। তখন তোকে দেকনু।”

কথা বলতে বলতে ভক্তা পকেট থেকে বিড়ি আর দেশলাই বের করে ধরাতে গেলে, আমি আদুরে গলায় বললাম, “বিড়িটা রাখ এখন। এটা নে…” বলে, আমি আমার সিগারেটের প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট বার করে ওকে দিলাম।

ভক্তা সিগারেটটা দেখে বলল, “ও বাবা, এ যে খুব দামি সিগ্রেট রে। থাক আমার বিড়িই ভাল।”

আমি ওকে মিষ্টি ধমক দিয়ে বললাম, “নে তো! বেশি পাকামো করিস না।”

সূর্য কখন সমুদ্রের গর্ভ থেকে লাফিয়ে উঠে পড়েছে খেয়াল করিনি। আকাশ এখন খড়ির মতো সাদা। হাঁটতে হাঁটতে আমরা হোটেলের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছিলাম। আমি একবার চট করে নজর বুলিয়ে দেখে নিলাম হোটেলের বারান্দায় মনো কিংবা অন্য কেউ দাঁড়িয়ে আছে কিনা। দেখলাম, না, কেউ নেই।

ভক্তা সিগারেটটা হাতে নিয়ে বলল, “থাক এখুন এটা। পরে খাব। তুই খুব বড় চাকরি করিস বাপি লয়?”

আমি মনে মনে প্রমাদ গুনি। ভক্তা নিশ্চয়ই এবার একটা চাকরির জন্য বায়না ধরবে। দেখলাম না, ও সে-সবের ধার দিয়ে গেল না। সিগারেটটা যত্ন করে পকেটে রেখে দিল। আমার কেমন যেন মায়া হল। ভক্তার হাতে আর একটা সিগারেট দিয়ে বললাম, “এই নে। ওটা যেমন রেখেছিস রেখে দে। এখন এটা ধরা।”

ভক্তার মুখটা প্রসন্নতায় ছেয়ে গেল। মনে হল, খুব খুশি হয়েছে। সূর্যের হলুদ বর্ণে ওর মুখমণ্ডল উজ্জ্বল হয়ে উঠল। খুব হাওয়া দিচ্ছিল। সিগারেটটা ধরাতে ভক্তার দু–দু’টো কাঠি নষ্ট হল। তারপর কোনওরকমে ধরিয়ে, কষে একটা টান মারল।

আমার মাথায় তখন অন্য এক চিন্তা পাক খাচ্ছিল। বলা যেতে পারে, দুশ্চিন্তা। আমি ভক্তাকে বললাম, “দাঁড়া এখানে। আর এগোস না।”

তারপর পাঞ্জাবির পকেট থেকে পার্স বের করে, তার থেকে একটা পাঁচশ টাকার নোট ভক্তার সামনে বাড়িয়ে ধরে বললাম, “এই নে, এটা রাখ।”

ভক্তা অবাক হয়ে আমার দিকে বোকার মতো চেয়ে লজ্জা লজ্জা মুখ করে বলল, “এটা আবার ক্যানে!” ওর হলুদ দাঁতের ফাঁক গলে লোভী হাসি গড়িয়ে পড়ছিল।

আমি কর্মক্ষেত্রে গলায় যেমন গাম্ভীর্য এনে কথা বলি, তেমনি গাঢ় স্বরে বললাম, “আমি এখানে আরও ক’টা দিন থাকব ভক্তা বুঝলি। এর মধ্যে তোর সঙ্গে আমার আর দেখা না হওয়াই ভালো। যদি বাইচান্স দেখা হয়েও যায়, তো খবরদার, আমায় বাপি-টাপি বলে ডাকবি না। কী, কথাটা মনে থাকবে? এই যে, তোর সঙ্গে আমার আজ দেখা হল, এত কথাবার্তা হল, এসব ভুলে যা। আমরা কেউ কাউকে চিনি না। কেমন? ব্যাপারটা মাথায় গেল? এখন যা। আমি হোটেলে ফিরব।”

এই নরম সূর্যের আলোয় দেখলাম ভক্তার মুখটা কেমন যেন উঠের মতো ঝুলে পড়ল। টাকাটা নেবার জন্য ও হাত বাড়িয়েছিল। গুটিয়ে নিল। আমার মুখের দিকে কেমন অবাক হয়ে চেয়ে রইল কিছুক্ষণ। তারপর পিচিক করে বালির ওপর একটু থুতু ফেলে বলল, “এই কতা? তা আগে ক’বি তো! যা তুই লিশ্চিন্তে হোটেলে যা। এর জন্যে ঘুষ দিতে হবেনিকো।” সমুদ্রের জলে পা ভিজিয়ে ছপ ছপ করতে করতে চলে গেল ভক্তা। কিছুদূর গিয়ে আমার দেওয়া সিগারেটটা ছুড়ে ফেলে দিল জলে। ঢেউ-এর মাথায় নাচতে নাচতে সিগারেটটা আমার দিকে তেড়ে আসছিল।

চিত্রকর: মৃণাল শীল

Comments are closed.